১৭ নভেম্বর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
সরকারের তিন বছর: ব্যাংকিং খাতে সুখবর নেই; ঘটেছে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও রিজার্ভ চুরি; কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ
১৬ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
২০১৪-১৬ তিন বছরে ব্যাংকিং খাতে কোনো সুখবর নেই। এ সময়ে মোটা দাগে আলোচিত ঘটনার মধ্যে বেসিক ব্যাংক কেলেঙ্কারির দায়ে এমডিকে অপসারণ ও পরিচালনা পর্ষদ ভেঙে দেয়া। রিজার্ভ চুরির মতো স্মরণকালের ভয়াবহ ঘটনা, এ জন্য গভর্নর পদত্যাগ করা এবং ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়া। একই সাথে ব্যাংকের অনিয়ম, দুর্নীতি ঠেকাতে অতীতের সব রকর্ড ভঙ্গ করে ১২টি ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর বাইরে গত তিন বছরেই বিনিয়োগ খরায় ভোগে ব্যাংকিং খাত। এ কারণে আমানতকে নিরুৎসাহিত করতে গিয়ে আমানতের সুদহার তলানিতে নেমে যায়। এর পরেও ব্যাংকগুলো টাকা খাটাতে না পারায় বেড়ে যায় অলস অর্থ। 
ব্যাংকিং চ্যানেলে বলা যায় গত তিন বছরে আলোচ্য ঘটনাগুলোই উল্লেখযোগ্য ঘটনা। ব্যাংকারদের মতে, ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি প্রধান বিরোধী দলহীন নির্বাচনের পর বিনিয়োগকারীরা শুরু থেকেই বিনিয়োগে আস্থার সঙ্কটে ভোগেন। এর আগে ২০১৩ সালের শেষ দিকে চলে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বিরোধী দলগুলোর রাজনৈতিক কর্মসূচি। টানা কর্মসূচিতে হাঁপিয়ে ওঠেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু ২০১৪ সালের পর থেকে বিরোধী দলগুলোর হরতাল অবরোধের মতো রাজনৈতিক কর্মসূচি না থাকলেও বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগে আস্থায় আসতে পারেননি। এর ফলে ব্যাংকিং খাত তিন বছরজুড়েই বিনিযোগ খরায় ভোগে। বিনিয়োগ চাহিদা কমে যাওয়ায় প্রতিটি ব্যাংকের হাতেই থাকে অলস অর্থ। ব্যাংকগুলো তহবিলব্যবস্থাপনা ব্যয় কমাতে আমানত সংগ্রহে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে। ফলে তারা আমানতের সুদহার কমাতে থাকে। একসময় টাকার সঙ্কট মেটাতে যেখানে ব্যাংকগুলো ১০০ টাকা আমানত নিতে সর্বোচ্চ ১৪ টাকা ব্যয় করেছে, এখন তা সর্বোচ্চ সাড়ে সাত টাকায় নেমে এসেছে। কিন্তু এর পরেও ব্যাংকগুলোতে উদ্বৃত্ত তারল্য কমছে না। বরং দিন দিন বেড়ে চলছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, ব্যাংকিং খাতে উদ্বৃত্ত তারল্যের পরিমাণ বেড়ে হয়েছে এক লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা।
বেসিক ব্যাংকের ঋণ কেলেঙ্কারি : ২০০৯ সালের আগে সরকারি খাতে মডেল ব্যাংক হিসেবে বলা হতো বেসিক ব্যাংককে। কিন্তু এমন একটি ব্যাংকে সরকার সমর্থক ব্যক্তিদের পরিচালনা পর্ষদে বসানোর পর মডেল ব্যাংকটিতে দুর্নীতির বাসা বাঁধতে থাকে। ২০১১ সাল থেকে ঋণ কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটতে থাকে এই ব্যাংকটিতে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্ত প্রতিবেদনে উঠে এলেও শুরু থেকেই রহস্যজনক কারণে তাদের পক্ষ থেকে তেমন কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়নি। ২০১২ সাল থেকে পত্রপত্রিকায় বেসিক ব্যাংকের দুর্নীতির চিত্র আসতে থাকে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার অনড় অবস্থানে অনেকটা বাধ্য হয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থা বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষ থেকে পদক্ষেপ নেয়া হয় বেসিক ব্যাংকের বিরুদ্ধে। প্রথমে ২০১৪ সালের মার্চ মাসে বেসিক ব্যাংকের এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে শোকজ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। বড় ধরনের ঘটনা ফাঁস হওয়ার আগেই তৎকালীন পর্ষদ তড়িঘড়ি করে ওই বছরের ১৭ এপ্রিল ডিএমডিসহ ছয় কর্মকর্তাকে বহিষ্কার করে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের অনড় অবস্থানের কারণে ২৯ এপ্রিল প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার ঋণ কেলেঙ্কারির দায়ে বেসিক ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদকে ভেঙে দেয়ার জন্য অর্থমন্ত্রণালয়কে চিঠি দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। একই সাথে ২৫ মে এমডি কাজী ফখরুল ইসলামকে অপসারণ করা হয়। পরে বিতর্কিত চেয়ারম্যান শেখ আবদুল হাই বাচ্চু স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করেন। এরপরে এমডি ও চেয়ারম্যান দু’জনই দেশ ত্যাগ করেন। আজো ফেরেননি তারা। 
রিজার্ভ চুরির ঘটনা : ২০১৫ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রা লেনদেন কারা সুরক্ষিত সুইফট সিস্টেমের সাথে আরটিজিএস নামের একটি সফটওয়্যার যুক্ত করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তার অতিউৎসাহে। এর পর থেকেই ব্যাংকিং সেক্টরে ঘটে একের পর এক দুর্ঘটনা। গত বছরের শুরুতেই এটিএম কার্ড ও আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ড জালিয়াতি করে এটিএম বুথগুলো থেকে টাকা হাতিয়ে নেয় আন্তর্জাতিক প্রতারকচক্র। গত ৪ ফেব্রুয়ারি ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহ আলোচিত রিজার্ভ চুরির ঘটনা। রিজার্ভ থেকে ৮০০ কোটি টাকা চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমানকে পদত্যাগ করতে হয়। দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেয়া হয় দুই ডেপুটি গভর্নরকে। ওএসডি করা হয় অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে। সরকারের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনকে প্রধান করে। রিজার্ভ চুরির ঘটনার দীর্ঘ এক মাস পরে ড. আতিউর রহমানের পদত্যাগের দিনে এ ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয় বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের পক্ষ থেকে। চুরি হওয়া অর্থের মধ্যে ফিলিপাইন থেকে কিছু অর্থ ফেরত পাওয়া গেলেও বেশির ভাগ অর্থ আদায় এখনো অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। 
ধারাবাহিকতা কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহে : বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভকে সমৃদ্ধ করে প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ রেমিট্যান্স। কিন্তু ২০১৪ সাল থেকে ধারাবাহিকভাবে কমছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০১৪ সালে রেমিট্যান্স এসেছিল এক হাজার ৪৮৩ কোটি ডলার। পরের বছর অর্থাৎ ২০১৫ সালে তা কিছুটা বেড়ে হয় এক হাজার ৫৩১ কোটি ডলার। কিন্তু সমাপ্ত অর্থবছরে গত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম রেমিট্যান্স আসে। বিদায়ী বছরে (২০১৬) রেমিট্যান্স আসে এক হাজার ৩৬১ কোটি ডলার। রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাওয়ার কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যে তেলের দাম কমে যাওয়ায় উন্নয়ন ব্যয় কমে গেছে। এর বাইরে বৈধ পথে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে গেছে। বেড়েছে হুন্ডির প্রবণতা। সব মিলে রেমিট্যান্স প্রবাহ কমে যাচ্ছে বলে তারা মনে করছেন।
বিভিন্ন ছাড় দেয়ার পরেও বাড়ছে খেলাপি ঋণ : বাংলাদেশ ব্যাংক তিন বছর ধরেই ঋণখেলাপিদের বিশেষ ছাড় দিয়ে আসছে। এর পরেও খেলাপি ঋণ কমছে না, বরং খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে গেছে। সাধারণত খেলাপি ঋণ বাড়লে এর বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে হয়। আর প্রভিশন সংরক্ষণ করা হয় মুনাফা থেকে। এতে মুনাফা কমে যাওয়ার কথা। কিন্তু মজার বিষয় হলো মুনাফা না কমে বরং বেড়ে গেছে। এর কারণ হিসেবে ব্যাংকাররা জানিয়েছেন, তিন বছর ধরেই ডিসেম্বরের আগে খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ছাড় দিয়ে আসছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কখনো রাজনৈতিক কারণে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীদের স্বার্থে, আবার কখনো বড় বড় বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগমুখী করতে ঋণ পুনর্গঠন করা হয়। যেমন ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে খেলাপি ঋণ ছিল ৫৬ হাজার কোটি টাকা, ডাউন পেমেন্ট ছাড়াই ঋণ নবায়নের সুযোগ দেয়ায় মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে ২০১৩ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ১৬ হাজার কোটি টাকা কমে ৪০ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকায় নামে। গত ২০১৫ সালেও ঋণ পুনর্গঠনের নামে বড় বড় ১৪টি ব্যবসায়ী গ্রুপের ১ ও ২ শতাংশ ডাউন পেমেন্ট নিয়ে ১৫ হাজার কোটি টাকার খেলাপি ঋণ নিয়মিত করা হয়। এতে ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ ৫০ হাজার কোটি টাকার মধ্যে ধরে রাখে। কিন্তু গত বছরের শুরু থেকেই খেলাপি ঋণ বাড়তে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান মতে, গত সেপ্টেম্বর থেকে খেলাপি ঋণ বেড়ে হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে ঋণ অবলোপন আছে ৪৮ হাজার কোটি টাকা। সব মিলে ব্যাংকিং খাতে এখন খেলাপি ঋণের পাহাড় জমে হয়েছে অবলোপনসহ এক লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু গত কয়েক বছরে ডিসেম্বরে খেলাপি ঋণ কমাতে বিশেষ ছাড় দেয়ায় ব্যাংকে প্রকৃতপক্ষে প্রভিশন সংরক্ষণ কম করতে হয়েছে। এর বিপরীতে বেড়েছে কৃত্রিম মুনাফা। আর এ কৃত্রিম মুনাফার ওপর ভর করে নগদ লভ্যাংশের নামে বের হয়ে গেছে সাধারণের আমানত। 
১২ ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ ঃ ঋণ অনিয়মসহ নানা কেলেঙ্কারী ঠেকাতে বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে ১২টি সরকারি বেসরকারি বাণিজ্যিক ব্যাংকে পর্যবেক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এর আগে কখনো এ পরিমাণ পর্যবেক্ষক আর বসানো হয়নি বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের পর্যবেক্ষকরা ব্যাংকগুলোর পরিচালনা পর্ষদে উপস্থিত থেকে অনেকটা ঋণ অনিয়মের ঠেকাতে পাহাড়া দিচ্ছেন। পর্যবেক্ষক রয়েছে এমন ব্যাংকগুলোর মধ্যে রয়েছে- এনআরবি কমার্শিয়াল, ফারমার্স, বাংলাদেশ ডেভলপমেন্ট ব্যাংক, সোনালী, জনতা, অগ্রণী, রূপালী, বাংলাদেশ কৃষি, বেসিক, বেসরকারি খাতের ন্যাশনাল, বাংলাদেশ কমার্স ও আইসিবি ইসলামী ব্যাংক। আর দীর্ঘ সময় ধরে মার্কেন্টাইল ব্যাংকে পর্যবেক্ষক থাকলেও সম্প্রতি তা প্রত্যাহার করা হয়েছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/187768