২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
৩ বছরে ১২ হাজার হত্যাকাণ্ড
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
মহাজোট সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদের তিন বছরে দেশে ১২ হাজার ২৭৭টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। এ সময়ে আওয়ামী লীগের আন্তকোন্দল জনিত সংঘর্ষে ১৪৬ জন নিহত হয়েছে। তাদের মধ্যে ২০১৪ সালে ৪৩ জন, ২০১৫ সালে ৪০ জন এবং ২০১৬ সালে ৭৩ জন। মানবাধিকার সংস্থার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে। 
একই সময়ে রাজনৈতিক নেতাকর্মী, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য, এমনকি বিদেশী নাগরিকও খুন হয়েছেন। ক্ষমতাসীন দলের একজন সংসদ সদস্যসহ (এমপি) বেশ কয়কটি আলোচিত হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। খুন হয়েছেন তিন বিদেশী নাগরিক ইতালীয় নাগরিক তাবেলা সিজার, জাপানি নাগরিক হোসি কুনিও এবং জাপানি নারী হিরোয়ি মিয়াতার লাশ উদ্ধার করা হয়। ২০১৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত সময়ে জঙ্গি হামলায় নিহত হয় পঞ্চগড় জেলার দেবীগঞ্জে হিন্দু পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর রায়, অনলাইন এক্টিভিস্ট নাজিমুদ্দিন সামাদ, ঝিনাইদাহে শিয়া ধর্ম প্রচারক আব্দুল রাজ্জাক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. এএফএম রেজাউল করিম সিদ্দিকী, ‘রূপবান’ পত্রিকার সম্পাদক জুলহাস মান্নান, নাট্য ও সমকামীদের অধিকার আন্দোলনের কর্মী মাহবুব তন্ময়, নিখিল চন্দ্র জোয়ারদার, রাজশাহীর তানোর উপজেলার ‘কথিত পীর’ মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, বান্দরবানের বাইশারী ইউনিয়নের চাক পাড়ার বৌদ্ধ ভিক্ষু মংশৈ উ চাক, গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জের জুতা ব্যবসায়ী দেবেশ চন্দ্র প্রামাণিক, নাটোরে খৃস্টান ব্যবসায়ী সুনীল গমেজ, ঝিনাইদহে বৃদ্ধ পুরোহিত আনন্দ গোপাল গাঙ্গুলি, পাবনা সদর উপজেলার হেমায়েতপুরে শ্রীশ্রী ঠাকুর অনুকুল চন্দ্র সৎসঙ্গ সেবাশ্রমের সেবক নিত্যরঞ্জন পান্ডে, ঝিনাইদহে হিন্দু সেবায়েত শ্যামানন্দ দাস ও বান্দরবানে বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মংশৈনু মারমা। 
এ সকল হত্যাকাণ্ডের কয়েকটিতে আনসার-আল-ইসলাম নাম এলেও অধিকাংশ হত্যার জন্য আইএস ‘দায় স্বীকার’ করে। তবে সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে দেশে আইএস বলতে কিছু নেই। নব্য জেএমবি অধিকাংশ হত্যাকাণ্ডে জড়িত। চাঞ্চল্যকর কয়েকটি হত্যাকান্ডের রহস্য উন্মোচন হয়নি। 
পুলিশ সদর দফতর থেকে প্রাপ্ত তথ্যে দেখা গেছে গত তিন বছরে মোট পাঁচ লাখ ৪৬ হাজার ৩৫টি মামলা রেকর্ড হয়েছে। ৬১ হাজার ২১৬টি নারী নির্যাতনের মামলা হয়েছে। তিন বছরে দস্যুতা ও ডাকাতির ঘটনা রেকর্ড হয়েছে চার হাজার ৩৮৮টি। অপহরণের মামলা হয়েছে ২৪ হাজার আটটি। দিনে গড়ে মামলা হয়েছে ৫০০টি। মামলাগুলোর মধ্যে ২০১৬ সালে এক লাখ ৮২ হাজার ২২৭টি, ২০১৫ সালে এক লাখ ৭৯ হাজার ৮৮০টি ও ২০১৪ সালে এক লাখ ৮৩ হাজার ৯২৯টি। এই তিন বছরে দায়ের হওয়া ১২ হাজার ২৫৭টি হত্যা মামলার মধ্যে ২০১৬ সালে তিন হাজার ৭২৮টি, ২০১৫ সালে চার হাজার ৩৫টি ও ২০১৪ সালে চার হাজার ৫১৪টি মামলা রেকর্ড হয়। আর তিন বছরে সারা দেশে ২৪ হাজার আটটি অপহরণ মামলার মধ্যে ২০১৬ সালে ৬৮২টি, ২০১৫ সালে ৯২০টি ও ২০১৪ সালে ৮০৬টি। 
জানা গেছে, গত বছরের (২০১৬) শুরুতেই চাঞ্চল্য ছড়ায় তনু হত্যাকাণ্ড। ২০ মার্চ সেনানিবাস এলাকায় নিজ বাড়ির কয়েকশ গজ দূরেই খুন হন কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ছাত্রী তনু। সেনানিবাস সংলগ্ন সংরক্ষিত এলাকায় এ হত্যাকাণ্ড নিয়ে দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। তবে তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আজও হয়নি। সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা চট্টগ্রামের এসপি বাবুল আক্তারের স্ত্রী মাহমুদা আক্তার মিতু হত্যাকাণ্ড। গত বছর ৫ জুন সকালে চট্টগ্রাম নগরের জিইসি এলাকায় সন্তানকে স্কুলবাসে তুলে দিতে যাওয়ার সময় নিজ বাসার ১০০ গজ দূরে ছুরিকাঘাত ও গুলীতে নিহত হন মাহমুদা আক্তার মিতু। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, জঙ্গি দমনে বাবুল আক্তারের সাহসী ভূমিকার কারণে জঙ্গিরা তার স্ত্রীকে খুন করতে পারে। ঘটনার পর মিতুর স্বামী এসপি (অব্যাহতি পাওয়া) বাবুল আক্তার পুলিশ সদর দফতরে অজ্ঞাত পরিচয় তিনজনকে আসামী করে মামলা করেন। ঘটনার পর সন্দেহজন কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও মূলহোতারা আজও ধরাছোয়ার বাইরে।
১ জুলাই রাতে হলি আর্টিজান রেস্তোরাঁয় হামলা চালায়। হামলায় দেশী-বিদেশী ২০ জন এবং পুলিশের দুই কর্মকর্তা নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ৯ ইতালীয়, ৭ জাপানি ও একজন ভারতের নাগরিক। নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তা হলেন ডিএমপির গোয়েন্দা বিভাগের (ডিবি) সহকারী কমিশনার রবিউল ইসলাম ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দিন। এ ঘটনায় রাতেই ইসলামিক স্টেট (আইএস) হামলার দায় স্বীকার করে। ঘটনার পরদিন সকালে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে সঙ্গে নিয়ে ‘অপারেশন থান্ডার বোল্ট’ পরিচালনা করে সেনা কমান্ডোর একটি দল। কমান্ডো অভিযানে পাঁচ জঙ্গি নিহত হয়। তারা হলো- রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, নিবরাস ইসলাম, মীর সাবিহ মোবাশ্বের, শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল ও খায়রুল ইসলাম পায়েল।
গত বছর ঈদুল ফিতরের দিন সকালে কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়া ঈদগাহের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা পুলিশ সদস্যদের ওপর বোমা হামলা এবং গুলীতে দুই কনস্টেবলসহ চারজন নিহত হন। আট পুলিশ সদস্যসহ আহত হন আরো ১৫ জন। তবে এ ঘটনায় জড়িত আটজনকে তাৎক্ষণিকভাবে আটক করা হয়। হামলার দিনই বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয় আবীর রহমান নামে নব্য জেএমবির এক সদস্য। আহত অবস্থায় গ্রেফতার হয় শফিউল নামে আরেক জঙ্গি। এরপর দেশব্যাপী শুরু হয় জঙ্গিবিরোধী অভিযান।
২৪ আগস্ট দুপুরে রাজধানীর কাকরাইলে স্কুলের সামনে ফুটওভার ব্রিজের উপরে উইলস লিটল ফ্লাওয়ার স্কুলের অষ্টম শ্রেণির সুরাইয়া আক্তার রিশার পেট ও হাতে ছুরি মেরে পালিয়ে যায় টেইলার্স কর্মচারী ‘বখাটে’ ওবায়দুর রহমান। পরে তিনদিন চিকিৎসাধীন থাকার পর মারা যায় রিশা। পরিবার ও শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে নীলফামারী ডোমার থেকে ওবায়দুরকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরে আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দীও দেয় সে। 
এদিকে নাটোরের যুবলীগ কর্মী রেদওয়ান আহমেদ সাব্বির, আবু আব্দুল্লাহ ও সোহেল আহমেদের গুলীবিদ্ধ লাশ দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট থেকে গতবছল ৫ ডিসেম্বর উদ্ধার করা হয়। নিহতদের পরিবারের অভিযোগ, র্যাব পরিচয়ে রাতে সদর উপজেলার তকিয়া বাজার থেকে তাদের তুলে নেয়া হয়। পরদিন নাটোর সদর থানায় এ ব্যাপারে জিডিও করেন তারা। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে র্যাব। নিহত তিনজনই শীর্ষ সন্ত্রাসী। সাব্বির ও সোহেলের নামে ১৫টি মামলা আছে বলে জানিয়েছে র্যাব।
৬ এপ্রিল জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) ছাত্র নাজিমউদ্দিন সামাদকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। পুলিশের মতে, নাজিম ধর্মবিরোধী বা ব্লগার ছিলেন না। তবে বিভিন্ন সময়ে মতামত তুলে ধরে ফেসবুকে সক্রীয় থাকতেন। গণজাগরণ মঞ্চের কর্মীও ছিলেন সামাদ। ২২ এপ্রিল গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়ায় প্রকাশ্য দিবালোকে সাধু পরমানন্দ রায়কে কুপিয়ে হত্যা করা হয়। ধর্ম নিয়ে বিরূপ মন্তব্য বা কারও সঙ্গে বিরোধ ছিল না বলে দাবি পরিবারের। তবে বাসুরিয়া রসরাজ ঠাকুরের অনুসারী ছিলেন তিনি। সেখানে সনাতন ধর্মের তপস্যা করতেন।
গত বছরের ২৩ এপ্রিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের অধ্যাপক এ এফ এম রেজাউল করিম সিদ্দিকীকে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রাজশাহী মহানগরীর শালবাগান এলাকায় বাড়ির কাছেই নির্মমভাবে কুপিয়ে তাকে খুন করা হয়। অধ্যাপক রেজাউল ‘কোমলগান্ধার’ নামে একটি সাহিত্য পত্রিকার সম্পাদক এবং ‘সুন্দরম’ নামে একটি সাংস্কৃতিক সংগঠনের উপদেষ্টা ছিলেন। ২৫ এপ্রিল গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারের কয়েকশ গজ দূরে প্রধান কারারক্ষী রুস্তম আলীকে গুলী করে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। রুস্তম আলী ‘সার্জেন্ট ইন্সট্রাক্টর’ পদে ছিলেন। ২৫ এপ্রিল বিকেলে কলাবাগানের লেক সার্কাস এলাকায় ৫/৭ যুবক জুলহাস মান্নানের বাসায় ঢুকে তাকে এবং তার বন্ধু তনয়কে কুপিয়ে হত্যা করে। সমকামীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার সাময়িকী ‘রূপবান’ সম্পাদক জুলহাস আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক দীপু মনির খালাতো ভাই। মাহবুব রাব্বী তনয় ছিলেন লোকনাট্য দলের কর্মী। পিটিএ নামে একটি প্রতিষ্ঠানে ‘শিশু নাট্য প্রশিক্ষক’ হিসেবেও তিনি কাজ করতেন। আল-কায়েদা ভারতীয় উপমহাদেশ (একিউআইএস) শাখা ওই হত্যাকাণ্ডের দায় স্বীকার করলেও পুলিশ অভিযুক্ত করে দেশীয় উগ্রপন্থীদের।
৩০ এপ্রিল টাঙ্গাইলের গোপালপুরে নিখিল জোয়াদ্দার নামে এক দর্জিকে প্রকাশ্যে কুপিয়ে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা। ধর্ম নিয়ে নিখিল নাকি কয়েক বছর আগে কটূক্তি করেছিলেন বলে প্রচার ছিল। তখন তার বিরুদ্ধে মিছিল এবং তার বাড়ি আক্রান্ত হয়েছিল। ৭ মে শিক্ষক রেজাউল করিমের মতো একই কায়দায় কুপিয়ে হত্যা করা হয় শহিদুল্লাহ নামে এক ‘পীর’কে। গোয়ালন্দঘাটের পীর নূর মোহাম্মদ দয়ালের ভক্ত ছিলেন শহিদুল্লাহ। এ ঘটনায় মামলা হলেও রহস্য উদঘাটিত হয়নি। ১৪ মে সকালে বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়িতে মং শু হুক (৭৫) নামে এক বৌদ্ধ ভিক্ষুকে গলা কেটে হত্যা করে দুর্বৃত্তরা।
http://www.dailysangram.com/post/267966-%E0%A7%A9-%E0%A6%AC%E0%A6%9B%E0%A6%B0%E0%A7%87-%E0%A7%A7%E0%A7%A8-%E0%A6%B9%E0%A6%BE%E0%A6%9C%E0%A6%BE%E0%A6%B0-%E0%A6%B9%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%A3%E0%A7%8D%E0%A6%A1