১৯ নভেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
স্কুলের ভেতরে বসতবাড়ি: দখল ৪
১৯ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই ভবনের একাংশকে বসতবাড়ি বানিয়ে ফেলেছেন বিদ্যালয়টির প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারীরা -মামুনুর রশিদ
বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। পুরান ঢাকার প্যারিদাস রোডের এই স্কুুলটিরই একাংশে পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করছেন স্কুলের জমিদাতা জগদীশ চন্দ্র দাসের নাতি কমল চন্দ্র দাস ওরফে দুখু। অথচ স্কুলে নেই ক্লাস নেওয়ার মতো জায়গা। নেই শৌচাগার এবং খাবার পানির ব্যবস্থাও। তবু এভাবেই চলছে স্কুলটি।
 
শুধু এই একটি স্কুল নয়, সরেজমিন পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে আরও অনেক শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সন্ধান মিলেছে, যেগুলোর জায়গা-জমি 
 
বেহাত হয়ে গেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়-সংক্রান্ত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির পক্ষে গঠিত উপকমিটির প্রতিবেদনে রাজধানীর যে অর্ধশত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জায়গা-জমি ও ভবন বেদখলের তথ্য পাওয়া যায়, সেগুলোর বেশিরভাগই পুরান ঢাকার।
 
বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিদাতা জগদীশ চন্দ্র দাস স্থানীয় ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য নিজের বাড়িতেই স্কুলটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন বলে জানালেন তার নাতি কমল দাস। ঠিক কবে থেকে স্কুলের শুরু হয়েছিল, তা খোদ কমল দাসও জানাতে পারলেন না। 
 
তিনি বললেন, সেটা ব্রিটিশ আমলের কথা, পাঠশালার মতো করে চলছিল এই টোলের স্কুল। পরে মুক্তিযুদ্ধের পর স্কুলটি সরকারি করা হয়। কিন্তু জমিদাতার উত্তরাধিকারীদের থাকার মতো বাড়ি না থাকায় কমল চন্দ্র দাস ও তার দুই ভাই এবং তাদের এক পিসি এখন সরকারি এ স্কুলের একাংশে বসবাস করছেন। এতে চরম অব্যবস্থাপনায় রয়েছে স্কুলটির পরিবেশ। 
 
সরেজমিন বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, স্কুলটির শ্রেণি কক্ষ মাত্র তিনটি। শিক্ষার্থী ২২ জন। শিক্ষক দু\'জন। শৌচাগার এবং খাবার পানির ব্যবস্থা যেমন নেই, তেমনি নেই শিক্ষকদের বসার কক্ষও। এমন সমস্যার মধ্যেই স্কুলটির একাংশে বসবাস করছে তিনটি পরিবার। জমিদাতার উত্তরাধিকারীদের ওই তিন পরিবারের দাবি, ব্রিটিশ আমলে এই এলাকার ছেলেমেয়েদের লেখাপড়ার জন্য নিজের বাড়িতেই টোলের মতো যে পাঠশালাটি করেছিলেন জগদীশ চন্দ্র দাস, জগদীশের মৃত্যুর পরও সেটি বন্ধ করেননি তার ছেলে চন্দ্র মোহন দাস। পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭৩ সালে স্কুলটি সরকারি করা হয়। তবে তারা কখনও স্কুলের জন্য জমি দান করেননি। তাদের দাবি, ২০১৫ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রী স্কুলটি পরিদর্শনে এসে এটি অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে বলে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছিলেন। বসতবাড়ির মধ্যে স্কুলের অবস্থান মানতে নারাজ তারা। তাই স্কুলটি অন্য কোথাও সরিয়ে নেওয়া হোক এমনটাই তাদের দাবি।
 
স্কুলটির প্রধান শিক্ষিকা সাদিয়া মৌ অবশ্য স্কুলের জমির কোনো দানপত্র রয়েছে কি-না তা নিশ্চিত করতে পারলেন না। তিনি বলেন, স্থানাভাবে স্কুলটিতে লেখাপড়ার কোনো পরিবেশ নেই। এ কারণে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও কমে গেছে। তিনি বলেন, স্কুলটি অন্যত্র সরিয়ে নিতে সুপারিশ করা হয়েছে। ঢাকা জেলার প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শাহীন আরা বেগম অবশ্য জানালেন, এই স্কুলটি কাছেরই একরামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সঙ্গে একত্রকরণের কাজ চলছে। তবে তিনিও নিশ্চিত করতে পারেননি স্কুলের জমিটি কার। তার বক্তব্য, যদি এমন হয়ে থাকে যে জমিটি আদৌ দান করা হয়নি, তাহলে নিশ্চয়ই প্রতিষ্ঠাতার উত্তরাধিকারীদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হবে এটি। তবে জমি নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এখতিয়ার তার নেই।
 
রাজধানীর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর হাল-হকিকত দেখার জন্য প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে পাঁচ সদস্যের যে উপকমিটি গঠন করা হয়, ২০১৪ সালের ২২ অক্টোবর তারা স্কুলগুলোতে সরেজমিন ঘুরে যে প্রতিবেদন দিয়েছিল, তাতেও বাংলাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কথা রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুলের \'প্রতিষ্ঠাতারা\' বসবাস করছেন ভবনের দোতলায়, শ্রেণিকক্ষের মধ্য দিয়ে আসা-যাওয়া করেন তারা। ওই প্রতিবেদনে পাওয়া তথ্য থেকে আরও জানা যায়, পুরান ঢাকার কোতোয়ালি থানার সুরিটোলা মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমিতে ওয়াসার পাম্প বসানো হয়েছে। এ ছাড়া বিদ্যালয় ভবনের প্রথম, তৃতীয় ও চতুর্থ তলা ব্যবহার করছে রমনা রেলওয়ে উচ্চ বিদ্যালয়। এফকেএম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় থেকে চতুর্থ তলায় কার্যক্রম চালাচ্ছে বংশাল উচ্চ বিদ্যালয়। তৃতীয় ও চতুর্থ তলা ব্যবহৃত হচ্ছে কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে। ছোট কাটরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় দখল করে রেখেছে আবদুল হামিদ কালান্দর উচ্চ বিদ্যালয়। আরমানিটোলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ১৮.০২ শতাংশ জমির মধ্যে ৫.৬ শতাংশ জমি নিজ নামে নামজারির মাধ্যমে দখল করেছেন সাবেক প্রধান শিক্ষক। নাজিরাবাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দুটি কক্ষ নাজিরাবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় দখল করে মালপত্র রেখেছে। হাজি মাজহারুল হক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একটি কক্ষ আনসার বাহিনী দখলে রেখেছে। গোয়ালনগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি ১৯৯০ সাল থেকে স্থানীয় হাইস্কুলের নামে দখল হয়ে গেছে। সূত্রাপুর থানার গে ারিয়া মহিলা সমিতি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২৫.৭৬ শতাংশ জমি দখল করে নিয়েছে খেলাঘরের স্থানীয় শাখা। স্কুলের সামনে তিনটি দোকান দখল করে আছে গে ারিয়া মহিলা সমিতি। এমএ আলীম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঁচ শতাংশ জমি দখল করে পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করছেন স্থানীয় এক প্রভাবশালী। শহীদ নবী মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ২.০৩ শতাংশ জমি দখল করেছে শহীদ নবী উচ্চ বিদ্যালয়। বিপিন রায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সীমানা প্রাচীরের ভেতরে একটি ক্লাবের কার্যালয় নির্মাণ করা হয়েছে। মুসলিম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি নিয়ে আনোয়ার হোসেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে মামলা চলছে। ঢালকানগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের জমি নিয়েও মামলা আছে। শিশুরক্ষা সমিতি প্রাথমিক বিদ্যালয় নতুন করে জাতীয়করণ হলেও স্থানীয় পঞ্চায়েত কমিটি এ বিদ্যালয়ের ১৬ শতাংশ জমি দখল করে ঘর বানিয়েছে। শিশুরক্ষা সমিতি কারিগরি মহাবিদ্যালয় পরিচালনা করছে। ডেমরা থানার ব্রাহ্মণচিরণ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩১ শতাংশ জমিতে টিনের ঘর তৈরি করে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। 
 
সংসদীয় স্থায়ী কমিটি থেকে প্রতিবেদনের আলোকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়কে বলা হয়। পরে মন্ত্রণালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ঢাকা জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। গত অক্টোবরে স্থায়ী কমিটির এক বৈঠক সামনে রেখে ঢাকার জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার পক্ষে একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন দাখিল করেন। ওই প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পুনরুদ্ধার কার্যক্রম কেবল উদ্যোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এরপর গত বছরের ৩০ মার্চ একই দপ্তর থেকে ২৩টি স্কুলের বেদখল জমি-ভবন উদ্ধার বিষয়ে পাঠানো আরেক প্রতিবেদনে মাত্র দুটি স্কুলের ক্ষেত্রে সামান্য অগ্রগতির কথা উল্লেখ আছে। অবশ্য উপকমিটির সদস্য উম্মে রাজিয়া কাজল জানান, আমাদের প্রতিবেদন অনুযায়ী স্কুলগুলোর জমি পুনরুদ্ধারের কাজ চলছে। বেশ কিছু স্কুল দখলমুক্ত হয়েছে। আমরা বিষয়টি নজরদারিতে রেখেছি। এখন এটা কেবল সময়ের ব্যাপার। সব কয়টি স্কুলের জমিই পুনরুদ্ধার করা হবে। 
 
উল্লেখ্য, আ খ ম জাহাঙ্গীর হোসাইনকে আহ্বায়ক করে গঠিত ওই উপকমিটির অন্য সদস্যরা হলেন_ নজরুল ইসলাম বাবু, আলী আজম ও মোহাম্মদ ইলিয়াছ।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/19/264026#sthash.6Sju81kE.dpuf