১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মহা বেকারত্বের পদধ্বনি: ২০ সংস্থার হয়রানিতে শিল্পের বেহাল দশা ; গ্যাস-বিদ্যুতের বিলেই উদ্যোক্তারা দিশেহারা ; বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক কারখানা
২২ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
চড়া সুদে ব্যাংকের বিনিয়োগে প্রতিষ্ঠিত একটি পেপার মিল। দুই বছর আগেও যেখানে গ্যাসের বিল আসত মাসে ২০ লাখ টাকা। এখন দিতে হয় ৩০ লাখ টাকার মতো। ১০ লাখ থেকে বেড়ে বিদ্যুৎ বিল দাঁড়িয়েছে মাসে ১৬ লাখ টাকায়। তিতাস গ্যাস, ডেসা, ওয়াসা, এনবিআর, র্যাব, রাজউক, দুদক, কারখানা পরিদফতর, বিএসটিআই, সিটি করপোরেশনসহ সরকারের কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষ এ কারখানায় হানা দিচ্ছে সপ্তাহের কোনো না কোনো দিন। চড়া হারে গ্যাস-বিদ্যুৎ বিল পরিশোধের পাশাপাশি সরকারের এসব সংস্থার অত্যাচারে অতিষ্ঠ পেপার মিলের উদ্যোক্তারা। পথ খুঁজছেন সব কিছু ছেড়ে পালানোর। কর্মসংস্থানের পথ যেভাবে রুদ্ধ হয়ে আসছে তাতে দেশে মহাবেকারত্বের পদধ্বনি দেখা দিচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, এনবিআরের পক্ষ থেকে সংস্থাটির অঙ্গ অফিসগুলোকে মোটা অঙ্কের টার্গেট ধরিয়ে দেয়া হয়েছে। মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ক্ষমতা দেয়া হয়েছে অধিকাংশ সংস্থাকে। অন্তত ২০টি সরকারি সংস্থার লোকজন প্রতিনিয়ত চড়াও হচ্ছে উদ্যোক্তাদের ওপর। তাদের আচরণ অনেক ক্ষেত্রেই শিল্পবিরোধী। যেন কারখানা বন্ধ করে দিতে পারলেই তারা সফল। এমতাবস্থায় নতুন শিল্প কারখানা করা তো দূরের কথা বিদ্যমান কারখানাগুলো টিকিয়ে রাখাই দুঃসাধ্য হয়ে পড়েছে। নতুন কর্মসংস্থানের বিপরীতে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের পথ খুঁজছেন তারা।
রফতানিকারকদের ৪২টি সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ইএবি) সভাপতি ও বিজিএমইএর সাবেক সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী নয়া দিগন্তকে বলেন, গত দুই বছরে শ্রমিক মজুরি বেড়েছে ৩২ শতাংশ। বিদ্যুৎ খরচ বেড়েছে ১৫ শতাংশ। গ্যাসের খরচ বেড়েছে ১০ শতাংশ। এ সময়ের মধ্যে ৩০ শতাংশ বেড়েছে পরিবহন ব্যয়। সবমিলিয়ে আমাদের উৎপাদন খরচ বেড়েছে ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ। প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য অন্য দেশগুলো তাদের উদ্যোক্তাদের নানামুখী প্রণোদনা দিচ্ছে। ডলার-ইউরোর সাথে নিজেদের মুদ্রার মান সমন্বয় করেছে। অথচ আমরা সরকারের কাছ থেকে কিছুই পাচ্ছি না। অন্যান্য দেশ জ্বালানি তেলের দাম চারবার কমিয়েছে। আমাদের কমানো হয়েছে মাত্র তিন টাকা। যতই বলা হোক না কেন, উদ্যোক্তারা এখনো সিঙ্গেল ডিজিট সুদে ব্যাংকঋণ পাচ্ছে না। এসব কারণে অনেক উদ্যোক্তা ব্যবসায় গুটিয়ে বাড়ি যেতে বাধ্য হচ্ছেন। তিনি বলেন, আমাদের মতো পুরনো উদ্যোক্তাদের চেহারা ফ্যাকাশে দেখলে, হতাশ হতে দেখলে নতুন উদ্যোক্তারা বিনিয়োগ করবেন কী আশায়? আর নতুন বিনিয়োগ না হলে ২০ লাখ নতুন শিক্ষিত যুবক যাবে কোথায়?
উদ্যোক্তারা জানান, বাংলাদেশী তৈরী পোশাকের দেশভিত্তিক সর্ববৃহৎ একক বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অগ্রাধিকারমূলক রফতানি সুবিধা (জিএসপি) হারিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন রফতানিকারকেরা আরো আগেই। অঞ্চলভিত্তিক সর্ববৃহৎ বাজার ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) থেকে ইংল্যান্ডের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণায় তারা মর্মাহত। গ্যাস-বিদ্যুতের সীমাহীন দুর্ভোগ তো এ দেশের উদ্যোক্তাদের নিত্যসঙ্গী। যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ১২ জাতির জোট ট্রান্স প্যাসিফিক পার্টনারশিপে (টিপিপি) অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী ভিয়েতনামের অন্তর্ভুক্তি নতুন করে ভাবনায় ফেলে দিয়েছে বাংলাদেশকে। একের পর এক বিদেশী হত্যাকাণ্ড এবং উগ্রবাদী হামলার ঘটনায় ক্রেতাদের ফিরে যাওয়ার প্রবণতা তো আছেই। চ্যালেঞ্জের তালিকায় সর্বশেষ যুক্ত হয়েছে বাজার দখলে প্রতিযোগী ভারতের আগ্রাসী কর্মসূচি। পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে নতুন করে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ঘোষণা করেছে দেশটির সরকার।
পেট্রোবাংলার তথ্যানুযায়ী, দেশে বর্তমানে গ্যাসসংযোগ আছে পাঁচ হাজার ৯৭৩টি শিল্প কারখানায়। এসব কারখানায় উৎপাদনের প্রধান উপাদান গ্যাস হলেও নিরবচ্ছিন্ন ও প্রয়োজনীয় চাপসহ গ্যাস পাচ্ছে না কোনো প্রতিষ্ঠানই। গ্যাসের জন্য আবেদন করে বছরের পর বছর অপেক্ষার প্রহর গোনছেন আরো দুই হাজার ২২৩ শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উদ্যোক্তা। সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হলেও তারা জানেন না কবে গ্যাসসংযোগ পাবেন, কবে উৎপাদনে যেতে পারবেন। ফলে তীব্র গ্যাস সঙ্কটে অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে পুরো শিল্পোৎপাদনে। ভণ্ডুল হতে বসেছে দ্রুত শিল্পায়নের মাধ্যমে উৎপাদন বাড়িয়ে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার সরকারি পরিকল্পনা। তীব্র গ্যাস সঙ্কট সামাল দিতে সরকার ২০০৯ সালের ১ অক্টোবর থেকে সারা দেশে নতুন শিল্প ও বাণিজ্যিক সংযোগ এবং লোড বৃদ্ধি কার্যক্রম বন্ধ করে দেয়। এরপর অগ্রাধিকার ভিত্তিতে শিল্পে সংযোগ দিতে ২০১১ সালের ২ জানুয়ারি একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
তৈরী পোশাক শিল্পখাত সংক্রান্ত স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জিএসপি সুবিধা বাতিল এবং ভারতের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আন্তর্জাতিক বাজার দখলের কৌশলে বাংলাদেশ কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশের তৈরী পোশাকের ৭০ শতাংশ ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাজারে বিক্রি হয়। বছরে রফতানির তিন বিলিয়ন ডলারের বেশির ভাগই পোশাক খাতের। ইইউ থেকে বের হয়ে যাওয়া ব্রিটেনের বাজারে বাংলাদেশী পোশাক শুল্কমুক্ত সুবিধা না পেলে সেখানকার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে দেশের অর্থনীতিতে। ভারত সরকার পোশাক শিল্পের উন্নয়ন ও প্রসারে ছয় হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি ঘোষণা করেছে উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০১৮ সালের মধ্যে চার হাজার ৩০০ কোটি ডলারের পোশাক রফতনির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে দেশটি। সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জগুলো যথাযথভাবে মোকাবেলা করা না গেলে ২০২১ সালের মধ্যে ৫০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রফতানির লক্ষ্যমাত্রা অর্জন মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হবে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এ দিকে নানা সঙ্কটে গত তিন বছরে ৬১৮ কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে জানিয়ে তৈরী পোশাক রফতানিকারকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো: সিদ্দিকুর রহমান নয়া দিগন্তকে বলেন, বন্ধ হওয়ার পথে রয়েছে আরো ৩১৯ কারখানা। রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা, বিভিন্ন পর্যায়ে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়া এবং গ্যাস-বিদ্যুৎ সঙ্কটে এই খাতে বিনিয়োগ হচ্ছে না জানিয়ে তিনি বলেন, বিনিয়োগের অভাবে কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হচ্ছে না। যেখানে প্রতি বছর ২০ লাখ লোক শ্রমবাজারে যুক্ত হচ্ছে সেখানে গত দুই অর্থবছরে দেশে কর্মসংস্থান হয়েছে মাত্র ছয় লাখ লোকের। তিনি বলেন, ইউরোপ আমেরিকায় অর্থনৈতিক মন্দা, জিএসপি ফিরিয়ে পাওয়ার বিষয়ে অনিশ্চয়তা, ইইউ থেকে যুক্তরাজ্যের বেরিয়ে যাওয়ার ঘোষণা, বাজার দখলে ভারতের ব্যাপক পরিকল্পনা, মার্কিন জোটে ভিয়েতনামের অন্তর্ভুক্তি আমাদের আরো বেশি ভাবিয়ে তুলছে। এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেয়া না হলে রফতানি বাণিজ্যে ৮৩ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প ভীষণ সমস্যায় পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
বিজিএমইএর একটি সূত্রে জানা গেছে, গত চার বছরে এই খাতে ২১৯ শতাংশ বেতন বাড়ানো হয়েছে। বন্দরে কার্গো হ্যান্ডলিং চার্জ দ্বিগুণ হয়েছে। বীমা কোম্পানিগুলোও বেপরোয়া আচরণ করছে। বিদেশী ক্রেতাদের জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স ভবন নিয়ে আপত্তি তুলে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছে। গত ৬ বছরে নিট, হোসিয়ারি এবং ওভেন গার্মেন্ট মিলে প্রায় ছয় হাজার পোশাক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। আর এসব শিল্প খাতে বিনিয়োগ করা প্রায় ৫৫ হাজার কোটি টাকার মূলধন হারিয়েছে ব্যবসায়ীরা। এসব উদ্যোক্তা পুঁজি হারিয়ে এখন দেউলিয়া। ঋণের দায় শোধ করতে না পেরে অনেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। সব মালিকই কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত। 
বিশ্বখ্যাত ব্রিটিশ সাময়িকী ইকোনমিস্টের ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এক বিশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে বাংলাদেশের ৪৭ শতাংশ ডিগ্রিধারী লোক বেকার। দক্ষিণ এশিয়ায় এর চেয়ে বেশি উচ্চশিক্ষিত বেকার আছেন কেবল আফগানিস্তানে, ৬৫ শতাংশ। এর বাইরে ভারতে এর হার ৩৩ শতাংশ, নেপালে ২০ শতাংশের বেশি, পাকিস্তানে ২৮ শতাংশ ও শ্রীলঙ্কায় ৭ দশমিক ৮ শতাংশ। বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর ২২ লাখ মানুষ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু কাজ পায় মাত্র সাত লাখ। এর মধ্যে উচ্চশিক্ষিত অর্থাৎ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ে যারা শিক্ষাজীবন শেষ করেছেন, তারাও আছেন। জাতিসঙ্ঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) তথ্য মতে, দেশে বেকার যুবকের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/189432