২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সিদ্ধিরগঞ্জে এখনো নূর হোসেন আতঙ্ক
১৭ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকার এখনো আতঙ্কের নাম নূর হোসেন। সেভেন মার্ডারের ঘটনায় আদালত তার বিরুদ্ধে ফাঁসির আদেশ দিলেও মানুষ এখনো নূর হোসেনের ভয়ে তটস্থ। ফাঁসির রায় হলেও এলাকার মানুষ এখনো তার ভয়ে মুখ খুলতে চান না। স্থানীয় সূত্র জানায়, নূর হোসেনের সাম্রাজ্য এখনো অক্ষত। তার বাহিনীর সদস্যদের অবাধ বিচরণ ওই এলাকায়। অলিখিত হলেও এখনো তার নির্দেশেই চলছে সিদ্ধিরগঞ্জ।
নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর নূর হোসেন। সিদ্ধিরগঞ্জ থানা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতি ছিলেন তিনি। এই নূর হোসেন প্রায় দেড় যুগ ধরে সিদ্ধিরগঞ্জ ও এর আশপাশের এলাকায় কায়েম করে সন্ত্রাসের রাজত্ব। ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুল ও অ্যাডভোকেট চন্দন সরকারসহ সেভেন মার্ডারে তার নাম জড়িয়ে গেলে তাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশ ভারতে গিয়ে আশ্রয় নেন তিনি এবং তার সহযোগীরা। সেখানে গ্রেফতার হওয়ার পর ২০১৫ সালের ১২ নভেম্বর তাকে ফেরত আনা হয়। স্থানীয় সূত্র জানায়, দীর্ঘ দিন নূর হোসেন জেলে থাকলেও তার আধিপত্য মোটেই কমেনি। তার লোকজনই এখনো নিয়ন্ত্রণ করছে সিদ্ধিরগঞ্জ ও এর আশপাশের বিশাল এলাকা। নূর হোসেনের অবর্তমানে তার ভাতিজা নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর বাদল ওই এলাকায় আধিপত্য টিকিয়ে রেখেছেন। তার সাথে যুক্ত হন ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হাসান। নূর হোসেন খুনের মামলায় অভিযুক্ত হয়ে পালিয়ে গেলে হাসান তার ওয়ার্ডে নির্বাচন করে কাউন্সিলর হন। স্থানীয় সূত্র জানায়, এই হাসান নূর হোসেনেরই ঘনিষ্ঠ সহযোগী। নূর হোসেনের নামে ১১টি অস্ত্রের লাইসেন্স ছিল। সেভেন মার্ডারের পর কয়েকটি অস্ত্র উদ্ধার হলেও বাকিগুলো থেকে যায় নূর হোসেনের বাহিনীর কাছে। ওই লাইসেন্সে অন্তত এক শ’ আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহার করত নূর হোসেনের লোকজন। এখনো সেসব অস্ত্র আন্ডারওয়ার্ল্ডেই রয়ে গেছে বলে স্থানীয় সূত্র জানায়। সেভেন মার্ডারের পর ওই সব আগ্নেয়াস্ত্রের লাইসেন্স বাতিল করা হলেও তা উদ্ধার হয়নি। 
সূত্র জানায়, শীতলক্ষ্যা নদী দখল করে বালু-পাথরের ব্যবসা, উচ্ছেদে বাধা, পরিবহন চাঁদাবাজি ও খুনসহ বিভিন্ন সময় এই নূর হোসেনের নাম আলোচনায় এলেও সর্বশেষ সেভেন মার্ডারের ঘটনায় তার কুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশের বাইরেও। পুলিশ সূত্র জানায়, ফতুল্লা ও সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় নূর হোসেনের বিরুদ্ধে ছয়টি খুনসহ অন্তত দুই ডজন মামলা রয়েছে। একসময়ের ট্রাকের হেলপার ছিলেন নূর হোসেন। পরে ট্রাকচালক হন। ১৯৯২ সালের দিকে কৃষক লীগের সাবেক নেতা গিয়াসউদ্দিনের হাত ধরে রাজনীতিতে আসেন নূর হোসেন। ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর শামীম ওসমানের হাত ধরে নূর হোসেন আওয়ামী লীগে যোগ দেয়। এর পর থেকেই তিনি নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে ওঠেন। আওয়ামী লীগের ওই সময় তার বিরুদ্ধে ১৩টি মামলা দায়ের হয়। বাংলাদেশ ট্রাকচালক শ্রমিক ইউনিয়ন কাঁচপুর শাখার সভাপতিও হয়েছিলেন তিনি। এ সময় তার হাতে বেশ কয়েকজন খুন হন বলে অভিযোগ আছে।
সূত্র জানায়, নিহত ওয়ার্ড কাউন্সিলর নজরুলের সাথে তার বিরোধ সেই ১৯৯৮ সাল থেকেই। ওই সময় সিদ্ধিরগঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে তারা দু’জনই নির্বাচন করেন। তখন প্রথমে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয় নজরুলকে। পরে আদালতের নির্দেশে পুনঃনির্বাচন হলে সেখানে নূর হোসেন চেয়ারম্যান জয়লাভ করেন। সে থেকেই নজরুল ও নূর হোসেনের দ্বন্দ্ব চলে আসছিল।
২০০১ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত এই নূর হোসেন পলাতক ছিলেন। বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় আসার পরপরই তার গডফাদারের সাথে তিনিও এলাকা ছেড়ে চলে যান। তখন তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে গ্রেফতারি পরোয়ানাও ছিল। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর একজন উপদেষ্টা ও দুই এমপির সুপারিশে ইন্টারপোলের হুলিয়া আওয়ামী লীগ সরকার তুলে নেয়ার ব্যবস্থা করে। এরপর নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে তিনি ৪ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর হিসেবে নির্বাচিত হন। সেই থেকে আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন নূর হোসেন। একক নিয়ন্ত্রণে নেয়ার চেষ্টা করেন পুরো সিদ্ধিরগঞ্জ। গোটা এলাকার চাঁদাবাজি নিয়ন্ত্রণ করেন তিনি। শীতলক্ষ্যার বালু মহাল, নদীর তীর দখল, সিদ্ধিরগঞ্জের ট্রাকস্ট্যান্ড, চুন কারখানাসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতি মাসে কোটি টাকার ওপরে চাঁদা আদায় হতো নূর হোসেনের নামে; যা এখনো অব্যাহত রয়েছে। 
স্থানীয় সূত্র জানায়, সেভেন মার্ডারের পর যারা এলাকা ছাড়া হয়েছিল সেসব সন্ত্রাসী কয়েক দিন পরই ফিরে আসে। নূর হোসেনের ভাতিজা বাদল ও সহযোগী হাসানের নিয়ন্ত্রণে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। নূর হোসেনের বিরুদ্ধে খুন, রাহাজানি, ডাকাতি, ছিনতাই, দস্যুতা, মাদক ব্যবসা, চাঁদাবাজি, অন্যের জমি দখল, অন্যের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নেয়াসহ সব অপরাধেরই অভিযোগ রয়েছে। অপরের স্ত্রীকে ভাগিয়ে নিয়ে রক্ষিতা হিসেবে রাখাসহ আরো অনেক অপরাধের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/188043