২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
তীব্র গ্যাস সঙ্কটে সীমাহীন ভোগান্তি: সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন
২০ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পাইপলাইনে গ্যাস থাকছে না। তাই দিনে বাসাবাড়িতে চুলা জ্বলছে না। শীতে খাবার পানি পর্যন্ত গরম করা যাচ্ছে না। গভীর রাত জেগে গৃহিণীদের রান্না করতে হচ্ছে। এতে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। যারা রাতজেগে রান্না করতে পারছেন না, তাদের বাধ্য হয়ে হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হচ্ছে। আবার হোটেলগুলোতেও খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। বাসি খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। এতে অনেকেই পেটের পীড়াসহ নানা রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন। স্কুলগামী ছেলেমেয়েদের বাসি খাবার খেয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে। এ চিত্র রাজধানীর।
গত কয়েক দিনে গ্যাস সঙ্কটের কারণে অনেকে কেরোসিনের চুলা কিনেছেন। যাদের সুযোগ আছে, তারা মাটি বা লাকড়ির চুলায় রান্না করছেন। আবাসিক এলাকার অনেক ফ্যাটের বাসিন্দা কাজের বুয়াদের দায়িত্ব দিয়েছেন তাদের বস্তি থেকে খাবার রান্না করে আনার। অনেকেই বাধ্য হয়ে বৈদ্যুতিক হিটার চালিয়ে পানি গরমসহ রান্নার কাজ চালাচ্ছেন। এতে মাসিক বিদ্যুৎ বিলও বেড়ে যাচ্ছে। শুধু বাসাবাড়িতেই সমস্যা হচ্ছে তা নয়, সিএনজি পাম্পগুলোতেও গ্যাসের চাপ কমে গেছে। এতে একবার গ্যাস নিতে ৩-৪ ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে সিএনজিচালিত গাড়িগুলোকে। এ কারণে সিএনজি পাম্পগুলোতে গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে। পাম্পের ভেতর ছাড়িয়ে রাস্তার ওপর কয়েক কিলোমিটার ছাড়িয়ে যাচ্ছে গাড়ির লাইন। এতে করে রাস্তায় স্বাভাবিক যান চলাচলের রাস্তা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। সৃষ্টি হচ্ছে ব্যাপক যানজট। 
রাজধানীবাসীর এ দুর্ভোগ যেন স্থায়ী রূপ নিয়েছে। প্রতি বছরই শীতের শুরুতে এ সঙ্কট শুরু হয়, স্থায়ী হয় পুরো শীতজুড়ে। এ দুর্ভোগের কারণ নিয়ে বরাবরই গ্যাস খাতের সংস্থাগুলোর পরস্পরের পক্ষে-বিপক্ষে দোষারোপ করতে দেখা যায়। যেমনÑ গ্যাস বিতরণের সাথে জড়িত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান তিতাস থেকে বলা হয়, চাহিদা অনুযায়ী তাদের গ্যাস সরবরাহ করছে না পেট্রোবাংলা। আবার পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে তিতাসের পাইপলাইনকেই দোষারোপ করা হয়। বলা হয়, গ্যাস সরবরাহের জন্য পাইপলাইনগুলো অনেক পুরনো এবং ব্যাস কম থাকায় শীতকালে বর্ধিত চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ করা যায় না। 
যাত্রাবাড়ীর দনিয়া এলাকার গ্যাস সঙ্কটের ভয়াবহতা তুলে ধরে গৃহবধূ তানিয়া আকতার ও বিলকিছ আক্তার গতকাল নয়া দিগন্তকে জানিয়েছেন, প্রতিদিন ভোর ৬টায় পাইপলাইনে গ্যাস চলে যায়, সারা দিন আর গ্যাস আসে না। সন্ধ্যায় গ্যাস এলেও অনেক দিন তা রাত ৯টায় চলে যায়। গ্যাসের এ দুর্ভোগে এ এলাকার গৃহিণীরা রাতজেগে রান্না করতে গিয়ে অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। অনেকেই শীত উপেক্ষা করে ভোর ৩-৪টা থেকে দিনের রান্না শুরু করেন। সকাল ৬টার আগেই রান্না শেষ করতে হয়। অন্যথায় উপোস থাকতে হয়। গ্যাসের এ সঙ্কটের কারণে সামর্থ্যবানেরা বিকল্প হিসেবে এলপি গ্যাস ব্যবহার করছেন। কেউ বা কেরোসিনের চুলা কিনে কোনো রকম রান্নার কাজ সারছেন। তবে সবচেয়ে বেশি অসুবিধায় পড়তে হচ্ছে স্কুলগামী ছোট শিশুদের নিয়ে। তাদের বাসি খাবার খেয়ে স্কুলে যেতে হচ্ছে, কিন্তু টিফিন দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
খিলগাঁও তালতলার বি ব্লকের বাসিন্দা আশরাফ আলী জানান, এ এলাকায় নতুন করে গ্যাস সঙ্কট দেখা দিয়েছে। প্রতিদিন সকাল ৯টার পর গ্যাস চলে যাচ্ছে। আর আসছে বেলা ২-৩টায়। এ সময়ের মধ্যে সামান্য পানিও গরম করা যায় না।
উত্তরা ৯ নম্বর সেক্টরের বাসিন্দা ওমর আলী জানান, আগে কখনো এ এলাকায় গ্যাস সঙ্কট ছিল না। এক মাস ধরে গ্যাস সমস্যা এ এলাকার নতুন সঙ্কট হিসেবে দেখা দিয়েছে। বেলা ১১টার পর থেকে দুপুর পর্যন্ত এবং কখনো কখনো রাতেও এ এলাকায় গ্যাস থাকে না। গ্যাসের চাপ কম থাকায় সামান্য খাবার গরম করা যায় না। উত্তরা ৪ নম্বর সেক্টরের অবস্থাও ভয়াবহ। উত্তরা সংলগ্ন উত্তরখান ও দক্ষিণখান এলাকার বাসিন্দারা বলতে গেলে গ্যাসের চুলা জ্বালানো ভুলেই গেছে।
দক্ষিণ মুগদার বাসিন্দা আয়েশা ছিদ্দিকা জানান, মুগদা এলাকায় গ্যাসের করুণ অবস্থা। সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩-৪টা পর্যন্ত একটানা পাইপলাইনে গ্যাস থাকে না। গ্যাস না থাকায় ভয়াবহ সমস্যায় পড়তে হচ্ছে তাদের।
রাজধানীর গেন্ডারিয়া থেকে দেলোয়ার হোসেন গ্যাস সঙ্কটের ভয়াবহতা সম্পর্কে বলেন, রাত ১১টা থেকে সকাল ৬টা পর্যন্ত সরবরাহ লাইনে গ্যাস থাকে। এর মধ্যে রান্না করতে না পারলে হয় হোটেল থেকে খাবার কিনে খেতে হবে, না হয় উপোস থাকতে হবে। আর দিনে মেহবান এলে সামান্য আপ্যায়ন করা যায় না। এতে মানসম্মান নিয়ে টানাটানি অবস্থা। মেহমানকে আপ্যায়ন করতে হয় হোটেলে নিয়ে। তিনি জানান, তার বাসায় গ্রামের বাড়ি থেকে গতকাল এক মেহমান এসেছেন। হোটেলে নিয়ে দুপুরের খাবার খাওয়ানোর ফলে মেহমান অনেকটা মনোুণœ হয়েছেন। তিনি বলেন, একে তো বাড়িভাড়ার সাথে দফায় দফায় বিদ্যুৎ বিল বাড়ানো হচ্ছে। ৩০০ টাকার বিদ্যুৎ বিল এখন ক্ষেত্রবিশেষে দেড় হাজার টাকা পরিশোধ করতে হচ্ছে। সব মিলে রাজধানীতে জীবনযাত্রার ব্যয় অস্বাভাবিক হারে বেড়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে এখন রাজধানীতে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে।
রামপুরার ওয়াপদা ওমর আলী লেনের বাসিন্দা মিসেস রেখা রহমান জানান, সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গ্যাস থাকে না। তিনি আরো বলেন, গোসল করার জন্য এক পাতিল পানি গরম করতে ৪-৫ ঘণ্টা লেগে যায়। এভাবেই চলছে তাদের নিত্যদিন।
বাসাবো কদমতলার বাসিন্দা আনোয়ারা বেগম জানিয়েছেন, দিনে একটু পানি গরম করার মতো গ্যাস থাকে না। ছোট শিশুদের গোসল করার জন্য পানি গরম করা যায় না। রাতজেগে খাবার রান্না করতে হয়। এ কারণে গৃহিণীরা অসুস্থ হয়ে পড়ছেন। এ দুর্ভোগ কবে শেষ হবে, তারও কোনো উত্তর তাদের জানা নেই।
গ্যাসের এ সঙ্কট রাজধানীর বেশির ভাগ এলাকাতেই রয়েছে। এমনকি রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র সংসদ ভবন এলাকার আশপাশে মনিপুরীপাড়া, ফার্মগেট, গ্রিন রোড, মোস্তফা রোড, মতিঝিল, মালিবাগ, রামপুরা ও খিলগাঁও এলাকায়ও গ্যাসের তীব্র সঙ্কট শুরু হয়েছে শীতকাল ঘিরে। 
সিএনজি স্টেশনে দীর্ঘ লাইন : শুধু রান্নার কাজেই রাজধানীবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন না, এসব এলাকার সিএনজি স্টেশনগুলোতে গ্যাস নেয়ার জন্য গাড়ির দীর্ঘ লাইন পড়ে যাচ্ছে। পাইপলাইনে গ্যাসের চাপ কম থাকায় কোনো কোনো এলাকার সিএনজি পাম্প থেকে একবার গ্যাস নিতে ৩-৪ ঘণ্টা লেগে যায়। এতে যানজট সৃষ্টি হচ্ছে। বেড়ে যাচ্ছে পরিবহন ভাড়া। উত্তরা ও বিমানবন্দর এলাকার পাম্পগুলোতে গ্যাসের চাপ এতটাই কমে গেছে যে, পাম্পগুলো বাধ্য হচ্ছে গ্যাস বিতরণ বন্ধ রাখতে। এতে অনেকে বাধ্য হয়েই গ্যাসের পরিবর্তে তেলে গাড়ি চালাচ্ছেন। 
গ্যাস উৎপাদনের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে পেট্রোবাংলার দৈনিক গ্যাস উৎপাদনের প্রতিবেদন থেকে দেখা যায়, গতকাল গ্যাস উৎপাদন হয়েছে ২৭৭ কোটি ঘনফুট। এর মধ্যে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে ১৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে ৯৩ কোটি ঘনফুট। এ হিসাবে প্রায় অর্ধেক, অর্থাৎ ৭৭ কোটি ঘনফুট ঘাটতি রয়েছে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতে। সরকার কারখানাগুলোতে ৩১ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ করা হয়েছে মাত্র ১৪ কোটি ঘনফুট। 
রাজধানীজুড়ে এ ভয়াবহ গ্যাস সঙ্কট উত্তরণের কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি বিতরণ কোম্পানি তিতাসের কাছ থেকে। এ বিষয়ে তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশীল এইচ এম আলী আশরাফ গতকাল ‘নয়া দিগন্ত’কে জানিয়েছেন, এমনিতেই বছরের অন্যান্য সময়ের তুলনায় শীতে গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। কিন্তু এ চাহিদা অনুযায়ী তাদের সরবরাহ করা হচ্ছে না। চাহিদা ও সরবরাহের ঘাটতি বেড়ে যাওয়ায় মূলত গ্যাস সঙ্কট বেড়েছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188868