১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
প্রকৌশল বিভাগের অবহেলা: বিমানের ইঞ্জিন পুড়ে ক্ষতি একশ’ কোটি টাকা
২০ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
ফুয়েল ফিল্টার পরিবর্তন না করায় ইঞ্জিনে আগুন || রক্ষণাবেক্ষণে গাফিলতি বীমার দাবিও নাকচ || পাইলটের দক্ষতায় বেঁচে গেলেন ৪১৯ যাত্রী
প্রকৌশল বিভাগের অবহেলায় বিমানের বোয়িং ৭৭৭-৩০০ এয়ারক্রাফটের একটি ইঞ্জিন পুড়ে গেছে। এতে বিমানের ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে একশ’ কোটি টাকার বেশি। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ইঞ্জিনের ফুয়েল ফিল্টার পরিবর্তন না করায় নতুন কেনা উড়োজাহাজটি এ ক্ষতির মুখে পড়েছে। রক্ষণাবেক্ষণে প্রকৌশলীদের গাফিলতির কারণ দেখিয়ে ক্ষয়ক্ষতির দাবিও নাকচ করে দিয়েছে বীমা কোম্পানি। ৭ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বহনকারী ফ্লাইট আকাশে ৩১ মিনিট চক্কর দেয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ বিমান গঠিত তদন্ত কমিটির রিপোর্টে এ তথ্য উঠে এসেছে।
 
বিমান পরিচালনা পর্ষদ চেয়ারম্যান এয়ার মার্শাল (অব.) মো. ইনামুল বারী যুগান্তরকে বলেন, তদন্ত কমিটি রিপোর্টে বলা হয়েছে, ইঞ্জিনের ফুয়েল ফিল্টার নষ্ট থাকায় ইঞ্জিন বার্ন হয়েছিল। এ নিয়ে বিমানের পক্ষ থেকে দীর্ঘ সময় তদন্ত হয়েছে। ইঞ্জিন প্রস্তুকারী কোম্পানি জিই, ইঞ্জিন মেরামতকারী কোম্পানি এমটিউ ও এবং ইঞ্জিনের বীমা কোম্পানির সঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। চেয়ারম্যান বলেন, বীমা কোম্পানিগুলো তো চাইবেই কিভাবে টাকা দেয়া না যায় সেটা করতে। তবে আমরা এখনও তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছি। তিনি আশা করছেন, বীমা কোম্পানির কাছ থেকে টাকা আদায় করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, এটি যদি বিমানের কারও অবহেলায় হয়ে থাকে তবে তদন্ত রিপোর্টের আলোকে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিমান ম্যানেজমেন্ট ব্যবস্থা নেবে। এ ঘটনায় দ্বিতীয় দফায় কোনো তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে কিনা তা তিনি জানেন না।
 
সূত্র জানায়, প্রতিটি ইঞ্জিনের একটি করে ফুয়েল ও অয়েল ফিল্টার থাকে। একটি ফুয়েল ফিল্টারের দাম ২০ হাজার টাকা। তেলের সঙ্গে যাতে পানি বা অন্য কোনো ময়লাজাতীয় পদার্থ কিংবা তেলের বাই-প্রডাক্ট ইঞ্জিনে প্রবেশ করতে না পারে সে কারণে ফিল্টারগুলো ব্যবহার করা হয়। বোয়িং চেকলিস্ট অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পরপর এই ফিল্টার পরিবর্তন করতে হয়। কিন্তু এক্ষেত্রে তা করা হয়নি। ফলে দীর্ঘদিন পরিবর্তন না করায় ফিল্টারটি অকেজো হয়ে পড়ে। এতে তেলের সঙ্গে সুপার এবজরমেন্ট পলিমার (এসএপি) জাতীয় পদার্থ ইঞ্জিনে প্রবেশ করে, যা তেলের সঙ্গে বিকিরণ ঘটিয়ে আগুন তৈরি করে। এতে পুরো ইঞ্জিনটি পুড়ে যায়। সাধারণত ইঞ্জিনের যে অংশে তেল পড়ে চাপ তৈরি হয় ওইদিন ওই পলিমার মিশ্রিত তেল আরও দূরে গিয়ে আগুন ধরে যাওয়ায় দ্রুত শনাক্ত হয়নি। তবে পাইলট টেকঅফের জন্য প্লেন চালানো শুরু করলে সঙ্গে সঙ্গে ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখা দেয়। বিমানের এক পাইলট বলেন, এ অবস্থায় যদি এয়ারক্রাফটটি আকাশে উড়ত তাহলে মাঝ আকাশে ফ্লাইটটিতে আগুন ধরে ক্রাশ করার আশংকা ছিল। তিনি বলেন, পাইলটের বুদ্ধিমত্তায় ফ্লাইটের ৪১৯ যাত্রী ও ক্রুদের জীবন রক্ষা হয়। একই সঙ্গে বেঁচে যায় ১৪শ’ কোটি টাকার এয়ারক্রাফট।
 
এ ঘটনার পর বিমানের ক্যাপটেন ফজল মাহমুদের নেতৃত্বে ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। দুই পাইলট, দুই প্রকৌশলী ও এক কর্মকর্তাসহ মোট ৫ সদস্যের তদন্ত কমিটি ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী কোম্পানি, ইঞ্জিন মেরামতকারী কোম্পানিসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে। ইঞ্জিনটি যুক্তরাষ্ট্রের অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। এতকিছুর পর জার্মানিতে ইঞ্জিন কোম্পানির অফিস ভিজিট করেন এক প্রধান প্রকৌশলী ও প্রকৌশল বিভাগের পরিচালক। রহস্যজনক কারণে এ সময় কমিটির কোনো সদস্যকে নেয়া হয়নি। বর্তমান পরিস্থিতিতে একই ঘটনায় বিমান আরও একটি তদন্ত কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পেছনেও রহস্য আছে বলে সংশ্লিষ্টরা অভিযোগ করেন।
 
বাংলাদেশ বিমান গঠিত তদন্ত রিপোর্টে বলা হয়েছে, প্রধানমন্ত্রীর ফ্লাইট শাহজালালে অবতরণের আগে অন্য একটি এয়ারক্রাফটের ইঞ্জিনে ক্রটি দেখা দেয়। উড়োজাহাজটি টেকঅফের আগমুহূর্তে পাইলট ইঞ্জিনে ত্রুটি দেখতে পান। এরপর তিনি প্লেনের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে যাত্রী ও ক্রুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন। পরবর্তীকালে ওই এয়ারক্রাফটটি রানওয়ে থেকে সরিয়ে নিলেও ইঞ্জিনের বেশ কিছু ভাঙা অংশ রানওয়েতে পড়ে ছিল। এ কারণে এসএসএফ (স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্স) প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী ফ্লাইটটির অবতরণ থামিয়ে দেয়। তদন্ত কমিটি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করে, যে এয়ারক্রাফট থেকে ধাতব পদার্থ রানওয়েতে পড়েছিল তার একটি ইঞ্জিন আগুনে পুড়ে যায়। ফুয়েল ফিল্টার পরিবর্তন না করায় ইঞ্জিনে আগুন ধরে। খোদ ইঞ্জিন প্রস্তুতকারী কোম্পানি যুক্তরাষ্ট্রের জিই, জার্মানির এমটিইউ তাদের আলাদা প্রতিবেদনেও বিমানের তদন্ত কমিটির রিপোর্ট সঠিক বলে জানিয়েছে। জার্মানির ইঞ্জিন ওভারহোলিং কোম্পানি আগুন লাগার কারণ, কিভাবে আগুন ধরে, ইঞ্জিনের কি কি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সবকিছু পাওয়ার পয়েন্ট প্রেজেন্টেশনের মাধ্যমে বিমানের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকে অবহিত করে।
 
এ পরিস্থিতিতে চাকরি বাঁচাতে পুরো ঘটনা অন্যদিকে ঘোরানোর চেষ্টা চালাচ্ছে বিমানের সর্বোচ্চ ম্যানেজমেন্টের অসাধু কর্মকর্তারা। জানা গেছে, সম্প্রতি বিমানের বোর্ড সভার পর বিমান ম্যানেজমেন্ট ঘটনাটি আবারও তদন্তের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এ জন্য ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী দেবব্রত বণিক ঘটনাটিকে ‘কর্পোরেট সেফটি’ উল্লেখ করে তার পছন্দের কর্মকর্তাকে প্রধান করে নতুন তদন্ত কমিটি গঠনের জন্য নোট ইস্যু করেছেন। আর তাতে সায় দিয়েছেন বিমানের পরিচালক প্রকৌশল উইং কমান্ডার (অব.) আসাদুজ্জামান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্যাপ্টেন (অব.) মোসাদ্দিক আহম্মেদ। এরপর ঘটনাটি আবারও তদন্তের জন্য বিমানের উপ-মহাব্যবস্থাপক কর্পোরেট সেফটি অ্যান্ড কোয়ালিটি আবদুল ওয়াদুদকে প্রধান করে নতুন কমিটি গঠন করা হয়েছে। ঘটনায় বিমানজুড়ে তোলপাড় চলছে। এভিয়েশন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দুর্নীতিবাজ প্রকৌশলীদের দুর্নীতি, স্বেচ্ছাচারিতা ও লুটপাটের কারণে তুচ্ছ ঘটনায় ১৪শ’ কোটি টাকার এয়ারক্রাফটের ইঞ্জিন পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত কাউকে ছাড় না দেয়ার জন্য তারা দাবি জানান।
 
বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোসাদ্দিক আহম্মেদ এ প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য দিতে রাজি হননি। পরিচালক প্রকৌশল আসাদুজ্জামান বলেন, তিনি খুবই ব্যস্ত। একটি এয়ারক্রাফটরে ‘সি চেক’ নিয়ে তার এই ব্যস্ততা। তার মতে, বিমানের ইতিহাসে এই সি চেক একটি বড় ধরনের সাফল্য। বিজি ০৪৯ ফ্লাইটের ইঞ্জিন নিয়ে ক্ষয়ক্ষতির কোনো তথ্য তিনি জানেন না বলেও উল্লেখ করেন।
 
বিমানের সাবেক বোর্ড মেম্বার ওয়াহিদুল আলম বলেন, ০৪৯ ফ্লাইটের ওই ঘটনা কোনোভাবেই ‘কর্পোরেট সেফটি’ হতে পারে না। এটা টেকনিক্যাল সেফটি। এটি তদন্ত করতে হলে টেকনিক্যাল বিশেষজ্ঞ দিয়ে করাতে হবে। মূলত ঘটনাটিকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য নতুন করে এই কমিটি গঠন করেছে ম্যানেজমেন্ট। তিনি বলেন, ফুয়েল ফিল্টার পরিবর্তন না করায় শত কোটি টাকার ইঞ্জিনের যে ক্ষয়ক্ষতি তা সংশ্লিষ্ট অভিযুক্তদের কাছ থেকে আদায় করতে হবে।
 
এদিকে নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানের এক শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, ইঞ্জিনটি আগুনে পুড়ে যাওয়ার পর তার ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে সেটা পরিশোধ করার জন্য বিমানের সংশ্লিষ্ট বীমা কোম্পানির কাছে আবেদন জানানো হয়েছিল। বীমা কোম্পানির কাছে ১০০ কোটি টাকার ক্ষতিপূরণ দাবি করা হয়। কিন্তু সংশ্লিষ্ট কোম্পানি তদন্ত করে প্রমাণ পেয়েছে, প্রকৌশল বিভাগের অবহেলার কারণেই দুর্ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। কাজেই তারা বিমানের বীমার দাবিটিও নাকচ করে দিয়েছে বলে জানা গেছে।
http://www.jugantor.com/first-page/2017/01/20/94606/%E0%A6%AC%E0%A6%BF%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%87%E0%A6%9E%E0%A7%8D%E0%A6%9C%E0%A6%BF%E0%A6%A8-%E0%A6%AA%E0%A7%81%E0%A7%9C%E0%A7%87-%E0%A6%95%E0%A7%8D%E0%A6%B7%E0%A6%A4%E0%A6%BF-%E0%A6%8F%E0%A6%95%E0%A6%B6%E2%80%99-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE