২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
পার পেয়ে যাবেন ১৬ জন!
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
নারায়ণগঞ্জের চাঞ্চল্যকর সাত খুন মামলার এজাহারে এবং আসামিদের জবানবন্দিতে নাম এলেও বিচারের আওতায় আনা হয়নি ১৬ জনকে। এঁরা সবাই মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের সহযোগী। এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামির নাম রাখা হয়নি চার্জশিট বা অভিযোগপত্রে। তদন্তপর্যায়ে আরো ১১ জনের নাম উঠে এলেও তাঁদেরও চার্জশিটে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। ওই ১৬ জনকে বিচারের আওতায় আনার লক্ষ্যে বারবার অধিকতর তদন্তের দাবি জানিয়েছে বাদীপক্ষ। কিন্তু নারকীয় হত্যাকাণ্ডের তিন বছরের মধ্যেও সেই অধিকতর তদন্ত করেনি তদন্ত সংস্থা। যদিও মামলার বিচার চলাকালীন যেকোনো সময়ে অধিকতর তদন্ত করা এবং প্রতিবেদন দাখিল করার বিধান আছে।
বাদীর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্টেরও অভিমত ছিল, তদন্ত সংস্থা যেকোনো সময় অধিকতর তদন্ত করতে পারে। নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলা প্রসঙ্গে হাইকোর্ট এমনও বলেছিলেন যে বাদীর আবেদন অনুযায়ী তদন্ত সংস্থা অধিকতর তদন্ত করতে পারে। বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার কথাও বলেছিলেন হাইকোর্ট। কিন্তু এজাহারভুক্ত পাঁচ আসামিসহ উল্লিখিত ১৬ জনের বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তাঁদের বিরুদ্ধে আর কোনো তদন্ত হয়নি। অধিকতর তদন্তের জন্য পরে আর আবেদনও করা হয়নি। ফলে ওই ১৬ জনকে ছাড়াই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়েছে।
দেশজুড়ে আলোচিত ওই মামলায় ২৬ আসামিকে মৃত্যুদণ্ড এবং ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দিয়ে গত সোমবার রায় ঘোষণা করেছেন নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ সৈয়দ এনায়েত হোসেন। কিন্তু অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও ১৬ জনকে আইনের আওতায় না আনায় সন্তুষ্ট হতে পারেনি নারায়ণগঞ্জের সাবেক কাউন্সিলর ও প্যানেল মেয়র নিহত নজরুল ইসলামের স্বজনরা।
নিহত নজরুলের শ্বশুর সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান শহিদুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা এই রায়ে খুশি নই। যারা জড়িত, প্রত্যেককে বিচারের আওতায় আনা হয়নি। তাদের বিচারের আওতায় এনে শাস্তি দিতে পারলে আমরা পুরোপুরি খুশি হতাম। ’ তিনি বলেন, ‘চার্জশিটভুক্ত আসামির জবানবন্দি এবং এজাহারে যেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়েছে, একটি প্রভাবশালী মহলের ইঙ্গিতে তাদের বাদ দিয়ে চার্জশিট দিয়েছেন তদন্ত কর্মকর্তা। হাইকোর্টের অভিমত ছিল, তদন্ত সংস্থা যেকোনো সময়ে অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারবে। কিন্তু তা করা হয়নি। ’
শহিদুল ইসলাম জানান, নূর হোসেনের ওই সহযোগীদের মধ্যে এজাহারে যাঁদের নাম ছিল তাঁরা মামলা চলাকালীন বারবার এসেছেন এলাকায়। তাঁরা বিভিন্নভাবে বাদীপক্ষকে হুমকি দিয়েছেন। সাক্ষীদের ওপর প্রভাব খাটিয়েছেন যাতে তাঁরা সাক্ষ্য না দেন।
সাত খুন মামলার বাদী এবং নিহত নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি তদন্ত কর্মকর্তার দাখিল করা চার্জশিট প্রত্যাখ্যান করে নারাজি আবেদন করেছিলেন। নারায়ণগঞ্জ চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত এবং নারায়ণগঞ্জ জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সেই আবেদন নামঞ্জুর করা হয়েছিল। সর্বশেষ হাইকোর্টেও নামঞ্জুর করা হয় নারাজির আবেদন। তবে হাইকোর্ট কিছু অভিমত দিয়েছিলেন। হাইকোর্টের সেই অভিমত গ্রাহ্য করে রাষ্ট্রপক্ষ পদক্ষেপ নিলেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হতো বলে মনে করেন নজরুলের শ্বশুর ও স্বজনরা।
নারাজি আবেদনের ওপর হাইকোর্টে বাদীপক্ষে শুনানি করেছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের ঘটনা অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর। ওই ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। হাইকোর্ট বলেছিলেন চার্জশিট ত্রুটিপূর্ণ। হাইকোর্টের অভিমত অনুযায়ী রাষ্ট্রপক্ষের সঠিক পদক্ষেপ নেওয়া উচিত ছিল। এমন একটি চাঞ্চল্যকর হত্যাকাণ্ডের বিচারে যাতে বিলম্ব না হয় সে জন্য হাইকোর্ট বলেছিলেন, তদন্ত কর্মকর্তা ইচ্ছা করলে নিজেই অধিকতর তদন্ত করতে পারেন। অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। হাইকোর্টের ওই অভিমতের প্রতি সম্মান দেখিয়ে তদন্ত কর্মকর্তার উচিত ছিল চার্জশিটের ত্রুটি দূর করতে অধিকতর তদন্ত করা।
২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তখনকার প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলাম ও তাঁর চার সঙ্গী এবং নিরীহ আইনজীবী চন্দন সরকার ও তাঁর গাড়িচালককে দিনদুপুরে তুলে নিয়ে গিয়েছিলেন অভিযুক্ত সাবেক র্যাব সদস্যরা। সেই রাতেই অপহৃত সাতজনের শরীরে নেশাযুক্ত ইনজেকশন পুশ করে এবং শ্বাস রোধ করে হত্যা করা হয়েছিল। পরে লাশ গুম করার জন্য পেট কেটে ইটভর্তি দুটি বস্তা শরীরে বেঁধে মেঘনার মোহনায় শীতলক্ষ্যা নদীতে ডুবিয়ে দেওয়া হয়। তিন দিন পর লাশগুলো ভেসে উঠলে জানা যায়, এগুলো অপহৃত সাতজনের লাশ। নিহত সাতজন হলেন নজরুল ইসলাম, সিরাজুল ইসলাম লিটন, তাজুল ইসলাম, মনিরুজ্জামান স্বপন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর এবং অ্যাডভোকেট চন্দন কুমার সরকার ও তাঁর গাড়িচালক ইব্রাহিম।
অভিযোগপত্র মতে, ঘটনার সময় র্যাবে কর্মরত অভিযুক্ত সদস্যরা ওই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত করেন নজরুলের প্রতিদ্বন্দ্বী নারায়ণগঞ্জের আরেক কাউন্সিলর নূর হোসেনের কাছ থেকে নেওয়া টাকার বিনিময়ে।
অপহরণের পরের দিন নজরুলের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি বাদী হয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা মডেল থানায় মামলা করেছিলেন। এতে আসামি হিসেবে নূর হোসেন ছাড়াও তাঁর সহযোগী হাজি ইয়াসিন মিয়া, হাসমত আলী হাসু, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার ও ইকবাল হোসেনের নাম উল্লেখ ছিল। নূর হোসেন ছাড়া অন্য পাঁচজনকে চার্জশিট থেকে বাদ দেওয়া হয়।
মামলা দায়ের করার পর পর্যায়ক্রমে তদন্ত করেন ফতুল্লা মডেল থানার তখনকার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. ফজলুল হক তালুকদার, নারায়ণগঞ্জ পুলিশের গোয়েন্দা শাখার পরিদর্শক আবদুল আউয়াল ও পরিদর্শক মো. মামুনুর রশিদ মণ্ডল। চার্জশিটের বেশ কিছু ত্রুটি উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে নারাজি আবেদন করেন মামলার বাদী। কিন্তু নিম্ন আদালত থেকে উচ্চ আদালত পর্যন্ত বাদীর আবেদন নামঞ্জুর হয়।
হাইকোর্ট অবশ্য নারাজি আবেদন নামঞ্জুর করে বলেছিলেন, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তদন্ত কর্মকর্তা যেকোনো পর্যায়ে অনুমতি ছাড়াই অধিকতর তদন্ত করতে পারবেন। বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহীম ও বিচারপতি আমির হোসেনের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ ওই অভিমতসহ আদেশ দেন।
আদেশে বলা হয়, তদন্ত কর্তৃপক্ষ ফৌজদারি কার্যবিধি অনুসারে অধিকতর তদন্ত করতে পারে, সে অধিকার তাদের আছে। যেকোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অপরাধের তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও অধিকতর তদন্ত প্রতিবেদন দিতে পারে। এ ক্ষেত্রে পূর্ব অনুমতির প্রয়োজন হবে না।
এজাহারে বলা হয়েছিল, নূর হোসেন এবং তাঁর ওই পাঁচ সহযোগীর প্রত্যেকেই ঘটনার আগে নজরুলকে হত্যার জন্য বাসার আশপাশে মহড়া দেন। বাদীর নারাজি আবেদনে বলা হয়, নূর হোসেনের ওই পাঁচ সহযোগীকে গ্রেপ্তার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে সাত খুনের ঘটনা সম্পর্কে আরো জানা যেত।
এই মামলায় গ্রেপ্তার হওয়া আসামি আলী মোহাম্মদ আদালতে ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে বলেন, নজরুলকে খুনের আগে একদিন নূর হোসেনের বাসায় যান তিনি। বাসায় গিয়ে দেখেন নূর হোসেন এবং তাঁর ভাই নূর ইসলাম, নূর সালাম, জজ মিয়া, নরুদ্দিন, নূরুল হক ও ভাতিজা বাদল বসা আছেন। তখন আলী মোহাম্মদ নূর হোসেনকে উদ্দেশ করে বলেন, ‘নজরুলকে নিয়ে ভালো লাগে না। নজরুল বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করেছে। আপনি হুকুম দেন, ওকে শেষ করে দিই। ’ তখন নূর হোসেন বলেন, ‘এটা আমার ব্যাপার, এটি আমি দেখব। ’ বাদীর দাবি, ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেওয়া একজন আসামির বক্তব্যে এটা প্রতিষ্ঠিত হয় যে নূর হোসেনের পরিকল্পনার সঙ্গে তাঁদের ভাইয়েরা ও ভাতিজাও জড়িত থাকতে পারে। কিন্তু বিষয়টি তদন্ত হয়েছে—এমন বক্তব্য চার্জশিটে নেই বিধায় চার্জশিট ত্রুটিপূর্ণ।
আসামি আলী মোহাম্মদের জবানবন্দিতে বলা হয়েছে, সাত খুন ও লাশ গুমের সঙ্গে রিয়াজ নামের এক ব্যক্তি জড়িত রয়েছেন। অথচ রিয়াজের নাম-ঠিকানা না পাওয়ার অজুহাতে চার্জশিটে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। বাদী নারাজি আবেদনে বলেছেন, রিয়াজের বাড়ি সিদ্ধিরগঞ্জের আটিগ্রামে। তাঁর পিতার নাম মৃত মোসলেহ উদ্দিন। এই ঠিকানা তদন্ত কর্মকর্তাকে বাদীপক্ষ থেকে জানানোর পরও তাঁকে বাদ দিয়ে চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। তাঁর নাম-ঠিকানা পাওয়া গেলে পরে সম্পূরক চার্জশিট দেওয়া হবে বলে উল্লেখ করেছিলেন তদন্ত কর্মকর্তা। কিন্তু সম্পূরক চার্জশিট আর দেওয়া হয়নি।
আলী মোহাম্মদের জবানবন্দিতে উল্লেখ ছিল, হাসান, বিডু, মহিত, ফারুক, আসলাম, ভাগিনা মামুন, ফয়সাল, রুবেল, ক্যাশিয়ার কাসেম ও জিতু ঘটনার সঙ্গে জড়িত। কিন্তু এঁদের বিষয়ে চার্জশিটে কিছু উল্লেখ করা হয়নি। এমনকি তাঁদের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে কোনো তদন্তও করা হয়নি। এই ১০ জনকেও আইনের আওতায় আনা হয়নি।
 
http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/18/453243