২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে ভুল: দায় নিতে নারাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিকল্প ভাবনা প্রাথমিকের
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
২০১৭ সালের বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ে ভুলের দায় নিতে নারাজ শিক্ষা মন্ত্রণালয়। অথচ এ মন্ত্রণালয়ের অধীন জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (এনসিটিবি) অধীনেই পাঠ্যবই পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন, সংশোধন, মুদ্রণ ও বিতরণ হয়ে থাকে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় তাদের প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত বইয়ের পাণ্ডুলিপি প্রণয়ন করে এনসিটিবির কাছে পাঠায়। এনসিটিবির সংশোধনসহ মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রম সম্পন্ন করে থাকে। 
পাঠ্যবই শিক্ষার্থীদের হাতে পৌঁছার পর প্রাথমিকের বইয়ের নানা ধরনের ভুল নজরে আসার পর এ নিয়ে গত পক্ষকাল ধরে ব্যাপক সমালোচনা ও বিতর্ক চলছে। অব্যাহত সমালোনার মুখে শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ ৯ দিন পর মুখ খুলেন এবং তার আগের দিন এনসিটিবির পর্যালোচনা কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রথমে দুইজন পরে আরো একজন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ওএসসি ও সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ বরাবরের মতো হুঁশিয়ারি দেন ‘দোষীরা কেউ রেহাই পাবেন না’। ২০১৭ সালের পাঠ্যপুস্তকে ভুলত্রুটি নির্ণয় ও এসব ভুলত্রুটির জন্য দায়ী ব্যক্তিদের চিহ্নিত করে যথাযথ সুপারিশ প্রদানের জন্য ৯ জানুয়ারি মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব রুহী রহমানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যবিশিষ্ট উচ্চ ক্ষতাসম্পন্ন তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটিকে সাত কর্ম দিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করবে। এ কমিটি তাদের তদন্তকাজ চালিয়ে যাচ্ছে বলে সংশ্লিøষ্টরা জানান। 
এ দিকে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, বিনামূল্যে পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে মাধ্যমিকের বই মাউশি, প্রাথমিকের বই প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, মাদরাসার বই মাদরাসা বোর্ড এবং কারিগরির বই কারিগরি বোর্ড চূড়ান্ত করে এনসিটিবিকে দেয়। এনসিটিবি বইয়ের ভুলত্রুটি সংশোধন করে তা ছাপার জন্য পাঠায়। এরপর ছাপা বই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পৌঁছে দেয়া পর্যন্ত এনসিটিবি তৎপর থাকে। এনসিটিবি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন একটি দফতর। নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, বই যার যারটা তৈরি করে দেন। সে অনুযায়ী এডিট (সম্পাদনা ও সংশোধন) করা, আরো উন্নত করা এনসিটিবির দায়িত্ব। কিন্তু ভুল সংশোধন করতে গিয়ে তা নজরে না আসাটাই বড় ধরনের ভুল। এ ভুলকে তো মেনে নেয়া যায় না। 
অপর দিকে প্রাথমিকের ভুলে ভরা পাঠ্যবই নিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখে নিজেরাই বই ছাপাতে আগ্রহী প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিক স্তরের বই প্রণয়নে এনসিটিবির মতো আলাদা প্রতিষ্ঠান করারও চিন্তাভাবনাও করছে তারা। পাঠ্যপুস্তকে ভুল নিয়ে বথ্যাপক সমালোচনার মুখে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এনসিবিটির ওপরই দোষ চাপিয়েছে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়। প্রাথমিকের মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার বলেন, বই ছাপানোর দায়িত্ব শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা প্রতিষ্ঠান এনসিটিবির। 
জানা গেছে, এনসিটিবিতে প্রাথমিকে বই সংশোধনের জন্য যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তাদের সবাই কলেজ শিক্ষক এবং সংশ্লিষ্ট বিষেয় বিশেষজ্ঞ। প্রাথমিকের বই সংশোধনে দায়িত্বহীনতার অভিযোগ যে কর্মকর্তাকে ওএসডি করা হয়েছে তিনি অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন। প্রাথমিকের বই সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ হিসেবে যেসব কর্মকর্তা রয়েছেন তারা সবাই বিসিএস ক্যাডারের কর্মকর্তা। সেখানে প্রাথমিকের কোনো কর্মকর্তার নিয়োগ দেয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে। বছরের পর বছর বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কিছু কর্মকর্তা প্রেষণে বিভিন্ন পদ আঁকড়ে আছেন এখানে। পাঠ্যক্রম তৈরি, রচনা, মুদ্রণ বিষয়ে কোনো অভিজ্ঞতা ছাড়াই এসব কর্মকর্তা ঢাকায় থাকার জন্য এনসিটিবিতে পড়ে আছেন। ২৪টি পদ প্রাথমিকের পাঠ্যবইয়ের উছিলায় সৃষ্টি করা হলেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অযোগ্য লোকদের এখানে বসিয়ে রাখা হয়েছে। 
যে সাতজন শীর্ষ কর্মকর্তা নিয়ে এনসিটিবি গঠিত তার সদস্য প্রাথমিক (প্রাথমিক শিক্ষাক্রম) অধ্যাপক ড. মো: আবদুল মান্নান। জানা গেছে, এ কর্মকর্তা সরকারি কলেজে বাংলার শিক্ষক ছিলেন। নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে প্রাথমিকের বই নিয়ে যে বিতর্ক ও সমালোচনা হচ্ছে তা উড়িয়ে দিয়ে তিনি বলেছেন, প্রাথমিকের বইয়ে কোনো ভুল নেই। যে বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে তা আসলে কোনো ভুলই নয়। যেমন ‘ছাগলে গাছের পাতা খাওয়া’ মোটেই ভুল নয়। একে তিনি চমৎকার দৃশ্যকল্প বলে অভিহিত করে বলেছেন, এটি একটি অসাধারণ ছবি। ‘ওড়না’-র বিষয়টিকে তিনি বলেন, অভিধানে এর বিকল্প কোনো শব্দ না থাকায় এটিকে ব্যবহার করা হয়েছে। মুক্তমনা সমাজে এটিকে ‘জেন্ডার ইস্যু’ করা হয়েছে। তাই আগামী বছর একে সংশোধন বা বিকল্প ভেবে দেখা হবে। 
প্রাথমিকের পাঠ্যবই আলাদাভাবে ছাপানোর চিন্তাভাবনা সম্পর্কে মন্ত্রী অ্যাডভোকেট মোস্তাফিজুর রহমান ফিজার বলেন, এ জন্য নতুন প্রতিষ্ঠান করা যায় কি না সেটি নিয়ে ভাবনা আছে। প্রাইমারির বইটা আলাদা করে ছাপালে জবাবদিহিটা আমাদের থাকবে। এ ছাড়া প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষা নেয়ার জন্য স্বতন্ত্র একটি শিক্ষা বোর্ড করা যেতে পারে বলে তিনি মনে করেন।
উল্লেখ্য চলতি শিক্ষা বছরে ৩৬ কোটি ২১ লাখ ৮২ হাজার বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়েছে। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১০ কোটি ৮৭ লাখ ১৯ হাজার ৯৯৭টি বই ও শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করা হয়। বছরের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে ভুল ও অসম্পূর্ণ তথ্যে ভরা প্রাথমিকের সব শ্রেণীর পাঠ্যবই তুলে দেয়া নিয়ে সমালোচনা শুরু হয়। শিশু মনস্তাত্ত্বিক বিষয়টি বিবেচনায় না নিয়েই কঠিন এবং অপ্রচলিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি শ্রেণীতে মুক্তিযুদ্ধ প্রসঙ্গে রচনা থাকলেও সন, তারিখ ও প্রেক্ষাপটের উল্লেখ ছাড়া অসম্পূর্ণ। প্রথম শ্রেণীর বাংলা বইয়ে বর্ণ পরিচয়ে ‘ওড়না’ বির্তক কিংবা ছাগল আম খায়-এর মতো হাস্যকর তথ্য রয়েছে। এ ছাড়া তৃতীয় শ্রেণীর ‘আদর্শ ছেলে’ কবিতা বিকৃত করাসহ অসংখ্য ভুলে ভরা এবারের পাঠ্যবই।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188331