২১ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শনিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান : অদৃশ্য গণতন্ত্র
১৬ জানুয়ারি ২০১৭, সোমবার,
দ্বিতীয় মেয়াদে বর্তমান সরকারের তিন বছর শেষে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড দৃশ্যমান হচ্ছে। নিজস্ব অর্থায়নে স্বপ্নের পদ্মা সেতু নির্মাণ এবং রাজধানীতে মেট্রোরেলের কাজ শুরুসহ বড় বড় উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়নের দিকে এগোচ্ছে সরকার। পাশাপশি বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ দৃশ্যপটও। সরকার সমর্থক সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বিশ্বসভায় বাংলাদেশ যেন এক অনন্য উচ্চতায় পৌঁছেছে। তবে উন্নয়নের ধারায় দেশ এগিয়ে গেলেও এ সময় দেশ পরিচালনায় সরকারকে অনেকটাই বেগ পেতে হয়েছে। দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা না থাকলেও উগ্রপন্থীদের তৎপরতায় খানিকটা হোঁচট খেতে হয়েছে সরকারকে। তারপরও কঠোর পদক্ষেপের কারণে উগ্রবাদ দমনে সরকার অনেকটাই সফল। তবে এ সময় অর্থনৈতিকভাবে দেশ এগিয়ে গেলেও গণতন্ত্রের বিষয়ে যেন ছিল আগের মতোই উদাসীন। সরকারের দমন-পীড়ন ও নানা চাপের কারণে বিরোধী মতাদর্শের রাজনৈতিক দলগুলোর উন্মুক্ত সভা-সমাবেশ যেন অদৃশ্য ছিল আগের মতোই। 
২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি বিরোধী জোটহীন ‘একতরফা’ নির্বাচনের মাধ্যমে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ আসন পেয়ে দ্বিতীয় মেয়াদে সরকার গঠন করে শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার। সরকারের তিন বছর পূর্তিতে গত বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ভাষণে তিনি সরকারের নানা উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরেন। 
তিন বছর পূর্ণ করে চতুর্থ বছরে পা রাখা শেখ হাসিনা সরকার আগের দুই বছরের ধারাবাহিকতায় উন্নয়নের ধারা বজায় রাখতে সক্ষম হয়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের হার নেমে এসেছে সাড়ে ২৩ শতাংশে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে অতি দারিদ্র্যের হার এখন ১২ দশমিক এক শতাংশ। এ সময় মোট দেশজ আয়ে (জিডিপি) ৬ শতাংশের বাধা অতিক্রম করে প্রথমবারের মতো প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৭ দশমিক ১১ শতাংশ। মাথাপিছু আয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪৬৫ মার্কিন ডলারে। একসময় খাদ্যচাহিদা পূরণ ও বাজেট বাস্তবায়নে বিদেশী দাতাদের মুখের দিকে তাকিয়ে তাকতে হলেও খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ বাংলাদেশ এখন আর খাদ্য সহায়তা নেয় না। দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংকের সটকে পড়ার পরও পদ্মা সেতুর মতো বড় প্রকল্পের কাজ নিজস্ব অর্থায়নে চলছে। বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণের অপেক্ষায়। 
এক লাখ ১৩ হাজার ৯৬ কোটি টাকা ব্যয়ের রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র প্রকল্পটি এখন বাস্তবায়নের অপেক্ষায়। দেশে বিনিয়োগের পরিমাণ এখন পাঁচ লাখ ১৩ হাজার ৮৩৯ কোটি টাকা। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩০ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশে নেমেছে। বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ১৪ হাজার ৯৮০ মেগাওয়াট। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে সরকারের মনোযোগ ছিল অনেক বেশি। 
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, তৃতীয় বছরে বিদেশে সাত লাখ ৫৭ হাজার ৭৩১ জন কর্মীর কর্মসংস্থান হয়েছে। রফতানির পরিমাণ এখন ৩৪ দশমিক ২ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। আমদানির পরিমাণ ৪০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রবাসী আয় ১৪ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাজস্ব আয় দুই লাখ ৪২ হাজার ৭৫২ কোটি টাকায় উন্নীত। সাক্ষরতার হার ৬৩ দশমিক ২ শতাংশ। মোবাইল ফোন ব্যবহারকারীর সংখ্যা ১১ কোটি ৯ লাখ। 
দেশের বিপুল জনশক্তির কর্মের নিশ্চয়তা দিতে অবকাঠামো উন্নয়নে চলছে বিশাল কর্মযজ্ঞ। এসব প্রকল্পের কাজ শেষে দেশের চেহারা অনেকটাই পাল্টে যাবে বলে মনে করছেন সরকারের নীতিনির্ধারকেরা। চলতি বছরের মধ্যে পদ্মা সেতুর মূল কাঠামো গড়ে তুলতে কর্মযজ্ঞ চলছে নদীর দুই পাড় ঘিরে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের ভৌত অগ্রগতি ৪০ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। রাজধানীর যানজট নিরসনে মেট্রোরেল প্রকল্পের কাজ চলছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থা আধুনিকায়নের কাজ চলছে। ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক চার লেনে রূপান্তর করা হয়েছে। চার লেনের কাজ চলছে আরো কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে। গুরুত্বপূর্ণ রেলপথগুলো ডাবল ট্র্যাকে উন্নীতের কাজও চলছে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় প্রকল্প হিসেবে মাতারবাড়ী কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয়েছে। এর ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫ হাজার ৯৮৪ কোটি ৪৬ লাখ টাকা। ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের কাজও শুরু হয়েছে। রামপাল ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ প্রকল্পের উৎপাদনে আসার কথা রয়েছে ২০১৮ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে। জ্বালানি চাহিদা পূরণে মহেশখালীতে নির্মাণ হচ্ছে এলএনজি টার্মিনাল। কৃষিনির্ভরতা থেকে বেরিয়ে শিল্পভিত্তিক অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। 
সরকারের উন্নয়নমুখী নানা পদক্ষেপ দৃশ্যমান হলেও গণতন্ত্রের ব্যাপারে উদাসীনতা লক্ষণীয়। রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ উন্মুক্ত বিভিন্ন স্থানে ক্ষমতাসীন দল নির্বিঘেœ সভা-সমাবেশ করতে পারলেও পারছে না সরকারবিরোধীরা। হামলা-মামলা, জেল-জুলুমসহ সরকারের মারমুখী ও দমনমূলক আচরণে চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে তারা। বিভিন্ন মামলায় আদালতে নিয়মিত হাজিরা দিয়ে ব্যস্ত সময় পার করছেন বিরোধী জোটের প্রধান বেগম খালেদা জিয়া।
২০১৫ সালের শুরুতে টানা তিন মাস হরতাল-অবরোধ কর্মসূচি পালন করলেও তারপর থেকে দৃশ্যত কোনো আন্দোলন করতে পারেনি বিএনপি। প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশ করতে গেলে অনুমতি পাচ্ছে না দলটি। দলটির কর্মসূচি ঘিরে যেন এক ধরনের বিধিনিষেধ চলছে। দিবসভিত্তিক শান্তিপূর্ণ সমাবেশের ‘গ্যারান্টি’ দিয়েও মিলছে না অনুমতি। জানা যায়, বিগত তিন বছরে সাতবার সমাবেশের অনুমতি চাইলেও তা দেয়নি পুলিশ। সর্বশেষ এ বছরের ৫ জানুয়ারি ‘গণতন্ত্র হত্যা দিবস’ পালন করতে ৭ জানুয়ারি সোহরাওয়ার্দী উদ্যান বা নয়া পল্টন দলীয় অফিসের সামনে সমাবেশের অনুমতি চেয়েছিল বিএনপি; কিন্তু প্রশাসন চুপ থাকে। প্রতিবাদে সারা দেশে জেলা ও মহানগরে বিক্ষোভ কর্মসূচি ঘোষণা দেয় দলটি। কিন্তু ওই কর্মসূচিতে সরকারদলীয় লোকজন ব্যাপক আক্রমণ চালায়। বরিশালে প্রকাশ্যে বিএনপির নারী কর্মী ও নেত্রীদের হেনস্তা করা হয়েছে। এর আগে ৭ নভেম্বর ‘জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস’ উপলক্ষে সমাবেশ করতে ৭, ৮ ও ১৩ নভেম্বর অনুমতি চাইলেও পুলিশ কোনো সাড়া দেয়নি। ফলে সারা দেশে এবং মহানগরে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে দলটি। বাধার মুখে তা-ও পালন করতে পারেননি দলটির নেতাকর্মীরা। বিএনপির উন্মুক্ত সভা-সমাবেশে যেন একরকম অদৃশ্য নিষেধাজ্ঞা চলছে। 
তবে বিষয়টিকে নিরাপত্তাজনিত কারণ হিসেবে দাঁড় করছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং ক্ষমতাসীন দলের শীর্ষ নেতারা। তাদের কেউ কেউ আবার অন্য যুক্তি দাঁড় করিয়ে বলছেন, আসলে বিএনপির কোনো কর্মসূচি পালন করার মতো শক্তি এবং সাহস নেই। না হলে তারা বাধার মুখেও কর্মসূচি পালনের চেষ্টা করত। 
অন্য দিকে বিএনপি নেতারা বলছেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্র এবং জনগণকে মুখোমুখি হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। এই সরকার নিজেরা মুখে গণতন্ত্রের কথা বলে, আসলে তারা গণতন্ত্রের চর্চা করে না। এ কারণেই সমাবেশের অনুমতি দেয় না প্রশাসন। সরকার নিজেরা যেকোনো স্থানে সভা-সমাবেশ করতে পারলেও বিএনপির ক্ষেত্রে না। তারা উন্নয়নের ধুয়া তুলে দেশে নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্র চালু করেছে। কিন্তু জনগণ যখন ঠেকে যাবে তখন তো আর বসে থাকবে না।
এ দিকে বিগত তিন বছর উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ডে মনোযোগী থাকলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরকারকে বেশ হিমশিম খেতে হয়েছে। গত বছর গুলশানের হোলে আর্টিজানে উগ্রবাদী হামলায় বেশ কয়েকজন হতাহতের ঘটনায় বিশ্বব্যাপী নিন্দার ঝড় বয়ে যায়। এ ছাড়া বছরের শেষ দিকে গাইবান্ধায় নিজ বাসায় সরকারদলীয় একজন সংসদ সদস্য নৃশংসভাবে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন। এতে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। বিশেষ করে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগে এবং সরকারের প্রথম বর্ষপূর্তিকে কেন্দ্র করে সারা দেশে চরম অস্থিরতা এবং জ্বালাও-পোড়াওয়ের মধ্যেও এ ধরনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। এখন যেখানো বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো চরম কোণঠাসা অবস্থায় রয়েছে তখন একজন সংসদ সদস্য হত্যার ঘটনা সরকারের নীতিনির্ধারক এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্তাব্যক্তিদের ভাবিয়ে তুলেছে।
http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/187748