১৬ ডিসেম্বর ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
রফতানি সক্ষমতা: প্রতিযোগী ৭ দেশের চেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ; টাকার অতি মূল্যায়নই দায়ী
১৬ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
রফতানি আয়ের সক্ষমতায় বাংলাদেশ প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় যথেষ্ট পিছিয়ে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এতে বাংলাদেশী রফতানিকারকদের নিট আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়েছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের রফতানিকারকদের টিকে থাকাই এখন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এক হিসাবে দেখা গেছে, প্রতি মার্কিন ডলারে বাংলাদেশের রফতানি আয় প্রতিযোগী দেশগুলোর চেয়ে গড়ে ০.৩৮ ডলার কম। অর্থাৎ সমপরিমাণ পণ্য রফতানি করে অন্য দেশগুলো যেখানে ১ মার্কিন ডলার আয় করে, সেখানে বাংলাদেশ আয় করে ০.৬২ ডলার। এজন্য টাকার অতি মূল্যায়নকেই দায়ী করছেন রফতানিকারকরা। ভারত, চীন, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া ও তুরস্ক- এ সাত প্রতিযোগী দেশ এবং বাংলাদেশের মুদ্রার মান ও অবমূল্যায়ন পর্যালোচনা করে এ তথ্য পাওয়া গেছে।
 
 
আন্তর্জাতিক লেনদেনে মুদ্রার বিনিময় হয় মার্কিন ডলারে। ডলারের বিপরীতে টাকা কম পাওয়া গেলে মুদ্রার অতি মূল্যায়ন হচ্ছে বলে ধরে নেয়া হয়। একইভাবে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা আগের চেয়ে বেশি পাওয়া মানে মুদ্রার অবমূল্যায়ন। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বলেছে, একটি দেশের মুদ্রা যদি ১০ শতাংশ অবমূল্যায়ন করা হয়, তাহলে ওই দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ দশমিক ৫ শতাংশ রফতানি বাড়ে। চীন সম্প্রতি একাধিকবার তাদের মুদ্রা ‘ইউয়ান’র অবমূল্যায়ন ঘটিয়েছে। একইভাবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে ভারত, ভিয়েতনাম, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, তুরস্ক, রাশিয়া ও লাতিন আমেরিকার কয়েকটি দেশও ধাপে ধাপে তাদের মুদ্রার মান কমিয়ে দিয়েছে।
 
দেশের রফতানিকারকরা বলছেন, টাকার অতি মূল্যায়নের কারণেই রফতানি আয়ে সক্ষমতা হারাচ্ছে দেশ। টাকার এ শক্তিশালী অবস্থান টানা চার বছর অব্যাহত আছে। ফলে রফতানি খাত থেকে বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত বৈদেশিক মুদ্রা আয় করতে পারছে না। অথচ প্রতিযোগী দেশগুলো মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে তাদের রফতানিকারকদের বেশি আয়ের সুযোগ করে দিচ্ছে।
 
বর্তমানে দেশীয় মুদ্রামানে এলসি রেট হচ্ছে এক ডলারে ৭৮.৫০ টাকা। এ হিসাব বিবেচনায় নিয়ে যুগান্তরের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, পণ্য রফতানিতে প্রতি ডলারে ভারত বাংলাদেশের চেয়ে ৩৮.৪২ টাকা বেশি আয় করছে। একইভাবে সক্ষমতা বেশি হওয়ায় প্রতি ডলারে চীনের আয় বেশি হচ্ছে ৯.৯০ টাকা, ভিয়েতনামের ৯.৮৭, পাকিস্তানের ১৮.০৯, শ্রীলংকার ২৪.৪৯, ইন্দোনেশিয়ার ৪৭.৫২ এবং তুরস্কের ৫৯.৭২ টাকা।
 
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে অর্থ প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান যুগান্তরকে বলেন, টাকার দামে দীর্ঘদিন স্থিতিশীলতা থাকা মানে বুঝতে হবে, দেশের অর্থনীতি একটি ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। কারণ সরকার রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধি অর্জনে কাজ করে যাওয়ার পাশাপাশি সার্বিক আমদানি পরিস্থিতির দিকেও তীক্ষè নজর রাখছে। এক্ষেত্রে মুদ্রার অবমূল্যায়ন করা হলে রফতানি আয় যে পরিমাণ বাড়বে, তার চেয়ে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা বাড়তি খরচ হয়ে যাবে আমদানিতে।
 
তিনি বলেন, তৈরি পোশাক রফতানিকারকদেরও কিন্তু তাদের শিল্পের বড় একটা অংশ পণ্য হিসেবে আমদানি করছেন। অন্যান্য খাত তো আমদানি করছেই। দেশের অর্থনীতি অনেকটাই আমদানিনির্ভর। এখানে শিল্পায়নের ব্যাপক প্রসার সত্ত্বেও মৌলিক কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতিতে আমরা এখনও স্বনির্ভর হতে পারিনি। ফলে এ দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য ধরে রাখাটাও জরুরি।
 
এক প্রশ্নের জবাবে অর্থ প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাই বলে সরকার রফতানিতে নজর দিচ্ছে না, বিষয়টি এমনও নয়। এসডিজি অর্জনে অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বাড়াতে বড় ভূমিকা রাখবে রফতানি খাত। এর লক্ষ্যে সরকার তৈরি পোশাকসহ বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাত অগ্রাধিকার দিয়ে প্রয়োজনীয় আমদানিতে যেমন সুষম শুল্ক ব্যবস্থা দিয়ে নীতিগত সহায়তা দিচ্ছে, একইভাবে রফতানিতেও নগদ প্রণোদনা, ভর্তুকিসহ বিভিন্ন শুল্ক-কর সুবিধার পাশাপাশি নীতিগত সুবিধা দিয়ে রফতানি সচল রাখার কাজ করে যাচ্ছে।
 
তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সভাপতি মো. সিদ্দিকুর রহমান এ প্রসঙ্গে যুগান্তরকে বলেন, মুদ্রার অবমূল্যায়ন হলে উদ্যোক্তারা রফতানি বাড়াতে উৎসাহ দেখান। এ পদক্ষেপে ডলারের বিপরীতে স্থানীয় মুদ্রা বেশি মিলে। ফলে প্রতিযোগী সব দেশই মুদ্রার অবমূল্যায়ন করেছে। কিন্তু বিপরীত চিত্র বাংলাদেশে। তিনি বলেন, প্রতিযোগী দেশগুলোর ডলারের সঙ্গে নিজস্ব মুদ্রা বিনিময় হারের তুলনামূলক চিত্র পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাই, দেশে মুদ্রামান অতি মূল্যায়ন অবস্থায় রয়েছে। ফলে সক্ষমতার বিচারে আমরা প্রতি ডলারে ২০১৩ সালের চেয়ে ৭.৬৬ শতাংশ পিছিয়ে আছি। এটা শুধু দেশের মুদ্রার হিসাব। অথচ অবমূল্যায়ন ঘটিয়ে প্রতিযোগী ভিয়েতনাম রফতানি সক্ষমতার বিচারে আমাদের চেয়ে ৪.৯১ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। একইভাবে চীন ৪.৯৫ শতাংশ, পাকিস্তান ১৫.৩৯ শতাংশ, শ্রীলংকা ২৩.৫৪ শতাংশ, ভারত ৪০.০১ শতাংশ, ইন্দোনেশিয়া ৫২.৮৭ শতাংশ ও তুরস্ক ৬৮.৪২ শতাংশ এগিয়ে রয়েছে। তিনি রফতানি খাতে সক্ষমতা বাড়াতে বাংলাদেশী টাকার অবমূল্যায়নের বিষয়টি পুনর্বিবেচনা এবং তা সম্ভব না হলে রফতানি খাতের জন্য একটি ভিন্ন মুদ্রা বিনিময় হার নির্ধারণ করা যায় কিনা, সে বিষয়ে সরকারকে পদক্ষেপ নেয়ার অনুরোধ করেন।
 
বৈদেশিক মুদ্রা বিনিময় হার বিশেষজ্ঞ ড. মনজুর হোসেন এ বিষয়ে বলেন, কোনো দেশের মুদ্রার অবমূল্যায়নের উদ্দেশ্য হচ্ছে ওই দেশের রফতানি বাড়ানো এবং আমদানি সীমিত করা। অবমূল্যায়নের ফলে সাধারণত ওই দেশের পণ্য বিদেশে সস্তায় রফতানি করা যায়। এ কারণে অনেক দেশ তাদের মুদ্রার অবমূল্যায়ন করে। কিন্তু এ ধরনের প্রতিযোগিতা বিশ্ব অর্থনীতির জন্য সুখকর নাও হতে পারে। এমন পদক্ষেপের মাধ্যমে সব দেশই যদি রফতানি বাড়াতে আর আমদানি কমাতে চায়, তাহলে বিশ্ববাণিজ্য কমে যাবে। ফলে আমদানি ও রফতানি দুটিই কম হবে। এতে বিশ্ব অর্থনীতিতে আবারও মন্দা দেখা দিতে পারে।
 
বাংলাদেশ রফতানিকারক সমিতির (ইএবি) সভাপতি আবদুস সালাম মুর্শেদী যুগান্তরকে বলেন, মুদ্রার অতি মূল্যায়নের কারণে প্রতিযোগী দেশের তুলনায় টাকা কম পেয়ে আমরা এমনিতেই সরাসরি প্রতিযোগিতায় অসম অবস্থায় রয়েছি। এর পাশাপাশি তাদের চেয়ে আমরা সরকারের নীতিগত সহায়তা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে। সেই সঙ্গে শিল্পকারখানায় গ্যাস-বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে না। যেটুকু মিলছে সেখানেও কোয়ালিটি সংযোগ পাচ্ছি না। এতে বিকল্প উপায়ে উৎপাদন চালু রাখতে গিয়ে খরচ বেড়ে যাচ্ছে। অথচ ক্রেতাদের কাছ থেকে বাড়তি খরচ মেলা তো দূরের কথা, নানা কারণে পণ্যের বিদ্যমান দামও পাওয়া যায় না। সব মিলিয়ে রফতানি আয়ে প্রবৃদ্ধির কথা বলা হলেও উদ্যোক্তার নিট আয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। রফতানি খাতকে সচল রাখতে হলে সরকারকে অবশ্যই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
http://www.jugantor.com/last-page/2017/01/16/93545/%E0%A6%AA%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%A4%E0%A6%BF%E0%A6%AF%E0%A7%8B%E0%A6%97%E0%A7%80-%E0%A7%AD-%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A7%87%E0%A6%B0-%E0%A6%9A%E0%A7%87%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AA%E0%A6%BF%E0%A6%9B%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A7%87-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6