১৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
গণতন্ত্রের ছদ্মাবরণে একনায়কতন্ত্র: সুশাসন
১৭ জানুয়ারি ২০১৭, মঙ্গলবার,
|| ইকতেদার আহমেদ ||
 
ধর্মীয় জাতিসত্তার ভিত্তিতে ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ বিভাজিত হয়ে ভারত ও পাকিস্তান নামক দুটি পৃথক রাষ্ট্রের জন্ম হওয়ায় পরবর্তী উভয় রাষ্ট্রের অধিবাসীদের প্রত্যাশা ছিল, রাষ্ট্র দু’টির শাসনব্যবস্থা গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে পরিচালিত হবে। রাষ্ট্র দু’টির নাগরিকদের প্রত্যাশানুযায়ী প্রথমোক্ত রাষ্ট্রটির ক্ষেত্রে নিরবচ্ছিন্নভাবে গণতন্ত্রের চর্চা অব্যাহত থাকলেও শেষোক্ত রাষ্ট্রটি স্বাধীনতার এক যুগ অতিক্রমের পরক্ষণেই সামরিক শাসনের কবলে নিপতিত হলে দেশটির গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। সামরিক শাসক আইয়ুব খান পরবর্তীকালে মৌলিক গণতন্ত্রের নামে পাকিস্তান রাষ্ট্রে যে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন করেছিলেন প্রকৃত অর্থে তাতে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের প্রতিফলনের পরিবর্তে সামরিক একনায়কের আকাক্সক্ষার প্রতিফলন ঘটেছিল। সামরিক একনায়ক আইয়ুব খান ১০ বছরের অধিক কাল পাকিস্তানের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। তিনি শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালীন সামরিক উর্দি পরা অবস্থায় দলগঠনপূর্বক দলীয় ও রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে একই সাথে শাসনক্ষমতা পরিচালনা অব্যাহত রাখেন। আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তানের পশ্চিম ও পূর্ব উভয় অংশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামোর ব্যাপক উন্নয়ন সাধিত হলেও গণতন্ত্রহীনতা ও রাজনীতিসংশ্লিষ্ট ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের দুর্নীতি পাকিস্তানের উভয় অংশে তার বিরুদ্ধে ব্যাপক জন-অসন্তোষের জন্ম দেয়। ফলে ১৯৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের উভয় অংশে সংগঠিত গণ-অভ্যুত্থানে সামরিক শাসক আইয়ুব খান পদত্যাগে বাধ্য হলে অপর সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। ক্ষমতায় আসীন হওয়া পরবর্তী এই সামরিক শাসক জন-অসন্তোষ প্রশমনে প্রাপ্তবয়স্কদের ভোটাধিকারের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের প্রতিশ্রুতি দেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ সামরিক শাসক ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় ১৯৭০ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানে যে জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা সার্বিক বিবেচনায় অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন হিসেবে দেশ ও বিদেশে স্বীকৃত হয়। সে নির্বাচনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা পরিচালনার অধিকার অর্জন করে। পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক শাসক নির্বাচনে বিজয়ী দলকে ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা হলে পাকিস্তানের পূর্বাংশ পূর্ব পাকিস্তানে ব্যাপক জন-অসন্তোষ দেখা দেয়। এ অসন্তোষ দমনে সামরিক শাসক ইয়াহিয়া খান শক্তি প্রয়োগ করলে তা এ দেশে মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রামে রূপ নেয়। দীর্ঘ ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তি তথা স্বাধীনতা সংগ্রাম চূড়ান্ত পরিণতিতে এ দেশের মানুষের জন্য বিজয় বয়ে এনে স্বাধীন রাষ্ট্ররূপে বাংলাদেশের আত্মপ্রকাশ ঘটায়।
বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি অভ্যুদ্বয়-পরবর্তী দলীয় ও সরকারপ্রধান হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে দেশটি পরিচালিত হতে থাকে এবং তিনি স্বাধীনতার এক বছরের মাথায় দেশবাসীকে দেশের সর্বোচ্চ আইন সংবিধান উপহার দিতে সমর্থ হন। বাংলাদেশের সংবিধানে স্পষ্টরূপে ব্যক্ত রয়েছে যে, জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংসদ গঠিত হবে এবং সংসদ নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী দল কর্তৃক সরকার পরিচালিত হবে। এ দেশের মানুষ গণতন্ত্রের জন্য সংগ্রাম করে পাকিস্তানের শাসনক্ষমতা লাভের যোগ্যতা অর্জন-পরবর্তী তা প্রাপ্তিতে ব্যর্থ হওয়ায় এ দেশের মানুষের মধ্যে দৃঢ় আশাবাদ সৃষ্টি হয়েছিল যে, দেশটিতে কখনো গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হবে না। 
স্বাধীনতা-পরবর্তী তিন বছরের মাথায় বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে একদলীয় শাসনব্যবস্থার প্রবর্তন হলে এ দেশের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা বড় ধরনের হোঁচট খায়। বাকশাল গঠন-পূর্ববর্তী এ দেশ সংসদীয় পদ্ধতি সরকারব্যবস্থা দ্বারা পরিচালিত হয়ে আসছিল। বাকশাল গঠনের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা দ্বারা দেশের শাসনকার্য পরিচালনার প্রথা প্রবর্তিত হয়। বাকশাল গঠন-পরবর্তী ছয় মাসের মাথায় মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনায় বঙ্গবন্ধু নিহত হলে প্রথমত তার সহকর্মী খোন্দকার মোশতাক আহমদ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। তার শাসনকাল ক্ষণস্থায়ী হলেও তিনি শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থাকাকালীন দেশে সামরিক শাসন জারি করেন। বিভিন্ন ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্য দিয়ে তার ক্ষমতা থেকে বিদায় ঘটলে সামরিক শাসক জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন হন। জিয়াউর রহমান ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় রাজনৈতিক দল গঠনপূর্বক একই সাথে দলীয় ও সরকারপ্রধান হিসেবে শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকেন। জিয়াউর রহমানের শাসনামলে তিনি পুনরায় এ দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের প্রবর্তন করেন। জিয়াউর রহমান শাসনক্ষমতায় আসীন থাকাবস্থায় তিনি রাষ্ট্রপতি পদে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন এবং তার শাসনকালে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও তার দল বিজয় লাভ করে। জিয়াউর রহমান তার সহকর্মী সেনাকর্মকর্তাদের দ্বারা নিহত হলে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটের ভিত্তিতে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। সে নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের প্রতিষ্ঠিত দলের রাষ্ট্রপতি মনোনীত প্রার্থী আবদুস সাত্তার উপরাষ্ট্রপতি হিসেবে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্বাধীন থাকাবস্থায় নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে বিশাল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন। রাষ্ট্রপতি আবদুস সাত্তার স্বল্পকালীন সময়ে ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় সামরিক বাহিনী প্রধান এরশাদ সংঘটিত সামরিক অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হন। এরশাদ শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমানের মতো রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা অক্ষুণœ রাখেন এবং তিনি রাষ্ট্রপতি পদে আসীন থাকাবস্থায় তার পূর্বসূরির মতো দল গঠনপূর্বক দলীয় প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অবতীর্ণ হয়ে বিজয়ী হন। এরশাদের শাসনামলে দু’টি সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। উভয় সংসদ নির্বাচন সর্বোচ্চ মাত্রার কলুষতায় ভরপুর ছিল এবং এর অবশ্যম্ভাবী পরিণামে তার দল ছাড়া নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বী অপর কোনো দলের বিশেষত প্রথমোক্ত নির্বাচনে বিজয়ের সম্ভাবনা থাকলেও তা তিরোহিত হয়। এরশাদ প্রায় এক দশকের কাছাকাছি ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলেন। ব্যাপকভিত্তিক গণ-আন্দোলনের মুখে এরশাদ ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হলে কর্মরত প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত অস্থায়ী সরকারের অধীন সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এটি ছিল পঞ্চম সংসদ নির্বাচন। এ নির্বাচন অতীতের চারটি সংসদ নির্বাচনের তুলনায় অবাধ, সুষ্ঠু, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও অংশগ্রহণমূলক ছিল। 
এ নির্বাচনে জিয়াউর রহমানের স্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। এ নির্বাচন-পরবর্তী পঞ্চম সংসদে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের ঐকমত্যের ভিত্তিতে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনী প্রণয়নের মধ্য দিয়ে রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থা থেকে সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রত্যাবর্তন করা হয় যা অদ্যাবধি অক্ষুণœ আছে। পঞ্চম সংসদ বহাল থাকাকালীন নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগসহ জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সংসদ থেকে পদত্যাগ করলে নির্ধারিত সময়ের আগে আগাম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী সে নির্বাচনটি বর্জনসহ প্রতিহতের হুমকি দেয়ায় তা সর্বোচ্চমাত্রার কলুষতায় পরিপূর্ণ ছিল। ষষ্ঠ সংসদ সে সময়কার বিরোধী দলগুলোর সম্মিলিত দাবির পরিপ্রেক্ষিতে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার বিধানসংবলিত ত্রয়োদশ সংশোধনী প্রবর্তনপূর্বক সে সরকারের অধীন নির্বাচন অনুষ্ঠানের মানসে অবলুপ্ত করা হয়। নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত সপ্তম ও অষ্টম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বিজয়ী হয়। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের প্রধান প্রধানমন্ত্রী পদে বহাল থাকাকালীন দলীয় প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন যা তারা উভয়ে এখনো পালন করে চলেছেন। 
বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর সময় তার দুই কন্যা দেশের বাইরে অবস্থানের কারণে তারা উভয়ে ঘাতকদের হাত থেকে রক্ষা পান। বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রায় ছয় বছর অতিক্রান্তের পূর্বক্ষণে দলীয় ঐক্য সুসংহত করার জন্য তদজ্যেষ্ঠ কন্যা শেখ হাসিনাকে দলীয় সভানেত্রী নির্বাচিত করা হয়। সভানেত্রীর দায়িত্ব পাওয়া পরবর্তী তিনি ১৯৮১ খ্রিষ্টাব্দে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর প্রথম বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং প্রত্যাবর্তন পরবর্তী অদ্যাবধি দলটির শীর্ষ নেতৃত্বে রয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর মতো জিয়াউর রহমানেরও মর্মান্তিক ও বিয়োগান্তক ঘটনার মাধ্যমে মৃত্যু হয়। উভয় মৃত্যুর ঘটনা সংগঠনে বিপথগামী সেনাকর্মকর্তারা যে মুখ্য ভূমিকা পালন করেন তা দেশবাসীর কাছে স্পষ্ট। 
নবম সংসদ নির্বাচনটি নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পরিবর্তে সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হয়। এ সরকারটির কোনো সাংবিধানিক ভিত্তি নেই এবং অদ্যাবধি সংসদ কর্তৃক এ সরকারকে সাংবিধানিক বৈধতা দেয়া হয়নি। সেনাসমর্থিত নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নবম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভূমিধস বিজয়-পরবর্তী দলটি তাদের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারসংক্রান্ত বিধান হতে জনমতের অবজ্ঞা ও উপেক্ষায় ফিরে এসে সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তা বাতিল করে দলীয় সরকারের অধীন সংসদ বহাল থাকাকালীন অবস্থায় নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিধান প্রবর্তন করে। দলীয় সরকারের অধীন যে দশম সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় তা প্রধান বিরোধী দল বিএনপি বর্জন ও প্রতিহতের হুমকি দিলে সে নির্বাচনটিতে ষষ্ঠ সংসদ নির্বাচনের মতো ব্যাপক মাত্রায় অনিয়ম ও সহিংসতা হয়। 
বাংলাদেশে বর্তমানে প্রধান রাজনৈতিক দল বলতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এ দু’টি দলকে বোঝায়। এ দু’টি দলের প্রধানরূপে বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনা ও জিয়াউর রহমানের সহধর্মিণী খালেদা জিয়া দীর্ঘ ৩৫ ও ৩২ বছর যাবৎ দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন। এ সময়ের মধ্যে উভয় দল তিনবার করে ক্ষমতাসীন হয় এবং উভয় দলের ক্ষেত্রেই প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব দলীয় প্রধান প্রাপ্ত হন। 
১৯৫৮-২০১৭ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত ৫৯ বছরে যেসব নির্বাচিত সরকারের আগমন হয়েছে এগুলোর প্রধান ছিলেন আইয়ুব খানের নেতৃত্বাধীন কনভেনশন মুসলিম লীগ, বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ, জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি, এরশাদের নেতৃত্বাধীন জাতীয় পার্টি, বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বিএনপি এবং শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ। তারা সবই সরকার ও দলীয় প্রধান হিসেবে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা ভোগ করেন এবং সরকার ও দলের শীর্ষ ও গুরুত্বপূর্ণ পদে কোথায় কার ঠাঁই হবে এর একক সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার তাদের ওপরই অর্পিত ছিল এবং ক্ষেত্রবিশেষে আছে। তারা ক্ষমতাসীন থাকাবস্থায় দলের কেউ কখনো তাদের প্রতি অনাস্থা ব্যক্ত করেছে এমনটি প্রত্যক্ষ করা যায়নি। উপরিউক্ত নেতৃবৃন্দের মধ্যে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা ছাড়া অন্য কেউ ক্ষমতা থেকে বিদায়-পরবর্তী পুনরায় ক্ষমতাসীন হতে পারেননি যদিও বঙ্গবন্ধু ও জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার কারণে তাদের পুনরায় ক্ষমতাসীন হওয়ার সুযোগ ছিল না।
গণতন্ত্র অর্থ সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন এবং গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় দেশের প্রতিটি প্রাপ্তবয়স্ক নাগরিক অবাধে তার ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পায়। আইয়ুব খানের শাসনামল থেকে শুরু করে এ যাবৎকাল পর্যন্ত দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল পরাভূত হয়নি, অপর দিকে এ সময়ের মধ্যে দলীয় সরকারবিহীন যেসব নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এর প্রতিটিতে নির্বাচন-পূর্ববর্তী ক্ষমতাসীন দল বিজয় লাভে ব্যর্থ হয়েছে। সুতরাং একাদশ সংসদ নির্বাচন সংবিধানের বিধান অনুযায়ী দলীয় সরকারের অধীন অনুষ্ঠিত হলে এর ফলাফল অতীতের অভিজ্ঞতার আলোকে কী হবে তা বোধকরি দেশের সচেতন জনমানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম।
আমাদের সংবিধান রাষ্ট্রপতিশাসিত সরকারব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির জন্য যেমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিশ্চিত করেছিল, অনুরূপ সংসদীয় পদ্ধতির সরকারব্যবস্থায় প্রধানমন্ত্রীর জন্য সমরূপ ক্ষমতা নিশ্চিত করেছে। সংবিধানের বর্তমান ব্যবস্থায় রাষ্ট্রপতির পক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর আকাক্সক্ষার বাইরে অপর কাউকে কোনো সাংবিধানিক পদে নিয়োগের সুযোগ নেই।
গণতন্ত্রের শক্তি সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থন। যেকোনো রাজনৈতিক দলে প্রতিটি পর্যায়ে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কমিটি গঠন করা হলে তাতে দলের নেতৃত্বে উপযুক্ত ও যোগ্য লোকের আবির্ভাব ঘটবে। আমাদের দেশে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দলের শীর্ষ নেতৃত্বে এক দিকে যেমন একই ব্যক্তি দীর্ঘ দিন ধরে আসীন; অপর দিকে তাদের বিদায়ে তাদের স্থলে নিজ পরিবারের অপর কারো যে আগমন ঘটবে এটা অনেকটা নিশ্চিত। আর তাই প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী দু’টি দলে শীর্ষ নেতৃত্বের বাইরে যত যোগ্য ব্যক্তিরই আগমন ঘটুক না কেন তার পক্ষে যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয়ে শীর্ষ নেতৃত্বে আসীন হওয়া সম্ভাবনার বিপরীত। 
এ দেশের মানুষ আইয়ুব খানের ধ্যানধারণালব্ধ গণতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন ও সংগ্রাম করেছে তার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনভাবে জনসাধারণের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে নির্বাচিত দল কর্তৃক দেশ পরিচালনার সুযোগ লাভ। সে সুযোগ আমরা কতটুকু লাভ করেছি তা পূর্বোল্লিখিত অনুচ্ছেদের আলোচনায় প্রতিভাত। 
লেখক : সাবেক জজ, সংবিধান ও 
রাজনীতি বিশ্লেষক
E-mail: iktederahmed@yahoo.com
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/187907