২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
উন্নয়ন প্রকল্প গতিহারা
১৯ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
রেলের উন্নয়নে নেওয়া ৪১টি প্রকল্পের অধিকাংশই চলছে ঢিমেতালে। এর মধ্যে বেশ ক\'টির মেয়াদপূর্ণ হয়েছে। বাস্তবায়ন কাজে গতি না থাকায় বারবার সময় বাড়ানোর পরও ওইসব প্রকল্প বছরের পর বছর ধরে চলছে। দুই থেকে ছয় বছর আগে নেওয়া ছয়টি প্রকল্পে অগ্রগতি পাঁচ শতাংশেরও কম। আরও সাতটি প্রকল্পের \'কাজ\' বেশ ক\'বছর ধরে চললেও অগ্রগতি এখনও দশ শতাংশে পেঁৗছতে পারেনি। চলতি অর্থবছরে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের চিত্র আরও খারাপ। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের অর্ধেক সময় পার হলেও ১২টি প্রকল্পের অগ্রগতি এক শতাংশেরও কম। জুলাই থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত রেল মন্ত্রণালয়ে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ২২ ভাগ বাস্তবায়িত হয়েছে। 
 
চলতি অর্থবছরের এডিপিতে রেলের জন্য বরাদ্দ রয়েছে নয় হাজার ১১৪ কোটি ৯৬ লাখ টাকা। তার মধ্যে সরকারি অর্থায়ন সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। প্রকল্প সাহায্য হিসেবে বৈদেশিক ঋণ পাওয়া যাবে পাঁচ হাজার ৬১৪ কোটি টাকা। বছরের প্রথম ছয় মাসে অর্থ ছাড় হয়েছে এক হাজার ৬৪৪ কোটি টাকা। বৈদেশিক ঋণ পাওয়া গেছে মাত্র ৬২৮ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এ ছাড়া বৈদেশিক ঋণ প্রাপ্তির আশায় নেওয়া সাতটি প্রকল্পে অপেক্ষা করেও টাকা না মেলায় তা বাদ দেওয়া হচ্ছে। কারিগরি সহায়তার (টিএ) প্রকল্পগুলোও চলছে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে। রেলের পরিকল্পনা শাখার প্রতিবেদনে 
 
এসব তথ্য পাওয়া গেছে।
 
তবে রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক বলছেন ভিন্ন কথা। তার মতে, রেলের প্রকল্পগুলো ভালোভাবেই চলছে। তিনি সমকালকে আরও বলেন, \'কোনো প্রকল্পই গতিহারা নয়। কাঙ্ক্ষিত না হলেও সব প্রকল্পে কম বেশি গতি রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী রেলকে পুনর্জীবন দিয়েছেন। বিএনপি-জামায়াত জোটের আমলে রেল সবচেয়ে অবহেলিত ছিল। মৃতপ্রায় রেলকে বাঁচিয়ে তোলা হয়েছে। টাকার অভাবে কয়েকটি প্রকল্পে গতি কিছুটা কম।\' এ সমস্যা কেটে যাবে বলেও আশা প্রকাশ করেন রেলমন্ত্রী। 
 
ঋণের প্রকল্পে শম্ভুকগতি :ভারতের লাইন অব ক্রেডিট (এলওসি) ঋণে ঢাকা-টঙ্গী সেকশনে তৃতীয় ও চতুর্থ ডুয়েল গেজ লাইন এবং টঙ্গী-জয়দেবপুর সেকশনে ডুয়েল গেজ ডাবল লাইন নির্মাণ প্রকল্প ২০১২ সালে অনুমোদন পায়। গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। কাজ শেষ হয়েছে মাত্র তিন দশমিক পাঁচ শতাংশ। চলতি অর্থবছরে যতটুকু কাজ শেষ করার লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রথম ছয় মাসে তার ১ শতাংশ হয়েছে। এক হাজার ১০৬ কোটি টাকার প্রকল্পে ভারতীয় ঋণ পাওয়ার কথা ৯০২ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। ঋণ না পাওয়ায় কাজও এগোচ্ছে না। চলতি অর্থবছরে এডিপিতে ১০৫ কোটি টাকা ঋণ পাওয়ার সম্ভাবনা ধরা হয়েছে। সরকারি অর্থায়নের ছয় কোটি ২৭ লাখ টাকার মধ্যে ১ কোটি ১৯ লাখ টাকা ছাড় করে প্রকল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখা হয়েছে। প্রকল্প পরিচালক শহীদুল ইসলাম সমকালকে জানান, দ্রুত ঠিকাদার নিয়োগ করে ভৌত কাজ শুরুর সিদ্ধান্ত হয়েছে। এর জন্য প্রাক-যোগ্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে।
 
জাপানের ঋণের সুদ মওকুফের টাকায় ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ সেকশনে বিদ্যমান মিটার গেজ লাইনের সমান্তরালে একটি ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণের প্রকল্প নেওয়া হয় ২০১৪ সালে। আগামী জুনে এ প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হবে। আড়াই বছরে কাজ হয়েছে তিন দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের ছয় মাসে ভৌত কাজ হয়েছে এক দশমিক ৩০ শতাংশ। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে শূন্য দশমিক শূন্য ছয় শতাংশ। ৩৭৮ কোটি টাকার এ প্রকল্পে চলতি বছরের এডিপিতে বরাদ্দ রয়েছে ৩৪ কোটি ৪২ লাখ টাকা। এখন পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে আট কোটি ৬০ লাখ টাকা। কিন্তু রেল খরচ করতে পেরেছে মাত্র ২ লাখ টাকা। 
 
নিজস্ব অর্থায়ন প্রকল্পেও একই দশা :৭০টি মিটার গেজ ডিজেল ইলেকট্রিক লোকোমোটিভ সংগ্রহের প্রকল্প ২০১১ সালে নেওয়া হয়। বাস্তবায়নের সময় ধরা হয় ২০১১ সালের জুলাই থেকে ২০১৭-এর জুন পর্যন্ত। ছয় বছর মেয়াদি প্রকল্পের সাড়ে পাঁচ বছর চলে গেছে। এ সময়ে বাস্তবায়ন হয়েছে শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ১ হাজার ৯৪৫ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। পুরো টাকার জোগান দেবে সরকার। চলতি অর্থবছরে ১৫ কোটি ৮২ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। ডিসেম্বর পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে চার কোটি ১৬ লাখ টাকা। রেল ব্যয় করতে পেরেছে ৩১ লাখ ৭১ হাজার টাকা। আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে ২ শতাংশ। ভৌত কাজে অগ্রগতি শূন্য শতাংশ। 
 
অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের কারণে প্রতি বছর শত শত মানুষের প্রাণ যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এসব লেভেল ক্রসিংয়ের মান উন্নয়ন ও পুনর্বাসনে ২০১৫ সালের জুলাইয়ে রেলের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের জন্য দুটি পৃথক প্রকল্প নেওয়া হয়। আগামী জুনের মধ্যে দুই প্রকল্পেরই কাজ শেষ হওয়ার কথা। দুই বছর মেয়াদি প্রকল্পের দেড় বছর পার হলেও পূর্বাঞ্চলে অগ্রগতি ১৫ দশমিক ৫০ শতাংশ। পশ্চিমাঞ্চলে অগ্রগতি ১৩ দশমিক ৯২ শতাংশ। পূর্বাঞ্চলে কাজ দ্রুত শেষ করতে দুই ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। পশ্চিমাঞ্চলে দরপত্র আহ্বান করে ঠিকাদার পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছেন রেলের প্রকৌশল শাখার এক কর্মকর্তা।
 
ফাস্ট ট্র্যাক প্রকল্পেও গতি নেই :এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে দোহাজারী থেকে রামু হয়ে কক্সবাজার এবং রামু থেকে মিয়ানমার সীমান্তের গুমদুম পর্যন্ত ডুয়েল গেজ লাইন নির্মাণ প্রকল্প ২০১০ সালের জুলাইয়ে নেওয়া হয়। ওই বছরের ৬ জুলাই একনেকে অনুমোদন পায় প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকারভুক্ত (ফাস্ট ট্র্যাক প্রজেক্ট) এ প্রকল্পটি। ১৮ হাজার ৩৪ কোটি টাকার এ প্রকল্পে এডিবি ঋণ দেবে ১৩ হাজার ১১৫ কোটি টাকা। গত বছর প্রকল্পটির ব্যয় বৃদ্ধির অনুমোদন দেওয়া হয়। মূল প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। 
 
২০১১ সালের ৩ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। গত ছয় বছরে প্রকল্পের অগ্রগতি হয়েছে দুই দশমিক ৩০ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের এডিপিতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৬৩১ কোটি টাকা। তার পুরোটাই সরকারের। এখন পর্যন্ত ছাড় করা হয়েছে ৪২৮ কোটি টাকা। এ সময়ে ভৌত কাজ হয়েছে শূন্য দশমিক ২ শতাংশ। গত মাসে ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এ প্রক্রিয়া শেষ হলেই ভৌত অবকাঠামোর কাজ শুরু হবে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক মাহবুবুল হক বকশী। জানা যায়, চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনের মধ্য দিয়ে রেললাইনটি নির্মাণ করতে হবে। এ কারণে পরিবেশগত ছাড়পত্র নিতে হবে। তবে এখনও তা নিতে পারেনি রেলওয়ে। 
 
বাতিল করা হচ্ছে সাত প্রকল্প :বছরের পর বছর অপেক্ষা করেও বৈদেশিক ঋণ মেলেনি; কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়েছে। তাই ঋণের আশায় হাতে নেওয়া সাতটি প্রকল্প বাতিল করতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ জানানো হয়েছে। রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক জানান, বিশ্বব্যাংকসহ বিভিন্ন দাতা সংস্থার কাছ থেকে প্রতিশ্রুত অর্থ না পাওয়ায় প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি হয়নি। এগুলো বাতিলের পর্যায়ে আছে। 
 
জানা যায়, ওই সাত প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছিল দুই হাজার ৭০৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে বৈদেশিক সহায়তায় ছিল দুই হাজার ৪৪২ কোটি টাকা। বাতিলের তালিকায় থাকা তিনটি প্রকল্পের আওতায় ১২৫টি ব্রড গেজ কোচ, চারশ\' মিটার গেজ কোচ ও দুটি ব্রড গেজ পরিদর্শন কার সংগ্রহ করার কথা ছিল।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/19/264025#sthash.Vvdk8uT3.dpuf