১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
তারেক, আরিফ, রানার যত অপকর্ম
১৭ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
নারায়ণগঞ্জে ৭ খুনের মামলায় র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক লে. কর্নেল তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, মেজর আরিফ হোসেন এবং লে. কমান্ডার মাসুদ রানার বিরুদ্ধে ফাঁসির রায় দিয়েছেন আদালত। গতকাল রায়ের কথা আদালতের বাইরে অপেক্ষমাণ সাধারণ মানুষের কাছে পেঁৗছলে তারা উৎফুল্ল হয়ে ওঠেন। সে সময় তাদের মুখে মুখে ছিল এই তিন কর্মকর্তার বিভিন্ন অপকর্মের কথা। 
 
সাত খুনের ঘটনায় তারা গ্রেফতার হওয়ার পর ভুক্তভোগী পরিবারগুলো মুখ খুলতে শুরু করে। এই তিন কর্মকর্তা র্যাব-১১তে যোগদানের পর থেকেই শীতলক্ষ্যা নদীতে পাওয়া যায় হাত-পা বাঁধা অজ্ঞাতপরিচয়ের অসংখ্য লাশ। যা সর্বশেষ ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল ৭ জনকে হত্যার মধ্য দিয়ে শেষ হয়। 
 
২০১৩ সালের ৩ নভেম্বর র্যাব-১১-এর সিও হিসেবে তারেক সাঈদ, একই বছরের ১ ফেব্রুয়ারি কোম্পানি কমান্ডার হিসেবে মেজর আরিফ হোসেন এবং ২ জুলাই এমএম রানা র্যাব-১১-এর সিপিসি-১-এর অধিনায়ক হিসেবে যোগদানের পর নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন এলাকা থেকে র্যাব পরিচয়ে সাধারণ মানুষকে তুলে নেওয়ার ঘটনা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে যায়। তাদের কাউকে হাতের আঙুল কেটে দিয়ে, কাউকে
 
পায়ে গুলি করে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। আবার ফিরে আসেনি অনেকেই। 
 
এখানেই শেষ নয়, র্যাবের প্রভাব খাটিয়ে ওই সময় সিদ্ধিরগঞ্জ পাওয়ার স্টেশনের ভেতরে বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ করা দুটি ফ্ল্যাট নিজেদের ব্যবহারের জন্য দখলে রেখেছিলেন আরিফ ও রানা। সমকালের অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে লোমহর্ষক এসব ঘটনা।
 
মুদি দোকানিকে বাড়ি থেকে ধরে নিয়ে দুই হাতের ৬ আঙুল কর্তন ও শরীরে অগি্নসংযোগ 
 
নারায়ণগঞ্জের বন্দর উপজেলার সাবদি এলাকা থেকে ২০১৩ সালের ৩ ডিসেম্বর রাতে মানিক নামে এক মুদি দোকানিকে বাসা থেকে তুলে নিয়ে যায় পোশাক পরা র্যাব সদস্যরা। র্যাব-১১ লেখা ২টি মাইক্রোবাসে করে বন্দরের সাবদির বাড়ি থেকে তাকে বাবা-মার সামনে থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ২টি মাইক্রোবাসের একটিতে পোশাকধারী র্যাব সদস্যরা এবং অপর মাইক্রোবাসে সাদা পোশাকধারী লোকজন ছিল। মানিকের বাবা হাজি আমিন উদ্দিন জানান, র্যাব সদস্যরা প্রথমে তার বড় ছেলে যুবদল নেতা মহিউদ্দিন শিশিরের খোঁজ করে। তাকে না পেয়ে ছোট ছেলে মানিককে ধরে নিয়ে যায়। ওই সময় মানিককে ধরে নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তারা জানায়, তার বিরুদ্ধে বোমাবাজির অভিযোগ আছে। পরদিন থানায় যোগাযোগ করতে বলে তারা মানিককে নিয়ে চলে যায়। 
 
ঘটনার শিকার মানিক জানান, র্যাবের লোকজন তাকে আটক করে শহরের পুরাতন কারাগারে অবস্থিত র্যাব অফিসে নিয়ে যায়। পরদিন দুপুরে র্যাবের লোকজন বোমা কোথায় আছে জানতে চায়। তিনি বোমার কোনো হদিস দিতে না পারায় র্যাবের লোকজন তরকারি কাটার দা দিয়ে তার দুই হাতের ছয়টি আঙুল কেটে ফেলে। এরপর রাত সাড়ে ১১টার দিকে র্যাবের লোকজন একটি মাইক্রোবাসে করে তার চোখ বেঁধে বন্দর উপজেলায় ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের লাঙ্গলবন্দ ব্রিজের ওপর নিয়ে যায়। মাইক্রোবাস থেকে নামিয়ে তার শরীরে পেট্রোল ঢেলে আগুন লাগিয়ে দিয়ে তারা মাইক্রোবাস নিয়ে চলে আসে। ওই সময় আগুনের উত্তাপে মানিক সঙ্গে সঙ্গেই ব্রিজ থেকে ব্রহ্মপুত্র নদে লাফিয়ে পড়ায় তিনি তেমন দগ্ধ হননি। ওই সময় নদীতে থাকা জেলেরা তাকে উদ্ধার করে লাঙ্গলবন্দ বাজারে নিয়ে যান। পরে তাকে স্থানীয় একটি ক্লিনিকে নিয়ে অপারেশন করানো হয়। আগুনে মানিকের কনুই থেকে কব্জি পর্যন্ত ঝলসে যায়। জানতে চাইলে মানিকের বড় ভাই মহিউদ্দিন শিশির বলেন, এ ঘটনায় এখনও তারা র্যাবের কারও বিরুদ্ধে কোনো মামলা করেননি। কারণ, র্যাব একটি নিয়মিত বাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে মামলা করে পেরে ওঠা অসম্ভব। 
 
ব্যবসায়ী তাজুল ইসলাম হত্যাকাণ্ড 
 
বন্দর উপজেলার জাঙ্গাল এলাকার বাসিন্দা তাজুল ইসলাম। তিনি পোলট্রি ব্যবসায়ী এবং সোনারগাঁ চৌরাস্তায় রয়েল স্পেশালাইজড নামে একটি ক্লিনিকের মালিক ছিলেন। এ ক্লিনিকে তাজুল তার ফুফাতো ভাই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালের (পিজি) চিকিৎসক ডা. কামরুজ্জামানকে প্র্যাকটিস করতে দেন। ডা. কামরুজ্জামান ক্লিনিকটিকে হাতিয়ে নিতে র্যাবের সহায়তায় ষড়যন্ত্র শুরু করেন। ২০১৩ সালের ২০ নভেম্বর তাজুল ইসলামকে র্যাব-১১-এর সদস্যরা তুলে নিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জে র্যাব-১১-এর প্রধান কার্যালয়ে নিয়ে যায়। সেখানে র্যাব-১১-এর তৎকালীন সিও লে. কর্নেল তারেক সাঈদ এবং মেজর আরিফ তার কাছ থেকে ৩টি সাদা স্ট্যাম্পে এবং ৩৫ লাখ ৩৫ হাজার ২০ টাকা লেখা একটি চেকে স্বাক্ষর করিয়ে ছেড়ে দেন। ছাড়া পেয়ে তাজুল ইসলাম ২১ নভেম্বর এ ব্যাপারে বন্দর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি এবং পরদিন ডা. কামরুজ্জামান, ফুপাত ভাই বদরুজ্জামান ও তাদের সহযোগী হাতেমের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এ কারণে ওই বছরের ১৭ ডিসেম্বর বিকেলে প্রকাশ্যে সোনারগাঁয়ের ললাটি এলাকা থেকে বন্ধু কবীরের সামনে থেকে তাকে র্যাব পরিচয়ে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। ওই সময় র্যাব সদস্যদের সঙ্গে ফুফাত ভাই বদরুজ্জামান ছিলেন। ১৬ দিন পর তাজুলের হাত-পা বাঁধা ইটবাঁধা লাশ মেঘনা নদী থেকে উদ্ধার করা হয়। তাজুলের ভাই মাজহারুল বলেন, অপহরণের পর ৭ জনকে যেভাবে হত্যার পর বেঁধে লাশ ফেলা হয়েছিল তাজুলকেও একইভাবে হত্যার পর লাশ ফেলে দেওয়া হয়। তাজুলের পেটও চেরা ছিল এবং লাশের সঙ্গে ইট বাঁধা ছিল।
 
ফতুল্লা থানা ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মুন্নাকে তুলে নিয়ে দু\'পায়ে গুলি
 
২০১৪ সালের ২০ জানুয়ারি বিকেলে ফতুল্লা থানার পোস্ট অফিস এলাকা থেকে থানা ছাত্রলীগের ক্রীড়া সম্পাদক মো, মুন্নাকে র্যাব পরিচয়ে মাইক্রোবাসে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে গভীর রাতে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে তার ডান পায়ে দুটি এবং বাম পায়ে একটি গুলি করা হলে তিনি অজ্ঞান হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। পরদিন ভোরে মুন্সীগঞ্জের মুক্তারপুর ব্রিজের নিচে পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয় লোকজন তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নারায়ণগঞ্জ জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখান থেকে উন্নত চিকিৎসার জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। তবে কেন, কী কারণে তাকে তুলে নিয়ে দু\'পায়ে গুলি করা হলো তা আজও অজানা রয়ে গেছে। 
 
আ\'লীগ নেতা ইসমাইলকে অপহরণ, খোঁজ মেলেনি এখনও
 
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থেকে ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগ নেতা ইসমাইল হোসেনকে র্যাব পরিচয়ে অপহরণ করা হয় ২০১৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি। আজও তার খোঁজ মেলেনি। ঘটনার জন্য র্যাবকে দায়ী করেছেন পরিবারের সদস্যরা। তাদের দাবি, র্যাব-১১-এর সিও তারেক সাঈদ মোহাম্মদ ঘটনার পর ইসমাইলকে মুক্ত করতে ২ কোটি টাকা চেয়েছিল। অপহৃতের স্ত্রী জ্যোৎসনা বেগম এক কোটি টাকা জোগাড় করে র্যাবের তৎকালীন সিও তারেক সাঈদ মোহাম্মদের কাছে গেলেও তার মন গলেনি। উল্টো তাদের সঙ্গে তিনি রূঢ় আচরণ করে বলেছেন, এক টাকা কম হলেও হবে না। পরে মেজর আরিফের সঙ্গে দেখা করলে তিনিও একই কথা বলেন। ইসমাইলের খোঁজ দাবি করে পরিবার ও এলাকাবাসী মানববন্ধনসহ অনেক কর্মসূচি পালন করেছে। তবুও কিছুতেই কিছু হয়নি। ৭ খুন মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনের শ্যালক ছাত্রলীগ নেতা নূর আলমের ইন্ধনেই এ অপহরণের ঘটনা ঘটেছে বলে ইসমাইলের পরিবার থেকে দাবি করা হয়। 
 
র্যাব পরিচয়ে আরও যাদের তুলে নেওয়ার পর খোঁজ মেলেনি
 
র্যাব পরিচয়ে তুলে নেওয়ার পর নারায়ণগঞ্জের অনেকের খোঁজ এখনও মেলেনি। তাদের মধ্যে ২০১৪ সালের ২২ জানুয়ারি শহরের দেওভোগ তাঁতীপাড়া এলাকার মেজর, ২৯ জানুয়ারি ফতুল্লার নূরার এখনও কোনো খোঁজ মেলেনি।
- See more at: http://bangla.samakal.net/2017/01/17/263551#sthash.1fFuSn37.dpuf