১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ইনসাফের আদালত কেন জনগণকে স্বস্তি দেয়: বিবিধ প্রসঙ্গ
১৯ জানুয়ারি ২০১৭, বৃহস্পতিবার,
|| মাসুদ মজুমদার ||
 
১৯৮৫ সালের ঘটনা। সরকার বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কিছু পদের বেতন স্কেল বৃদ্ধির পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল। ফলে অন্যান্য ক্যাডারের সাথে অসঙ্গতি দেখা দেয়। আপত্তি ওঠার পর সরকার জজদের বেতন স্কেল বাড়িয়ে দেয়। আবার প্রশাসন ক্যাডারদের আপত্তির মুখে সেই স্কেল স্থগিত করে দেয়া হয়। এটি ছিল ১৯৯৪ সালের ঘটনা।
কেঁচো খুঁড়তে সাপ উঠে আসার শুরু এখান থেকেই। জজদের বেতন স্কেল স্থগিতের বিরুদ্ধে সংুব্ধ জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন প্রতিকার চেয়ে রিট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ৪৪১ জন বিচারকের পক্ষে অ্যাসোসিয়েশনের তৎকালীন মহাসচিব ১৯৯৫ সালে উচ্চ আদালতে রিট দায়ের করেন। সে সময় অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ছিলেন মাসদার হোসেন। তখন থেকে বিচার বিভাগ পৃথকীকরণ মামলার সাথে মাসদার হোসেনের নামটি ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। রাষ্ট্রপক্ষ বনাম জুডিশিয়াল সার্ভিসেস অ্যাসোসিয়েশনের মধ্যকার এই বিরোধ নিষ্পত্তিতে উচ্চ আদালত সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছেন। দীর্ঘ শুনানি শেষে উচ্চ আদালত ১৯৯৭ সালে ৫ দফা সুপারিশসহ রায় ঘোষণা করেন। এই রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করলে ১৯৯৯ সালে আপিল বিভাগ ১২ দফা নির্দেশনাসহ ঐতিহাসিক রায় ঘোষণা করেন। দেশের সর্বোচ্চ আদালত নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগ পৃথক করার রায় দিয়ে দীর্ঘ দিন ধরে উপেক্ষিত একটি প্রত্যাশার জন্ম দিলেন। একই সাথে ক্ষমতা চর্চাকারীদের অনীহা সত্ত্বেও বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে পথ চলার বন্ধ কপাট খুলে দেন। 
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের নিয়ন্ত্রণ বা হস্তক্ষেপমুক্ত থাকবেÑ এটা শুধু প্রত্যাশিত নয়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের অবিচ্ছেদ্য অংশ। এটাই স্বাধীন বিচারব্যবস্থার প্রাণ। মাসদার হোসেন মামলার রায় ঘোষণার দীর্ঘ আট বছর পর ২০০৭ সালে বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগ থেকে পৃথক করার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া কার্যত শুরু হয়। ওই সময় যে চারটি বিধিমালা গেজেট আকারে জারি করা হয়, তার একটি ছিল বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (কর্মস্থল নির্ধারণ, পদোন্নতি, ছুটি মঞ্জুরি, নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বিধান এবং চাকরির অন্যান্য শর্ত) বিধিমালা ২০০৭। এ বিধিমালায় বলা ছিল, পৃথক বিধি তৈরি না হওয়া পর্যন্ত অধস্তন আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলা বিধান করা হবে ১৯৮৫ সালের গভর্নমেন্ট সার্ভিস রুলস অনুযায়ী। মাসদার হোসেন মামলার রায়ের ৭ নম্বর নির্দেশনা অনুযায়ী, জুডিশিয়াল সার্ভিসের জন্য পৃথক শৃঙ্খলা বিধি তৈরি করার কথা রয়েছে। নতুন বিরোধ বা বৈপরীত্য সৃষ্টির সুযোগ সৃষ্টি হয় এখান থেকেই। নির্বাহী বিভাগ এই ফাঁক দিয়েই ১৯৮৫ সালের গভর্নমেন্ট সার্ভিস রুলস অনুযায়ী চলতে চেয়েছে। তিক্ত হলেও সত্য, যারা ক্ষমতা চর্চা করেন, তারা বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সম্পর্কে নির্লিপ্ত থাকেন এবং নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপমুক্ত থাকার পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেন। রাজনীতিবিদদের এই দ্বিমুখী নীতির কারণেই জনগণের প্রত্যাশাটি অপূরণীয় থেকে গেছে। তাই গভর্নমেন্ট সার্ভিস রুলসের সাথে মাসদার হোসেন মামলার বিষয়টি কোনো সাধারণ বিরোধ নয়, সর্বোচ্চ আদালতের নির্দেশনা কৌশলে উপেক্ষা করে নির্বাহী বিভাগের দৌরাত্ম্য প্রদর্শনের সুযোগ নেয়া, যা রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও সততার অভাব হিসেবে দেখা যায়।
দুর্ভাগ্য যে, নির্বাহী বিভাগ এই বিরোধে রাষ্ট্রপতিকে উচ্চ আদালতের মুখোমুখি করে দেয়ার একটি মন্দ নজির সৃষ্টি করেছে। ২০১৬ সালের অর্থাৎ গত বছরের ১১ ডিসেম্বর রাতে আইন মন্ত্রণালয় এক পরিপত্রে জানিয়ে দেয়, নি¤œ আদালতের বিচারকদের শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নেই বলে রাষ্ট্রপতি সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিয়েছেন। আইন মন্ত্রণালয় থেকে সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে এর কপি বা একটি অনুলিপিও পাঠানো হয়। এতে বলা হয়েছে, ‘বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক আচরণ বিধিমালা, শৃঙ্খলা বিধিমালা এবং বাংলাদেশ জুডিশিয়াল সার্ভিস (সার্ভিস গঠন, সার্ভিস পদে নিয়োগ ও বরখাস্তকরণ, সাময়িক বরখাস্তকরণ ও অপসারণ) বিধিমালা ২০০৭ সংশোধনীকল্পে সুপ্রিম কোর্টের প্রস্তাবিত খসড়া গেজেট আকারে প্রকাশের প্রয়োজনীয়তা নেই মর্মে রাষ্ট্রপতি সানুগ্রহ সিদ্ধান্ত প্রদান করেছেন।’
এই প্রেক্ষাপটে সর্বোচ্চ আদালত অত্যন্ত দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছেন। আপিল বিভাগ জটিলতা না বাড়িয়ে শুধু জানিয়ে দেয়, রাষ্ট্রপতিকে ভুল বুঝানো হয়েছে। রাষ্ট্রপতির সাথে দ্বিমত পোষণ করে এর চেয়ে পরিশীলিত ভাষা আর কী হতে পারে! গত ১২ ডিসেম্বর আপিল বিভাগ জানিয়ে দেয়, ‘এটা বিচার বিভাগের স্বাধীনতার প্রশ্ন, এখানে কোনো আপস নেই।’ নির্দেশমতো দুই সচিবের উপস্থিতিতে আপিল বিভাগ জানিয়ে দেয়Ñ ‘এটা আপনারাই করে পাঠিয়েছেন। মাসদার হোসেন মামলার আলোকে আমরা শুধু সংশোধন করে দিয়েছি। মামলার রায় সরকার মেনে নিয়েছে। আমরা এখান থেকে পিছু হটব না।’
আপিল বিভাগ ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত শৃঙ্খলাবিধির গেজেট প্রকাশের নির্দেশ দিয়েছেন। রাষ্ট্রপক্ষ সময় বাড়ানোর আবেদন করলে ৫ ফেব্রুয়ারি ’১৭ পর্যন্ত গেজেট প্রকাশের সময় বৃদ্ধি করা হয়।
বিচার বিভাগের এই দৃঢ়তা শুধু প্রত্যাশিত ছিল না, পরম কাক্সিতও ছিল। দীর্ঘ দিন আগে বিচার বিভাগ পৃথক করার রায় হয়েছে। তার পরও সময়ক্ষেপণ ছিল দৃষ্টিগ্রাহ্য। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রপতির গুডবুক অপব্যবহারের নজির সৃষ্টি হলো। এমনটি না হওয়াই কাক্সিত ছিল।
যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশে বিচার বিভাগ স্বাধীন। আমাদের পড়শি ও বন্ধুপ্রতিম দেশ ভারতে বিচার বিভাগ এবং নির্বাচন কমিশন দৃঢ়তা প্রদর্শন করে বলেই ভারতের মতো একটি বৃহৎ ও জটিল মানচিত্রের দেশে গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও মানবাধিকার রক্ষা করা কিছুটা হলেও সম্ভব হচ্ছে। মৌলিক অধিকার যতটুকু সমুন্নত আছে, তাও বিচার বিভাগের কারণে। ভোটাধিকার রক্ষার জন্য নির্বাচন কমিশন সক্রিয় রয়েছে। সংসদীয় ধারাও টিকে আছে এর কল্যাণে। কারণ সব সীমাবদ্ধতা নিয়েও ভারতের বিচার বিভাগ ও নির্বাচন কমিশন অনেকটা প্রাতিষ্ঠানিকতা পেয়েছে। এটা ভারতীয় জনগণের বড় ধরনের একটি প্রত্যাশা পূরণ করছে।
আমাদের নির্বাহী বিভাগ দলতন্ত্রের বাইরে যেতে পারছে না। প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তারা জনগণের নয়, শাসকদের আজ্ঞাবহ হয়ে রয়েছেন। বর্তমান আইন বিভাগে জনগণের কোনো প্রতিনিধিত্ব নেই। নির্বাচন কমিশন সক্ষম নয়, প্রভাবমুক্তও নয়। সব সীমাবদ্ধতার পরও বিচার বিভাগ প্রায়ই আলোচনায় থাকছে। তারা নির্বাহী বিভাগের সীমা অতিক্রম করাকে মেনে নিতে চান না, হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে সোচ্চার। তাই এখানেও একটা নতুন আশাবাদ সৃষ্টি হতে যাচ্ছে।
জনগণের অংশগ্রহণের মাধ্যমে সংসদ গঠিত না হলে আইন বিভাগের ব্যাপারে কোনো প্রত্যাশা জাগবে না। এ জন্য গণতন্ত্রচর্চার ধারায় ফিরে আসার কোনো বিকল্প নেই। আর বর্তমান নির্বাচন কমিশন নিয়ে মন্তব্য করার জায়গা কমে গেছে। কারণ একরাশ হতাশার জন্ম দিয়ে, ব্যর্থতার গ্লানি বহন করে বর্তমান কমিশন আগামী মাসেই মেয়াদ শেষ করবে। পুনর্গঠিত নতুন কমিশন সামনে চলার পথ রচনা করবে। নির্বাচন কমিশন গঠনের লক্ষ্যে রাষ্ট্রপতির সংলাপ এখন পরিণতির দিকে। ইতোমধ্যে ইসি গঠন প্রশ্নে রাষ্ট্রপতি ২৩টি দলের সাথে কথা বলেছেন, আরো আটটি দলকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে। মাত্র দুই দিন আগেই একটি সূত্র জানিয়েছে, রাষ্ট্রপতি পাঁচ সদস্যের সার্চ কমিটি গঠনের উদ্যোগ নেবেন। প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে, সার্চ কমিটি সুপারিশ করবেÑ সেই আলোকে সিইসি নিয়োগ এবং ইসি গঠনের পদক্ষেপ নেবেন।
অবশ্য এতে কোনো নতুনত্ব নেই। ২০১২ সালে ২৪টি দলের সাথে আলোচনা করে চার সদস্যের সার্চ কমিটি গঠন করেছিলেন রাষ্ট্রপতি মরহুম মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান। সেই কমিশন আগামী মাসেই বিদায় নিচ্ছে। ’১৪ সালের ৫ জানুয়ারির সংসদ নির্বাচন আমাদের গণতন্ত্র দেয়নি; ভোটের অধিকার দেয়নি। ভবিষ্যতের জন্য আশাবাদ ছাড়া আর কী-ই বা রয়েছে? এত রাজনৈতিক হতাশার ভেতরও বিচার বিভাগ যখন একটু দৃঢ়তা প্রদর্শন করার সুযোগ পায়, তখনই প্রত্যাশিত ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।
সর্বশেষ নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর ও নৃশংস সাত খুনের রায় জনগণকে স্বস্তি দিয়েছে। রায়ে ২৬ জনের ফাঁসি হয়েছে। ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে শাস্তি হয়েছে। দেশের সব মানুষ আশা করছেনÑ বিচারিক আদালতের এই রায় উচ্চ আদালতে বহাল থাকবে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের বিচার শুধু একটি বিচারপ্রক্রিয়ার দৃষ্টান্ত নয়, এটা বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের প্রভাব ও হস্তক্ষেপমুক্ত থাকার একটা সৎ চিন্তারও উন্মেষ ঘটিয়েছে। এখন এই রায় চির ধরা গণ-আস্থার ফাটলই শুধু মেরামত করবে না, স্বাধীন বিচার বিভাগের অঙ্গীকারকে আরো শাণিত করবে।
জনগণ এখন আশা করবে, রাষ্ট্রপতি তার অবস্থানগত কারণেই গুণগত কিছু করার জন্য সচেষ্ট হবেন। তার সাংবিধানিক ও আইনি সীমাবদ্ধতা নিয়েও তিনি ইতিহাস হয়ে উঠবেন। ভোটের অধিকার নিশ্চিত হলে গণতন্ত্র ফিরবে, আইনসভা জনগণের আকর্ষণ বাড়াবে। সব রাজনৈতিক চর্চার জন্য জাতীয় সংসদ হয়ে উঠবে সরব এবং জনগণের মনোযোগ আকর্ষণের প্রাণকেন্দ্র। এভাবেই আমাদের গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিকতার দিকে কদম কদম এগিয়ে যাবে। নারায়ণগঞ্জে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা কম হয়নি। এলিট ফোর্সের বিপথগামী সদস্যদের বিচারের মুখোমুখি করতে বেগ পেতে হয়েছে। সব কিছু ভণ্ডুল হয়ে গেছে জনমতের তোড়ে এবং বিচার বিভাগের দৃঢ়তার কারণে। এই রায় সব বিচারবহির্ভূত হত্যা ও নির্বাহী বিভাগের সাফাইয়ের বিরুদ্ধে একটি বার্তাও বহন করছে।
masud2151@gmail.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188487