২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
শুধুই সাত খুন নয়: সহজ কথা
১৮ জানুয়ারি ২০১৭, বুধবার,
|| আলফাজ আনাম ||
১৮ জানুয়ারি ২০১৭,বুধবার, ০০:০০
 
 
বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ অনেক পুরনো। এসব হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচারের নজির নেই। শেষ পর্যন্ত নি¤œ আদালতে এ ধরনের একটি বিচার সম্পন্ন হলো। বহুল আলোচিত নারায়ণগঞ্জে সাত খুন মামলায় নি¤œ আদালতের রায়ে ২৬ জনের ফাঁসির আদেশ দেয়া হয়েছে। এই রায়ের গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে এলিট ফোর্স র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের আঞ্চলিক কমান্ডার লেফটেন্যান্ট (বরখাস্ত) তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ও আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতা কাউন্সিলর নূর হোসেন ফাঁসির দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। এ ছাড়া র্যাবের আরো ১১ সদস্য একই দণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তিন বছর আগে কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম, আইনজীবী চন্দন সরকারসহ সাতজনকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। এই হত্যার সাথে র্যাব-১১ অধিনায়কসহ কয়েকজন কর্মকর্তার সম্পৃক্ততা ছিল। যারা অর্থের বিনিময়ে নূর হোসেনের হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করেছিল। এই রায়ের পর কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সন্তোষ প্রকাশ করে বলেছেন, এই রায় দ্রুত কার্যকর হোক এবং হাইকোর্টে যেন এই রায় বহাল থাকে। বিচারবহির্ভূত হত্যার দায়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের মৃত্যুদণ্ডের রায় নিঃসন্দেহে একটি নজিরবিহীন ঘটনা। 
মামলার রায়ে দেখা যাচ্ছে অপহরণের সহযোগিতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণ সরানোর অভিযোগেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কয়েকজন সদস্যকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেয়া হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের ঘটনায় যারা দণ্ড পেয়েছেন তাদের বাইরে আরো অনেকের নাম উচ্চারিত হয়েছে। সেসব ব্যক্তির সম্পৃক্ততার প্রশ্নের সমাধান এখনো হয়নি। কিভাবে এই হত্যা মামলার প্রধান আসামি পালিয়ে গিয়েছিলেন। কারা তাকে সহযোগিতা করেছে সেসব বিষয় নিয়ে গণমাধ্যমে খবর এসেছে। যার সাথে প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্বের যোগাযোগের অভিযোগ ছিল। কেন নূর হোসেন র্যাবের মাধ্যমে তার প্রতিপক্ষকে হত্যার পরিকল্পনা করেছিলেন? এ ক্ষেত্রে অভ্যন্তরীণ রাজনীতির বিরোধের দিকগুলো কী ছিল তা উপেক্ষার মতো বিষয় নয়।
নূর হোসেনরা কিভাবে এমন অপরাধীতে পরিণত হন, কারা তাদের তৈরি করেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসন তাদের কিভাবে সমর্থন দিয়ে যায়, এ ঘটনার মধ্য দিয়ে তা ফুটে উঠেছে। সাত খুনের ঘটনার পর শীতলক্ষ্যা নদীতে পেট চিরে ডুবিয়ে দেয়া মানুষগুলোর লাশ ভেসে ওঠার পর নারায়ণগঞ্জের মানুষ কিন্তু স্থানীয় প্রশাসনের বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিলেন। নূর হোসেনরা বছরের পর বছর ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। তিনি ও তার সহযোগীরা ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স পেয়েছিলেন। পরে এসব অস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে। স্থানীয় প্রশাসনে কতটা প্রভাব থাকলে একজন ব্যক্তি এতগুলো অস্ত্রের লাইসেন্স পেতে পারে তা সহজেই অনুমান করা যায়। শুনতে যত খারাপই লাগুক না কেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নূর হোসেনের মতো ব্যক্তিরাই স্থানীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে আছেন। ক্ষমতাসীনদের ছত্রছায়ায় এরা আরো বেশি প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন। নূর হোসেনের উত্থান একইভাবে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত তিনি সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি পদে ছিলেন।
দণ্ডিত র্যাবের কর্মকর্তারা এ ধরনের হত্যাকাণ্ডের পেছনে তাদের জবানবন্দীতে যেসব ব্যাখ্যা দিয়েছেন তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর মাধ্যমে এ ধরনের বাহিনীর সদস্যরা কেন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ঘটান এবং কিভাবে নির্দেশ পালন করেন সেই অসুখের কারণগুলো জানা যাবে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সুশৃঙ্খল একটি বাহিনীর সদস্যরা কেন এ ধরনের অপরাধের সাথে জড়িয়ে পড়ছেন তা নিয়ে নতুন করে ভাবনার সময় এসেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, র্যাব-১১ এর কর্ম এলাকায় এই হত্যাকাণ্ড ছাড়াও আরো অনেক বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যার মধ্যে অনেক হত্যা ও গুমের শিকার হয়েছেন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীরা। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক নেতৃত্ব নানাভাবে ব্যবহার করতে গিয়ে এমন বিপজ্জনক ঘটনাগুলো ঘটছে। 
এই রায়ের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় নতুন পথের সূচনা হতে পারে। মনে রাখতে হবে অপহরণ, হত্যা ও গুমÑ এই তিন ধরনের অপরাধের জন্য আসামিরা দণ্ড পেয়েছেন। কিন্তু এ কথাও সত্য, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলে সব সমস্যার সমাধান হয় না। বহু দেশে মৃতুদণ্ড বিলোপ করা হয়েছে। কিন্তু সেসব দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এমন অপরাধে জড়ায় না। কেন এ ধরনের অপরাধ হচ্ছে তার কারণ আগে সন্ধান করা দরকার। এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা যিনি করেছিলেন, সেই কাউন্সিলর নূর হোসেন যেমন ক্ষমতাসীন দলের স্থানীয় নেতা; তেমনি যাকে টার্গেট করে এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটেছে সেই কাউন্সিলর নজরুল ইসলামও ক্ষমতাসীন দলের নেতা ছিলেন। অপর দিকে, র্যাবের আঞ্চলিক অধিনায়কও ক্ষমতাবলয়ের খুব কাছাকাছি অবস্থান করছেন। ফলে এই মামলার তদন্ত ও বিচার ক্ষমতাসীন দলের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি ও ভাবমর্যাদা রক্ষার একটি বিষয় ছিল।
ক্ষমতাসীন দলের নেতারা দাবি করেছেন, এই বিচারের মাধ্যমে ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়েছে। অভিযোগপত্র দেয়ার ক্ষেত্রে কাউকে ছাড় দেয়া হয়নি। নিঃসন্দেহে পুলিশের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে অপরাধ প্রমাণ করা এবং অভিযোগপত্র দেয়ার কারণে প্রকৃত অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য স্থানীয় পুলিশ প্রশাসন অবশ্যই প্রশংসার দাবিদার। 
তবে এ কথাও সত্যি যে এই মামলার তদন্ত নিয়ে শুরুতে গড়িমসি করা হয়েছে। উচ্চ আদালতের নির্দেশে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। ঘটনার অনেক পরে তাদের আইনের আওতায় আনা হয়েছে। 
এখন দেখার বিষয় হচ্ছে কয়েক বছরে আরো যেসব বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড ও গুমের ঘটনা ঘটেছে সেগুলোর ক্ষেত্রে এই বিচারের পথ ধরে সুষ্ঠু তদন্তের পথে কতটা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায়। গত কয়েক বছরে যারা গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন তাদের বেশির ভাগ বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী। রাজধানীতে বিএনপি ও ছাত্রদলের কমপক্ষে ২১ জন নেতাকর্মী ২০১৪ সালের পর গুমের শিকার হয়েছেন। গুম হওয়ার পরিবারের স্বজনেরা দাবি করছেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। শুধু দেশের দক্ষিণাঞ্চলের ঝিনাইদহ জেলায় ১০ জনের বেশি বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে একই ধরনের অভিযোগ এসেছে। এভাবে বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী যারা নিহত হয়েছেন তাদের পরিবারের সদস্যরাও ন্যায়বিচারের প্রত্যাশী। আইন সবার জন্য সমান। বিচার পাওয়ার অধিকার সবার আছে। 
বিচারবহির্ভূত হত্যা ও গুমের মতো অপরাধের কারণে দেশ-বিদেশে সরকার ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে। সরকারের বিরুদ্ধে বড় অভিযোগ, বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, ভিন্ন মতের লোকজনকে হত্যা ও কারারুদ্ধ করা এখন সাধারণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের নামে কার্যত নির্মূলের রাজনীতি শুরু হয়েছে। বাক ও ব্যক্তিস্বাধীনতা সঙ্কুচিত হয়ে পড়ছে। সম্প্রতি মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক মানবাধিকার রিপোর্টে বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতির এমন চিত্র তুলে ধরেছে। যদিও ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। ভিন্নমতাবলম্বী ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে দমনমূলক ব্যবস্থাকে নিছক আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা হিসেবে হাজির করা হয়েছে।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বার্ষিক রিপোর্টে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে নির্বিচারে গ্রেফতার গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ রয়েছে। তবে এই অবমাননাকর চর্চার কোনো বিচার নেই। দেশে ক্রমবর্ধমান নিরাপত্তা সমস্যায় জনগণের সুরক্ষা নিশ্চিত করা বাংলাদেশ সরকারের জন্য জরুরি; তবে তা করতে হবে মানবাধিকার সমুন্নত রেখেই। নিপীড়নমূলক পরিস্থিতির মধ্যে কর্তৃত্বপরায়ণ ও লোকরঞ্জনবাদী নতুন প্রজন্ম মানবাধিকার সংরক্ষণের ধারণা বদলে দিতে চাইছে বলে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে বাংলাদেশে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করছে উন্নয়ন ও আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যার নামে মানবাধিকার ও বাক-ব্যক্তিস্বাধীনতা হরণের দিকটি আড়ালে চলে গেছে। ফলে ভিন্ন মতাদর্শী লোকজনকে হত্যা, গুম ও পঙ্গু করা হলেও তা নিয়ে আলোচনা সামনে আসছে না। 
নারায়ণগঞ্জে সাত খুনের মামলার রায়ের মাধ্যমে নতুন আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছে যে গুম, অপহরণ বা বিচারবহির্ভূত হত্যার বিষয়গুলো সামনে চলে আসবে। কিন্তু তা নির্ভর করবে সরকারের আন্তরিকতার ওপর। ক্ষমতাসীন দলের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত মামলার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হবে কিন্তু বিরোধী রাজনীতির সাথে জড়িতরা বিচার পাবে না, তা নিশ্চয়ই আইনের শাসনের কথা হতে পারে না। মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারকে দেশ-বিদেশে যেভাবে সমালোচনার মুখে পড়তে হচ্ছে, তা থেকে উত্তরণের একটাই পথÑ আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগী হওয়া। ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। 
ক্ষমতাসীন দলের রাজনৈতিক নেতৃত্বকে উপলব্ধি করতে হবে বিরোধী দলের নেতাকর্মীদের গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার অনুমোদন দেয়া হলে তা একসময় নিজেদের দিকে ফিরে আসবে। বাস্তবে নারায়ণগঞ্জে এ ঘটনা ঘটেছে। অপরাধ কিংবা বিরোধীদের দমনে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার পথ বেছে নেয়া হলে তার প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। কেউ যদি অপরাধ করে অবশ্যই তাকে শাস্তি পেতে হবে। কিন্তু তা হতে হবে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়ায়। কিন্তু বিচার ছাড়া একজন মানুষকে কেউ শাস্তি দিতে পারে না। সমাজ ও রাষ্ট্রে এমন পরিস্থিতি বিরাজ করলে আইনের শাসন ভেঙে পড়ে। দেশে একধরনের অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। নূর হোসেন এবং তার গডফাদাররা নারায়ণগঞ্জে এমন অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন সাত খুন মামলার রায়ের মাধ্যমে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়েছে এবং অপরাধের সাথে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না বলে তিনি সতর্ক করে দেন। আমরা বলব, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় এই রায় আশাবাদ সৃষ্টি করেছে। এ ধরনের আরো যেসব হত্যাকাণ্ড ঘটেছে সেগুলোর বিচার ও তদন্ত শুরু হলে এই আশাবাদে সাধারণ মানুষ আস্থা পাবে। এখন সরকারের উচিত হবে ইমেজ বাড়ানোর জন্য কোনো একটি মামলার সুষ্ঠু তদন্ত বা বিচার নয়, সামগ্রিকভাবে সব বিচারবহির্ভূত হত্যার সুষ্ঠু তদন্তের নির্দেশ দেয়া। 
alfazanambd@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188191