১৫ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
উন্নয়নের গণতন্ত্র আর উন্নয়ন মেলা
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
|| ড. রেজোয়ান সিদ্দিকী || ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিনা ভোটের নির্বাচনের আগে-পরে এই সরকার কত যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তার মধ্যে এরা সবচেয়ে বেশি বাগাড়ম্বর করেছে গণতন্ত্র আর সুশাসন নিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশে গণতন্ত্র ক্রমেই অধরা হয়ে যাচ্ছে। এই সরকার ক্ষমতাই দখল করেছে গণতন্ত্রের কবর রচনা করে। ২০১৪ সালের তথাকথিত নির্বাচনের আগে সরকার স্বীকৃত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকেই তছনছ করে দেয়। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করে নিজেদের অধীনেই তারা নির্বাচনের বিধান কায়েম করে। ফলে দেশে এক জগাখিচুড়ি শাসন ব্যবস্থার সৃষ্টি হয়। সংসদের ৩০০ আসনে এমপিরা বহাল থাকেন। আবার তারা পদত্যাগ না করেই পরবর্তী নির্বাচনে অংশ নেয়ার সুযোগ পান। ফলে ঐ নির্বাচন শেষে জাতীয় সংসদে সদস্য সংখ্যা দাঁড়ায় ৬০০। এটা ছিল সংবিধান আর সংসদ নিয়ে এক বড় তামাশা।
এ রকম তামাশার ভিতর দিয়েই তারা এগিয়ে যেতে থাকে। এ ধরনের তামাশা সৃষ্টির কারণেই ২০১৪ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সঙ্গে জোটভুক্ত দলগুলো ছাড়া আর কেউ অংশগ্রহণ করেনি। ঐ নির্বাচনে দেশের পাঁচ শতাংশ মানুষও  ভোট দেয়নি। অর্ধ শতাধিক ভোট কেন্দ্রে একজনও ভোট দেয়নি। এমন কি ভোটকেন্দ্রে উপস্থিত আওয়ামী জোটের নেতাকর্মী, পোলিং এজেন্টরা পর্যন্ত ভোট দেবার প্রয়োজন অনুভব করেননি। কারণ তারাও উপলব্ধি করেছিলেন যে, ভোটের নামে যে প্রহসন হচ্ছে তা কোনোই অর্থ বহন করে না। বেশির ভাগ ভোটকেন্দ্র ছিল শূন্য। সেখানে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা অলসভাবে বসে ছিলেন। অনেক কেন্দ্রেই রোদ পুহিয়েছে শীতার্ত কুকুর। ৩০০ আসনের ১৫৩ আসনে কোনো নির্বাচনই হয়নি। তাদের বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত ঘোষণা করে দেয়া হয়েছে।
এরপর থেকে স্থানীয় সরকার পর্যায়ে যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে, তার সবই ছিল প্রহসন। জাতীয় নির্বাচন সঙ্গত কারণেই বর্জন করলেও স্থানীয় সরকার নির্বাচনে অংশ নিয়েছিল বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো। কিন্তু নজিরবিহীর কারচুবি, ভোট ডাকাতি, আগের রাতেই ব্যালট বাক্স ভরে রাখা, বিরোধী ভোটারদের ভয়-ভীতি প্রদর্শনের জন্য ঠাঙাড়ে ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে যথেচ্ছ ব্যবহার করা হয়। সরকার  যাকে খুশি তাকে নির্বাচিত ঘোষণা করে বসে। এর মাধ্যমে দেশে জনমতের প্রতিফলনের পথ রুদ্ধ করে দেয়া হয়। ভোটের রাজনীতির প্রতি মানুষ আস্থা হারাতে শুরু করে। প্রতিশ্রুতি যাই দিক না কেন, সরকারও সম্ভবত এই অবস্থাই সৃষ্টি করতে চেয়েছে। ভোট নয়, জনমতের প্রতিফলন নয়, সরকার যা জনগণের ওপর চাপিয়ে দেবে, সেটাই মেনে নিতে হবে। এই হলো বর্তমান বাংলাদেশের গণতন্ত্রের অবস্থা।
আবার কেউ যখন গণতন্ত্রের আগে নানান বিশেষণ যুক্ত করে, তখনই বুঝতে হবে, এদের মতলব ভালো নয়। এরা জনমতের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না। কিংবা নিশ্চিত জানেন যে, জনগণের মতামত প্রতিফলিত হলে তাদের ভরাডুবি কেউ রোধ করতে পারবে না। তার উদাহরণ আমরা আগে দেখেছি, পাকিস্তান আমলে জেনারেল আইয়ুব খানের সময়। আইয়ুব খান সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করেছিলেন ১৯৫৮ সালে। ১৯৬০ সালে দিয়েছিলেন তার অনুকূলে গণভোট। সেই হ্যাঁ না ভোটের মাধ্যমেই তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ‘নির্বাচিত’ হয়েছিলেন। এরপর ১৯৬৫ সালে তিনি আবার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন দিয়েছিলেন। সেই নির্বাচনের আগে তিনি গণতন্ত্রের নতুন নামকরণ করেছিলেন ‘মৌলিক গণতন্ত্র’। সে এক আজব জিনিস ছিল। সেখানে জনগণের সরাসরি ভোটের ব্যবস্থা রদ করা হয়েছিল।
মৌলিক গণতন্ত্র ব্যবস্থা অনুযায়ী স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিরাই কেবল ভোট দিতে পারতেন, জনগণ নয়। আইয়ুব খানের আমলে এমন মৌলিক গণতন্ত্রী ভোটারের সংখ্যা ছিল ৮০ হাজার। আইয়ুব খানের লক্ষ্য ছিল, এই ৮০ হাজারের মধ্যে ৫০ হাজার ভোট কিনতে পারলেই সহজে নির্বাচিত হয়ে আসা সম্ভব। সে চেষ্টাই তিনি করেছিলেন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হচ্ছিল না বলে তিনি ব্যাপক কারচুবির আশ্রয় নেন। আর সেবারই প্রথম পাকিস্তানে নির্বাচনে কারচুবির কাজে ব্যাপকভাবে সামরিক গোয়েন্দা বাহিনীকে ব্যবহার করা হয়। ঐ নির্বাচনে আইয়ুব খানের প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ছিলেন কায়েদে আযম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর বোন ফাতিমা জিন্নাহ। কেবল মাত্র আইয়ুব খানের মুসলিম লীগ ছাড়া পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের সকল রাজনৈতিক দল ফাতিমা জিন্নাহকে সমর্থন দিয়েছিল। আর ব্যাপকভাবে ধারণা করা হয় যে, ঐ নির্বাচনে ফাতিমা জিন্নাহই বিজয়ী হয়েছিলেন। কিন্তু দুর্নীতি কারচুবির মাধ্যমে আইয়ুব খান নিজেকে প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত ঘোষণা করেন। তবে ঐ কারচুবির নির্বাচন দিয়ে আইয়ুব খান ক্ষমতা চিরস্থায়ী করতে পারেননি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে আইয়ুব সরকারের পতন ঘটে।
এবার বাংলাদেশে জেলা পরিষদ নির্বাচনে আমরা তেমনই এক মৌলিক গণতান্ত্রিক নির্বাচন দেখলাম। এ আয়োজনও ছিল বেশ চমৎকার। প্রথমে সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ফল জোর করে আওয়ামী লীগ তাদের অনুকূলে নিয়ে যায়। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যদেরও মনোনয়ন দেয়া হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বাক্ষরে। ফলে সরকারি কর্মকর্তাদের দায়িত্ব হয়ে যায় সেই ব্যক্তিকে যেভাবেই হোক জিতিয়ে আনা। বাস্তবে ঘটেছেও তাই। ফলে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে নিজেদের লোক বসানো সম্ভব হয়। আর তাই আইয়ুব খানের মৌলিক গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে আওয়ামী লীগ সরকার জেলা পরিষদ নির্বাচন দেয়। সব কিছু ছকের মধ্যে সাজানো ছিল। সরকার ভেবেছিল যেভাবে তারা স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেড়ে নিয়েছে, একই কায়দায় আইয়ুবি ছকে জেলা পরিষদগুলোও তারা দখল করে নেবে। কিন্তু এত সব ছক কষায় তেমন একটা সুফল হয়নি। সকল হুমকি ধামকি সত্ত্বেও প্রায় এক-তৃতীয়াংশ জেলা পরিষদে আওয়ামী লীগের প্রার্থীদের ভরাডুবি হয়েছে। সরকারকে উপলব্ধি করতে হবে যে, বেশি টাইট দিলে শেষ পর্যন্ত রশি ছিঁড়ে যায়। আর নিজেদের লোকেরাই সরকারের খামখেয়ালির প্রতিবাদ করতে শুরু করেছে। সরকারের নির্দেশ আর মানছে না।  
গণতন্ত্র নিয়ে সরকারের এই খেলায় যুক্ত হয়েছে আইয়ুবি আরও উপাদান। জেনারেল আইয়ুব খান মৌলিক গণতন্ত্র চালু করেছিলেন। আর আওয়ামী লিগ এখন চালু করার চেষ্টা করছে ‘উন্নয়নের গণতন্ত্র’। যেখানে নির্ভেজাল গণতন্ত্র আছে, জবাবদিহিতা আছে, কার্যকর জাতীয় সংসদ আছে, সেখানে উন্নয়ন অবধারিত। তার জন্য গণতন্ত্রকে উন্নয়নের অভিধা দেয়ার দরকার নেই। এসব বিশেষণ যুক্ত করলে আমাদের সংশয় জাগে। আমরা ঘর পোড়া গরু, সিঁদুরে মেঘ দেখলে ভয় পাই। এই উন্নয়নের ডামাডোলও এখন চলছে। ১৯৬৮ সালে আইয়ুব খান তার ক্ষমতা দখলের দশ বছর পূর্তি উপলক্ষে সারা দেশে পালন করেছিলেন ‘উন্নয়ন দশক’। ট্রাক সাজিয়ে ঢাকঢোল পিটিয়ে তিনি এ আয়োজন করেছিলেন, যখন তার জনপ্রিয়তা একেবারে শূন্যের কোঠায়। গোটা পাকিস্তানে আইয়ুব-বিরোধী আন্দোলন জোরদার হয়ে উঠছে। তার হয়তো ধারণা হয়েছিল যে, শহুরে কিছু ছাত্র আর রাজনীতিকই কেবল তার বিরোধিতা করছে, আর সকল মানুষ আছে তার সঙ্গে। কিন্তু তার পায়ের নিচের মাটি যে ঝুরঝুরে হয়ে গিয়েছিল, আইয়ুব তা টের পাননি। ফলে সারা দেশেই সাধারণ মানুষ তার উন্নয়নের ট্রাক জ্বালিয়ে দিয়েছিল।
শেখ হাসিনা সরকারকেও তেমন আয়োজন করতে দেখলাম। জবরদস্তির এই সরকারের বর্ষপূর্তিতে দেখলাম জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে চলছে উন্নয়ন মেলা। এক একটা মাঠ পরিষ্কার করে প্যান্ডেল টানিয়ে মাইক লাগিয়ে জেলা প্রশাসনের লোকেরা তোতা পাখির মতো উন্নয়নের কাহিনী বলে যাচ্ছে। একটি কৌতূহলি শিশুও সেখানে শ্রোতা নেই। শূন্য ময়দান পড়ে আছে। তাহলে জনগণের বিপুল অর্থ ব্যয় করে এই আয়োজনের হেতু কী? সরকারের মুখে উন্নয়নের দীর্ঘ দীর্ঘ ফিরিস্তি শুনি। কিন্তু উন্নয়ন টের পেলাম ময়মনসিংহ থেকে দূর্গাপুর যেতে গিয়ে। ৫০ কিলোমিটারের মতো রাস্তা। বোঝা যায় এক সময় এখানে সড়ক ছিল। এই পথে এখন বিশ মিটার রাস্তাও পাকা নেই। মিললো না ইট কংক্রিট পিচের দেখা। কেবল ধূলা আর ধূলা। গোটা সড়ক খানাখন্দময়। গাড়ির গতি দশ কিলোমিটারও করা যায় না। প্রতি মুহূর্তে মনে হয়, এই বুঝি কাত হয়ে পড়ে গেল গাড়ি। এই সড়কে চলে শুধু বালির ট্রাক। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা চলার পথে আর কোনো যানবাহন চোখে পড়ল না। দু’পাশে যাদের ঘরবাড়ি, তারা ধূলা আটকাতে সারা বাড়ি পলিথিন দিয়ে মুড়ে দিয়েছেন। গাছের পাতা দেখা যায় না। ধূলার আস্তরণ পড়ে গেছে।
দূর্গাপুর গিয়ে স্থানীয় লোকদের কাছে জানতে চাইলাম, রাস্তার কেন এই করুণ দশা। আর তারাই বা কীভাবে চলাচল করেন ময়মনসিংহ বা নেত্রকোণায়। তারা জানালেন, যান মোটর সাইকেলে। রোগী নিতে বাধ্য হলে যার সাধ্য আছে, তিনি যান অ্যাম্বুলেন্সে করে। রাতে চলে গোটা তিনেক নৈশ কোচ। তারা যেন বন্দী নিজ নিজ এলাকায়। সহজে দূর্গাপুর থেকে বের হবার চেষ্টা করেন না। এখানকার এমপি কী করেন? তিনি দেখেন না? দেখেন না। ঢাকায় থাকেন। কালেভদ্রে আসেন। তবে লোকেরা জানালেন, কয়েক বছর আগে ২৮০ কোটি টাকা ব্যয়ে এই সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল। নিয়ম আছে, ঐ অঙ্কের অর্থ ব্যয় করলে পাঁচ বছরের মধ্যে আর ব্যয় বরাদ্দ দেয়া হয় না। পাঁচ বছর আসতে আর কতো দেরি। আরও দুই বছর। অর্থাৎ ঐ বিপুল অর্থ ব্যয়ে যে সড়ক নির্মাণ করা হয়েছিল, তার সবটাই ছিল ছ্যাপ দিয়ে ল্যাপ দেয়া। পুরোটাই লুটপাট করে খেয়েছে আওয়ামী ঠিকাদাররা। যেভাবে ভবন তৈরিতে তারা রডের বদলে ব্যবহার করে বাঁশ। বর্তমান সরকারের উন্নয়নের গণতন্ত্র আর উন্নয়ন মেলার এই হাল।
http://www.dailysangram.com/post/268012-%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%9F%E0%A6%A8%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A6%A3%E0%A6%A4%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0-%E0%A6%86%E0%A6%B0-%E0%A6%89%E0%A6%A8%E0%A7%8D%E0%A6%A8%E0%A7%9F%E0%A6%A8-%E0%A6%AE%E0%A7%87%E0%A6%B2%E0%A6%BE