১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মসজিদের জায়গাও রক্ষা পায়নি: দখল
২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
ধোলাই খাল ভরাট করে দখল করা হয়েছে অনেক আগেই। রাস্তার পাশে সরকারের যেসব ডোবা জমি ছিল সেগুলোও দখলদারদের পেটে গেছে। দখলদারদের হাত থেকে রক্ষা পায়নি মসজিদও। সূত্রাপুরের শতবর্ষী হায়াৎ বেপারী মসজিদের কোটি টাকার জমি দখলে মৃত ব্যক্তিকে জীবিত দেখানো হয়েছে।
 
 
খোদ পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, মৃত মালিককে জীবিত দেখিয়ে জাল দলিলের মাধ্যমে মসজিদের জমি দখল করেছেন রাজধানী সুপার মার্কেট মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি আশরাফ উদ্দিন। তদন্ত হলেও বেদখল হয়ে যাওয়া জমি উদ্ধার হয়নি। বরং রাতারাতি ওই জমিতে তোলা হয়েছে দোকানপাট।
 
 
এখন আবার মসজিদের মালিকানাধীন কারখানা থেকে ভাড়াটিয়াদের উচ্ছেদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।
 
 
সূত্রাপুরের হৃষিকেশ দাস লেনে হানিফ স্টিল মিলের পাশেই হায়াত বেপারী মসজিদ। ১৮৯০ সালে মসজিদটি নির্মাণ করেন স্থানীয় ব্যবসায়ী হায়াৎ বেপারী। মসজিদের পেছনে ছিল চার দশমিক ১৬ শতাংশ খোলা জায়গা। এ জমির একাংশে ছিল অজুখানা ও মসজিদের মালিকানাধীন তিনটি কারখানা ঘর। কারখানার ভাড়ায় মসজিদের ব্যয় নির্বাহ করা হতো। অজুখানাটি দখলদাররা ভেঙে ফেললেও একটি কারখানা এখনও টিকে আছে। অজুখানার পরেই ছিল সিটি করপোরেশনের মালিকানাধীন এক একর ৭০ শতাংশ ডোবা জমি। সরেজমিনে দেখা যায়, এ জমি ভরাট করে ট্রাক টার্মিনাল ও দোকানঘর নির্মাণ করা হয়েছে।
 
 
স্থানীয়রা জানান, অজুখানা ও কারখানা ঘর ছিল ব্যক্তি মালিকানাধীন। মসজিদের পাশেই ছিল ধনাঢ্য ব্যবসায়ী খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশিদের বাড়ি। তার জমিতেই মসজিদের অজুখানা নির্মাণ করা হয় সত্তরের দশকে। মসজিদের দলিল থেকে জানা যায়, খান বাহাদুর কাজী আবদুর রশিদের মেয়ে জোবেদা মমতাজ আরা রহমান ২০০৪ সালে অজুখানার এক দশমিক ৩৫ শতাংশ জমিটি মসজিদকে দান করে দেন। অজুখানা নির্মাণের জন্য ২০১০ সালে তিনি মসজিদকে ৬৪ অযুতাংশ জমি দেন। পাশাপাশি অবস্থিত দুটি জমিই দখল হয়ে গেছে।
 
 
গত শুক্র ও শনিবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, মসজিদের পশ্চিম পাশে যেখানে অজুখানা ছিল, সেখানে হয়েছে লেদ কারাখানা। শ্রমিকরা জানান, এর মালিক আশরাফ উদ্দিন। লেদ কারখানার পাশেই পিভিসি পাইপের কাঁচামাল উৎপাদনের কারখানা রয়েছে। এর মালিক হায়াৎ বেপারী মসজিদ। কারখানা মালিক সাজিদ হোসেন জানান, আশরাফ উদ্দিন এ জায়গাটিরও মালিকানা দাবি করছেন। তাকে উচ্ছেদ করতে চাচ্ছেন। সাজিদ হোসেন বলেন, \'৮৫ সাল থেকে এখানে আছি। মসজিদকে ভাড়া দিচ্ছি। এখন আশরাফ বলে, এ জমি তার। কারখানার ভাড়া তাকে দিতে হবে। নয়তো উচ্ছেদ করা হবে।\'
 
 
সাজিদ হোসেনের কারখানা ঘেঁষেই নতুন একটি গুদামঘর তোলা হয়েছে। এর পাশেই শামসুদ্দিন নামের এক ব্যক্তির ভাঙাড়ির দোকান। তিনি জানান, গত ডিসেম্বরে হঠাৎ একদিন এ জমিতে গুদামঘর নির্মাণ শুরু করেন আশরাফ উদ্দিন। শামসুদ্দিন স্বীকার করেন, তিনি সিটি করপোরেশনের ডোবা জমি ভরাট করে দোকান নির্মাণ করেছেন। কিন্তু এখন তাকেও উচ্ছেদ করতে চাচ্ছেন আশরাফ উদ্দিন।
 
 
মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক তাজুল ইসলাম বলেন, \'মসজিদ আল্লাহর ঘর। এর জমিও কেউ দখল করতে পারে!\' তিনি জানান, স্থানীয় পুলিশ থানা, এমপিকে জানানোর পরও জমি উদ্ধার হয়নি। বরং জানানোর কারণে দখল পাকাপোক্ত করতে মসজিদের জমিতে রাতারাতি ঘর তোলা হয়েছে।
 
 
মামলার সূত্রে জানা যায়, মসজিদটি সূত্রাপুর মৌজার সি/এস ১০৩, আর/এস-৪৭৩৭ এবং এসএ-৩১৪৭ দাগে অবস্থিত। মসিজদের পেছনে সিএস খতিয়ান ৭৩৩৭-এ ছয় দশমিক ৭২ জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ ছিল কাজী আবদুল আউয়াল জেওয়ার রশিদ ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে। নিম্ন আদালতের রায়ে ১৯৯২ সালে সিটি করপোরেশন জমির মালিকানা পায়। ২০০৭ সালে হাইকোর্ট কাজী আবদুল আউয়ালের পক্ষে রায় দেন। সিটি করপোরেশন এ রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেছে।
 
 
হাইকোর্টের রায় পেয়ে ২০১০ সালের ৫ মে আশরাফ উদ্দিনের কাছে ২১১৩ নম্বর দলিল মূলে দুই দশমিক ৯৭ শতাংশ জমি বিক্রি করেন কাজী আবদলু আউয়ালের তিন ওয়ারিশ। মামলার সূত্রে জানা গেছে, বিক্রেতাদের মধ্যে মসজিদে জমি দান করা জোবেদা মমতাজ আরা রহমানের নামও রয়েছে। দানের ছয় বছর পর বেআইনিভাবে জমি বিক্রি করা হয়। এ জমির বর্তমান মূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা হলেও আশরাফ উদ্দিন সমকালকে জানান ২০১০ সালে ২৬ লাখ টাকায় ওই জমি কিনেছেন তিনি। তার অভিযোগ, মসজিদ তার জমি দখল করে রেখেছে এবং উল্টো তাকেই দখলদার হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করছে মসজিদ কমিটি।
 
 
তবে পুলিশের তদন্তে বলা হয়েছে, জালিয়াতির মাধ্যমে মসজিদের জমি দখল করেছেন আশরাফ উদ্দিন। তিনি যে ২১১৩ নম্বর দলিলে দুই দশমিক ৯৭ শতাংশ জমি কিনেছিলেন, একই নম্বরের আরেকটি দলিলে দেখিয়েছেন জমির পরিমাণ চার দশমিক ১৬ শতাংশ। এর মধ্যে রয়েছে মসজিদকে দেওয়া সিটি করপোরেশনের জমিও।
 
 
আদালতে দেওয়া পুলিশের চার্জশিটের তথ্যানুযায়ী, দ্বিতীয় দলিলটি জাল। জালিয়াতির মাধ্যমে ভূমি অফিসের সিল-সই দিয়ে তৈরি করা। এ জমিতে জমির মালিক দেখানো হয়েছে কাজী সারোয়ার হারুনুর রশিদ, কাজী আনোয়ার আমিনুর রশিদ, জোবেদা মমতাজ আরা রহমান ও কাজী আউয়াল জেওয়ার রশিদকে। দুই দলিলে জমির পরিমাণ ভিন্ন! ২০১০ সালে দলিল সম্পাদনের অনেক আগেই ২০০৬ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি কাজী আনোয়ার আমিনুর রশিদ এবং ১৯৮৬ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি কাজী আউয়াল জেওয়ার রশিদের মৃত্যু হয়েছে।
 
 
২০১১ সালের ১৩ জানুয়ারি অজুখানা ভেঙে মসজিদের জমি দখল করেন আশরাফ উদ্দিন। তাকে এতে সহায়তা করেন স্থানীয়ভাবে সন্ত্রাসী হিসেবে পরিচিত বশির আহমেদ জুয়েল, ইকবাল হোসেন বিপু। তাদের বিরুদ্ধে পুলিশ আদালতে অভিযোগপত্র দিলেও কেউ গ্রেফতার হননি।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/22/264779#sthash.nbvpzrva.dpuf