২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
নূর হোসেনের সহযোগীরা বহাল তবিয়তে
১৯ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
নারায়ণগঞ্জে সাত খুন ঘটনার পর নূর হোসেনের অস্ত্র ও মাদকের আস্তানায় অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিপুল মাদক ও অস্ত্রের সন্ধান পাওয়া যায় : ফাইল ফটো
সাত খুনের প্রধান আসামি মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নূর হোসেন এখন কারাগারের কনডেম সেলে। উচ্চ আদালতে রায় বহাল থাকলে বলা যায় তিনি মৃত্যুর মুখোমুখি। তাতে কী, তার সহযোগীরা বহাল তবিয়তে রয়েছে এলাকাতে। তার ফেলে যাওয়া রাজত্ব চালাচ্ছে তারা আগের মতোই। দাপিয়ে বেরাচ্ছে এক সীমানা থেকে আরেক সীমানা পর্যন্ত। তার কয়েকজন সহযোগী গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর ও জেলা পরিষদ নির্বাচনে সদস্য নির্বাচিত হয়েছেন।
সাত খুনের ঘটনার আগে সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকাতে ট্রাকস্ট্যান্ড থেকে চাঁদাবাজি, প্রকাশ্য মাদক, জুয়া, নগ্ন নৃত্য পরিচালনা করত নূর হোসেন, যেখান থেকে তোলা টাকার প্রায় ১০ লাখ টাকা বিভিন্ন সংস্থাকে উপঢৌকন হিসেবে দেয়া হতো। সাত খুনের মামলায় আসামিদের জবানবন্দী ও চার্জশিটে উঠে আসে এসব তথ্য। যারা মূলত এসব সেক্টর নিয়ন্ত্রণ করেছে তারা এখনো বহাল রয়েছে এলাকাতে।
দণ্ডপ্রাপ্ত ২৩ আসামির মধ্যে রয়েছেÑ নূর হোসেনের প্রধান বডিগার্ড মর্তুজা জামান চার্চিল, প্রধান ক্যাশিয়ার আলী মোহাম্মদ, ক্যাশিয়ার সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহপ্রচার সম্পাদক আবুল বাশার, মাদক স্পট, জুয়া ও অশ্লীল নৃত্য পরিচালনাকারী রহম আলী ও মিজানুর রহমান।
সাত খুনের ঘটনায় গ্রেফতার হলেও শেষতক চার্জশিটভুক্ত না হওয়ায় ছাড়া পাওয়া নূর হোসেনের আরো ১০ জন সহযোগী হলোÑ তার বডিগার্ড মহিবুল্লাহ, তানভীর, ইয়াসিন, আলমগীর, গাড়িচালক সোনা মিয়া, জুয়েল আহম্মেদ, মিজান, আবদুর রহিম, আরিফুজ্জামান, রফিকুল ইসলাম। 
এজাহারভুক্ত কিন্তু চার্জশিট থেকে অব্যাহতিপ্রাপ্ত পাঁচ আসামি হলোÑ সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাজী ইয়াসিন মিয়া, ইকবাল, হাসমত আলী হাসু, থানা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক আমিনুল হক রাজু ও আনোয়ার। 
সাত খুন থেকে অব্যাহতি পাওয়া আসামি প্রসঙ্গে মামলার বাদি নিহত প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অভিযোগ করেছিলেন, নূর হোসেন ও ইয়াসিন এলাকায় জমি দখল, মাদক ব্যবসায় নিয়ন্ত্রণ ও চাঁদাবাজি করে আসছিলেন। নজরুল ইসলাম এসব কর্মকাণ্ডের প্রতিবাদ করার কারণেই তাকে কয়েকবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল।
নূর হোসেনের সহযোগীদের দখলে পদ পদবি
গত ২২ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত সিটি করপোরেশন নির্বাচনে নূর হোসেনের বেশ কয়েকজন কাউন্সিলর পদে জয়ী হয়েছেন। নির্বাচনের আগে কারাবন্দী নূর হোসেনের নির্দেশে তার অনুসারীরা কয়েকজন প্রার্থীর পক্ষে ছিল সক্রিয়।
নূর হোসেনের শ্যালক নূরে আলম খান পুলিশের খাতায় সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত। গত বছর রাজধানীর মহাখালীতে নূর হোসেনের লাইসেন্স বাতিলকৃত পিস্তলসহ ধরা পড়ার পরও নূর আলম চিকিৎসাধীন অবস্থায় পালিয়ে যান। গত ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদ নির্বাচনে তিনি ৯ নম্বর ওয়ার্ড (জামপুর ইউনিয়ন, নোয়াগাঁও ইউনিয়ন, কাঁচপুর ইউনিয়ন ও সাদিপুর ইউনিয়ন) থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে ৪০ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। 
২ নম্বর ওয়ার্ডে নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি ওই মামলায় অব্যাহতি পাওয়া আসামি ইকবাল হোসেনের কাছে হেরেছেন। ইকবাল থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হলেও তাকে প্রত্যক্ষ সহায়তা করছেন একই ওয়ার্ডের বাসিন্দা থানা আওয়ামী লীগের সেক্রেটারি হাজী ইয়াসিন। ইয়াসিন মামলার আসামি হলেও চার্জশিট থেকে তার নাম বাদ দেয়া হয়। ২০১৪ সালে নজরুলের মৃত্যুর পর উপনির্বাচনে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন বিউটি। ওই সময়ে নূর হোসেনের অনেক সহযোগী ছিল পলাতক। তবে এবার তারা এলাকাতে বীরদর্পে থাকায় কাজ করেছেন বিউটির বিরুদ্ধে ও ইকবালের পক্ষে।
৩ নম্বর ওয়ার্ডে এবারো জিতেছেন নূর হোসেনের ভাতিজা শাহজালাল বাদল। সাত খুনের পর তিনি দীর্ঘ দিন পলাতক ছিলেন। ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে এলাকায় ফিরে এলে পুলিশ তাকে গ্রেফতার করে। পরে তিনি জামিনে মুক্তি পান। ৪ নম্বর ওয়ার্ডে নূর হোসেনের ক্যাশিয়ার আরিফুল হক হাসান এবারো জিতেছেন। গত বছরের ২৮ এপ্রিল মদসহ আরিফুলকে র্যাব গ্রেফতারও করেছিল। আরিফুল নির্বাচিত হওয়ার পর দিন তার প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীর বিরুদ্ধে মামলা করেন।
৬ নম্বর ওয়ার্ডে থানা যুবলীগের আহ্বায়ক মতিউর রহমান জিতেছেন। সাত খুনের পর তিনি অনেক দিন পলাতক ছিলেন। ওই সময়ে সিআইডি কয়েকবার মতির বাসায় অভিযান চালায়। নূর হোসেনের সাথে তার ভালো সম্পর্ক ছিল।
সাত খুনের ঘটনায় নজরুলের সাথে নিহত স্বপনের ভাই মিজানুর রহমান খান রিপন ৭ নম্বর ওয়ার্ডে নির্বাচন করে হেরেছেন। এখানে জিতেছেন নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজন আলী হোসেন আলা।
সিদ্ধিরগঞ্জের সর্বত্র ছিল নূর হোসেনের চাঁদাবাজি
শিমরাইল ট্রাক টার্মিনাল থেকে গাড়ির প্রতিটি ট্রিপ বাবদ ৩৫০ টাকা চাঁদা আদায় করতেন নূর হোসেন। সিলেট ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১৮টি জেলার প্রায় ৭০টি রুটের শতাধিক বাস কাউন্টার থেকে দৈনিক ৩০০ টাকা চাঁদা আদায় করা হতো। বেবি ট্যাক্সি, সিএনজি, টেম্পোস্ট্যান্ড, দুরন্ত পরিবহন, শীতলক্ষ্যা পরিবহন, নসিব পরিবহনসহ প্রতিটি পরিবহনের গাড়ি থেকে ৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হতো তাকে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন শ্রমিক ইউনিয়ন (বি-৪৯৪) এর শিমরাইল পূর্বাঞ্চলীয় কমিটির রসিদে এ চাঁদাবাজি হতো। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রতি মাসে পরিবহন থেকে ৪০ লাখ টাকার ওপরে চাঁদা আদায় করা হতো। ফুটপাথের চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করত নূর হোসেনের বিশ্বস্ত ছিন্নমূল হকার্স সমিতির সভাপতি পরিচয়দানকারী সেলিম রেজা। সিদ্ধিরগঞ্জের হিরাঝিল ও এর আশপাশ এলাকায় গড়ে ওঠা ১৪টি চুন উৎপাদনকারী কারখানা থেকে মাসে অন্তত ৪০ লাখ টাকা চাঁদা আদায় করত নূর হোসেন। মণপ্রতি ৩০ টাকা চঁাঁদা দিতে হতো নূর হোসেনকে। সিদ্ধিরগঞ্জের কাঁচপুরে শীতলক্ষ্যা নদীর পশ্চিম তীরে নদী দখল ও ভরাট করে বালুর সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল নূর হোসেন ও তার ছোট ভাই নূরুজ্জামান জজ।
এখানো এলাকাতে নূরের লোকজন
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নূর হোসেনের ভাই নুরুজ্জামান জজ এলাকায় ফিরেই কাঁচপুর সেতুর ঢালে মেসার্স জেরিন ট্রেডার্সের সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে বালুর ব্যবসায় শুরু করেছেন। শিমরাইল ট্রাক টার্মিনালটির নিয়ন্ত্রণ ছিল মনিরের ছোট নজরুল ও জহিরুলের হাতে। কাউন্সিলর আরিফুল ও কাউন্সিলর বাদল এখন ট্রাকস্ট্যান্ডটি নিয়ন্ত্রণ করছেন। নূর হোসেনের ভাতিজা আনোয়ার হোসেন ওরফে আনু এলাকায় ফিরে লেগুনা ও টেম্পোস্ট্যান্ড দখলে নিয়েছেন। সেখানে ৩০০ লেগুনা থেকে প্রতিদিন ১৫০ টাকা করে চাঁদা তোলা হয়। নূর হোসেনের ভগ্নিপতি রতন মোল্লা পরিবহন সেক্টরের দখল নিয়েছেন।
বিত্ত বৈভবে নূর হোসেন
জানা গেছে, হলফনামায় নিজেকে মাছ ব্যবসায়ী পরিচয় দিলেও অঢেল সম্পদ করেছেন নূর হোসেন। শিমরাইলে ১১ শতাংশ জমির ওপর প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে পাঁচতলা ফ্যাট বাড়ি নির্মাণ করেছেন নূর হোসেন। এই ফ্যাটের ওপরের দুইতলায় করেছেন অত্যাধুনিক বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স। এই বাড়িটিতে ব্যবহার করেছেন ইটালি থেকে আমদানি করা ব্রাউন কালার থাই গ্লাস। স্যানিটারি পণ্য দিয়েছেন ইটালি ও ভারতের। টাইলস এবং মার্বেল দিয়েছেন চীন ও নেপালের। ঝাড়বাতি দিয়েছেন জার্মানি থেকে আমদানি করা। শিমরাইলে ১০ শতাংশ জমির ওপর প্রায় পাঁচ কোটি টাকা ব্যয়ে সম্প্রতি ছয়তলা বাড়ি, ১০তলা ফাউন্ডেশন দিয়ে ছয়তলা ভবন, রসুলবাগে সাড়ে আট কাঠা জমির ওপর সাততলা ভবনসহ পাঁচটি বিলাসবহুল বাড়ি ও চারটি ফ্যাটের মালিক নূর হোসেন। তার বাড়িগুলোতে জার্মানি, চীন, ভারত ও নেপাল থেকে আমদানি করা স্যানিটারিসামগ্রী, টালইস এবং অত্যাধুনিক সব আসবাবপত্র ফিটিংস রয়েছে।
নূর হোসেনের মালিকানায় রাজধানীর গুলশান-২-এ রয়েছে দু’টি ফ্যাট। গুলশান লেকের ধারে ৩৬০০ স্কয়ার ফুটের ফ্যাট দু’টিতে বসবাস করতেন নূর হোসেন। এ ছাড়া বনানী ও ধানমণ্ডিতে আরো দু’টি ফ্যাট রয়েছে তার। নূর হোসেনের ঘনিষ্ঠজনদের দাবি চারটি ফ্যাটের গড় মূল্য অন্তত ৮ কোটি টাকা। এ ছাড়া স্থানীয়দের দাবি অন্তত ৫০ বিঘা জমির মালিক নূর হোসেন। এর মধ্যে বেশ কিছু সরকারি সম্পত্তিও তার দখলে রয়েছে। সিদ্ধিরগঞ্জ আঁটি মৌজায় দুই বিঘা এবং ৪২৮ দাগে ৩০ শতাংশ জমি, সিদ্ধিরগঞ্জ হাউজিংয়ের উল্টো পাশে চার বিঘা সরকারি জমি, সানারপাড় এলাকায় চার বিঘা জমি রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি অনেককেই অস্ত্রের মুখে কম দামে জমি বিক্রি করতে বাধ্য করতেন নূর হোসেন। ডেমরা কলেজসংলগ্ন আফজাল ডকইয়ার্ডে চার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি জাহাজ তৈরির অর্ডার দিয়েছিলেন নূর হোসেন। দু’টি নূর হোসেনের ভাইয়ের নামে ও অপর দু’টি তার সহযোগী মতিনের নামে। আফজাল ডকইয়ার্ডের মালিক আফজাল হোসেন জানান, তিন মাস আগে চার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি জাহাজ নির্মাণের অর্ডার দেয়া হয়েছিল। এর মধ্যে চারটি জাহাজের নির্মাণকাজ দুই-তৃতীয়াংশ সম্পন্ন হয়েছে।
সব মিলিয়ে নূর হোসেন ও তার সহযোগীর দাপটে কোণঠাসা সাত খুনে নিহতদের স্বজনসহ এলাকাবাসী। আতঙ্ক কাটছে না কোনোভাবেই। সাত খুনের মামলার বাদি ও নিহত নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি অভিযোগ করেন, মামলার কারণে এবার হাজী ইয়াছিন তার বিরুদ্ধে কাজ করেছেন। সে কারণেই নির্বাচনে তিনি হেরে গেছেন। এখন তাদের উল্টো হুমকি দেয়া হয়েছে। সাত খুনের চার্জশিট দেয়ার পর থেকে অব্যাহতি পাওয়া লোকজন এসে নানা অপকর্ম করে বেড়াচ্ছে।
এ বিষয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানার ওসি সরাফত উল্লাহ জানান, কেউ কাউকে হুমকি দিচ্ছে কিংবা স্বাভাবিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেয়া হচ্ছে এমন কোনো অভিযোগ কেউ করেননি।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188566