২২ সেপ্টেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ব্যাংকের হিসাব খোলায় কড়াকড়ি: গ্রাহক হয়রানির শিকার
১৯ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
ব্যাংকে লেনদেন দিন দিন কঠিন হয়ে যাচ্ছে। মানিলন্ডারিং ও সন্ত্রাসী কাজে অর্থায়ন প্রতিরোধ করতে গিয়ে ব্যাংক লেনদেন জটিল হয়ে গেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন করতে গিয়ে নিরূপায় ব্যাংক কর্মকর্তাদের সাথে গ্রাহকের ঝগড়াবিবাদ যেন নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। নতুন নানা কাগজ ও তথ্য সরবরাহ করতে গিয়ে গ্রাহক যেমন হাঁপিয়ে উঠছেন, তেমনি ব্যাংক কর্মকর্তাদেরও এ তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে নাভিশ্বাস উঠেছে। এমনি অবস্থায় ব্যাংকের হিসাব খোলার ক্ষেত্রে আরো কড়াকড়ি করল বাংলাদেশ ব্যাংক। এ বিষয়ে গতকাল ৩৫ পৃষ্ঠার এক সার্কুলার দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ফরম ব্যাংকগুলোকে চালু করতে আড়াই মাস সময় দেয়া হয়েছে। অর্থাৎ আগামী ১ এপ্রিলের মধ্যে এ নির্দেশনা পরিপালন করতে ব্যাংকগুলোকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। সার্কুলারটি স্বাক্ষর করেছেন বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের মহাব্যবস্থাপক ও অপারেশনাল হেড দেবপ্রসাদ দেবনাথ।
নতুন এ সার্কুলার লেটারের বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র শুভঙ্কর সাহা জানিয়েছেন, এর আগেও হিসাব খোলার ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ফরম পরিবর্তন করা হয়েছিল। এখন অনেক কিছুই পরিবর্তন হচ্ছে। যেমন আগে ই-টিআইএন ছিল না, এখন তা চালু হয়েছে। ফলে সময়ের সাথে মিল রেখে হিসাব খোলার ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি ফরম হালনাগাদ করা হচ্ছে।
সাধারণ গ্রাহকের বক্তব্য হলোÑ বাংলাদেশ ব্যাংক এত কিছু করার পরেও টাকা পাচার বন্ধ হচ্ছে না। বরং তা দিন দিন বেড়ে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিকগবেষণা সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যান্সিয়াল ইলিসিটির (জিএফআই) এক গবেষণায় বলা হয়েছে শুধু ২০১৩ সালেই বাংলাদেশ থেকে পাচার হয়েছে ৭৩ হাজার কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। কিন্তু বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের পক্ষ থেকে পাচার ঠেকাতে বা পাচারকারীদের বিরুদ্ধে তেমন কোনো পদক্ষেপই নিতে পারছে না।
জানা গেছে, ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে সাধারণ গ্রাহকেরা নানাভাবে ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব খোলার ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি তথ্য হালনাগাদ করার নির্দেশনা ব্যাংকগুলোও পরিপালন করছে অনেকটা অভিনব পদ্ধতিতে। এসব জটিল ফরম পূরণে বাধ্য করতে গ্রাহকের অজান্তেই অ্যাকাউন্ট লেনদেন স্থগিত করা হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে এটিএম কার্ড দিয়ে গ্রাহক টাকা তুলতে গেলে বুথের স্কিনে ভেসে আসছে ‘গ্রাহকের সংশ্লিষ্ট ব্যাংক শাখায় যোগাযোগ করতে’। এভাবে অনেকেই প্রথমে তা বুঝে উঠতে না পেরে জরুরি প্রয়োজন মেটাতে গ্রাহক ব্যাংকের এক বুথ থেকে অন্য বুথে ছুটে যাচ্ছেন। কিন্তু কোনো বুথ থেকেই টাকা উত্তোলন করতে না পেরে বাধ্য হয়ে ছুটে আসছেন ব্যাংকের শাখায়। শাখায় এসে গ্রাহক জানতে পারছেন তার অ্যাকাউন্টে লেনদেন স্থগিত করে রাখা হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা নতুন অ্যাকাউন্ট খোলার ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি ফরম পূরণ করতে হবে। আর এসব ফরম পূরণ করার জন্য গ্রাহকের ছবি ও নমিনির ছবি চাওয়া হচ্ছে। একই সাথে চাওয়া হচ্ছে ভোটার আইডি কার্ডের ফটোকপি। যদিও হিসাব খোলার সময় তা সরবরাহ করা হয়েছিল। কিন্তু তাৎক্ষণিকভাবে গ্রাহক জরুরি প্রয়োজন মেটাতে টাকা উত্তোলন করতে পারছেন না। অথচ গ্রাহকের হিসাব বন্ধ করার আগে গ্রাহককে অবহিত করা হলে এ রকম সমস্যায় পড়তে হতো না।
এভাবেই গ্রাহক ব্যাংক লেনদেনের ক্ষেত্রে হয়রারি শিকার হচ্ছেন। এ বিষয়ে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের একটি ব্যাংকের এমডি জানিয়েছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা পরিপালন না করলেই জরিমানার শিকার হতে হচ্ছে। আবার গ্রাহককেও আগে বারবার চিঠি দিয়ে কোনো সাড়া পাওয়া যেত না। এ কারণে বাধ্য হয়ে এখন গ্রাহকের লেনদেন স্থগিত করে দেয়া হচ্ছে। এ ক্ষেত্রে গ্রাহক ব্যাংকের হিসাব পরিচালনায় কিছুটা নিরুৎসাহিত হলেও তাদের করার কিছু থাকছে না।
গতকাল বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে জারি করা নতুন সার্কুলার লেটারে হিসাব খোলার ফরম ও গ্রাহক পরিচিতি ফরমে বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে। পরিবর্তন আনা হয়েছে গ্রাহকের লেনদেনের সীমা নিয়েও। এ ফরম দু’টি আপাতত কেবল নতুন হিসাব খোলার ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রয়োজন হবে। তবে বিদ্যমান গ্রাহকদের জন্য তা হালনাগাদ করার কাজ শুরু হয়েছে। এটা চূড়ান্ত হলে বিদ্যমান গ্রাহকদের জন্যও তা পরিপালনের জন্য ব্যাংকগুলোকে নির্দেশনা দেয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন।
নতুন সার্কুলার লেটারে গ্রাহক পরিচিতি (কেওয়াইসি) ফরমে আগে প্রতিষ্ঠানের মাসিক আয়ের পরিমাণ দেখানো হতো। নতুন ফরমে ব্যক্তি গ্রাহকের মাসিক আয়ের পরিমাণ সংযুক্ত করে তা ঝুঁকি স্কোর দেয়া হয়েছে। যেমন গ্রাহকের মাসে এক লাখ টাকা পর্যন্ত নেনদেনের ঝুঁকি ধরা হয়েছে নি¤œ মানের। এক লাখ টাকা থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ঝুঁকি দেখানো হয়েছে মধ্য মানের। আর তিন লাখ টাকার ওপর লেনদেনে উচ্চ মানের ঝুঁকি দেখানো হয়েছে। আগে কোনো প্রতিষ্ঠানের লেনদেন অন্য কেউ করলে আর তার ওই প্রতিষ্ঠানের শেয়ার কমপক্ষে ২০ শতাংশ থাকলে তবে ওই গ্রাহকের গ্রাহক পরিচিতি তথ্য সরবরাহ করতে হতো। এখন ব্যক্তি হিসেবে অন্য কেউ লেনদেন করলে তারও গ্রাহক পরিচিতি তথ্য ব্যাংকে সরবরাহ করতে হবে।
আগে গ্রাহকের অনুমিত মাসিক লেনদেন ৫০ লাখ টাকার ওপরে হলে উচ্চ মানের ঝুঁকি বলা হতো। নতুন সার্কুলারে তা ২০ লাখ টাকায় নামিয়ে আনা হয়েছে। অনুরূপভাবে আগে গ্রাহকের অনুমিত মাসিক লেনদেনের সংখ্যা ২৫০টির অধিক হলে উচ্চ মানের ঝুঁকি হিসেবে ধরা হতো, এখন তা ২৫টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। আগে ১০০টি লেনদেন পর্যন্ত কোনো ঝুঁকি দেখানো হতো না এখন তা ১৫টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। এ ছাড়া নমিনির ক্ষেত্রে আগে একজন হলেই চলত, এখন একাধিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে নমিনি রাখার বিধান করা হয়েছে। 
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, মানিলন্ডারিং প্রতিরোধে গ্রাহকের সঠিক ও পূর্ণাঙ্গ তথ্য সংগ্রহ করা এবং গ্রাহক পরিচিতি সংগ্রহে ব্যাংকগুলোকে নিশ্চিত করতেই এ নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188618