২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মাসে দেড় কোটি টাকা
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
রাজধানীর মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকার ফুটপাত থেকে মাসে কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা চাঁদা ওঠে। দুই সিটি কর্পোরেশনের প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার ফুটপাতে প্রতিদিন তোলা এই চাঁদার পরিমাণ প্রায় ৫ কোটি টাকা। শুধুমাত্র রমজান মাসে এই চাঁদার পরিমাণ শত কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদ করলে এই চাঁদা বন্ধ হয়ে যাবে। সে কারণে হকারদের উচ্ছেদ না করতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে একাধিক চক্র। তারা জোটবদ্ধ হয়ে ‘হকার সমন্বয় পরিষদ’-এর ব্যানারে সভা-সমাবেশ করে মেয়রকেও হুমকি দিচ্ছে। বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশন ও বাংলাদেশ হকার্স লীগের সভাপতি এম এ কাশেম গতকাল ইনকিলাবকে বলেন, লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা তাদের চাঁদাবাজি অব্যাহত রাখার জন্য ষড়যন্ত্র ও বিশৃঙ্খলার পথ বেছে নিয়ে নিরীহ হকারদের বিপথগামী করার চেষ্টা করছে। তিনি বলেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি মেয়রের সাথে আজকেও আমার সাক্ষাতে কথা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনা অনুযায়ী তিনি প্রকৃত হকারদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করবেন। যারা হকার উচ্ছেদের বিরুদ্ধে সভা-সমাবেশ করছে তারা কোনো অনুমোদিত সংগঠনের নেতা-কর্মী নন বলে জানান এম এ কাশেম। গতকাল মঙ্গলবার ‘হকার সমন্বয় পরিষদ’-এর এক ‘প্রতিবাদ’ সভায় নুরুল ইসলাম নামে এক হকার নেতা বলেন, গুলিস্তান এলাকায় তালিকাভুক্ত হকারের সংখ্যা ১৬শ’। বাকিরা হকার নয়। হকারদের একাধিক সংগঠন থাকাও তাদের দুর্দশার একটি কারণ। তার এ বক্তব্যের পর হকারদের একটি অংশ তাকে মারতে উদ্যত হলে অন্যরা নুরুল ইসলামকে সমাবেশস্থল থেকে সরিয়ে দেন।
নগর বিশেষজ্ঞদের মতে, ভয়াবহ যানজট এড়াতে ফুটপাত থেকে হকারদের উচ্ছেদের কোনো বিকল্প নেই। হকাররা ফুটপাত থেকে শুরু করে রাস্তা দখল করে রাখার কারণে যানবাহন নির্বিঘেœ চলাচল করতে পারে না। দাতা সংস্থারা এ নিয়ে বহুবার সরকারকে অনুরোধ জানিয়েছে। সুপারিশ করেছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বরং এবারই প্রথম দিনের বেলায় হকারদের ফুটপাতে বসতে না দিয়ে সন্ধ্যার পর বসার সুযোগ দেয়া হচ্ছে। চালু করা হয়েছে ৫টি হলিডে হকার্স মার্কেট। আরও ১৬টি হলি ডে মার্কেট তৈরির কাজ প্রক্রিয়াধীন আছে। একই সাথে হকারদের পুনর্বাসনের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কাজও শুরু হয়েছে। তারপরেও হকারদের উচ্ছেদে বাধা দিচ্ছে কারা? 
গোয়েন্দা সূত্র জানায়, শুধুমাত্র মতিঝিল-গুলিস্তান এলাকার ফুটপাতের চাঁদাবাজির সাথে জড়িত রেজিস্ট্রেশনবিহীন ৫টি হকার্স সংগঠন। এগুলো হলো বাংলাদেশ হকার্স ইউনিয়ন, ছিন্নমূল হকার্স সমিতি, বাংলাদেশ জাতীয় হকার্স ফেডারেশন এবং বাংলাদেশ আওয়ামী হকার্স লীগ। মতিঝিল-গুলিস্তানের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের ঘোষণায় এরাই উচ্ছেদের বিরোধিতা করছে। এসব সংগঠনের ব্যানারে নেতা নামধারী ৬০ জন চাঁদাবাজের একটি তালিকাও তৈরি করেছেন গোয়েন্দারা।  
গত ১১ জানুয়ারি নগর ভবনে এক বৈঠক শেষে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র সাঈদ খোকন ঘোষণা দেন, রোববার থেকে সাপ্তাহিক কোনো কর্মদিবসে আর গুলিস্তান ও আশপাশের এলাকায় দিনের বেলায় ফুটপাতে হকার বসতে দেয়া হবে না। হকাররা দোকান নিয়ে বসতে পারবে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার পরে। তবে ছুটির দিনে এ নিয়ম প্রযোজ্য হবে না। এরপর রবি ও সোমবার সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে গুলিস্তান, বায়তুল মোকাররম, দৈনিক বাংলা মোড়, মতিঝিল, দিলকুশা ও পল্টন এলাকায় চালানো হয় হকার উচ্ছেদ অভিযান। সূত্র জানায়, গত সোমবার উচ্ছেদের পর লাইনম্যান নামধারী চাঁদাবাজরা একত্রিত হয়ে হকার সংগঠনের ব্যানারে মেয়র সাঈদ খোকনের সঙ্গে দেখা করে স্মারকলিপি দিয়ে আসেন। পুনর্বাসন ছাড়া হকার উচ্ছেদ না করা, হকারদের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দেয়া, চাঁদাবাজি বন্ধ করা, হকারদের উপর ‘দমন-পীড়ন’ বন্ধ এবং প্রকৃত হকারদের তালিকা করে পরিচয়পত্র দেয়াসহ ১০ দফা দাবির কথা সেখানে তুলে ধরেন তারা। অন্যদিকে নিজের অনড় অবস্থানের কথা জানিয়ে মেয়র সাঈদ খোকন সোমবার বলেন, জনগণের চলাচল নির্বিঘœ করতে করপোরেশেন আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে প্রধানমন্ত্রীর স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মেয়রের এই বক্তব্যকে প্রত্যাখ্যান করে সমন্বয় পরিষদের নেতারা গতকাল মঙ্গলবার আবার সমাবেশ করেন।
সরেজমিনে নগরীর গুলিস্তান, মতিঝিল, ফার্মগেট, নিউমার্কেট, মিরপুর, গাবতলী এলাকা ঘুরে হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, গোটা রাজধানীতে দুই সিটি করপোরেশনের অধীনে প্রায় ১৬৩ কিলোমিটার দীর্ঘ ফুটপাতে ৭০ হাজারেরও বেশি দোকান রয়েছে। হকার সমিতির হিসাব মতে, ফুটপাতের এসব দোকান থেকে প্রতিদিন গড়ে ৫ কোটি টাকা চাঁদাবাজি হয়। এই টাকার ভাগ পায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলেন নেতা, লাইনম্যান, স্থানীয় মাস্তান, রাজনৈতিক কর্মী ও পুলিশ। হকাররা জানায়, ফুটপাতে ব্যবসা করার জন্য চাঁদা দিতে হয় নানা পক্ষকেই। একই হকারকে চাঁদা দিতে হয় পুলিশকে, দিতে হয় ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতাদের, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তাদের, দিতে হয় মাস্তানদের। এভাবে চাঁদার কারণে প্রভাব পড়ে পণ্যমূল্যে। 
সূত্র জানায়, রাজধানীতে ফুটপাতের চাঁদা আদায়ের জন্য সাড়ে চার থেকে পাঁচশ লাইনম্যান কাজ করে। স্বাভাবিক সময়ে ফুটপাতে আড়াই লাখের মতো হকার থাকে। কিন্তু রমজানে ও ঈদ মৌসুমে হকার আরও বেড়ে যায়। এরা বিভিন্নভাবে প্রতিদিনই বিভিন্ন অংকের চাঁদা দিতে বাধ্য হয়। স্বাভাবিক সময়ে যে হারে চাঁদা দিতে হয়, রমজান মাসে দিতে হয় আরও বেশি পরিমাণে। ঈদের আগে কাপড়ের দোকানিদের চাঁদা বাড়ে দুই থেকে তিনশ টাকা।
গুলিস্তান এলাকার হকারদের সাথে কথা বলে জানা গেছে,  গুলিস্তান থেকে হকারদের না তুলতে সরকারদলীয় কয়েকজন প্রভাবশালী নেতা চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা মেয়র সাঈদ খোকনকে প্রভাবিত করতে ব্যর্থ হয়ে এখন লাইনম্যানদেরকে রাস্তায় নামতে বলেছেন। লাইনম্যানরা টাকার বিনিময়ে ও ভয়ভীতি দেখিয়ে সাধারণ হকারদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে। এ প্রসঙ্গে একজন হকার নেতা বলেন, মেয়রের সাথে মিটিং করে যারা দিনের বেলায় ফুটপাতে বসবে না বলে কথা দিয়েছিল তাদের কেউ কেউ বাধ্য হয়ে এখন রাস্তায় নেমে মেয়রের বিরুদ্ধে শ্লোগান দিচ্ছে।   
বাংলাদেশ হকার্স ফেডারেশনের হিসাব মতে, গুলিস্তান থেকে বায়তুল মোকাররম মসজিদ হয়ে ফুলবাড়ীয়া পর্যন্ত রাস্তা ও ফুটপাতে কমপক্ষে সাড়ে চার হাজার দোকান বসে। এসব দোকান থেকে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ লাখ টাকা চাঁদা তোলে লাইনম্যানরা। মাস শেষে এই টাকার পরিমান দাঁড়ায় দেড় কোটি টাকা। হকাররা জানিয়েছেন, প্রতিদিন নির্ধারিত চাঁদার টাকা না দিয়ে কেউই ফুটপাতে টিকতে পারে না। মারধর করে তুলে দেয়াসহ পুলিশ দিয়েও হয়রানী করা হয়। গতকাল দুপুরে গুলিস্তান এলাকার কয়েকজন হকারের সাথে এ প্রসঙ্গে কথা বললে তারা জানান, মেয়রের ঘোষণা অনুযায়ী  দিনের বেলায় ফুটপাতে বসা যাবে না-এমন সিদ্ধান্ত আমাদের নেতারা মেনে নিয়েছেন। কিন্তু তারপরেও আমাদেরকে নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে যাতে রাস্তায় নামি, আন্দোলন করি। কারা ভয়ভীতি দেখাচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে কয়েকজন হকার বলেন, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাসহ লাইনম্যানরা আছেন। 
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গুলিস্তান এলাকাসহ রাজধানীর প্রতিটি এলাকার ফুটপাতের হকারদের তদারকি করার জন্য পুলিশ লাইনম্যান নামধারী এক শ্রেণির দালাল নিয়োগ করে থাকে। এই সব দালাল আবার প্রভাবশালী নেতাদের আর্শিবাদপুষ্ট। এই দালালরাই সরকারী রাস্তা ‘ভাড়া’ দিয়ে মাসে হাতিয়ে নিচ্ছে দেড় কোটি টাকা।  গুলিস্তান এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, প্রতিদিন প্রতিটি দোকান থেকে নির্দিষ্ট হারে চাঁদা তোলা হয়। এই চাঁদার বড় অংশ যায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা, মতিঝিল থানা ও সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের কর্মকর্তাদের পকেটে। যারা সরাসরি এই চাঁদার টাকা তোলে তারা সব সময় থাকে ধরাছোঁয়ার বাইরে। পুলিশের সাথে সরাসরি যোগাযোগ বলে এরা কাউকে ভয়ও করে না। হকারদের ভাষায়, এরা নিজেদেরকে ‘পুলিশ’ মনে করে। সে কারনে কথায় কথায় হকারদেরকে লাঠিপেটা করে, অপমান করে, মালামাল কেড়ে নেয়। জানা গেছে, গুলিস্তান সুন্দরবন স্কোয়ারের উত্তর পাশের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে মোটা জজ, বাবুল, আমীর হোসেন, ভোলা ও কানা সিরাজ। গুলিস্তানের সবচেয়ে ব্যস্ততম এলাকা বলে এখানকার দর একটু বেশি। হকাররা জানান, এখানে ফুটপাতের দোকানগুলোর চাঁদা দেড়শ’ টাকা। বঙ্গভবনের পার্কের সামনে সার্জেন্ট আহাদ পুলিশ বক্সের সাথের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে লম্বা হারুন ও তার শ্যালক দেলোয়ার। গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের (গুলিস্তান সিনেমা হল) পূর্ব পাশের ফুটপাত ও রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে সরদার বাবুল। গুলিস্তান হলের (এখন নেই)  উত্তর পাশের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে খোরশেদ ও হাসান। রাজধানী হোটেলের সামনের ফুটপাত ও রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে হিন্দু বাবুল ও রব। জাতীয় গ্রন্থ ভবনের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে সুলতান ও লিপু। রমনা ভবনের পশ্চিম পার্শ্বের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে মনির ও তরিক আলী। আওয়ামী লগি অপিসের সামনে পূর্ণিমা ¯œাকসের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে আখতার ও জাহাঙ্গীর। বেলতলা বেল্টের গলির রাস্তা ও ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে কালা নবী, বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ের সোনালী ব্যাংকের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে সাবেক সর্দার ছালাম। জিপিও’র দক্ষিণের রাস্তার দোকান থেকে চাঁদা তোলে শহীদ ও দাড়িওয়ালা সালাম। মাওলানা ভাসানী স্টেডিয়ামের সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে আলী মিয়া। জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের দক্ষিণ গেটের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে কাদের ও খলিল। বায়তুল মোকাররম মসজিদের পশ্চিম দিকের মিনারের কাছের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে ফোটন, জাহাঙ্গীর ও নসু। বায়তুল মোকাররম মসজিদের স্বর্ণের মার্কেটের সামনের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে তমিজ উদ্দিন ও বাবুল ভূঁইয়া। জাতীয় মসজিদের উত্তর গেটের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে সাজু। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থার (বাসস) সামনের ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে কবির হোসেন, ফুলবাড়ীয়া টিএন্ডটির সামনের ফুটপাত থেকে চাঁদা তোলে ঘাউরা বাবুল, গুলিস্তান ট্রেড সেন্টারের পশ্চিমের রাস্তা ও ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদা তোলে বিমল। সূত্র জানায়, গোয়েন্দাদের তালিকাতেও এই সব চাঁদাবাজদের নাম রয়েছে। হকাররা জানায়, চিহ্নিত এই সব চাঁদাবাজরাই এখন বিভিন্ন রেজিস্ট্রেশনবিহীন সংগঠনের নেতা সেজে সিটি করপোরেশনের সিদ্ধান্তের বিরোধীতা করছে। মেয়রকেও হুমকী দিচ্ছে।
https://www.dailyinqilab.com/article/59303/%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A7%9C-%E0%A6%95%E0%A7%8B%E0%A6%9F%E0%A6%BF-%E0%A6%9F%E0%A6%BE%E0%A6%95%E0%A6%BE