১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
পার্ক দেখে চেনা মুশকিল: দখল ৫
২০ জানুয়ারি ২০১৭, শুক্রবার,
পুরান ঢাকার সিরাজ-উদ-দৌলা পার্কের ভেতরে গড়ে উঠেছে এই অবকাঠামো - সাজ্জাদ নয়ন
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তালিকায় ২৭টি পার্ক রয়েছে। সেগুলোর একটি \'বংশাল ত্রিকোনাকৃতির পার্ক\'। স্থান পুরান ঢাকার বংশাল এলাকা। সরেজমিনে ঘুরে এটা যে পার্ক, তা দেখে চেনা মুশকিল। চারপাশজুড়ে দোকান, ওয়ার্কশপ ইত্যাদি। পার্কের একাংশে তৈরি হয়েছে ময়লা ফেলার ভাগাড়। বাকি যেটুকু ফাঁকা রয়েছে, সেটাও লোহার গ্রিল দিয়ে ঘেরা। ভেতরে একটি বড়সড় উড়ন্ত কবুতরের ভাস্কর্য। অবশ্য ভাস্কর্যের নিচেও আগাছা ও আবর্জনার কমতি নেই। 
 
স্থানীয় বাসিন্দা মোজাহার আলী জানালেন, পার্কটা আগে একটু বড় ছিল। পাশ দিয়ে রাস্তা করায় পার্কের জায়গা কিছুটা কমে গেছে। এখন আর এটাকে পার্ক বলা যায় না। সড়কদ্বীপ বলা যেতে পারে। তবে সিটি করপোরেশন চাইলে এই সড়কদ্বীপকে আধুনিকায়ন করে এলাকার সৌন্দর্য বাড়াতে পারে। তিনি বলেন, বংশালের এই কাজী আলাউদ্দিন রোডেই বর্তমান মেয়রের আদি বাসস্থান। তিনি একটু নজর দিলেই এখানে সৌন্দর্য ফিরে আসতে পারে।
 
স্থানীয়রা জানান, এই এলাকায় বেশ কয়েকটি পার্ক ছিল। এর একটাতে করা হয়েছে নাজিরাবাজার মাতৃসদন এবং পাঠাগার ও ব্যায়ামকেন্দ্র। আরেকটি নাজিরাবাজার পার্ক। সেটারও একাংশে তৈরি করা হচ্ছে একটি বর্জ্য অপসারণের অস্থায়ী কেন্দ্র (এসটিএস_সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশন)। আরেকাংশ বর্জ্য ফেলার স্থান হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে বর্তমানে। বাকি অংশ পার্কের মতো মনে হলেও শিশু-কিশোরদের বিনোদন দেয় এমন কোনো উপকরণ নেই।
 
সরেজমিনে দেখা যায়, পার্কটির সামনেই রয়েছে একটি পুকুর। পানি সবুজাভ। দেখেই বোঝা যায়, একসময় এই পার্ক ও পুকুরকে কেন্দ্র করে এলাকার সৌন্দর্য নেহাত মন্দ ছিল 
 
না। এখন সেই সৌন্দর্য অনেকটাই মলিন।
 
অবশ্য পুরান ঢাকার আরও ডজনখানেক পার্ক সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, পার্কগুলোর বর্তমান চিত্র অতীতের চেয়ে বেশ ভালো। সম্পূর্ণ বেদখলে কোনো পার্ক আর নেই। একসময় ইংলিশ রোড পার্কটি সম্পূর্ণ বেদখল হয়ে গিয়েছিল। এলাকাবাসী ময়লা ফেলে আবর্জনার স্তূপ বানিয়েছিল। বাকি অংশ দখল করে ট্রাকস্ট্যান্ড বানিয়েছিল স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী। ডিএসসিসি সেটা উদ্ধার করে একাংশে বেড়া দিয়ে দৃষ্টিনন্দন কিছু স্থাপত্য নির্মাণ করেছে। বিভিন্ন ধরনের ফুল-লতাগুল্মের গাছ রোপণ করে সেটাকে আধুনিকায়ন করেছে। বাকি অংশ ইটের প্রাচীর দিয়ে ঘেরাও করা হলেও ভেতরে কিছু লোক এখনও মালপত্র রাখছেন। সরেজমিনে দেখা গেছে, পার্কটির পূর্ব কোণে কে বা কারা একটি টংঘর বানিয়ে রেখেছে। দক্ষিণ পাশে স্থানীয় কোনো ব্যবসায়ী রেখেছেন অনেকগুলো লোহার পাত। আশপাশে পার্কের গা-জুড়ে অবস্থান নিয়েছে ট্রাকগুলো। ভেতরে পার্কের কোনো উপকরণ নেই। সেখানে প্রবেশের কোনো উপায় নেই শিশু-কিশোরদের। নয়াবাজারের সিরাজ-উদ-দৌলা পার্কে গিয়ে দেখা যায়, ভেতরে 
 
কিছুটা ছিমছাম চেহারা। কিন্তু উত্তর-পশ্চিম কোণে দেখা যায় একটি ছোট টিনশেড ঘর। সেখানে থাকেন ডিএসসিসিরই মাস্টাররোলের কর্মচারী নিরাপত্তাকর্মী শাহাবুদ্দিন। পাশাপাশি ডাবের ব্যবসাও করেন পার্কের ফটকে। তিনি জানান, এই পার্ক দেখার জন্য সিটি করপোরেশনের তিনজন কর্মচারী আছেন। তার মধ্যে তিনি একজন। পার্কও দেখেন, পাশাপাশি পার্কের পাশে ডাবও বিক্রি করেন। ডাবগুলো ওই ঘরের ভেতরেই রাখেন। তবে প্রায়ই কিছু লোক পার্কের ভেতরে ময়লা ফেলে বলে অভিযোগ করেন তিনি। আর ঘরটি অনেক আগে থেকেই আছে, তাই সেখানেই তিনি থাকেন। দেখা যায়, ঘরটির পাশে একটি রিকশা। রিকশাটি কার_ জানতে চাইলে শাহাবুদ্দিন বলেন, আরেকজন কর্মচারী আছেন আবুল। এটা তার রিকশা। ভাড়া দেন। বাইরে রাখলে চুরি হয়ে যেতে পারে। এ জন্য পার্কেই রাখা হয়েছে। দেখা যায় রিকশার পাশেই কিছু চিপসের প্যাকেট। সেটা রুবেল নামের আরেকজন যুবকের। চিপসগুলো এখানে রেখে বাইরে বিক্রি করেন তিনি। দেখা যায় পার্কটির পূর্ব দিকের দেয়াল ঘেঁষে কিছু লোক ময়লা ফেলছেন। সেগুলো পরিচ্ছন্নতা কর্মীরা পরিষ্কার করেননি। পার্কটি ডিএসসিসির কাগজপত্রে দুই বিঘা হলেও বাস্তবে মনে হয় ওই পরিমাণ জায়গা বর্তমানে পার্কে নেই। স্থানীয়রা জানান, কিছু অংশে একটি পানির পাম্প বসানো হয়েছে। কিছু অংশ বেদখলও হতে পারে। দেখা যায় পার্কটির দেয়াল ঘেঁষে কেবলই অসংখ্য অস্থায়ী দোকানপাট। 
 
এর কিছুদূরেই বাবুবাজার পার্ক ও খেলার মাঠটির অবস্থান। সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ওই পার্কে ঘাস নেই, আছে কেবলই ধুলো। অবশ্য ঘাসের অভাব পরোয়া করছে না ছোট বাচ্চাগুলো। তারা ওই পার্কে ফুটবল খেলছিল। পার্কের চারপাশে সীমানাপ্রাচীর দেওয়া আছে। স্থানীয় দোকানিরা মাঠের কোণে যে প্রাতঃকর্ম সারেন, তা দেখেই বোঝা গেল। স্থানীয়রা জানান, এই পার্ক কাম মাঠটিতে সিটি করপোরেশন পার্কিং জোন বানাতে চেয়েছিল। এলাকাবাসীর প্রতিবাদে সেটা আর পারেনি ডিএসসিসি। তার পরও মাঠটিকে পার্কিং জোন করার হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন কি-না, তা নিয়ে এলাকাবাসী সংশয়ে আছেন। 
 
জানা গেছে, ডিএসসিসি এলাকায় বর্তমানে মোট যে ২৭টি পার্ক রয়েছে, সেগুলোর বেশিরভাগই পুরান ঢাকায়। পার্কগুলোর আয়তন কাগজ-কলমে যা আছে, বাস্তবে আছে তার চেয়ে কম। আশপাশের বাসিন্দা বা প্রভাবশালীরা এসব পার্কের অংশবিশেষ দখল করে নিয়েছেন। পার্কের দিকে সীমানা দেয়াল বাড়িয়ে এই কাজ করেছেন তারা। এর মধ্যে কিছু পার্ক ছিল সম্পূর্ণ বেদখলে। সেসব পার্ক এরই মধ্যে দখলমুক্ত করা হয়েছে। এখন ডিএসসিসি চাইছে পার্কগুলোর আধুনিকায়ন করতে। 
 
এ প্রসঙ্গে ঢাকা দক্ষিণের মেয়র সাঈদ খোকন জানান, এক হাজার কোটি টাকার একটি মেগা প্রকল্প হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। এ প্রকল্পের আওতায় ১৯টি পার্ক ও ১২টা খেলার মাঠের আধুনিকায়ন করা হবে। এ প্রকল্পের নাম দেওয়া হয়েছে \'জল-সবুজে ঢাকা\'। পার্ক ও মাঠগুলোর আধুনিকায়ন কীভাবে করা হবে, সে লক্ষ্যে ১৩টি সংস্থার গুণী ১০০ প্রকৌশলী-স্থপতিকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কোন পার্কটি কীভাবে সাজানো যায়, সেভাবে তাদের নকশা দিতে বলা হয়েছে। তারা বর্তমানে নকশা প্রণয়নের কাজ করছেন। তাদের দেওয়া নকশা অনুযায়ী পার্কগুলোর উন্নয়নকাজ করা হবে; পার্কগুলো সজ্জিত করা হবে। ২০১৭ সালের মধ্যেই এসব কাজ শেষ করার পরিকল্পনা ডিএসসিসির রয়েছে।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/20/264245#sthash.qGDDMabd.dpuf