১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
পুষ্প পুকুরের ১৪ আনাই গায়েব: দখল ৩-ভরাট করে আওয়ামী লীগ সভাপতির বাড়ি, কাউন্সিলরের অনুসারীরা বানিয়েছেন কার্যালয়. শ্রমিক লীগ গড়েছে গ্যারেজ
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
এখানে ছিল পুষ্প পুকুর। মাঝের এক চিলতে জায়গা ছাড়া সবটুকুই দখল হয়ে গেছে সাজ্জাদ নয়ন
লালবাগের জগন্নাথ সাহা সড়কের জরাজীর্ণ তিনতলা প্রাসাদটি স্থানীয়দের কাছে জমিদার বাড়ি হিসেবে পরিচিত। প্রবীণদের গল্পে জানা গেল, আজ থেকে ১১২ বছর আগে প্রাসাদটি নির্মাণ করেছিলেন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জগন্নাথ সাহা। বাড়ির সামনে খনন করেন দুই \'ঘাটলার\' বিশাল পুকুর। পুকুর হলে কী হবে ঘাটে বাঁধা থাকত নৌকা। জমিদার বাবু নৌকায় বসে মাছ ধরতেন। প্রাসাদটি ধ্বংসাবশেষ হয়ে কোনোমতে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু পুকুরটি গেল কোথায়?
 
গতকাল মঙ্গলবার পুকুরের সন্ধানে ওই এলাকায় গিয়ে এর-ওর কাছে জিজ্ঞেস করে প্রাসাদটি পাওয়া গেলেও পুকুরের হদিস মিলল না। প্রাসাদের সামনে ইট-আবর্জনার স্তূপ। সেখানে ছোট ছেলেরা ক্রিকেট খেলছিল। তাদের কাছেই জানা গেল, এই ইটের স্তূপে ঢাকা পড়েছে বিখ্যাত পুষ্প সাহার পুকুর। বাংলা ভাষায় প্রচলিত \'পুকুর-চুরি\' প্রবাদ বাক্যটিকে ছাড়িয়ে গিয়ে হয়েছে পুকুর-ডাকাতি। 
 
সরেজমিনে দেখা গেল, ৪৫ কাঠার বিশাল পুকুরটির ১৪ আনাই ভরাট করা হয়ে গেছে। \'নামেই তাল পুকুর আদতে ঘটি ডুবে না\' অবস্থা। ঠিক মাঝখানে অল্প একটু জায়গায় নর্দমার মতো কালো পানি। মাঝখানের ওই জায়গাটুকুও ভরাট চলছে বাসাবাড়ির দৈনন্দিন আবর্জনা ফেলে। কে ভরাট করছে এই পুকুর? এর উত্তরও পাওয়া গেল স্থানীয়দের কাছ থেকে। 
 
পুকুরের একাংশ ভরাট করে ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামী লীগের ২৪ নম্বর ওয়ার্ড সভাপতি ইকরামুল্লাহ সরওয়ার্দী বানিয়েছেন বাড়ি। একাংশে শ্রমিক লীগের কার্যালয় বানিয়েছেন স্থানীয় ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও আওয়ামী লীগ নেতা মোশাররফ হোসেন বি.কমের অনুসারীরা। লালবাগ থানা শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক বারেক হোসেন ও ওয়ার্ড শ্রমিক লীগের সভাপতি সিদ্দিকুর রহমান কার্যালয় নির্মাণ করেছেন। ঘর তুলে রিকশার গ্যারেজ হিসেবেও ভাড়া দিয়েছেন। লালবাগ থানা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজি দেলোয়ার ও তার বোন-জামাই হাজি নাজিম উদ্দিনও ভরাট করেছেন এই পুকুর। 
 
ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেনের দাবি, তার অনুসারীরা যেসব স্থাপনা নির্মাণ করেছে, সেগুলো অস্থায়ী। শ্রমিক লীগের কার্যালয়সহ দলের যেসব অফিস আছে, পুকুর দখলমুক্ত হলেই এগুলো সরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি অভিযোগ করেন, ইকরামুল্লাহ মূল দখলদার। মোশাররফ হোসেন সমকালকে বলেন, পুষ্প পুকুর সরকারি খাস সম্পত্তি। জেলা প্রশাসককে চিঠি দিয়ে অনুরোধ করেছি পুকুরটি দখলমুক্ত করতে। কিন্তু তারা কোনো ব্যবস্থা নিচ্ছেন না। 
 
স্থানীয়রা জানালেন, যত্নের অভাবে এবং পরিষ্কার না করায় নব্বইয়ের দশকেই মজে যায় পুষ্প পুকুর। ব্যবহারের অযোগ্য হয়ে পড়ে পুকুরের পানি। এর কিছু দিন পর ময়লা ফেলে ভরাট শুরু হয়। প্রায় এক যুগ আগে মাটি ফেলে ভরাট করে বাড়ি নির্মাণ শুরু করেন ইকরামুল্লাহ সরওয়ার্দী। হাজি দেলোয়ার ও হাজী নাজিম উদ্দিনও ভরাট চালিয়ে যান। তবে তাদের প্রত্যেকের দাবি, দখল নয় কেনা সম্পত্তিতে ঘর তুলেছেন তারা। 
 
পুষ্প পুকুর উদ্ধারে ২০১৪ সালে আন্দোলনে নামেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংগঠনও তাদের পাশে দাঁড়ায়। ধীরে ধীরে আন্দোলন স্তিমিত হয়ে পড়ে এবং দখল আরও বেড়ে যায়। পুষ্প পুকুর দখলমুক্ত করতে আন্দোলন করেছিল পুষ্ক সাহার পুকুর রক্ষা কমিটি। সংগঠনটির আহ্বায়ক সায়েমুল ইসলাম বলেন, এলাকাবাসীকে নিয়ে মানববন্ধন, মিছিল সবকিছুই করেছি। আন্দোলনে লাভ না হওয়ায় সবাই হতাশ হয়ে এক সময় নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। সরকারি কর্মকর্তাদের বারবার তাগিদ দেওয়ার পরও কোনো পদক্ষেপ নেননি তারা। 
 
সরেজমিনে দেখা যায়, পুকুরের দক্ষিণ-পূর্বপাড়ে একতলা বাড়ি তোলা হয়েছে। তার ছাদে জমির মালিকানা দাবি করে সাইনবোর্ডও লাগানো হয়েছে। উত্তর-পূর্বপাড়ে গড়ে তোলা হয়েছে কারখানা। এর মালিক ইকরামুল্লাহ সরওয়ার্দী। কারখানার শ্রমিকরা জানান, ইকরামুল্লাহ সরওয়ার্দীর কাছ থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছে কারখানাটি। পুকুরের প্রবেশপথে নির্মাণ করা হয়েছে রিকশা গ্যারেজ ও শ্রমিক লীগের কার্যালয়। 
 
পুকুর উদ্ধারের আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন আমির হোসেন। তিনি জানান, ২০০৫ সাল থেকে পুকুরটি ভরাট শুরু হয়। পুকুরের পূর্ব-উত্তর পাড়ে ১২ কক্ষের একটি টিনের ঘর নির্মাণ করেছেন ইকরামুল্লাহ সরওয়ার্দী। ২০০৯ সালে ওই অংশে নাজিম উদ্দিনের নামে নির্মাণ করা হয় দুটি পাঁচতলা আবাসিক ভবন। পাশাপাশি পুকুরটির পশ্চিম পাড়ে চারটি ও পূর্ব পাড়ে দুটি টিনের ঘর বানিয়ে ভাড়া দিয়েছেন নাজিম উদ্দিন। ২০১০ সালে আদালত পুকুরটি ভরাট না করার নির্দেশ দিয়ে স্থিতাবস্থা বজায় রাখার আদেশ দেন। কিন্তু ওই আদেশ উপেক্ষিত হয়েছে এবং এখনও ভরাট চলছে। 
 
লালবাগ থানার দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কমিশনার (ভূমি) রবীন্দ্র চাকমা জানান, আদালতে মামলা থাকায় পুকুর উদ্ধারের বিষয়টি এগোচ্ছে না। জেলা প্রশাসন পুকুরটি উদ্ধারে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছে। 
 
তবে ওয়ার্ড কাউন্সিলর মোশাররফ হোসেনের অভিযোগ, জেলা প্রশাসন তৎপর নয়। মোশাররফ হোসেন বলেন, \'আওয়ামী লীগের নেতা নামধারী কয়েকজন সরকারি পুকুর দখল করে ঘর তুলে মাসে মাসে ভাড়া আদায় করছেন। এলাকার মানুষ তাদের বিরুদ্ধে।\' 
 
জানা গেছে, ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের সময় বাংলাদেশ ছেড়ে ভারতে চলে যান জগন্নাথ সাহার ছেলেরা। তৎকালীন সরকার জগন্নাথ সাহার সম্পত্তি অর্পিত হিসেবে ঘোষণা করে। বাড়িটি একসনা ইজারা দেওয়া। পুকুরটি সরকারি ব্যবস্থাপনায় জনসাধারণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত ছিল। স্থানীয়রা জানান, ভুয়া দলিল তৈরি করে পুকুরের মালিকানা দাবির মামলা করেছে দখলদাররা। 
 
ইকরামুল্লাহর দাবি, দেশত্যাগের আগে জগন্নাথ সাহার পরিবারের সদস্যরা সমুদয় সম্পত্তি বিক্রি করে যান। ক্রেতাদের কাছ থেকে তিনি পরে ওই জমি কিনেছেন। কার কাছ থেকে কিনেছেন? ২০০৫ সালের আগে কেউ কেন মালিকানা দাবি করেননি_এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, \'এ কথা কোর্টে বলব।\' 
 
উল্লেখ্য, ইকরামুল্লাহ সর্বশেষ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে মোশাররফ হোসেনের সঙ্গে লড়াই করে হেরে যান।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/18/263808#sthash.wX9vXrR3.dpuf