২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
তোড়জোড় নির্বাচন কমিশন গঠনের: চলতি সপ্তাহে সার্চ কমিটি
২১ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের জন্য চলতি সপ্তাহে রাষ্ট্রপতি সার্চ কমিটি গঠন করতে পারেন। সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপ গত বুধবার শেষ হয়। ক্ষমতাসীন দল ও দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক দল বিএনপির পক্ষ থেকে সার্চ কমিটি এবং নির্বাচন কমিশনারদের নামের তালিকা রাষ্ট্রপতির কাছে দেয়া হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সাথে মাসব্যাপী এ সংলাপ ১৭ ডিসেম্বর শুরু হয়। সর্বশেষ ৩১টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রপতির সাথে সংলাপে অংশ নেয়। সংলাপের শুরুতে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি এবং ১১ জানুয়ারি সরকারি দল আওয়ামী লীগ নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব পেশ করে। প্রায় সব রাজনৈতিক দলই নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রশ্নে আইন প্রণয়নের ওপর জোর দিয়েছে। রাষ্ট্রপতি মো: আবদুল হামিদ প্রস্তাব অনুসারে চলতি সপ্তাহে সার্চ কমিটি গঠন করতে পারেন। 
বাংলাদেশে আগামী নির্বাচন জাতীয় এবং আন্তর্জাতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা নিয়ে আন্তর্জাতিক মহলে আপত্তি রয়েছে। ওই নির্বাচন একতরফা ও সব দলের অংশ নেয়া ছাড়াই অনুষ্ঠিত হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। শুরুতে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ম রক্ষার জন্য করা হয়েছে বলে সরকারি দলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল; কিন্তু পরে রাজনৈতিক দৃশ্যপট সম্পূর্ণরূপে বদলে যায়। ইতোমধ্যে ওই নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সংসদ তিন বছর পার করেছে। দেশে সংসদীয় রাজনীতির যে বিকাশ বিগত বছরগুলোতে হচ্ছিল একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে তা রুদ্ধ হয়ে গেছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। এ ছাড়া বাংলাদেশের শাসনতান্ত্রিক ক্ষেত্রে মৌলিক অনেক পরিবর্তন আনা হয়েছে। নব্বইয়ের দশকজুড়ে নির্দলীয় নিরপেক্ষ কেয়ারটেকার সরকার গঠনের লক্ষ্যে প্রায় সব ক’টি রাজনৈতিক দল ঐক্যবদ্ধ প্লাটফর্মে আন্দোলন করেছে। এর ফলে সংবিধানে কেয়ারটেকার সরকারব্যবস্থা সংযোজিত হয়েছিল; কিন্তু সরকারি উদ্যোগে সেই ব্যবস্থা এখন উঠে গেছে। উচ্চ আদালতের হস্তক্ষেপে শাসনতন্ত্রে অনেক পরিবর্তন সূচিত হয়েছে। এ ছাড়া আগামী নির্বাচন অবাধ, নিরপেক্ষ এবং গ্রহণযোগ্য করার সাংবিধানিক বিধিব্যবস্থা সীমিত হয়ে পড়েছে। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়ে তাই জোর আলোচনা শুরু হয়েছে। কাজী রকীবউদ্দিনের নেতৃত্বাধীন কমিশন স্থানীয় সরকার নির্বাচনে বিতর্কিত হয়ে পড়ে। তাদের অধীনেই নবম সংসদ নির্বাচনে ১৫৪ জন বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন। প্রায় ৪০ শতাংশ জনগণের প্রতিনিধিত্বাকারী প্রধান রাজনৈতিক দল এ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে বিরত থাকে, তা সত্ত্বেও নির্বাচন সম্পন্ন হয়। দশম সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করতে সরকারি দল মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিচ্ছে। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বর্তমান পরিস্থিতি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। বলতে গেলে বিরোধী দলের জন্য কোনো সুযোগ এখানে বিদ্যমান নেই। রাষ্ট্রযন্ত্রের বহুমাত্রিক নিপীড়নে তারা সম্পূর্ণ কোণঠাসা। মামলা-হামলায় বিপর্যস্ত বিরোধী দল নির্বাচন ভিন্ন ক্ষমতা পরিবর্তনের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে করছে না। বিএনপি এখন আন্দোলনের পরিবর্তে নির্বাচনমুখী কথাবার্তা নিয়েই ব্যস্ত। অপর দিকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনকে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক করে তোলার কথা ভাবছে। নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করে এ সঙ্কটের সমাধান সম্ভব বলে অনেকেই মনে করেন। রাষ্ট্রপতির সংলাপকে তাই অনেকেই দেশের আগামী দিনের রাজনীতির জন্যে একটি মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করছেন। 
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপের ভিত্তিতে চলতি সপ্তাহে একটি সার্চ কমিটি গঠন করবেন। রাষ্ট্রপতি যে সিদ্ধান্ত দেবেন আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে তা মেনে নেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি তার সিদ্ধান্ত থেকে সরে এলে তা হবে চরম হাতাশাজনক। তবে সব রাজনৈতিক দলের মতামতের ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রশ্নে নতুন আইন প্রণয়ন নিয়ে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে কি না তা এখনো স্পষ্ট নয়। 
জানা গেছে, সব দলের কাছে গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচন কমিশন গঠনের দাবি উঠলে এ দাবি শতভাগ পূরণের সম্ভাবনা ক্ষীণ। ক্ষমতাসীন দল প্রধান নির্বাচন কমিশনার পদের জন্য প্রথমত দু’জনকে নিয়ে চিন্তাভাবনা করলেও বর্তমানে সেখানে আরো একজন যুক্ত হয়েছেন। এ তিনজনই সরকারের সাবেক সচিব। এর মধ্যে দু’জন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। তাদের চাকরি স্বাভাবিকভাবে অবসানের পর পরবর্তী সময়ে একজনকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয়া হয়। অপরজন বর্তমানে অবসরে আছেন। এ দু’জনের বাইরে আরেকজনের আইনি ব্যাকগ্রাউন্ড রয়েছে। তিনি চুক্তিভিত্তিক সচিব হিসেবে নিয়োজিত থাকলেও সম্প্রতি তার চুক্তি বাতিল করা হয়েছে। 
নির্বাচন কমিশনার হিসেবে কমিশনে কর্মরত একজন মহিলা কর্মকর্তা, সাবেক একজন অতিরিক্ত সচিব, একজন সাবেক সেনাকর্মকর্তা এবং অপর একজন অবসরপ্রাপ্ত জেলা জজের নাম বিবেচনা করা হচ্ছে। সার্চ কমিটির কাছে প্রস্তাবিত অনেকগুলো নাম দেয়া হবে। কমিটি এর ভেতর থেকে মনোনীতদের বাছাই করবে। 
সূত্র জানিয়েছে, নতুন নির্বাচন কমিশন গঠনের পর জাতীয় নির্বাচন তারাই পরিচালনা করবে। অবস্থা অনুকূল দেখলে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচন কিছুটা এগিয়ে আনা হতে পারে। বিরোধী দলকে অপ্রস্তুত রেখে নির্বাচনে সুবিধা নিতেই এ চিন্তাভাবনা করা হচ্ছে। আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি বর্তমান নির্বাচন কমিশনের মেয়াদ শেষ হবে। এর আগেই নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করার তোড়জোড় চলছে। 
এ ব্যাপারে বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী নয়া দিগন্তকে বলেন, নির্বাচন কমিশন গঠন ও সার্চ কমিটি গঠনে রাষ্ট্রপতির উদ্যোগের নামে যা হচ্ছে, তা মূলত লোক দেখানো। এর মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান হবে বলে আমি বিশ্বাস করি না। বরং এটি সঙ্কট আরো বাড়িয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা করছি। কারণ নির্বাচন কমিশন জাতির জন্য অনেক বড় একটি ইস্যু। সেজন্য বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে আলোচনা করা উচিত। 
অন্য দিকে নতুন নির্বাচন কমিশন (ইসি) গঠনে ‘বল এখন রাষ্ট্রপতির কোটে’ মন্তব্য করে সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন, নতুন ইসির অধীনেই আগামী জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তাই ইসি গঠনে রাজনৈতিক সমঝোতা না হলে সঙ্কট আগের মতোই থেকে যাবে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি দু’ভাবে বলটা খেলতে পারেন। প্রথম অনুসন্ধান কমিটি বা সার্চ কমিটি করার তিনি উদ্যোগ নিতে পারেন। কিন্তু আমি মনে করি না এতে সমস্যার সমাধান হবে। এর মাধ্যমে বিতর্ক এড়ানো যাবে না। তার পরিবর্তে তিনি যেটা করতে পারেন সেটা হলো রাজনৈতিক দলগুলোকে বলতে পারেন যে, আপনারা বসুন এবং একটি ঐকমত্যে পৌঁছেন।
তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সঠিক একটি নির্বাচন কমিশন গঠন করে যদি সুষ্ঠু-নিরপেক্ষ নির্বাচন না করতে পারি, তাহলে দেশ আরো সঙ্কটের দিকে যাবে। কেননা আমরা এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সঙ্কটে আছি।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/189161