২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নতুন আতংকের নাম গ্যাং স্টার গ্রুপ
২১ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
উত্তরায় দেয়ালে দেয়ালে ফটকে ফটকে বিভিন্ন গ্রুপের নিশানা -যুগান্তর
ঢাকার বাইরেও এ ধরনের সন্ত্রাসী গ্রুপে সক্রিয় টিনএজাররা || রাজনৈতিক প্রভাবশালী বড়ভাইদের শেল্টারে দিন দিন বেপরোয়া হয়ে উঠছে নানা নামের অসংখ্য বাহিনী || ভালো পরিবারের ছেলেরাও বিপথগামী হয়ে পড়ছে, ছেড়ে দিচ্ছে লেখাপড়া
 
রাজধানীর বিভিন্ন পাড়া-মহল্লায় নানা নামে গড়ে উঠেছে গ্যাং স্টার গ্রুপ। বিপথগামী হয়ে যাওয়া উঠতি বয়সী কিশোর ও তরুণরা এসব বাহিনীর সদস্য। খুব সহজে বললে, এদের বেশিরভাগই টিনএজার বা ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী। যারা খুন-খারাবির মতো ভয়াবহ অপরাধেও জড়িয়ে পড়ছে। এরা এখন নগরবাসীর কাছে বড় আতংক হয়ে দেখা দিয়েছে। রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় থাকায় এসব গ্যাং স্টার গ্রুপের সদস্যরা অপরাধ করেও পার পেয়ে যায়। বিপদে পড়লে ‘বড়ভাই’ নামধারী গডফাদাররা শেল্টার দেয়। এ কারণে অভিযোগ করলে উল্টো বেকায়দায় পড়তে হয়। তাই ভয়ে আইনশৃংখলা বাহিনীর কাছে অভিযোগ দেয়ার সাহসও পান না সাধারণ মানুষ। ফলে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় এরাই এক ধরনের শাসক। এরা নির্বিঘ্নে চাঁদাবাজিসহ যা মন চায় তাই করে। সম্প্রতি রাজধানীর উত্তরায় স্কুলছাত্র আদনান খুন হওয়ার পর গ্যাং স্টার গ্রুপের বিষয়টি সামনে চলে আসে। দেখা যায়, সমবয়সী ছেলেরা তাকে নির্মমভাবে কুপিয়ে হত্যা করেছে। হত্যাকারী গ্রুপটি উত্তরা এলাকার বেশ কয়েকটি গ্যাং স্টারের মধ্যে অন্যতম ডিসকো গ্রুপ।
এদিকে এ ঘটনার পর রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় যুগান্তরের তথ্যানুসন্ধানে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে আসে। দেখা যায়, শুধু উত্তরা নয়, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ছাড়াও বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এসব গ্যাং সন্ত্রাস ছড়িয়ে পড়েছে। এসব বাহিনী তিন-চার ধাপে বিস্তৃত। নিচের ধাপে বখাটে টিনএজাররা গ্যাং স্টার গ্রুপের সদস্য হয়ে কাজ করে। এদের প্রতিটি গ্রুপে একজন দলনেতা থাকে। যে প্রভাবশালী ব্যক্তির ছেলে এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে বেশি পারদর্শী তাকে গ্রুপের নেতৃত্ব দেয়া হয়। উপরের দিকে দ্বিতীয় ধাপে এদের আবার বড়ভাই থাকে। যাদের বয়স ২৫ থেকে ৩০-এর মধ্যে। যারা এলাকায় আগে থেকে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড করে কুখ্যাতি অর্জন করেছে। কেউ কেউ এখন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের ওয়ার্ড পর্যায়ের নেতা বনে গেছে। অর্থবিত্তও অনেক। তারা পুরো এলাকার চাঁদাবাজিসহ ভাগাভাগির অনেক কিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এই বড়ভাইদেরও আবার ‘বড়ভাই’ আছে। যাদের অনেকে সমাজে সুপ্রতিষ্ঠিত রাজনীতিবিদ, দ্রুততম সময়ে অঢেল সম্পত্তির মালিক বনে গেছে। এভাবে একটি চেইনের মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে এসব গ্যাং স্টার গ্রুপ বেড়ে উঠেছে। গ্যাং সদস্যদের রাজনৈতিক আদর্শ না থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে তাদের রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বড়ভাইয়ের শক্তি হিসেবে তারা রাজনৈতিক মিটিং-মিছিলেও অংশ নেয়। তাই তারা যে কোনো ধরনের অপরাধমূলক কাজে অংশ নিতে কুণ্ঠাবোধ করে না। হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছে অবলীলায়। প্রযুক্তির কল্যাণে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকেও তারা সন্ত্রাস ছড়িয়ে দিচ্ছে। হত্যার ঘোষণা দিয়ে তারা ফেসবুকে ভিডিও আপলোড করছে। শক্তিমত্তা এবং সদস্য সংখ্যা বাড়াতে তারা পাড়া-মহল্লায় ফেসবুকে প্রচারণা চালায়। চাপের মুখে অনেক ভালো সহপাঠী এদের গ্রুপে যোগ দিতে বাধ্য হয়। আধিপত্যের নিয়ন্ত্রণ নিতে দেয়ালে দেয়ালে গ্যাং গ্রুপের চিকা মারে। রাজধানীর উত্তরা, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, আদাবর, পুরান ঢাকা, মতিঝিল, কাকরাইল এবং মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন অনুসন্ধান এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
অপরাধ বিশ্লেষকরা আশংকা করছেন, এখনই এদের নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে এরা জঙ্গি সন্ত্রাসের চেয়ে ভয়াবহ রূপ ধারণ করতে পারে। বিদ্যমান ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম দিয়ে এটা রোধ করা যাবে না।
কোথায় কোন গ্রুপ-
তেজগাঁও : গ্যাং স্টার গ্রুপের তৎপরতা জানতে বৃহস্পতিবার তেজগাঁও এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, স্থানীয় আওয়ামী লীগ অফিসের সামনে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোর মোবাইল ফোনে কাকে যেন উচ্চস্বরে গালাগাল করছিল। বলছিল, ‘তুই আমাকে চিনিস? তোকে গুলি করে মারব? এরপর অপরপ্রান্ত থেকে কিছু শোনার পর তার জবাব, আমার বড়ভাইকে চিনিস? তুই আমার কিছুই করতে পারবি না ...।’ পরে জানা গেল ওই কিশোর মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের এক উচ্চপর্যায়ের নেতার খুব ঘনিষ্ঠ।
এরপর তথ্যানুন্ধানে আরও জানা যায়, রাজধানীর তেজগাঁও এলাকায় ১৫ থেকে ২০টি গ্যাং তাদের অপতৎপরতা অব্যাহত রেখেছে। ডেডলি রকার্স, কে-ইউ, এসকে ৩০, ইএস ১৩ এবং পিপিসহ বিভিন্ন নামে চলে তাদের অপরাধ কার্যক্রম। স্থানীয় এক আওয়ামী লীগ নেতার নামে চলে ১৫-২০ জনের একটি গ্যাং। এ গ্যাংয়ের সব সদস্যই ১৮ বছরের নিচে। স্থানীয় একজন জনপ্রতিনিধির ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে পরিচিত উজ্জ্বল ও ফরহাদের নেতৃত্বে আছে ১০-১২ জনের একটি গ্রুপ। এ গ্রুপের সদস্যরাও অনূর্ধ্ব ১৮। তাদের মধ্যে বেশিরভাগই পড়াশোনা ছেড়ে দিয়েছে। তেজকুনিপাড়া খেলাঘর মাঠের পাশে তারা বেশ কিছু অবৈধ দোকানপাট বসিয়েছে। আশপাশের দোকানপাট থেকে এ গ্রুপের সদস্যরা চাঁদা আদায় করে। হায়দার সোহাগের নেতৃত্বে তেজগাঁও এলাকায় আছে পৃথক একটি গ্রুপ। ২০-২৫ জনের এ গ্রুপের সবাই ছাত্রলীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। তেজগাঁও থানার পাশে তৃতীয় গলিতে একটি গ্রুপের নেতৃত্ব দেয় ববি নামের এক যুবক। স্টেশন রোড থেকে তেজতুরিবাজার পর্যন্ত এলাকায় রয়েছে পৃথক একটি গ্যাং স্টার গ্রুপ। মফিজ নামে স্থানীয় এক প্রভাবশালী ব্যক্তির নেতৃত্বে আছে একটি গ্রুপ। খেলাঘর মাঠ ও এর আশপাশের এলাকায় এ গ্রুপের তৎপরতা বেশি। তা ছাড়া তেজগাঁওয়ের নাখালপাড়া, পলিটেকনিক কলেজ এবং তেজতুরিপাড়াসহ কয়েকটি এলাকায় গ্যাং স্টার গ্রুপের অস্তিত্ব পাওয়া গেছে।
মোহাম্মদপুর-আদাবর : অনুসন্ধানে জানা যায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর ও আদাবরে ১০-১২টি গ্যাং স্টার বাহিনী তাদের কার্যকলাপ চালাচ্ছে। এ এলাকার বেশিরভাগ গ্রুপই চলছে ব্যক্তি নামে। গ্রুপগুলোর নেতৃত্বে আছে- মামুন, পাপ্পু, জসিম, মোস্তফা, আলিফ, তুহিন, ফিরোজ, জলিল, বাবু, সোহরাব, রাজ্জাক প্রমুখ। সলিমুল্লাহ রোডে তৎপর মামুন গ্রুপ। পাপ্পু গ্রুপের প্রধান পাপ্পু মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। জেলখানায় বসেই সে গ্রুপ নিয়ন্ত্রণ করছে। নূরজাহান রোডের গ্রুপ আলিফের নেতৃত্বে চললেও এ রোডের ‘এম’ লাইনের নিয়ন্ত্রণ মোস্তফা গ্রুপের হাতে। স্থানীয়ভাবে জোনাকীর ভাই হিসেবে পরিচিত মোস্তফা। একই রোডের ‘টি’ লাইন চলছে নান্টু গ্রুপের অধীনে। আলিফ গ্রুপের সবাই বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। স্থানীয়রা জানান, বাঁশবাড়ি কারখানা এলাকার নিয়ন্ত্রণ জসিমের হাতে। মোহাম্মদপুর-আদাবরের সবচেয়ে বড় গ্রুপ হলো তুহিনের। রূপায়ন সিটি এলাকার একটি হত্যা মামলার আসামি তুহিন। স্থানীয়দের দেয়া তথ্য মতে, বিজলী মহল্লা এলাকা চলে ফিরোজের নেতৃত্বে। এলাকায় তিনি টলটল ফিরোজ হিসেবে পরিচিত। টাউন হল এলাকায় কাজ করে জলিল গ্রুপ। লালমাটিয়া এলাকার নেতৃত্বে আছে সোহরাব ও রাজ্জাক। জানা যায়, মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকায় যে ক’টি গ্রুপ আছে এদের সদস্যরা ১৪ থেকে ১৮ বছর বয়সী। তবে গ্রুপ লিডারদের বয়স ২৫-৩৫ বছর। তারা এলাকায় ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধ তৎপরতায় জড়িত। তাদের ভয়ে এলাকাবাসী অতিষ্ঠ হলেও আইনশৃংখলা বাহিনীকে জানানোর সাহস পান না অনেকেই। স্থানীয়রা আরও জানায়, বাঁশবাড়ি কারখানা এলাকায় প্রতিদিন সন্ধ্যার পর তরুণ ও কিশোরদের আড্ডা বসে। সলিমুল্লাহ রোডের পানির ট্যাংক মাঠে আসর বসে মামুন গ্রুপের। মোহাম্মদপুর ও আদাবর এলাকা ঘুরে আরও যেসব গ্রুপের তৎপরতা লক্ষ্য করা গেছে, তাদের মধ্যে আছে এফএনবি-৬, রাকিব লাল,  নবাবীজ, লারা ডিসি প্রভৃতি।
পুরান ঢাকা : রাজধানীর পুরান ঢাকার নাজিম উদ্দিন রোড, মাজেদ সরদার রোড, সিক্কাটুলি, আবুল হাসনাত রোড, আবদুল হাদী লেন, চানখাঁর পুল, আগাসাদেক রোড, কাহেরটুলি এবং নিমতলীসহ বিভিন্ন এলাকার অপকর্মের মূলে রয়েছে আওয়াল গ্রুপ। এ গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে আছে- রানা, দিলদার, নাঈম, মনসুর, জাউরা মাসুম, গলাকাটা হারুন, জাহাঙ্গীর, ফাহিম, বাউনা ফারুক, হেলু প্রমুখ।
স্থানীয়রা জানান- এলাকায় চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি এবং জুয়ার আসর বসানোসহ সব ধরনের অপকর্মে লিপ্ত এ গ্রুপের সদস্যরা। আশার আলো নামের একটি স্থানীয় সামাজিক সংগঠন তারা দখল করে নিয়েছে। মাজেদ সরদার রোডের পাশে অবৈধভাবে বাজার বসিয়ে প্রতিদিন সেখান থেকে প্রায় ৩০ হাজার টাকা আদায় করছে তারা। আরবান ইঞ্জিনিয়ারিংসহ ৫-৬টি ঘর থেকে প্রতি মাসে মোটা অংকের টাকা আদায় করা হচ্ছে আওয়াল গ্রুপের নামে। বাংলাদেশ মাঠসংলগ্ন ওয়াসা পাম্পের সঙ্গে সিটি কর্পোরেশনের জায়গায় একটি ঘর বানিয়ে সেখানে ইট ও বালুর গাড়ি ভাড়া দিয়ে প্রতি মাসে ২০-২৫ হাজার টাকা আদায় করছে। ৫০/২ আগাসাদেক রোডে সিটি কর্পোরেশনের পাবলিক টয়লেটটি দখল করে রেখেছে তারা। এলাকায় কোনো বাড়ি কেনাবেচা করতে হলে এ গ্রুপকে ২০ ভাগ কমিশন দিতে হয়।
স্থানীয় আবুল হাসনাত রোডের মেহবুব হাসানের দেয়া তথ্য অনুযায়ী- চাঁদার দাবিতে নাঈম ওরফে পিস্তল নাঈম ও আসগর চানখাঁরপুল এলাকায় ১৭ নভেম্বর তার ওপর সন্ত্রাসী হামলা চালায়। একই এলাকার কামাল জানান, আওয়াল গ্রুপের সদস্যরা ৫ সেপ্টেম্বর তাদের বাড়িতে হামলা চালায়। স্থানীয় তারেকুর রহমান মিশু জানান- ছিনতাই, চাঁদাবাজি, মারামারি, নির্যাতন এবং হত্যা মামলাসহ অনেক মামলা আছে এ বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে। আবুল হাসনাত রোডের মোস্তাকুর রহমান ফারুক জানান, ৫ সেপ্টেম্বর বংশালের আওয়ালের নির্দেশে ওই বাহিনীর সদস্যরা তার (ফারুক) বাড়িতে হামলা চালায়। এতে তার বড়ভাই মোখলেসুর রহমান নিহত হন।
উত্তরা : অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর উত্তরা এলাকায় ১৫-২০টি গ্রুপ সক্রিয় আছে। এদের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে চার হাজার। তবে এখানে ডিসকো ও নাইন স্টার গ্রুপের প্রাধান্য বেশি। ডিসকো গ্রুপের সদস্য সংখ্যা এক হাজার ২০০। নাইন স্টার গ্রুপের সদস্য সংখ্যা ৯ শতাধিক। নাইমুর রহমান অনিকের নেতৃত্বে ডিসকো গ্রুপ এবং তালাচাবি রাজুর নেতৃত্বে চলে নাইন স্টার গ্রুপের কার্যকলাপ। এ গ্রুপের সদস্যরা এলাকায় চাঁদাবাজি, ছিনতাই এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত। আধিপত্য বিস্তারের জন্য তারা হত্যাকাণ্ড ঘটাতেও দ্বিধা করে না। দুটি গ্রুপের মধ্যেই রয়েছে ছোটভাই এবং বড়ভাই গ্রুপ। তাদের মধ্যে রয়েছে ৩-৪টি করে উপ-গ্রুপ। ডিসকো ও নাইন স্টার গ্রুপের দ্বন্দ্বে ৬ জানুয়ারি উত্তরায় খুন হয় স্কুলছাত্র আদনান। এর আগে গ্রুপ দুটির মধ্যে বিবদমান দ্বন্দ্বের কারণে ৩ জানুয়ারি তুরাগ থানা ছাত্রলীগের প্রচার সম্পাদক সফিক, ছাত্রলীগকর্মী রূপক, ছাকিব এবং কমিউনিটি পুলিশের সদস্য ছালাম সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। একই দিন একই কারণে উত্তরা পশ্চিম থানা এলাকার ১৪ নম্বর সেক্টরে জাতীয় পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান বাহাউদ্দিন বারুলের ভাতিজা দীপু সিকদারকে ছুরিকাঘাত করা হয়।
ডিসকো এবং নাইন স্টার গ্রুপের বাইরে উত্তরায় যেসব গ্রুপের তৎপরতা দেখা যায় সেসবের মধ্যে আছে- পাওয়ার বয়েজ, ডিজে বয়েজ, জি স্টার, ফোর সিভি বয়েজ, সেভেন স্টার, ব্ল্যাক, কিং নাইন, দাদা বয়েজ, রেড লাইট, প্রাণ টিএমসি প্রভৃতি। পাওয়ার বয়েজের সদস্য সংখ্যা ৪৫০, ডিজে বয়েজের সদস্য সংখ্যা দেড় শতাধিক। এসব গ্রুপের সদস্যদের বয়স ১৩ থেকে ২০ বছর। গ্রুপ প্রধানদের বয়স ২০-২৫। এসব গ্রুপের প্রিয় বিষয় মাদক ও অস্ত্র। বিকট শব্দে হর্ন বাজিয়ে বাইক চালানো আর রাস্তায় মেয়েদের হয়রানি করা এ কিশোরদের বিরুদ্ধে নিত্যদিনের অভিযোগ। প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপের সঙ্গে মারামারিতে কে কত এগিয়ে থাকল কিংবা অপরাধ করেও কে ধরাছোঁয়ার বাইরে- এসবই ওদের গর্বের বিষয়। এতে দাপট যেমন বাড়ে, তেমনি বাড়ে গ্যাংয়ের সদস্য। কোনো অপারেশনে যাওয়ার আগে তারা ফেসবুকে লাইভ দিয়ে থাকে। এমনকি হত্যাকাণ্ডে যাওয়ার আগেও লাইভ দেয়া তাদের শখ বলে জানা গেছে। গ্রুপ সদস্যরা মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ, রাজউক উত্তরা মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, ট্রাস্ট স্কুল অ্যান্ড কলেজ, উত্তরা হাইস্কুল, নওয়াব হাবিবুল্লাহ মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ উত্তরা এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী।
মতিঝিল : রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলের কতিপয় ছাত্রের সমন্বয়ে গঠিত হয়েছে আইডিয়াল গ্রুপ। এ গ্রুপটি স্কুলের আশপাশের এলাকায় নানা ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত। এ গ্রুপে আছে অর্ক, হাসিব, সোহাগ, আনাছ, রিদম, সৈকত, ছায়েমসহ অনেকে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী এ গ্রুপের প্রায় সব সদস্যই মাদকসেবী। অভিভাবকদের সঙ্গে বেয়াদবি, ইভটিজিং, প্রকাশ্যে ধূমপান ও বিভিন্ন অসামাজিক কাজে লিপ্ত হওয়া যেন তাদের কাছে মামুলি বিষয়। এ গ্রুপের প্রাণের নাম মুন্না ওরফে কেবিআর মুন্না। মতিঝিলের শাহজাহানপুর এলাকায় অবস্থিত মতিঝিল সরকারি কলোনি উচ্চ বিদ্যালয়ের কতিপয় ছাত্র এবং কলোনির অন্যান্য ছাত্র স্কুল প্রাঙ্গণে আড্ডা দেয়। যারা এ আড্ডা দেয় তাদের বলা হয় ‘বাফার পোলাপাইন।’ তারা স্কুলের মাঠে ধূমপান, গাঁজা ও ইয়াবা সেবন করে। এ গ্রুপের কিছু সদস্য ছিনতাই, মারামারি এবং মেয়েদের উত্ত্যক্ত করছে হরহামেশাই। বাফার পোলাপাইন গ্রুপের সদস্যদের মধ্যে আছে- ছিয়াম, শামিম, রাকিব, সম্রাট, অপু, ফয়সাল ওরফে ভোটকা ফয়সাল, শুভ প্রমুখ।
কাকরাইল : গ্রুপিংকে কেন্দ্র করে রাজধানীর কাকরাইলে অবস্থিত উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলে হরহামেশা মারধরের ঘটনা ঘটে। ছোটভাই-বড়ভাই দ্বন্দ্বে সম্প্রতি এ স্কুলের এক ছাত্র ছুরিকাঘাত করে তারই বন্ধুকে। জানা যায়, স্কুলটিতে নবম শ্রেণীর ছাত্র মোন্তা ও হিমেলের নেতৃত্বে ৩০-৩৫ জনের একটি গ্রুপ আছে। অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র জয় রহমানের নেতৃত্বে আছে ৩০-৪০ জনের পৃথক গ্রুপ। সম্প্রতি এসব গ্রুপের তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় স্কুলের চারপাশে ১৫৭টি সিসি ক্যামেরা লাগানো হয়েছে।
মগবাজার : জানা যায়, রাজধানীর মগবাজারের বিটিসিএল (টিঅ্যান্ডটি) কলোনির ৩৮টি ভবনসহ আশপাশের এলাকার বাসিন্দারা স্থানীয় বিচ্ছু গ্রুপের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে। কলোনির ভেতর নিরাপদে অপরাধ সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে বিচ্ছু গ্রুপ। সরকারি জমিতে ঘর তুলে ভাড়া বাণিজ্য, কলোনির কোয়ার্টার বাণিজ্য, নিরাপরাধ মানুষের হাতে জোর করে তাস তুলে দিয়ে চাঁদাবাজি, কলোনির বিভিন্ন পয়েন্টে মাদক ব্যবসাসহ আরও অনেক অভিযোগ রয়েছে এ বিচ্ছু গ্রুপর বিরুদ্ধে। এখানে ইয়াবা, ফেনসিডিলসহ বিভিন্ন মাদক সেবন ও জুয়া খেলা চলে। এ গ্রুপের নেতৃত্বে আছে শিবলু আহমেদ হাসিব এবং তানভীর হোসেন নিপু। তাদের সঙ্গে পারভেজ, স্বচ্ছ, সাইফুল, শরীফ, আসাদ, হাবিব, আশরাফুল এবং মিস্টারসহ ২০-২২ জন সদস্য আছে বলে জানা গেছে।
বিশেষজ্ঞের মতামত : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. জিয়া রহমান যুগান্তরকে বলেন- ইন্টারনেট, ফেসবুক, টেলিভিশন, বিদেশী অনুষ্ঠান দেখে আমরা ভিনদেশী সংস্কৃতিকে গ্রহণ করছি। আমাদের তরুণরা যত দ্রুত টেকনোলজি গ্রহণ করছে, তত দ্রুত মূল্যবোধ গ্রহণ করছে না। তারা যখন টেকনোলজি ব্যবহার করছে তখন বুঝতে পারছে না তা দেশীয় সংস্কৃতির সঙ্গে কতটুকু গ্রহণ করা উচিত। ড. জিয়া রহমানের মতে, বিভিন্ন ভয়ংকর ভিডিও গেমস এবং অ্যাকশনধর্মী চলচ্চিত্র কিশোরদের চিন্তা-চেতনায় প্রভাব ফেলছে। স্কুলগুলো অতিমাত্রার বাণিজ্যিক হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীরা প্রকৃত শিক্ষা পাচ্ছে না। কিশোরদের জন্য কাউন্সেলিং জরুরি হলেও তাদের তা করানো হচ্ছে না। তিনি জানান, শুরুর দিকে যদি কিশোরদের সংশোধন করা যায় তবে অনভিপ্রেত অনেক ঘটনা এড়ানো সম্ভব। জিয়া রহমান আরও জানান, উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের হাতে বাড়তি টাকা যাচ্ছে। এ টাকা তারা নেতিবাচক কাজে ব্যবহার করছে। কিশোরদের মধ্যে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমান ক্রিমিনাল জাস্টিস সিস্টেম দিয়ে এটা রোধ করা যাবে না। পুলিশের মধ্যে রাজনীতিকরণ, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি আছে। বিচার প্রক্রিয়ায় ধীরগতি আছে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন- কিশোর অপরাধ সংশোধন কেন্দ্রগুলোকে অধিকতর আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করতে পারলে ভালো ফল পাওয়া যেতে পারে।
পুলিশের বক্তব্য : জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনার মাসুদুর রহমান বলেন, এতদিন এ গ্রুপগুলোর সদস্যরা চুরি, ছিনতাই এবং মারামারিসহ ছোটখাটো অপরাধ তৎপরতায় জড়িত ছিল। অনেক ক্ষেত্রেই লিখিত অভিযোগ আসেনি। তাই ওইসব ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো ব্যবস্থা নেয়া যায়নি। উত্তরা ও তেজগঁাওয়ে দুই কিশোর নিহত হওয়ার পর সব বিষয় সামনে চলে এসেছে। হত্যা মামলার তদন্তের পাশপাশি গ্রুপগুলো নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা চলছে। যেখানেই অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে সেখানেই অভিযান চালানো হচ্ছে। শুধু গ্রুপ বা গ্যাং নয়, এসবের বাইরেও যদি কেউ ফৌজদারি অপরাধ করে থাকে তাকেই গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে। গ্রুগুলোকে নজরদারিতে রাখা হচ্ছে। কোনো গ্রুপের সদস্যই যেন কোনো অপরাধ তৎপরতায় না জড়াতে পারে সে বিষয়ে পুলিশ তৎপর আছে।
http://www.jugantor.com/first-page/2017/01/21/94866/%E0%A6%A8%E0%A6%A4%E0%A7%81%E0%A6%A8-%E0%A6%86%E0%A6%A4%E0%A6%82%E0%A6%95%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%AE-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%82-%E0%A6%B8%E0%A7%8D%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A7%81%E0%A6%AA