১৪ অক্টোবর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
অন্যান্য হত্যাকাণ্ডেরও দ্রুত বিচার চান না’গঞ্জবাসী: নূর হোসেনরা কনডেম সেলে
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার রায়ে নারায়ণগঞ্জ কলঙ্ক মুক্ত হতে পারে না বলে দাবি করেছেন নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও সুশীলসমাজের নেতারা। তারা নারায়ণগঞ্জকে কলঙ্ক মুক্ত করতে সাত খুনের ঘটনার আগে ও পরে অন্য সব হত্যাকাণ্ডের বিচার দাবি করেন।
সাত খুনের মামলার রায়ের প্রতিক্রিয়ায় তারা এসব কথা বলেন।
নারায়ণগঞ্জ প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমান মাসুম বলেন, সাত খুনের মামলার রায়ে আমরা কলঙ্ক মুক্তির পর্যায়ে আছি। এটা একটি ম্যাসেজ সন্ত্রাসীদের জন্য যে অপরাধ করে পার পাওয়া যায় না। এ রায় একটি প্রতীক। সাত খুনের মতো অন্যান্য হত্যাকাণ্ড যেমনÑ ত্বকী, চঞ্চল, আশ্বিক, মিঠু হত্যাকাণ্ডেরও বিচার চাই।
নারায়ণগঞ্জ নাগরিক কমিটির সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ এ রায়ের মধ্য দিয়ে একটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। এ ক্ষেত্রে বিচারকদের বিচক্ষণতাকে সাধুবাদ জানাই।
নারায়ণগঞ্জের সাংস্কৃতিক ব্যতিত্ব ও নিহত ত্বকীর বাবা রফিউর রাব্বী বলেন, শুধু মাত্র সাত খুনের রায় দিয়ে নারায়ণগঞ্জ কলঙ্ক মুক্ত হওয়ার কোনো কারণ নাই। সরকার যেহেতু চেয়েছে তাই রায় হয়েছে। সরকার যখন না চায় তখন হয় না। সাত খুনের আগেও অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। ত্বকী হত্যার চার বছর হতে চলেছে কিন্তু এখনো পর্যন্ত চার্জশিটও দেয়া হয়নি। এ ছাড়াও চঞ্চল, আশ্বিক, মিঠুসহ অনেক হত্যাকাণ্ড হয়েছে। এসব হত্যাকাণ্ডেরও বিচার করতে হবে।
সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন নারায়ণগঞ্জ জেলার সাধারণ সম্পাদক ধীমান সাহা জুয়েল বলেন, সাত খুনের রায়ে খুশি, তবে শঙ্কিত এ রায় কার্যকর নিয়ে। নারায়ণগঞ্জে ত্বকী হত্যাসহ সব হত্যাকাণ্ডের বিচার না হওয়া পর্যন্ত কলঙ্ক মুক্ত হওয়া সম্ভব নয়।
মানবাধিকার সংগঠন ‘নির্ভীক’ এর প্রধান সম্বনয়ক ও নগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এ টি এম কামাল বলেন, সাত খুনের ঘটনায় যারা সরাসরি জরিত ছিল দ্রুত তাদের বিচার সম্পন্ন হওয়াতে নারায়ণগঞ্জবাসী সন্তুষ্ট। কিন্তু যারা এ ঘটনার পিছনে ছিল সেই রহস্য উদঘাটন হলো না। এ যেন নারায়ণগঞ্জের কলঙ্ক শেষ হয়েও হলো না।
গত সোমবার নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেন, র্যাবের তিন কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার এম এম রানা ও মেজর আরিফ হোসেনসহ ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দিয়েছেন আদালত। বাকি ৯ জনকে সাত থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় এ রায় দিয়েছেন আদালত।
সাত খুনের রায়ের কপি হাইকোর্টে যায়নি : নারায়ণগঞ্জের আলোচিত সাত খুন মামলার নি¤œ আদালতের রায় ও রায়ের আদেশ মঙ্গলবার হাইকোর্টে পাঠানো হয়নি। আর এদিন রায় ও রায়ের আদেশের নকল চেয়ে কোনো আসামির পক্ষ থেকে আবেদনও করা হয়নি। বুধবার এলসিআর হাইকোর্টে পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে আদালত সূত্র নিশ্চিত করেছে। ফতুল্লা মডেল থানায় দায়ের করা সাত খুনের আলোচিত দু’টি মামলায় সোমবার ৩৫ আসামির মধ্যে ২৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড ও ৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়। এদের মধ্যে ১২ জন পলাতক রয়েছে।
এ দিকে রায় ঘোষণার এক দিন পর নারায়ণগঞ্জ কারাগারে রাখা ১৮ জন আসামির সাথে দেখা সাক্ষাৎ করেছেন স্বজনেরা। প্রত্যেক আসামিই উচ্চ আদালতে আপিল করার জন্য তাদের স্বজনদের তাগিদ দিয়েছেন। 
নারায়ণগঞ্জ জজকোর্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো: আবদুল খালেক বলেন, সাজাপ্রাপ্ত আসামিদের কাছ থেকে এখনো নকলের জন্য আবেদন দেয়া হয়নি। নি¤œ আদালতের এলসিআল (রায় এবং রায়ের আদেশ) প্রস্তুত করে বুধবারের মধ্যে হাইকোর্টে পাঠানোর সম্ভাবনা রয়েছে।
সাত খুনের আসামিদের কান্না শুরু
নারায়ণগঞ্জে আলোচিত সাত খুন মামলার রায় ঘোষণার পর জেলা কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্ত ১৮ আসামিকে রাখা হয়েছে, যাদের মধ্যে ১২ জনই মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত। তাদেরকে কারগারের ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের জন্য নির্ধারিত কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। আর ছয় আসামিকে রাখা হয়েছে বিভিন্ন সেলে।
গতকাল মঙ্গলবার নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার আসাদুর রহমান বলেন, নারায়ণগঞ্জ কারাগারে আগেই ১৩ জন আসামি ছিল মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত তাদের সঙ্গে নতুন করে গত সোমবার আরো ১২ জন যুক্ত হয়েছে। এ ২৫ জনকে ১৫টি কনডেম সেলে রাখা হয়েছে। সেলগুলোতে দুই থেকে তিনজন করে একসঙ্গে আছেন।
আসাদুর রহমান আরো বলেন, কনডেম সেলে বন্দীরা কারাবিধি অনুযায়ী যতটুকু সুবিধা পাওয়ার কথা এর থেকে বেশি কোনো সুবিধা পায়নি। আসামিরা সবাই সুস্থ আছে। সোমবার কারাগারে পৌঁছেই তাদেরকে বিষণœ ও কান্না করতে দেখা গেছে। এমনকি আজকেও সকাল থেকে (মঙ্গলবার) কান্না করেছে। তারা অপিলের প্রস্তুতি নিচ্ছে। তবে সবাইকে কারাবিধি অনুযায়ী পোশাক পরানো হয়েছে। আসামিদের রাতে সবজি, ডাল, ভাত ও মাছ, সকালে রুটি ও গুড়, দুপুরে সবজি, ভাত ও ডাল খেতে দেয়া হয়েছে। কারাবিধি অনুযায়ী ফাঁসির আসামিরা বের হতে পারবে না।
এর আগে সোমবার (১৬ জানুয়ারি) সকালে রায় ঘোষণার পর দুপুরে আনুষঙ্গিক কাজ শেষে সাত খুনের মামলায় গ্রেফতার ২৩ আসামির মধ্যে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে ১৮ ও গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে পাঁচজনকে পাঠানো হয়।
নারায়ণগঞ্জ জেলা কারাগারের জেলার আসাদুর রহমান জানান, নারায়ণগঞ্জ কারাগারে ১৮ আসামিকে আনা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত ও ছয়জন বিভিন্ন কারাগারে দণ্ডপ্রাপ্ত। আর কাশিমপুর কারাগারে পাঠানো হয়েছে পাঁচজনকে। তারা হলো নূর হোসেন, র্যাবের চাকরিচ্যুত কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন, লেফটেন্যান্ট কমান্ডার মাসুদ রানা (এম এম রানা) ও ল্যান্স নায়েক বেলাল হোসেন।
অন্য দিকে নারায়ণগঞ্জ কারাগারে আছে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের মধ্যে হাবিলদার এমদাদুল হক, আরোজি-১ আরিফ হোসেন, ল্যান্স নায়েক হীরা মিয়া, সিপাহি আবু তৈয়্যব, কনস্টেবল মো: শিহাব উদ্দিন, এসআই পূর্ণেন্দু বালা, র্যাবের সদস্য আসাদুজ্জামান নূর, নূর হোসেনের সহযোগী মোর্তুজা জামান চার্চিল, আলী মোহাম্মদ, মিজানুর রহমান দিপু, রহম আলী, আবুল বাশার।
এ ছাড়া বিভিন্ন মেয়াদে দণ্ডপ্রাপ্তদের মধ্যে রয়েছেন করপোরাল রুহুল আমিন (১০ বছর), এএসআই বজলুর রহমান (৭ বছর), হাবিলদার নাসির উদ্দিন (৭ বছর), এএসআই আবুল কালাম আজাদ (১০ বছর), সৈনিক নুরুজ্জামান (১০ বছর), কনস্টেবল বাবুল হাছান (১০)।
নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের মামলার রায়ে সন্তুষ্ট তারেক সাঈদের গ্রামের মানুষ
পিরোজপুর সংবাদদাতা জানান, দেশবাসীর বিবেক স্তব্ধ করা আলোচিত নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলার অন্যতম সাজা প্রাপ্ত র্যাব থেকে বহিষ্কৃত কর্মকর্তা তারেক সাঈদের বাড়ি পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া উপজেলার দাউদখালী ইউনিয়নের দেবত্রি গ্রামে। রায়ে সারা দেশের মতো তার গ্রামের মানুষও সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। সোমবার সকালে তারা অধীর আগ্রহে টেলিভিশনের সামনে রায় শোনার জন্য অপেক্ষা করেন। রায় শোনার পর তারা সন্তোষ প্রকাশ করেন। 
সরেজমিন ওই গ্রামে গেলে এলাকাবাসী জানিয়েছেন সাবেক মেজর মো: মজিবুর রহমানের ছেলে তারেক সাঈদ কখনোই গ্রামে আসতেন না। ফলে এলাকাবাসীর কাছে তারেক সাঈদ অপরিচিত। নারায়ণগঞ্জের লোমহর্ষক ঘটনার পরই লোকজন তাকে চিনতে পারেন এবং আলোচনায় আসেন। তবে তারেক সাঈদের পরিবারের কেউই গ্রামে থাকে না। এমনকি তাদের বাড়িতে কোনো বসতঘরও নেই। 
রায়ের ব্যাপারে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি তারেক সাঈদের চাচা (বাবার মামাতো ভাই) মেজর (অব:) আবুল বাশার।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188292