১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
আমাদের শিক্ষানীতির ভিত্তিভূমি: আত্মপক্ষ
২১ জানুয়ারি ২০১৭, শনিবার,
|| এবনে গোলাম সামাদ ||
২১ জানুয়ারি ২০১৭,শনিবার, ০০:০০
 
সব দেশেরই প্রাথমিক শিক্ষার লক্ষ্য হলো ছাত্রদের পড়তে, লিখতে ও গুনতে শেখানো। আমাদের দেশে প্রাচীন যুগে পাঠশালায় পড়তে, লিখতে ও গুনতে শেখানো হতো। পড়াতে হলে কিছু বিষয়ে পড়তে হয়। কেননা, ভাষা হলো ভাবের বাহন। ভাব ছাড়া ভাষা হয় না। কোনো কিছু বলতে হলে আসে কোনো কিছুর বর্ণনা। ভাষার নিজের কোনো সত্তা নেই। মানুষ ভাষার মাধ্যমে ভাব প্রকাশ করে, ভাষার মাধ্যমে চিন্তা করে, ভাষার মাধ্যমে ধরে রাখতে চায় ঘটনার বিবরণ। ভাষা শব্দের মাধ্যমে প্রকাশ পায়। শব্দ বায়ুতরঙ্গ। তরঙ্গ হিসেবে আমাদের কানে সাড়া জাগায়। শব্দ বায়ুতরঙ্গ হিসেবে উদ্ভূত হয়ে তা আবার বায়ুতেই মিলিয়ে যায়। লেখার উদ্ভব হয়েছে শব্দকে বিশেষ চিহ্নের মাধ্যমে স্থায়ী করার প্রয়োজনে। মানুষ কথা বলতে পারে, কেননা তার আছে বাকযন্ত্র। এ ছাড়া মানুষের মগজের বাম দিকে আছে একটা বিশেষ জায়গা; যেখানে আঘাত লাগলে অথবা নষ্ট হয়ে গেলে মানুষ আর কথা বলতে পারে না। অর্থাৎ কথা বলতে পারার একটি দৈহিক ভিত্তি আছে। যদিও মানুষকে কথা বলা শিখতে হয়, আর সে যে জনসমষ্টির মধ্যে জন্মায়, সেই জনসমষ্টির ভাষাই সে শেখে। শিশু ভাষা শেখে তার সহজাত প্রবণতা থেকে। ভাষার জন্ম হয়েছে আগে, ভাষার ব্যাকরণ মানুষ লিখেছে পরে। লেখাপড়ার একটা উদ্দেশ্য হলো ব্যাকরণসম্মত উপায়ে ভাষার ব্যবহার করতে পারা। সব দেশেই শিক্ষার একটি প্রধান লক্ষ্য হয়েছে ছাত্রদের ভাষার মাধ্যমে গুছিয়ে মনোভাব প্রকাশ করতে শেখানো। জমি মাপতে গিয়ে, ব্যবসা-বাণিজ্য করতে যেয়ে প্রয়োজন হয়েছে সংখ্যা-লিখন পদ্ধতির। প্রয়োজন হয়েছে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগ করার। শিক্ষিত মানুষ বলতে বুঝিয়েছে, যে পড়তে ও লিখতে পারে। উন্নত শিক্ষিত বলতে বুঝিয়েছে এমন ব্যক্তিকে, যে গুছিয়ে মনোভাব ব্যক্ত করতে পারে। শিক্ষানীতি গড়ে উঠেছে মানুষের বাস্তব প্রয়োজনকে নির্ভর করে। একটা দেশের বাস্তব প্রয়োজন নির্ভর করেই রচিত হয় এবং হওয়া উচিত তার শিক্ষানীতি। মানুষ পড়তে, লিখতে ও গুনতে শিখতে শুরু করে অভিভাবকদের কাছ থেকে অথবা গৃহশিক্ষকের মাধ্যমে অথবা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেয়ে। প্রাচীন যুগে প্রাথমিক বিদ্যালয়কে বলা হতো পাঠশালা। আমাদের দেশে এক সময় এই প্রাচীন শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহ্যবাহী পাঠশালা ব্রিটিশ শাসনামলেও ছিল। আমি প্রাথমিক শিক্ষা লাভ করেছি আমার মা-বাবার কাছ থেকে এবং পাঠশালায় যেয়ে। আমার মনে পড়ে, ছেলেবেলায় আমার বাংলা পড়াশেখা শুরু হয়েছিল ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ নামের বই দিয়ে। যাতে একটা কবিতা ছিলÑ
পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল
কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল
রাখাল গরুর পাল লয়ে যায় মাঠে
শিশুগণ দেয় মন নিজ নিজ পাঠে।
সে আমলে রাখালেরা বয়সে ছোট হলেও শিশু ভাবা হতো না। শিশু বলতে প্রধানত বোঝাত সরকারি চাকরিজীবীদের সন্তানকে যারা পড়তে, লিখতে ও গুনতে শিখে সরকারি চাকরি করবে। লেখাপড়া করার উদ্দেশ্য ছিল সরকারি চাকরিজীবী হওয়া। বিশেষ করে অফিস-আদালতে কেরানি হওয়া। এখনো আমাদের দেশে লোকে লেখাপড়া শেখে প্রধানত সরকারি চাকরি লাভের আশায়, অন্য কোনো মহৎ উদ্দেশ্যে অনুপ্রাণিত হয়ে নয়। আমার ছেলেবেলায় অর্থাৎ ৮০ বছর আগে মানুষকে ছড়াকেটে বলতে শোনা যেত, 
লেখাপড়া করে যেই
গাড়ি ঘোড়ায় চড়ে সেই।
অর্থাৎ আমাদের লেখাপড়ার লক্ষ্য ছিল আর পাঁচজনকে ছাড়িয়ে যাওয়া। পায়ে হাঁটা মানুষদের চেয়ে আরেক স্তর ওপরে ওঠা। পায়ে হাঁটা মানুষদের প্রতি শিক্ষিত মানুষদের ছিল প্রচ্ছন্ন অবজ্ঞা। আমার কিন্তু লেখাপড়া করতে মোটেই ভালো লাগত না। আমার বাড়ির ধারে ছিল গোয়ালপাড়া। তাদের ছেলেদের দেখতাম মাঠে গরু চড়াতে। আমার ইচ্ছা জাগত রাখাল হতে, পাঠশালার কুঁড়েঘরে আটকা থাকতে নয়। লেখাপড়ায় মন ছিল না বলে বাবার হাতে মার খেয়েছি। পাঠশালায় পণ্ডিত মহাশয়ের কাছে খেয়েছি বেতের বাড়ি। তখন দেশে এখনকার মতো শিশু নির্যাতনের আইন ছিল না। তবে আমার মনে হয়, ওই প্রহার আমাকে বিদ্যাভ্যাসে নিয়োজিত করেছিল, আর পাঠশালায় পড়তে, লিখতে ও গুনতে শিখেছিলাম। যেটা পরবর্তী জীবনে আমার যথেষ্ট কাজে লেগেছে। সে সময় কেউ ভাবতে পরেনি ক্যালকুলেটর ও ক¤িপউটারের কথা। আমাদের তাই নামতা মুখস্থ করতে হতো। আমরা নামতা পড়েছি সব ছাত্র একত্রে; একজন ছাত্রের নির্দেশে, যাকে বলা হতো সরদার-পড়ো। পাঠশালার শিক্ষাব্যবস্থায় পণ্ডিত মহাশয়ের পরই ছিল সরদার-পড়োদের প্রভাব। অর্থাৎ প্রাচীনকালে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থায় বয়স্ক ছাত্ররা নবাগত কনিষ্ঠ ছাত্রদের লেখাপড়ার তথ্য নিত।
বাংলাদেশ একটা মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। অনেককে বলতে শুনি, এ দেশে প্রবর্তিত হওয়া উচিত ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা। এই ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা বলতে ঠিক কী বুঝতে হবে, সে সম্বন্ধে কেউ অবশ্য স্বচ্ছ ধারণা দিতে পারছেন বলে মনে হয় না। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে একটি বহুল প্রচলিত হাদিস হলো : জ্ঞান অর্জনের জন্য প্রয়োজনে সুদূর চীন দেশেও যাও। অর্থাৎ ইসলামে বিশ্বকে পরিভ্রমণ করে জ্ঞান অর্জনের কথা বলা হয়েছে। ইসলামি শিক্ষাব্যবস্থা শুধুই বিদ্যালয়কেন্দ্রিক নয়। ইসলামে কূপমণ্ডূকতাকে প্রশ্রয় দেয়া হয়নি। কবি ও দার্শনিক ইকবালের মতে, মানুষের জ্ঞানের উৎস হলো তিনটি :
অন্তর্গূঢ় অভিজ্ঞতা (Inner Experience)
প্রাকৃতিক জগৎ (Nature)
ইতিহাস (History)
ইকবাল বলেছেন, জ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে প্রথমটির চেয়ে পরের দু’টি উৎসের ওপর বেশি গুরুত্ব প্রদান করতে। কেননা, জ্ঞানচর্চার লক্ষ্য হতে হবে প্রকৃতি ও ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ এবং তার মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধন। তিনি আরো বলেন, ইউরোপীয় সংস্কৃতি আসলে হলো মুসলিম সংস্কৃতির কতগুলো গুরুত্বপূর্ণ দিকেরই পরিণতি। মুসলিম দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকদের মনে যেসব সমস্যা এককালে আলোড়ন তুলেছিল, বুদ্ধির জগতে মুসলিম বিশ্বের তন্দ্রাচ্ছন্ন শতাব্দীগুলোতে ইউরোপের দার্শনিক ও বৈজ্ঞানিকরা সেসব সমস্যা নিয়েই গভীরভাবে ভাবনা-চিন্তা করেছেন। ইউরোপের জ্ঞান-বিজ্ঞানকে তাই অনইসলামিক বলে অবহেলা করলে ভুল করা হবে। ইকবাল এসব কথা বলেছিলেন ১৯৩৪ সালে। কিন্তু মনে হয় এখনো এসব কথা আমাদের ক্ষেত্রে যথেষ্ট প্রাসঙ্গিক হয়েই আছে (দ্রষ্টব্য : Six Lectures on the Reconstructions of Religious Thought in Islam)।
এসব কথা আমার মনে আসছে, কেননা বাংলাদেশে এখন পাঠ্যবই রচনা নিয়ে হচ্ছে শোরগোল। আমাদের পাঠ্যবইতে ইতিহাস ও বিজ্ঞানের নামে এমন অনেক কিছু বলা হচ্ছে, যা ইতিহাস বিজ্ঞানের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। একটা বিশেষ ধরনের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য যেন আচ্ছন্ন করে ফেলতে চাচ্ছে আমাদের লেখাপড়ার জগৎকে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা আমরা যথেষ্ট শুনছি। কিন্তু প্রকৃত যুদ্ধ স¤পর্কে কোনো আলোচনা সেভাবে স্থান পাচ্ছে না আমাদের পাঠ্যবইয়ে। একটি জাতির জীবনে একটা যুদ্ধই শেষ কথা হয়ে থাকে না। তাকে আরো অনেক যুদ্ধের সম্মুখীন হতে হয়। আজ মিয়ানমারের সৈন্যরা বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সমুদ্রসীমানার মধ্যে এসে বাংলাদেশের মাছধরা ট্রলারের ওপর গুলিবর্ষণ করতে সাহসী হচ্ছে। কিন্তু আমরা দিতে পারছি না তার প্রত্যুত্তর। নিশ্চয়ই এটা হচ্ছে না আমাদের মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ। শোনা যাচ্ছে, তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ নাকি সমাগত। কিন্তু সে বিষয়েও দেখা যাচ্ছে আমাদের ঔদাসীন্য। আমাদের পাঠ্যপুস্তকে সমরশক্তি জাগরূক প্রবন্ধ নিতে পারছে না প্রয়োজনীয় স্থান করে। ১৭০০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বর্তমান পাকিস্তান থেকে খান সেনারা এখন আর ভারত পেরিয়ে আমাদের আক্রমণ করতে আসতে পারে না। কিন্তু অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত।
বর্তমানে আমাদের জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড তৃতীয় শ্রেণীর আমার বাংলা বই নামক পাঠ্যবইতে খলিফা হজরত আবু বকর রা:, চতুর্থ শ্রেণীর আমার বাংলা বই নামক পাঠ্যবইয়ে খলিফা হজরত উমর রা: এবং পঞ্চম শ্রেণীর একই বইতে শহীদ তিতুমীর স¤পর্কে রচনা সংযোজন করায় বলা হচ্ছে, শিক্ষাকে ইসলামীকরণ করা হচ্ছে। কিন্তু ইসলাম একটি নগণ্য ধর্ম নয়। ইসলামের ঐতিহাসিক ভূমিকা শিক্ষাপ্রদ। তিতুমীরের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম এ দেশের ইতিহাসে উল্লেখ হয়ে আছে। এক সময় এ দেশের বাম বুদ্ধিজীবীরা তিতুমীরের কথা অনেক বলেছেন। জানি না এখন তারা হঠাৎ তার বিরোধী হলেন কেন? বাংলাদেশ একটি মুসলিম অধ্যুষিত দেশ। খোলাফায়ে রাশেদিনের কথা এ দেশে ছাত্রদের পাঠ্য হওয়া স্বাভাবিক। কিছুসংখ্যক কথিত বাম বুদ্ধিজীবীর হইচইয়ে তাকে নাকচ করে দেয়ার প্রশ্ন উঠতে পারে না। সর্বোপরি দেশের সংবিধানে যখন ইসলাম পেয়েছে রাষ্ট্রধর্মের স্বীকৃতি। যে দেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম, সে দেশে ইসলাম নিয়ে এ ধরনের রাজনৈতিক উত্তেজনা-উদ্দীপক ইসলামবিরোধী বক্তব্য সংবিধানের পরিপন্থী কি না, সেটাও হওয়া উচিত বিবেচ্য। বাংলাদেশের রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। আমাদের বাড়ির কাছের রাষ্ট্র মালয়েশিয়ারও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম। কিন্তু সেখানে ইসলাম নিয়ে এতশত প্রশ্ন উঠছে না। রাষ্ট্রধর্ম বহু দেশেরই আছে। আছে ব্লাসফেম আইন। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র একটি ধর্মরিপেক্ষ রাষ্ট্র। কিন্তু সেখানের আইনে বলে, খ্রিষ্টধর্ম স¤পর্কে এমন কিছু বলা যাবে না, যা হতে পারে শান্তিভঙ্গের কারণ। ইসলাম একটি অজাগতিক ধর্ম নয়। আল কুরআনে বলা হয়েছে, ধন শুধু ধনীদের মধ্যে সঞ্চালিত হতে দেয়া হবে না। ব্যয় করতে হবে অভাগা অভাজনদের জন্য। (সূরা- ৫৯:৭)। ইসলামের নবী তাঁর বিদায় হজের বক্তৃতায় বলেছিলেন, শ্রমিকের গায়ের ঘাম শুকানোর আগেই তার মজুরি পরিশোধ করতে হবে। বিলাতের অক্সফাম নামক প্রতিষ্ঠান বলছে, পৃথিবীর শতকরা একভাগ লোকের হাতে নাকি এত ধনস¤পদ জমেছে যে, তা পৃথিবীর শতকরা ৯৯ ভাগ লোকের হাতে নেই। ইসলামে স¤পত্তির বিভাজন এমন যে, তা গুটিকয় লোকের হাতে স¤পদকে কেন্দ্রীভূত হতে দিতে চায় না। ধর্ম হিসেবে ইসলাম তাই বর্তমান পৃথিবীতে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেনি। অক্সফাম এই হিসাব কিভাবে করেছে আমরা তা জানি না। তবে হিসাবটা অনেকেরই দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত হার্ভার্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্যামুয়েল হান্টিংটন ১৯৯৩ সালে একটি প্রবন্ধ লেখেন। প্রবন্ধটির নাম The Clash of Civilizations, সভ্যতার সঙ্ঘাত। প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত Foreign Affair পত্রিকায়। এতে বলা হয়, ভবিষ্যতে যুদ্ধ হবে বিভিন্ন সভ্যতার ঐতিহ্যবাহী মানবসমষ্টির মধ্যে। যুদ্ধ হবে খ্রিষ্টান বিশ্বের সাথে মুসলিম বিশ্বের। খ্রিষ্টান বিশ্ব বলতে তিনি বিশেষভাবে বোঝাতে চান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিম ইউরোপকে। পরে তিনি ১৯৯৬ সালে একটি বই লেখেন, যার নাম The Clash of Civilizations and The Remaking of World Order । এতে তিনি বলতে চান, ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আর পশ্চিম ইউরোপ তাদের খ্রিষ্টীয় মূল্যবোধের ওপর নির্ভর করে সারা দুনিয়াকে রূপ দিতে চাইবে। ফলে ঘটবে সভ্যতার সঙ্ঘাত। তিনি এই সঙ্ঘাতের ক্ষেত্রে ইউরোপ-আমেরিকার সাথে মুসলিম বিশ্বের সঙ্ঘাতের কথাও টেনে এনেছেন। কিন্তু ইসলাম মানুষের ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, এমন নয়। আল কুরআনে সূরা বাকারায় বলা হয়েছে, ধর্মের নামে কোনো জবরদস্তি নেই। বিশ্বজুড়ে ইসলাম একটি সামাজিক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে চাচ্ছে। বাংলাদেশের মুসলমান ছাত্রদের তাই জানা প্রয়োজন ইসলামের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্বরূপ স¤পর্কে। বাংলাদেশের ছাত্র-পাঠ্যবইয়ে তাই যদি সামাজিক ও রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করে ইসলাম স¤পর্কে কোনো আলোচান সংযোজিত হয়, তবে তাকে অনাবশ্যক বলা চলে না, বরং বলা যেতে পারে সময়োচিত। ইসলাম মানে শুধুই আল্লাহর বন্দেগি করা নয়। সুন্নি মুসলমানদের মধ্যে একটি বহুলপ্রচলিত হাদিসে বলা হয়েছে, আল্লাহতে বিশ্বাস রাখবে, কিন্তু তাই বলে তুমি তোমার উটকে শক্ত করে বাঁধতে ভুলে যাবে না।
শেখ মুজিবুর রহমানের অসমাপ্ত আত্মজীবনী একটি মূল্যবান গ্রন্থ। এর ভাষা বেশ ঝরঝরে। এর কিছু অংশ হতে পারে ছাত্রপাঠ্য। শেখ মুজিব বলেছেনÑ তখন রাজনীতি শুরু করেছি ভীষণভাবে। সভা করি, বক্তৃতা করি। খেলার দিকে আর নজর নেই। শুধু মুসলিম লীগ আর ছাত্রলীগ। পাকিস্তান আনতেই হবে, নতুবা মুসলমানদের বাঁচার উপায় নেই। শেখ মুজিবের এই বক্তব্য থেকে পরিষ্কার হয়ে ওঠে, তিনি দ্বিজাতিতত্ত্বে বিশ্বাস করতেন। তাই শরিক হয়েছিলেন পাকিস্তান আন্দোলনে। তিনি হাজার বছরের বাঙালি ছিলেন না। শেখ মুজিবুর রহমান তার আত্মজীবনীর আরেক জায়গায় বলেছেনÑ আমাদের বাঙালির মধ্যে দুইটা দিক আছে। একটা হলো আমরা মুসলমান, আর একটা হলো আমরা বাঙালি। অর্থাৎ শেখ মুজিব তার মুসলিম স্বাতন্ত্র্য চেতনাকে অস্বীকার করতে চাননি। নিজেকে শুধুই বলতে চাননি বাঙালি। অথচ আমাদের দেশের কথিত বামচিন্তকেরা এক দিকে করছেন শেখ মুজিবের জয়গান, অন্য দিকে করছেন তার মুসলিম স্বাতন্ত্র্য চেতনার বিরোধিতা। বলছেন, হজরত আবু বকর রা:, হজরত উমর রা:দের কথা বলা যাবে না। বলা যাবে না, বাংলাদেশের ইতিহাসখ্যাত তিতুমীরের কথা। তিতুমীরের ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম ও বীরত্বের কথা শ্রদ্ধাভরে উল্লিখিত হয়েছে বিখ্যাত ঐতিহাসিক শ্রী রমেশচন্দ্র মজুমদার লিখিত বাংলাদেশের ইতিহাস গ্রন্থের দ্বিতীয় খণ্ডে। বাংলাদেশের ইতিহাসকে বুঝতে হলে হাজী শরীয়তুল্লাহ ও তিতুমীরের কথা না এসেই পারে না। ঐতিহাসিক রমেশচন্দ্র তাই তাদের প্রসঙ্গ তার বিখ্যাত ইতিহাসগ্রন্থে বাদ দেননি। অথচ আমাদের ছাত্রপাঠ্যবইয়ে তিতুমীরের কথা বলা হয়েছে বলে সমালোচনা করা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, পাঠ্যবইয়ের ইসলামীকরণ হচ্ছে।
ক’দিন আগে (যুগান্তর, ১৪ জানুয়ারি ২০১৭) বাংলাদেশের প্রথিতযশা বুদ্ধিজীবী ও কবি ফরহাদ মজহারের একটি লেখা পড়লাম। লেখাটির নামÑ পাঠ্যবই বিতর্ক : সবার কথা শুনতে হবে। লেখাটি পড়ে ভালো লাগল। তিনি যেভাবে এ দেশের কথিত ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীদের মুখোশ উন্মোচন করেছেন; সেটার প্রয়োজন ছিল। সুখের বিষয়, এরা সংখ্যায় বেশি নন। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলা একাডেমি ও পত্রপত্রিকায় প্রবিষ্ট হয়ে থাকার কারণে যথেষ্ট কোলাহল সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছেন। যদি এরা সংখ্যায় বেশি হতেন, তবে দেশে যে সামান্য গণতন্ত্রটুকু টিকে আছে, তাও অস্তিত্ব হারাত। কেননা, এরা নিজেদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় আস্থাশীল হলেও অপরের ব্যক্তিস্বাধীনতাকে মূল্য দিতে চান না। এদের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ ধর্মীয় গোঁড়ামিকেও ছাড়িয়ে গেছে। সৃষ্টি করছে ঘৃণা-বিদ্বেষ। ধর্মের মানবতন্ত্রী দিকটিকেও এরা জানাতে চাচ্ছেন অস্বীকৃতি। চিন্তাস্বাধীনতার নামে এরা শুধুই তুলে ধরতে চাচ্ছেন যান্ত্রিক জড়বাদী দর্শনকে। এরা মানবমনের বাস্তবতাকে স্বীকার করতে রাজি হচ্ছেন না।
লেখক : প্রবীণ শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/189026