১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
কর্মসূচিতে যাচ্ছে শিক্ষক সংগঠনগুলো: নববর্ষ ভাতা ও ইনক্রিমেন্ট না পাওয়ায় এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরা ক্ষুব্ধ; দাবি মানতে নারাজ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা
১৭ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
বর্তমান সরকার সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য উৎসব ভাতা হিসেবে ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ চালু করেছে। চলতি অর্থবছর (২০১৬-১৭) থেকে এটি চালু হয়েছে। সর্বশেষ জাতীয় বেতন স্কেলে এটির সুপারিশ করা হলে সরকার তাতে সম্মতি জানায় এবং চলতি অর্থবছর থেকে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। আগামী তিন মাসের মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা আরেকটি ‘বৈশাখী ভাতা’ বা ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ পেতে যাচ্ছেন। এ ভাতাটি দীর্ঘ দিন থেকে চালু থাকা ঈদুল ফিতর এবং ঈদুল আজহার উৎসব ভাতার অতিরিক্ত। 
অপর দিকে ড. ফরাস উদ্দিনের নেতৃত্বে সর্বশেষ জাতীয় পেকমিশনের সুপারিশমতে আগামীতে সরকার আর কোনো পেকমিশন গঠন করবে না। দেশের অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির সাথে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এখন থেকে প্রতি অর্থবছরে ৫ শতাংশ হারে বেতনের প্রবৃদ্ধি হবে। এটি অটো বা স্বয়ংক্রিয়ভাবে প্রতি অর্থবছরের শুরুতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পেয়ে যাবেন। একটি পরিসংখ্যানের মত হচ্ছে, সারা দেশে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা হচ্ছে সাড়ে ১৪ লাখের বেশি। আর স্বায়ত্ত শাসিত এবং আধা স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী মিলে এ সংখ্যা হচ্ছে ২১ লাখের বেশি। 
সরকারের নীতিনির্ধারকদের ভাষায় এ দু’টি ‘যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের’ সুফল সরকারি, স্বায়ত্ত শাসিত এবং আধা স্বায়ত্ত শাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পাচ্ছেন চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত (বেতনের সরকারি অংশ বা মান্থলি পেঅর্ডার) প্রায় সাড়ে পাঁচ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীরা এটি (‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ আর ‘৫% ইনক্রিমেন্ট’) পাচ্ছেন না। যদিও সরকারি স্কুল-কলেজ-মাদরাসার শিক্ষকরা ‘৫% ইনক্রিমেন্ট’ এবং ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ পাচ্ছেন। এ নিয়ে গত কয়েক মাস থেকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মধ্যে চরম হতাশা আর চাপা ক্ষোভ বিরাজ করছে। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলোর শিক্ষক নেতারা দাবি করেছেন, যে দিন থেকে সরকারের ওই দু’টি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হয়েছে সে দিন থেকে তারাও এ সুবিধা প্রাপ্য হবেন। নীতিগতভাবে এ দু’টি সুবিধা সরকার বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদেরও দেবেন এবং বাস্তবায়ন করবেন এটাই প্রত্যাশা তাদের। 
তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কোনো কর্মকর্তাই এ ব্যাপারে মুখ খুলতে নারাজ। নাম প্রকাশ না করার শর্তে মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব পর্যায়ের দু’জন কর্মকর্তা নয়া দিগন্তের সাথে আলাপচারিতায় বলেছেন, ‘বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীরা তো সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী নন। তারা এ সুবিধা পেতে পারেন না। এ ব্যাপারে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও কোনো অনুমোদন বা বাজেট বরাদ্দ নেই।’ শুধু তাই নয়, তারা আরো জানান, এমপিওভুক্তির বিষয়টি এবং নতুন ও বাড়তি এ সুবিধা বেসরকারি শিক্ষকদের দিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের জোর আপত্তি রয়েছে। এ নিয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়ে দাবি বা প্রস্তাবনা জানাতে গেলেই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মসূচিতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের বরাদ্দ নিয়ে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া পড়তে পারে। 
একজন অতিরিক্ত সচিব আরো জানান, নতুন করে ‘এমপিওর নীতিমালা’ প্রণীত হচ্ছে। তাতে বিগত দিনের এমপিওভুক্ত প্রতিষ্ঠানগুলো নিয়ে নতুন করে সিদ্ধান্ত নেয়া হতে পারে। বিদ্যমান নীতিমালাটিকে আরো সংশোধন করা হবে এবং যাচাই-বাছাইয়ের ক্ষেত্রে নতুন নির্দেশনা যুক্ত করা হবে। এর ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান বাদও যাবে। 
এদিকে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠনগুলো ওই দাবিতে সোচ্চার হচ্ছে। এখন পর্যন্ত বক্তৃতা-বিবৃতি আর সমাবেশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে তারা। আগামী দিনগুলো এ দু’টি দাবিসহ পুরো শিক্ষাব্যবস্থা বিশেষ করে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষা জাতীয়করণের দাবিতে রাজধানীতে বড় ধরনের মহাসমাবেশের কর্মসূচি রয়েছে। সরকার সমর্থক ও প্রধান বিরোধীদলগুলোর সমর্থক শিক্ষক সংগঠনগুলোও একই ধরনের কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। 
বর্তমান সরকার সমর্থক বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি (বকর-কাসেম) ওই সব দাবিসহ শিক্ষাব্যবস্থা জাতীয়করণ, শিক্ষানীতি-২০১০’র পূর্ণ বাস্তবায়নের দাবিতে আগামী ২৫ জানুয়ারি ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় সমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া আজ ময়মনসিংহে বিভাগীয় শিক্ষক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। একই ধরনের (বিভাগীয়) সমাবেশ ১৯ জানুয়ারি চট্টগ্রাম ও খুলনায়, ২২ জানুয়ারি রংপুর ও ঢাকা বিভাগে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। ঢাকা বিভাগের সমাবেশ হবে গোপালগঞ্জে। 
‘৫% ইনক্রিমেন্ট’ এবং ‘বাংলা নববর্ষ ভাতা’ সম্পর্কে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের অভিমত ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি সহসভাপতি রঞ্জিত কুমার সাহা গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বেসরকারি শিক্ষকরা সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী না হলে তাদের (শিক্ষকদের) মূল বেতনের শতভাগ কেন দেয়া হচ্ছে? কেন যতবারই জাতীয় বেতন স্কেল ঘোষণা করা হচ্ছে ততবারই বেসরকারি শিক্ষকদেরও বেতন-ভাতা আনুপাতিক হারে বৃদ্ধি করা হচ্ছে। রঞ্জিত কুমার সাহা আরো বলেন, এসব কর্মকর্তারা যা বলছেন সঠিক বলেননি। কোনো কোনো কর্মকর্তা এ নিয়ে ধূম্রজাল সৃষ্টি করতে পারেন। 
সরকার সমর্থক জাতীয় শিক্ষক-কর্মচারী ফ্রন্টের মুখ্য সমন্বয়কারী ও প্রবীণ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ সরকারি শিক্ষকদের অনুরূপ ৫% ইনক্রিমেন্ট ও বৈশাখী ভাতা এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের প্রদানের জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, শিক্ষকদের অসন্তুষ্ট রেখে মানসম্পন্ন ও গুণগত শিক্ষা পাওয়া যাবে না। সমযোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার সরকারি শিক্ষকেরা যে সুবিধা পান, তা বেসরকারি শিক্ষকদেরও পেতে হবে। আমরা চাই এ ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রীর সুদৃষ্টি। আমাদের বিশ্বাস আগামী নির্বাচনের আগে শিক্ষকদের অবাস্তায়িত অনেক দাবি ও চাওয়া সরকার পূরণ করবে। সরকারি কর্মকর্তাদের দৃষ্টিভঙ্গি সম্পর্কে প্রবীণ এ শিক্ষক নেতা অধ্যক্ষ কাজী ফারুক আহমেদ বলেন, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করতে পেকমিশন ছয় মাস পরে পর্যালোচনা সাপেক্ষে বাস্তবায়নের যে সুপারিশ করা হয়েছিল, তার পুরোটাই শিক্ষকেরা বকেয়াসহ আদায় করেছে। একই সাথে তিনি যোগ্যতার শর্ত পূরণকারী শিক্ষক-কর্মচারীদের অবিলম্বে এমপিওর আওতায় আনার দাবি জানান।
বর্তমান সরকারের নীতি-আদর্শ ও কর্মকাণ্ডের নিঃশর্ত সমর্থক স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের মহাসচিব অধ্যক্ষ মো: শাহজাহান আলম সাজু নয়া দিগন্তকে বলেন, দেশের শিক্ষাব্যবস্থার ৯৮ শতাংশ পরিচালন-বাস্তবায়ন ও নিয়ন্ত্রণ করছেন বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকেরা। শিক্ষাব্যবস্থায় মাত্র ২ শতাংশ পরিচালনা করে সরকারের সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করবেন সরকারি স্কুল কলেজের শিক্ষরা তা কখনোই গ্রহণযোগ্য নয়। 
সরকার নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্টের সরকার মনোনীত সদস্যসচিব অধ্যক্ষ মো: শাহজাহান আলম সাজু আরো বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে মানসম্পন্ন ও বিশ্বমানের শিক্ষাব্যবস্থার যে স্লোগান দেয়া হচ্ছে তার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন পুরো শিক্ষাব্যবস্থাকে জাতীয়করণ করাই জরুরি। বেসরকারি শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে বারবার সরকারের কাছে ধরনা দিতে চান না শিক্ষকেরা। শিক্ষকদের কাজ হচ্ছে শ্রেণী কক্ষে পাঠদান। কিন্তু জীবিকা ও বেঁচে থাকার স্বার্থে বারবার রাজপথে নামতে হচ্ছে শিক্ষকদের। 
অধ্যক্ষ শাহজাহান সাজু জানান, শিক্ষকদের দাবি-দাওয়া নিয়ে জেলায় পুরো ডিসেম্বর মাস স্বাধীনতা শিক্ষক পরিষদের সমাবেশ হয়েছে। আগামী মার্চ মাসে ঢাকায় বড় ধরনের সমাবেশ অনুষ্ঠিত হবে। 
বাংলাদেশ অধ্যক্ষ পরিষদ-বিপিসির সভাপতি অধ্যক্ষ মাযহারুল হান্নান গতকাল নয়া দিগন্তকে বলেন, বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের বিশেষ করে এমপিওভুক্ত শিক্ষক-কর্মচারীদের জাতীয় বেতন স্কেলে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। নীতিগতভাবেই বেতনস্কেলে সব নির্দেশনা ও সুবিধা এমপিওভুক্ত শিক্ষকেরাও পাবেন। সরকারের কাছে আমাদের দাবি অবিলম্বে এ দু’টি সুবিধা বকেয়াসহ বাস্তবায়ন করা হোক। তা না হলে শিক্ষাঙ্গনে বিশৃঙ্খলার আশঙ্কা থেকে যায়। কারণ বৈষম্য সৃষ্টি করে ভালো কিছু অর্জন করা যায় না। শিক্ষকদের মর্যাদা সমুন্নত রাখতে হবে। 
বেসরকারি শিক্ষক-কর্মচারীদের একক বৃহৎ সংগঠন শিক্ষক-কর্মচারী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ মো: সেলিম ভূঁইয়া বিদেশে অবস্থান করায় জোটের অতিরিক্ত মহাসচিব জাকির হোসেন বলেন, বাংলা নববর্ষ ভাতা আর ৫% ইনক্রিমেন্ট নিয়ে সারা দেশে শিক্ষকদের সচেতনতা গড়ে তুলতে কর্মসূচি অব্যাহত রয়েছে। আগামী মাসের শুরুতেই দেশব্যাপী কর্মসূচিসহ ঢাকায় বড় ধরনের মহাসমাবেশের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। 
শিক্ষকদের আরেক শিক্ষক সংগঠন সৈয়দ জুলফিকার আলম চৌধুরী ও মো: ইয়াদ আলী খানের নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতির সেকেন্ডারি টিচার্স টাওয়ারের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাম্প্রতিক সভায় অবিলম্বে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ৫% বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, পূর্ণাঙ্গ উৎসব ভাতা ও বৈশাখী ভাতা প্রদানের জন্য বর্তমান সরকারের প্রতি জোর দাবি জানানো হয়েছে। বলা হয়েছে, একই সিলেবাসে পাঠদান ও একই যোগ্যতার অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও বেতন ভাতার ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষকদের মধ্যে এখনো বৈষম্য অব্যাহত থাকায় মানসম্পন্ন শিক্ষাকার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188044