১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
মাদক মামলায় সাজা: মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও হয় ‘লঘুদণ্ড’
১৬ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
অস্ট্রেলিয়ার নাগরিক ভ্যান টন গুয়েইনকে ২০০৫ সালের ৪ ডিসেম্বর সিঙ্গাপুরে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়েছিল। ফিলিপাইনি বংশোদ্ভূত গুয়েইনকে ৩৭৬ গ্রাম হেরোইনসহ সিঙ্গাপুর বিমানবন্দরে আটক করা হয়েছিল।
অস্ট্রেলিয়ার মেলবোর্ন থেকে একটি বিমানে তিনি এসেছিলেন সিঙ্গাপুরে। তাঁকে আটকের পর অস্ট্রেলিয়া ও সিঙ্গাপুরের মধ্যে অনেক কূটনৈতিক দেনদরবারও হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া গুয়েইনের মৃত্যুদণ্ড রোধ করতে পারেনি সিঙ্গাপুরি আইনের কঠোরতার কারণে।
মাদক বহনের দায়ে ইন্দোনেশিয়ায় ৯ বিদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে ২০১৫ সালে। একই অপরাধে ২০০৯ সালে ব্রিটিশ নাগরিকের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে চীন। চীন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুরসহ অনেক দেশেই মাদক ব্যবসার ক্ষেত্রে শূন্য সহিষ্ণুতা দেখানো হয়। মাদকের ভয়াবহতা রোধে এসব দেশে দোষী ব্যক্তিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তা কার্যকরও করা হয়।
অথচ বাংলাদেশে প্রচলিত আইনে নির্দিষ্ট কিছু মাদকদ্রব্য জিম্মায় বা দখলে রাখা এবং ব্যবসার ক্ষেত্রে মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকলেও আজ পর্যন্ত এ অপরাধে কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে—এমন নজির নেই। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশে প্রচলিত আইনের একটির সঙ্গে আরেকটির সামঞ্জস্য নেই। তাই সিঙ্গাপুরে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামির কাছ থেকে যে পরিমাণ হেরোইন উদ্ধার হয়েছে তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণ হেরোইন জব্দের মামলায়ও এ দেশে আসামিদের গুরুদণ্ড হয় না। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আসামি খালাসও পেয়ে যায়। অথচ বাংলাদেশ এখন ভয়াবহ মাদকের থাবায় নিমজ্জিত।
হেরোইন বহন ও ব্যবসার দায়ে বাংলাদেশে দুই পাকিস্তানি নাগরিককে ফাঁসির দণ্ড দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু আইনি অসামঞ্জস্যের কারণে পরে তাদের শাস্তির পরিমাণ কমে যায়। তারা হলো রইস খান ও আলেফজান। তাদের সঙ্গে ইব্রাহিম নামের আরেক পাকিস্তানি ছিল, বিচার চলাকালে তার মৃত্যু হয়। তারা মাদক চোরাচালানের আন্তর্জাতিক চক্রের সঙ্গে জড়িত ছিল। ১৯৯৯ সালে বিপুল পরিমাণ হেরোইন নিয়ে তারা বাংলাদেশে আসে এবং রাজধানীর কাকরাইলের একটি অভিজাত হোটেলে ওঠে। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে এ তথ্য জানতে পারে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর। ১৯৯৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ওই হোটেলে পাকিস্তানিদের কক্ষে অভিযান চালান। সেখানে তিনজনের সঙ্গে থাকা ভ্রমণ ব্যাগের ভেতর ১১৮টি সাবানের প্যাকেটে রাখা ছিল প্রায় ২৫ কেজি হেরোইন। সেগুলো জব্দ করা হয়, যার আনুমানিক মূল্য ২৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মো. আমজাদ হোসেন বাদী হয়ে রমনা থানায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন-১৯৯০-এর ১৯(১)-এর ১(খ) ও ২৫ ধারায় মামলা করেন।
সে সময় এটাই ছিল বাংলাদেশে জব্দ করা হেরোইনের সবচেয়ে বড় চালান। জিজ্ঞাসাবাদে পাকিস্তানি তিন নাগরিক আন্তর্জাতিক হেরোইন চোরাচালানের সঙ্গে তাদের দীর্ঘদিন ধরে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের কয়েকজনের নাম প্রকাশ করে, তাদের কাছে হেরোইনগুলো পৌঁছে দিতে এসেছিল বলে দাবি করে তারা। ঘটনাটি তদন্ত করে রমনা থানা পুলিশ। তদন্ত শেষে ইব্রাহিম, রইস ও আলেফজানসহ বাংলাদেশের এরশাদ আহমেদ, হানিফ, দুলাল, মো. জাহাঙ্গীর ও এ কালামকে অভিযুক্ত করে ২০০০ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি চার্জশিট দেয় পুলিশ।
মামলার নথিপত্র ঘেঁটে জানা গেছে, বিচারকালে ১৬ জন সাক্ষীর সাক্ষ্য নেওয়া হয়। ওই হোটেলে অবস্থানরত পাকিস্তানি নাগরিকদের দখল থেকে হেরোইন উদ্ধারের ঘটনা তারা বর্ণনা করে। ঢাকার প্রথম অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত ২০০৫ সালের ৭ জুলাই রায় ঘোষণা করেন। রায়ে রইস খান ও আলেফজানের দখলে হেরোইন রাখার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় দুজনকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। মামলা চলাকালে ইব্রাহিম মারা যায়। আর বাংলাদেশি পাঁচ নাগরিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় তাদের খালাস দেওয়া হয়।
তদন্তে বাংলাদেশের পাঁচজনের বিরুদ্ধে হেরোইন চোরাচালানের অভিযোগ পাওয়া গেলেও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে তাদের খালাস দেওয়া হয়। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে শাস্তি দিতে হলে আসামির দখলে মাদক থাকা, তা নিয়ন্ত্রণ ও মাদক সম্পর্কে তারা জানত, সেটি প্রমাণ করতে হয়। অভিযুক্ত বাংলাদেশিদের বিরুদ্ধে এমন প্রমাণ সাক্ষীরা দিতে পারেননি। তাই চোরাচালানের সহযোগী হয়েও তারা আইনের ফাঁক গলে মুক্তি পেয়ে যায়।
মৃত্যুদণ্ড দেওয়ার পর পাকিস্তানি দুই নাগরিক হাইকোর্ট বিভাগে আপিল করে। তাদের মৃত্যুদণ্ড অনুমোদনের জন্যও হাইকোর্টে নথি পাঠানো হয়। শুনানি শেষে ২০০৯ সালের ১২ জুলাই হাইকোর্টের একটি দ্বৈত বেঞ্চ রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বলা হয়, যে ধারায় আসামিদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে, সেই ধারা অর্থাৎ মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ১(খ) ধারা তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। হাইকোর্ট রায়ে বলেন, উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ হেরোইন সাবানের প্যাকেটে ছিল। সাবানগুলো ছিল বিদেশি। কাজেই প্রমাণিত হয়, আসামিরা হেরোইন পাচারের সঙ্গে যুক্ত। এ কারণে মামলার ধারা পরিবর্তন করে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(বি)(২) ও ২৫(বি)(১) ধারায় তাদের দোষী সাব্যস্ত করে ১৪ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
বিশিষ্ট আইনজীবীরা বলছেন, আদালত পরে যে ধারায় দুই পাকিস্তানিকে ১৪ বছরের সাজা দিয়েছেন সেই ধারাতেও এ অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ড ও যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু আদালত এ ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব ক্ষমতাবলে মৃত্যুদণ্ড কমিয়ে ১৪ বছরের সাজা দিয়েছেন। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনেও ২৫ গ্রামের বেশি হেরোইন দখলে রাখার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ফাঁসির দণ্ড থেকে রেহাই পেয়ে আসামিরা ১৪ বছরের সাজা ভোগ করে।
আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আতিউর রহমান কালের কণ্ঠকে জানান, সাজার মেয়াদ শেষ হওয়ার পর আসামিরা মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশ ছেড়ে চলে গেছে।
গত বছর ৪ ফেব্রুয়ারি এক কেজির বেশি হেরোইন দখলে রাখার দায়ে ফারুক আহমেদ নামের এক যুবককে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দিয়েছেন নাটোরের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক রেজাউল করিম। এ রায় টিকবে কি না তা জানা যাবে হাইকোর্টে ডেথ রেফারেন্স শুনানি শেষে।
শুধু ওই দুই পাকিস্তানি না, ভয়ংকর মাদক বহনকারী অন্য আসামিরাও আইনের ফাঁক গলে বা আইনের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে গুরুদণ্ড থেকে রেহাই বা মামলা থেকে অব্যাহতি পেয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর বিমানবন্দর থানায় দায়ের করা প্রায় ছয় কোটি টাকা মূল্যের হেরোইন জব্দের মামলায় রায় দেওয়া হয় ২০১৪ সালের ১০ এপ্রিল। আসামি নাইজেরিয়ার নাগরিক অ্যাফোলেয়ান ওলাডিপুপু জ্যাখভসকে খালাস দেওয়া হয়। খিলক্ষেত থানায় দায়ের করা তিন কোটি টাকা মূল্যের হেরোইন চোরাচালান-সংক্রান্ত আরেক মামলার আসামি এমেকা এরিঞ্জ, কসমস ওগবুলি, চুকউ এমেকা স্যামুয়েল ওডিমা, একিন ক্যালিসটাস এনিকওয়েঞ্জ ওরফে কেসি, ন্যামদি কেলভিন ও সেলি ইকেন্নাও খালাস পায় একই বছরের ১৯ জুন। তারাও নাইজেরিয়ার নাগরিক। অস্বাভাবিক দ্রুততায় মামলার বিচারকাজ শেষ করেন ঢাকার জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনাল ও বিশেষ দায়রা জজ আদালতের তৎকালীন বিচারক ফারুক আহাম্মদ। রায়ে উল্লেখ করা হয়, নিরপেক্ষ সাক্ষী অর্থাৎ জব্দ তালিকা প্রস্তুতির সময় সাধারণ মানুষ, যারা জব্দ তালিকায় স্বাক্ষর করেছিলেন, তারা সাক্ষ্য না দেওয়ায় আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি।
জানা যায়, হেরোইন, কোকেন মামলার বড় বড় চালানসহ যে সব আসামি ধরা পড়ে তারা আইনি ফাঁকফোকর বের করে খালাস পেয়ে যায়। কারাগার থেকে বের হয়ে পরে তারা ফের একই ব্যবসায় জড়িত হয়।
সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র চার ধরনের মাদকে : বাংলাদেশে মাদক ব্যবসায়ীদের বিচার হয় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে। ১৯৯০ সালে এ আইন করা হয়। এ আইনের ১৯ ধারার বিভিন্ন উপধারায় মাদক ব্যবসা বা মাদকদ্রব্য দখলে রাখার বিচার করা হয়। ১৯-এর ১ ধারায় হেরোইন, কোকেন ও কোকা থেকে উদ্ভূত মাদকদ্রব্য দখলে রাখার শাস্তির বিধান উল্লেখ রয়েছে। (ক) উপধারায় কেউ এ ধরনের মাদকদ্রব্য ২৫ গ্রামের নিচে দখলে রাখলে বা ব্যবসা করলে তার জন্য দুই থেকে ১০ বছর পর্যন্ত শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। ২৫ গ্রামের বেশি হোরেইন, কোকেন বা কোকা থেকে উদ্ভূত মাদকদ্রব্য দখলে রাখলে বা ব্যবসা করলে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এ ধরনের মাদক রাখার দায়ে আর কোনো মৃত্যুদণ্ড কোনো আদালত দিয়েছেন এমন নজিরের কথা কেউ বলতে পারছে না।
অন্যান্য মাদকদ্রব্য দখলে রাখা বা ব্যবসা করার শাস্তি বর্ণনা রয়েছে ১৯-এর ২ ধারায়। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে প্যাথিডিন, মরফিন ও টেট্রাহাইড্রোক্যানাবিনল। এসব মাদকদ্রব্যের ১০ গ্রাম পর্যন্ত দখলে রাখার শাস্তি দুই থেকে ১০ বছরের কারাদণ্ড। আর ১০ গ্রামের বেশি দখলে রাখার অপরাধে যাবজ্জীবন বা মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। তৃতীয় শ্রেণির মাদকদ্রব্যের মধ্যে অপিয়াম, ক্যানাবিস বেসিন বা অপিয়াম থেকে উদ্ভূত মাদকদ্রব্য দখলে রাখা বা ব্যবসার শাস্তিরও উল্লেখ আছে এ ধারায়। এসব মাদক দুই কেজির বেশি পরিমাণ দখলে রাখার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন। আর মেথাডন জাতীয় মাদকদ্রব্য ৫০ গ্রামের বেশি পরিমাণ দখলে রাখার শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। তবে এসব মাদকদ্রব্য দখলে রাখার দায়ে আজ পর্যন্ত কারো মৃত্যুদণ্ড হয়নি।
এমন ভয়ংকর মাদক রাখার দায়ে কাউকে সর্বোচ্চ সাজা দেওয়া হয় না কেন—তার কারণ হিসেবে আইনজীবীরা কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে এসব মাদক ব্যবসার আড়ালে যে সব গডফাদার রয়েছে তারা ধরাছোঁয়ার বাইরেই থাকে। যারা মাদকসহ ধরা পড়ে তাদের পেছনে ওই গডফাদাররা কলকাঠি নাড়ে। এ সময় বিচার-সংশ্লিষ্টদের প্রভাবিত করা হয়। সাক্ষীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে আদালতে যেতে দেওয়া হয় না। উল্লিখিত মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সাক্ষীর অভাবে অপরাধ প্রমাণ করা যায়নি বলেই রায় থেকে দেখা যায়। আবার বিপুল পরিমান মাদক দ্রব্য জব্দের মামলায় অনেক সময় তদন্তেই ত্রুটি থেকে যায়। ঢাকার আদালতের তথ্য থেকে দেখা যায়, যে কটি মাদকের মামলায় আসামিদের সাজা হয়েছে তারা অতি সাধারণমানের আসামি। মাদকের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা শুধু বাহকরাই শাস্তি পাচ্ছে। অথচ বিপুল পরিমাণ মাদক নিয়ে গ্রেপ্তার আসামিরা প্রভাব খাটিয়ে আইনের ফাঁকফোকড় দিয়ে বেরিয়ে যায়।
আইনজীবীরা বলছেন, ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৩ ধারা অনুযায়ী কোনো মাদকদ্রব্য বা অন্য কিছু জব্দ করতে হলে স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী করা বাধ্যতামূলক। কিন্তু বড় ধরনের মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সখ্য থাকায় স্থানীয় গণমান্য ব্যক্তিদের সাক্ষী না করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে যারা কাজ করে তাদের সাক্ষী করা হয়। অনেক সময় পথচারীদেরও সাক্ষী করা হয়। তারা আর পরে সাক্ষ্য দিতে আদালতে হাজির হয় না। শেষ পর্যন্ত আসামিরা খালাস পেয়ে যায়।
ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী ও আইনজীবী ঢাকা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি মো. বোরহান উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, আসামিরা মামলা থেকে রেহাই পেতে আইনি দুর্বলতা খুঁজে বের করবেই। তবে চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ীদের ক্ষেত্রে মামলা দায়েরে অধিক সতর্কতা অবলম্বন করা হলে ভয়ানক আসামিদের শাস্তির আওতায় আনা সম্ভব।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ফারুক আহমেদ বলেন, হেরোইন বা যেসব মাদকদ্রব্য দখলে রাখার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড, সেসব আসামি অত্যন্ত প্রভাবশালী। যে কারণে অনেক ক্ষেত্রে এসব আসামির শাস্তি হয় না। এসব মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে সাক্ষীও হাজির হয় না। ফলে আইনি সুবিধা পেয়ে যায় আসামিরা।
অন্যান্য মাদকের শাস্তি কম : ২৫ গ্রামের ওপরে হেরোইন পাচার বা দখলে রাখার সর্বোচ্চ শাস্তি যেখানে মৃত্যুদণ্ড, সেখানে কোটি কোটি ইয়াবা বড়ি বহন, চোরাচালান বা দখলে রাখার শাস্তি সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ড। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে এ শাস্তি নির্ধারিত রয়েছে।
অপরাধ ও আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আইনে ভয়াবহ মাদকদ্রব্য বহন, উৎপাদন, নিয়ন্ত্রণ ও দখলের শাস্তির এই ফারাকের কারণেই দেশে ইয়াবার জাল বিস্তার হচ্ছে। হেরোইনের চেয়ে এখন ইয়াবা চোরাচালানের দিকে বেশি ঝুঁকছে মাদক ব্যবসায়ীরা। এ ক্ষেত্রে ইয়াবা দখলে বা নিয়ন্ত্রণে রাখার শাস্তি বাড়িয়ে মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত করলে যত্রতত্র ইয়াবা পাওয়া যেত না।
বাংলাদেশে প্রচলিত মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে বিভিন্ন প্রকার মাদকদ্রব্যের যে তফসিল রয়েছে তাতে ইয়াবার কথা উল্লেখ নেই। তবে এমফিটামিন নামক মাদকের নাম উল্লেখ আছে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও চিকিৎসকদের মতে, ইয়াবা বড়ির মধ্যে রয়েছে নেথএমফিটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণ। ইয়াবার মধ্যে এমফিটামিন থাকায় সেটি মাদকদ্রব্য হিসেবে আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য। ১৯৯০ সালের মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ধারায় বলা হয়েছে, ফেনসাইক্লিআইন, মেথাকোয়ালন এলএসডি, বারবিরেটস, এমফিটামিন অথবা এগুলোর যেকোনোটি দ্বারা তৈরি মাদকদ্রব্য কারো কাছে পাঁচ গ্রাম পর্যন্ত পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন ছয় মাস ও সর্বোচ্চ তিন বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে। ১৯(১)-এর ৯(খ) ধারায় পাঁচ গ্রামের বেশি পরিমাণ পাওয়া গেলে সর্বনিম্ন পাঁচ বছর ও সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া যাবে।
ইয়াবা এমফিটামিনের মিশ্রণে তৈরি বিধায় মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনের ১৯(১)-এর ৯(ক) ও ৯(খ) ধারার অধীনে বিচার্য। এ ক্ষেত্রে দেখা যায়, যত পরিমাণ ইয়াবা উদ্ধার হোক না কেন এর সর্বোচ্চ শাস্তি ১৫ বছরের কারাদণ্ড। তাও আবার বেশির ভাগ আসামিই সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে খালাস পেয়ে যায়।
এ ছাড়াও গাঁজা বা যেকোনো ক্যানাবিস জাতীয় ভেষজ, ক্যানাবিস গাছ ও অন্যান্য মাদকদ্রব্য উৎপাদন, বহন ও দখলে রাখার শাস্তি হিসেবে একই আইনের ১৯ ধারার বিভিন্ন উপধারায় সর্বোচ্চ ১৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।
ঢাকার আদালতে ফৌজদারি মামলা পরিচালনাকারী আইনজীবী সৈয়দ আহমেদ গাজী বলেন, ইয়াবা এখন সর্বনাশা মাদক। অথচ বিপুল পরিমাণ ইয়াবা ও অন্যান্য ধরনের মাদকদ্রব্য দখল, বহন ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মাত্র ১৫ বছর করা হয়েছে, যা মাদক ব্যবসায়ীদের মনে ভীতির সঞ্চয় করে না। দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা থাকলে অবশ্যই মাদক ব্যবসায়ীদের সামনে তা ভয়ের কারণ হতো।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান বলেন, পাঁচ গ্রামের বেশি মাদক রাখার যে শাস্তি, পাঁচ কোটি গ্রাম মাদক রাখার শাস্তিও তাই। এটা বৈষম্যমূলক। কয়েক লাখ ইয়াবা বড়ি উদ্ধারের ক্ষেত্রে মাত্র ১৫ বছরের শাস্তি গ্রহণযোগ্য নয়।
http://www.kalerkantho.com/print-edition/first-page/2017/01/16/452494