১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
রক্ত হিম করা সেই সাত খুন
১৭ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
রক্ত হিম করা যে খুন দেশের গণ্ডি ছাড়িয়ে সারা বিশ্বে তুলেছিল আলোচনার ঝড়। নারায়ণগঞ্জের সেই ভয়ঙ্কর সেভেন মার্ডারের রায় হয়েছে গতকাল সোমবার। প্রায় আড়াই বছর পর আলোর মুখ দেখল মামলাটি। আদালতের করা নাড়তে নাড়তে নিহতদের স্বজনেরা যখন অনেকটা ক্লান্ত, তখনই সেই ইতিহাস সৃষ্টি করা রায়। বিচারের হাত থেকে রেহাই পায়নি অপরাধীদের কেউই। রায়ে চাকরিচ্যুত লেফটেন্যান্ট কর্নেল তারেক সাঈদসহ ২৬ জনের ফাঁসি ও ৯ জনের বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেয়া হয়েছে। 
অভিযুক্তদের মধ্যে ১২ জন এখনো পলাতক রয়েছেন। পলাতকদের মধ্যে আছেন র্যাবের আট সদস্য। এই রায় ঘোষণার পরে নিহতদের পরিবারের সদস্যরা সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। নারায়ণগঞ্জ শহরজুড়ে হয়েছে আনন্দ মিছিল। দল-মত নির্বিশেষে সবাই রায়ে সন্তুষ্টির পাশাপাশি দ্রুত রায় কার্যকরের দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে আদালতে উপস্থিত সাজাপ্রাপ্তদের রায় শোনার পরও হাসিমুখ ও নিরুদ্বিগ্ন দেখে উপস্থিতদের কপালে চিন্তার ছাপ পড়েছে। উল্লেখ্য, ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জ আদালত থেকে ফেরার পথে র্যাবের কিছু সদস্য ওই সাতজনকে অপহরণ করে নির্মমভাবে খুন করার পরে লাশ শীতলক্ষ্যায় ডুবিয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনার পর বহু চড়াই-উতরাই পেরিয়ে এ রায় হলো।
যেভাবে ঘটনা ঘটেছিল
আড়াই বছর আগে ঘটনার দিন নারায়ণগঞ্জ আদালতে মামলায় হাজিরা দিয়ে সিদ্ধিরগঞ্জের বাসায় ফেরার পথে অপহৃত হন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের তৎকালীন প্যানেল মেয়র ও ২ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ইসলাম এবং তার সঙ্গী তাজুল, স্বপন, লিটন ও গাড়িচালক জাহাঙ্গীর। ওই দিন বেলা আড়াইটার দিকে একটি মামলায় হাজিরা শেষে নজরুল তার প্রাইভেটকার এক্স করোলা (ঢাকা মেট্রো ব-১৪-৯১৩৬) যোগে বাসায় যাচ্ছিলেন। শিবু মার্কেট এলাকায় তাদের গাড়ির গতি রোধ করে তাদেরকে অপহরণ করা হয়। প্যানেল মেয়রের পেছনের গাড়িতেই ছিলেন নারায়ণগঞ্জের সিনিয়র আইনজীবী অ্যাডভোকেট চন্দন সরকার। তিনি ও তার গাড়ির ড্রাইভার এ ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হওয়ায় তাদেরও অপহরণ করা হয়। বিকেল ৩টার দিকে পরিবারের সদস্যরা নজরুলের সাথে যোগাযোগ করে তার নম্বর বন্ধ পেলে বিষয়টি জানাজানি হয়। তখন থেকেই তারা খোঁজাখুঁজি শুরু করেন, কিন্তু না পেয়ে তারা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দ্বারস্থ হন। ঘটনার দিনই ওই এলাকায় রাস্তা অবরোধ করে এ ঘটনার প্রতিবাদ জানানো হয় এবং নিখোঁজ প্যানেল মেয়র ও আইনজীবীসহ সবাইকে অক্ষত অবস্থায় ফেরত দেয়ার দাবি করা হয়। ঘটনার রাতেই গাজীপুরের শালবন থেকে উদ্ধার করা হয় নজরুলের গাড়িটি। দু’দিন পরে রাজধানীর নিকেতন এলাকা থেকে উদ্ধার হয় চন্দন সরকারের গাড়িটি। বিষয়টি নিয়ে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর শীর্ষ পর্যায়ে তোলপাড় শুরু হয়। 
৪ দিন পরে লাশ উদ্ধার
স্থানটি নারায়ণগঞ্জের বন্দর থানার অন্তর্ভুক্ত। স্থানের নাম মদনগঞ্জের শান্তিনগর ও চর ধলেশ্বরী। শীতলক্ষ্যা নদীর শেষপ্রান্ত মেঘনার মোহনা। যেখানে জোয়ার-ভাটা দেখে স্থানীয়রা অভ্যস্ত। শীতলক্ষ্যার পানি গিয়ে মিলিত হয় মেঘনায়। পানির ঘূর্ণি থাকে দিনভর। এ স্থানেই ৩০ এপ্রিল দুপুরের পর একটি লাশ পানিতে ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। ওই লাশটি দেখে তারা পুলিশে খবর দেন। পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশটি উদ্ধারের সময় সেখানে কচুরিপানার মধ্যে আরো কয়েকটি লাশ ভাসতে দেখেন স্থানীয়রা। পুলিশকে ওই খবর জানানো হলে পুলিশ সেই লাশগুলোও উদ্ধার করে। লাশগুলোর হাত-পা বাঁধা, মুখ পলিথিনের ব্যাগ দিয়ে ঢাকা। পেছনে মোড়ানো অবস্থায় বাধা ছিল হাত। লাশগুলো বস্তাবন্দী করে নদীতে ফেলে দেয়া হয়। প্রতিটি বস্তায় লাশের সাথে বাঁধা ছিল ১৬ থেকে ২৪টি ইট। প্রথম লাশটি উদ্ধারের পর ওই এলাকা থেকেই কচুরিপানার ভেতরে পাওয়া যায় বাকি পাঁচটি লাশ। এক কিলোমিটারের ভেতর থেকে লাশ ছয়টি উদ্ধার করা হয়। পরে বাকি লাশটি উদ্ধার হয় ১ মে। ধারালো অস্ত্র দিয়ে লাশগুলো পেট কাটা ছিল। কয়েক দিন লাশগুলো পানিতে থাকায় তা বিকৃত হয়ে গিয়েছিল। পরে আত্মীয়স্বজন পরনের কাপড়, হাতের ঘড়ি-আংটি ইত্যাদি দেখে লাশগুলো শনাক্ত করেন।
মামলা দায়ের
ঘটনার পর থেকেই নিহত নজরুলের পরিবারের পক্ষ থেকে এ ঘটনায় র্যাবের সংশ্লিষ্টতার দাবি করা হয়। ঘটনার পর তারা র্যাবের অনেকের সাথে যোগাযোগ করেও কোনো ফল পাননি। অপহরণ ঘটনার পরই নাসিকের ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর সিদ্ধিরগঞ্জ আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি নূর হোসেন, থানা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইয়াসিন, নজরুলের চাচাশ্বশুর হাসমত আলী হাসু, ইকবাল হোসেন ও আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ফতুল্লা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। র্যাবের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠার পরে র্যাবের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে তদন্ত শুরু হয়। ওই তদন্তে র্যাব কর্মকর্তা ও কিছু সদস্যের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ মেলে। যে কারণে র্যাবের কয়েকজন সদস্যকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়। সেই সূত্র ধরেই ২০১৪ সালের ৬ মে থেকে র্যাব ১১-এর সাবেক সিও লে. কর্নেল তারেক মুহাম্মদ সাঈদ, মেজর আরিফ এবং লে. কমান্ডার রানাকে অন্তরীণ করা হয়। পরে তাদেরকে গ্রেফতার করে বিচারের মুখোমুখি করা হয়।
ঘটনার পর তদন্ত ও অভিযুক্তদের গ্রেফতারে দীর্ঘসূত্রতার কারণে হাইকোর্টের পক্ষ থেকে তদন্তের নির্দেশ দেয়া হয়। হাইকোর্টের নির্দেশে গঠিত তদন্ত কমিটির কাছে গণশুনানিতে জালালউদ্দিন নামের এক ব্যক্তি নিজেকে ওই ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে সাক্ষ্য প্রদান শেষে সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ঘটনার সময় তিনি ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ লিংক রোডের লামাপাড়া এলাকায় ময়লার স্তূপের পাশে বসে প্রস্রাব করছিলেন। সেখানে র্যাবের একটি গাড়ি ও একটি কালো রঙের ১২ থেকে ১৩ সিটের মাইক্রোবাস আগ থেকেই অবস্থান করছিল। ওই সময় তারা দু’টি প্রাইভেটকার আটক করে। সাদা রঙের একটি প্রাইভেটকারে ছিলেন প্যানেল মেয়র নজরুল ইসলামসহ পাঁচজন এবং নীল রঙের প্রাইভেটকারে ছিলেন আইনজীবী চন্দন সরকার ও তার গাড়িচালক। র্যাবের কর্মকর্তারা ওই প্রাইভেটকার দু’টি থেকে তাদের নামিয়ে কালো রঙের ওই মাইক্রোবাসে উঠিয়ে ¯েপ্র ছিটিয়ে দিলে এক মিনিটের মধ্যেই তারা জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন। পরে কালো রঙের মাইক্রোবাসটি ফতুল্লার খান সাহেব ওসমান আলী জাতীয় স্টেডিয়াম সংলগ্ন তক্কার মাঠের বিপরীতে লামাপাড়া মার্কাজ মসজিদের সামনের সড়ক দিয়ে চলে যায়। ঘটনার সময় লিংক রোডের অপরপ্রান্তে একটি প্রাইভেটকারে ছিলেন নূর হোসেন।
ঘটনার পর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম সাংবাদিকদের বলেছিলেন, তার স্বামীকে যারা হত্যা করেছে তাদেরকে শাস্তি দিতে হবে। র্যাব ১১-এর জড়িত সব কর্মকর্তার শাস্তির দাবি জানিয়ে সেলিনা ইসলাম বলেছিলেন, র্যাব ১১-এর সিওসহ তিন কর্মকর্তা শুধু জড়িতই নন, র্যাব ১১-এর আরো অনেক কর্মকর্তা জড়িত। কারা লিংক রোড থেকে আমার স্বামীসহ সাতজনকে তুলে এনেছিল, শুধু কি তিনজনেই সাতজনকে তুলে এনেছিল? নিশ্চয়ই সাতজনের ডাবল ছিল। তারা কারা? তারা এখন কোথায়? তাদের সবাইকে শাস্তি পেতে হবে।’
নিহতের নজরুল ইসলামের বড় ভাই নুরুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, র্যাব ১১-এর সাবেক সিও লে. কর্নেল তারেক, মেজর আরিফ, লে. কমান্ডার রানা, নূর হোসেনসহ আরো অনেকে এই ঘটনায় জড়িত। তাদের সবাইকে বিচারের মুখোমুখি করতে হবে।’ 
নজরুলের শ্বশুর শহীদ চেয়ারম্যান বলেন, কারা নজরুলসহ সাতজনকে হত্যা করিয়েছে, কারা করেছে তা তো আমরা বলছি। এ ঘটনায় মূল যারা সংশ্লিষ্ট, তা এখন সবার কাছেই পরিষ্কার। আমার জামাই মানে তো আমার সন্তান। আমার সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে। আমি সেখানে জড়িত নয়, এমন নিরীহ মানুষকে কেন ফাঁসাতে যাবো? বরং সাহস করে সত্য বলেছি। চাঞ্চল্যকর সেই মামলারই রায় হয়েছে গতকাল সোমবার।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188007