২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
জরিপের অর্থে ভ্রমণবিলাস: এক অর্থনৈতিক শুমারিতেই বিদেশ গেলেন ৮৫ কর্মকর্তা
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
অর্থনীতিতে কৃষিবহির্ভূত খাতের অবদান জানতে ২০১৩ সালের মে মাসে দেশব্যাপী অর্থনৈতিক শুমারি বা জরিপ করে বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস)। মাঠের তথ্য সংগ্রহের চার মাস পর জরিপের প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ করে সংস্থাটি। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে চূড়ান্ত প্রতিবেদনও প্রকাশ করেছে বিবিএস। ১০ বছর পর ২০২৩ সালে আবার এ ধরনের শুমারি করবে সংস্থাটি। অর্থনৈতিক শুমারির সব কাজ শেষ হয়ে গেলেও থেমে নেই বিবিএসের কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণ। এ বহরে যোগ দিয়েছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। 
 
১৫ জানুয়ারি অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে ইন্দোনেশিয়ার পর্যটন এলাকা বালি দ্বীপে গেছেন ১০ সরকারি কর্মকর্তা। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর অনেকেই এ সফরকে \'ভ্রমণবিলাস\' হিসেবে দেখছেন। 
 
অর্থনৈতিক শুমারি-সংক্রান্ত প্রকল্পের আওতায় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং বিবিএসের ৮৫ কর্মকর্তা শিক্ষা সফরের নামে বিদেশ ভ্রমণে গেছেন। এ তালিকায় আছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারাও। শুমারির পরিচালক দিলদার হোসেন একাই জরিপের টাকায় বিদেশ ভ্রমণ করেছেন ছয়বার। বিবিএসের কোনো জরিপের অর্থে এমন বিদেশ ভ্রমণের ঘটনা নজিরবিহীন। বিদেশ ভ্রমণ ছাড়াও বিভিন্ন ধরনের সম্মানী হিসেবে বড় অঙ্কের অর্থ শুমারি পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তার পকেটে গেছে।
 
জানতে চাইলে পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগের সচিব একেএম মোজাম্মেল হক সমকালকে বলেন, অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে বিদেশ সফরের ফাইল খতিয়ে দেখা শুরু হয়েছে। কোন কোন কর্মকর্তা বিদেশ গেছে, তার নাম চাওয়া হয়েছে। সেখানে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও বিদেশ গিয়ে থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি বলেন, \'অনিয়মের সঙ্গে আপস করে কখনও চাকরি করিনি। অর্থনৈতিক শুমারির নামে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় হতে দেওয়া হবে না। এ জরিপে অনিয়মের পোস্টমর্টেম করবে পরিসংখ্যান বিভাগ। সরকারের একটি টাকাও অপচয় করে কেউ পার পাবে না।\'
 
পরিসংখ্যান বিভাগের সচিব আরও বলেন, \'অর্থনৈতিক শুমারির আওতায় আমাকেও ইন্দোনেশিয়া সফরে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বিবেকের তাড়নায় এবং ব্যস্ততার কারণে আমি আর যাইনি।\'
 
অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে ফিলিপাইন ভ্রমণ করেছেন ১২ জন, শ্রীলংকা ৭ জন, থাইল্যান্ড ৯ জন, ভিয়েতনাম ৮ জন, দক্ষিণ কোরিয়া ৩ জন, অস্ট্রেলিয়া ৫ জন, যুক্তরাষ্ট্রে ৫ জন ও কানাডা গেছেন ৫ জন কর্মকর্তা। এর বাইরে দুই দফা মালয়েশিয়া গেছেন ২১ কর্মকর্তা। সর্বশেষ ১০ কর্মকর্তা ইন্দোনেশিয়া সফরে রয়েছেন। দেশটিতে বালি দ্বীপসহ পর্যটন এলাকা ১০ দিন সফর করে ২৪ জানুয়ারি দেশে ফেরার কথা রয়েছে। আরও পাঁচ কর্মকর্তা শিগগিরই বিদেশ যাবেন এ জরিপের অর্থে। প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন সবচেয়ে বেশিবার অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে বিদেশ গেছেন। জরিপের পরিচালক হিসেবে যোগ দিয়েই ২০১৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র সফর করেন। পরের বছর আবার তিনি যান যুক্তরাষ্ট্রে। ২০১৫ সালের ২৭ এপ্রিল থেকে ৪ মে পর্যন্ত এ জরিপের অর্থে অস্ট্রেলিয়া সফর করেন দিলদার হোসেন। ২০১৬ সালের ১৯ থেকে ২৫ জুলাই পর্যন্ত কানাডা সফর করেন এ প্রকল্প পরিচালক। এর পর গেছেন মালয়েশিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশে। বর্তমানে তিনি ইন্দোনেশিয়ায় ১০ দিনের ভ্রমণ করছেন। দেশে এসেই আরও একবার তার বিদেশে যাওয়ার কথা রয়েছে বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে।
 
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অর্থনৈতিক শুমারির আওতায় বিদেশ ভ্রমণে বেশিরভাগই গেছেন পরিচালক দিলদার হোসেনের ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তারা। সর্বশেষ ইন্দোনেশিয়ার বালি দ্বীপ ভ্রমণে গেছেন জরিপের সঙ্গে জড়িত নন এমন কর্মকর্তারাও। বর্তমানে বালি দ্বীপ ভ্রমণে নেতৃত্ব দিচ্ছেন পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের যুগ্মপ্রধান অঞ্জন কুমার বিশ্বাস। পরিকল্পনামন্ত্রীর দপ্তরে সংযুক্ত উপপ্রধান মোহাম্মদ মাসুদ রানা চৌধুরীও এ সফরে আছেন। অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে এভাবে বিদেশ সফরের কারণ জানতে চাইলে পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের যুগ্মপ্রধান অঞ্জন কুমার বিশ্বাস সমকালকে বলেন, \'অন্য কর্মকর্তারা ইন্দোনেশিয়ায় গিয়ে কী শিখছে, তাই দেখতে যাচ্ছি। এতে দোষের কিছু নেই।\' 
 
জরিপের সঙ্গে জড়িত না হয়েও বিবিএসের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হোসেন, সহকারী প্রোগ্রামার তারানা নাসরিন, বান্দরবান জেলা পরিসংখ্যান কার্যালয়ের উপপরিচালক জাহাঙ্গীর আলমকে এ সফরে রাখা হয়েছে। ইন্দোনেশিয়া সফরে অন্যদের মধ্যে রয়েছেন_ শুমারি পরিচালক এবং বিবিএসের যুগ্ম পরিচালক দিলদার হোসেন, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা রেশমা জেসমিন, পরিসংখ্যান কর্মকর্তা প্রতীক ভট্টাচার্য ও পরিসংখ্যান কর্মকর্তা আকলিমা খাতুন। এ ছাড়া সহকারী পরিসংখ্যান কর্মকর্তা জেরিনা পাশা অর্থনৈতিক শুমারির অর্থে ইন্দোনেশিয়া সফর করছেন। বিবিএসের নিজস্ব কর্মকর্তা না হয়েও এ জরিপের অর্থে বিভিন্ন সময় বিদেশে গেছেন পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব বাইতুল আমীন ভূঁইয়া, এমএ মান্নান হাওলাদার, যুগ্ম সচিব মাহফুজুল কাদের, উপসচিব আবদুল গনিসহ অর্ধশত কর্মকর্তা।
 
ইন্দোনেশিয়া সফরের আগে অর্থনৈতিক শুমারির প্রকল্প পরিচালক দিলদার হোসেন সমকালকে বলেন, বিবিএসের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুতগতিতে শেষ হয়েছে ২০১৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারি। কয়েকজন জুনিয়র কর্মকর্তার অক্লান্ত পরিশ্রমের কারণে এমন সাফল্য পাওয়া গেছে। এর প্রতিদান হিসেবে এসব কর্মকর্তাকে ইন্দোনেশিয়া সফরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। অর্থনৈতিক শুমারি শেষ হওয়ার পর বিজনেস রেজিস্ট্রার করা হবে। আধুনিক এ বিজনেস রেজিস্ট্রারের বিষয়ে ইন্দোনেশিয়ার অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো হবে। তিনি বলেন, অর্থনৈতিক শুমারির আওতায় কোনো ধরনের অনিয়ম হয়নি। কিছু কর্মকর্তার হিংসামূলক ষড়যন্ত্রের কারণে দুর্নীতির অভিযোগ তুলেছে, যা সম্পূর্ণভাবে ভিত্তিহীন। 
 
২০০৩ সালের অর্থনৈতিক শুমারির সঙ্গে জড়িত বিবিএসের সাবেক পরিচালক সাইদুর রহমান সমকালকে বলেন, বিবিএসের রুটিন কাজের একটি অর্থনৈতিক শুমারি। সংস্থাটি প্রতিষ্ঠার পর থেকে ১০ বছর পর পর এ জরিপটি করে আসছে। এ ধরনের জরিপ নতুন না হওয়ায় বিদেশ সফরের প্রয়োজন নেই। আগের কোনো জরিপে বিদেশ সফরের প্রয়োজন পড়েনি। এভাবে জরিপের অর্থে শতাধিক কর্মকর্তা বিদেশ সফর সরকারি অর্থ অপচয় ছাড়া কিছু না। এভাবে রাষ্ট্রীয় অর্থ অপচয় করে যারা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
 
বিবিএসের ইন্ডাস্ট্রি উইংয়ের এক যুগ্ম পরিচালক সমকালকে বলেন, অর্থনৈতিক শুমারিতে শুধু বিদেশ ভ্রমণ এবং পিকনিক হয়নি, প্রকল্প পরিচালক মূলত দুর্নীতি ঠেকাতে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের সন্তুষ্ট করতে কোটি কোটি টাকা সম্মানী দিয়েছেন। আর ফাইল অনুমোদনে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিদেশ ভ্রমণে নিয়ে গেছেন। 
 
২০১৩ সালে শুরু হওয়া অর্থনৈতিক শুমারির ব্যয় নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। বিবিএসের কর্মকর্তারা পরিকল্পনা কমিশনের শিল্প ও শক্তি বিভাগের কিছু কর্মকর্তাকে ম্যানেজ করে ১৯৫ কোটি টাকার বিশাল বাজেটের অনুমোদন নেন। এরই মধ্যে বিভিন্ন খাতে ব্যয় দেখানো হয়েছে ১৩১ কোটি টাকা। যদিও এর আগের ২০০৩ সালের দুই দফা অর্থনৈতিক শুমারিতে ব্যয় হয়েছে মাত্র ১৪ কোটি টাকা। 
 
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের এক হিসাবে দেখা গেছে, শুধু অর্থনৈতিক শুমারি ২০১৩ নয়, আদমশুমারি, শ্রমশক্তি জরিপ, ন্যাশনাল হাউসহোল্ড ডাটাবেজ (এইচডি), মনিটরিং দ্য সিচুয়েশন অব ভাইটাল স্ট্যাটিসটিকস অব বাংলাদেশ (এমএসভিএসভি) প্রকল্পসহ বিবিএসের বাস্তবায়নাধীন অধিকাংশ প্রকল্পে সংশ্লিষ্ট না হয়েও কর্মকর্তারা বিদেশ ভ্রমণ করেছেন। এর পেছনে ব্যয় হয়েছে বড় অঙ্কের অর্থ।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/18/263810#sthash.7yhqVeYs.dpuf