২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
১৫ বাংলাদেশির গ্রিস যাত্রা, ৪ জন কবরে
১৫ জানুয়ারি ২০১৭, রবিবার,
অনেক টাকা-পয়সা গেছে। নির্যাতনও হয়েছে তার ওপর। অনেকে বেঁচে গেছেন। কিন্তু সে আর বাঁচলো না। কথাগুলো বলতে বলতে কণ্ঠ ভারি হয়ে আসে মেহেরপুরের ইসলাম নগর গ্রামের জামিলা খাতুনের। বছর দুই আগে জামিলার ভাই ইব্রাহীম পাড়ি জমান যুদ্ধবিধ্বস্ত ইরাকে। এরপর দালালের খপ্পরে পড়ে সিদ্ধান্ত নেন গ্রিস যাওয়ার। আবারো মোটা অঙ্কের টাকা দেয়া হয় দালালদের। কিন্তু অবৈধপথে দেশটিতে পৌঁছানোর আগে সাগরেই মৃত্যু হয় ইব্রাহীমের। এখন তার ঠিকানা হয়েছে দেশটির থাসোস নামে একটি দ্বীপের কবরস্থানে। কিন্তু তার দাফনের বিষয়টি এখনো পরিবারের কেউ জানে না। মৃত্যুর সংবাদ পেলেও এখনো লাশের অপেক্ষায় রয়েছেন তারা। জামিলা খাতুন জানান, পরিবারের অনেক আর্থিক ক্ষতি হয়েছে। ভাইকেও হারিয়েছি। বাড়িতে বৃদ্ধ মা-বাবা সন্তান শোকে কাতর। শয্যাশায়ী। সন্তানের লাশ দেখে মরতে চান তারা। সে আশায় বুক বেঁধে আছেন আজও। জামেলা বলেন, জীবিত ভাইকে তো আর পাবো না, কিন্তু ভাইয়ের লাশটি অন্তত দেখতে চাই। এজন্য সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে যোগাযোগ করেছেন বলেও জানান তিনি। ইব্রাহীমের সঙ্গে মারা গেছেন আরো তিন বাংলাদেশি। তাদেরও একইসঙ্গে দাফন হয়েছে। এরা হলেন- টাঙ্গাইলের মো. আমিনুল ইসলাম, সৌরভ ও অজ্ঞাত এক ড্রাইভার। এছাড়া ১১ বাংলাদেশি গ্রিক কোস্ট গার্ডের হাতে আটক হয়ে বর্তমানে দেশটির নির্বাসন কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। গ্রিসের এথেন্সে অবস্থিত বাংলাদেশি দূতাবাস সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে। এ ব্যাপারে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে দূতাবাসের পক্ষ থেকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।       
নিহত ইব্রাহীমের বোন জামিলা জানান, দুই বছর আগে তার ভাই ইব্রাহীম ইরাক যান। ঢাকার একটি এজেন্সি সাড়ে ৫ লাখ টাকার বিনিময়ে তাকে ইরাকে নিয়ে যায়। কিন্তু যাওয়ার পর তাকে কোনো কাজ দেয়া হয়নি। এরপর কাজ পেতে দিতে হয়েছিল আরো ৬৫ হাজার টাকা। সবমিলে প্রায় ৭ লাখ টাকা খরচ করে কোনরকম একটা রোজগারের পথ পায়। কিন্তু পিছু ছাড়েনি দালালচক্র। বছর দেড়েক পর তাকে গ্রিসে পাঠানোর প্রলোভন দেখায়। স্বপ্ন দেখায় মোটা আয়-রোজগারের। আবারো তাদের ফাঁদে পা দেয় তার ভাই। এজন্য দালালের চাহিদা মতো পরিবারের কাছে আরো ৫ লাখ টাকা চায়। এই ৫ লাখের সঙ্গে নিজের আয় করা টাকা যোগ করে তুলে দেন দালালের হাতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রিস পৌঁছতে পারেনি তার ভাই। কাজে আসেনি কয়েক দফায় দালালদের দেয়া টাকা। সাগরেই জীবনাবসান ঘটেছে তার। পরিবারের অভিযোগ, দালালরা তার ওপর শারীরিক নির্যাতনও চালিয়েছে। নির্যাতনে তার মৃত্যু হয়েছে। তিনি আরো জানান, ইরাক যাওয়া ও পরবর্তীতে গ্রিসে যাওয়ার জন্য পরিরবারে কাছ থেকে প্রায় ১২ লাখ টাকা নিয়েছে। এ সব টাকাই জমিজমা বিক্রি করে দেয়া হয়।
দূতাবাস সূত্র জানায়, গত ২৫শে নভেম্বর এক চিঠিতে হেলেনিক রিপাবলিক (গ্রিস) এর সেন্ট্রাল পোর্ট অব কাভালার নিরাপত্তা অফিস দূতাবাসকে জানায়, গত ১৬ই নভেম্বর একটি ডিঙিতে করে অন্যদের সঙ্গে ১৫ বাংলাদেশি বৈধ কাগজপত্র ছাড়াই দেশটির থাসোস দ্বীপে প্রবেশের চেষ্টা করছিল। এ সময় গ্রিক কোস্ট গার্ড তাদের আটক করে। ১৫ বাংলদেশির মধ্যে ৪ জন অচেতন অবস্থায় ছিল। উদ্ধারের পর কাভালা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে জানা যায় আগেই ওই ৪ জন মারা গেছে। পরে তাদের ময়নাতদন্তের জন্য ডিএনএ নমুনা, ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে থাসোস দ্বীপের সটিরোস কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। এই চিঠি পাওয়ার পর এথেন্সস্থ বাংলাদেশ দূতাবাস ফোনে গ্রিক পোর্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে তাদের দুই কর্মকর্তাকে গত ২৯শে নভেম্বর ঘটনাস্থল এথেন্সের উত্তর কাভালায় পাঠায়। তারা সেখানে জীবিত ১১ বাংলাদেশির সঙ্গে কথা বলেন। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানিয়ে দূতাবাস ১লা ডিসেম্বর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে একটি চিঠি দিয়েছে। এতে উল্লেখ করা হয়েছে, মানবপাচারকারীরা এই ১৫ বাংলাদেশিকে বিভিন্ন রুট দিয়ে ডিঙিতে করে তুর্কিতে নিয়ে একসঙ্গে জড়ো করে। সেখান থেকে তারা তাদেরকে গ্রিসের অন্তর্ভুক্ত এজিয়ান সাগরের থসোস দ্বীপে পৌঁছানোর চেষ্টা করেন। গ্রিকের কোস্ট গার্ড তাদের ডিঙিসহ তাদেরকে আটক করে। এরপর তাদেরকে কাভালা জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে ৪ বাংলাদেশির মৃত্যু সম্পর্কে তারা নিশ্চিত হন। দূতাবাস জানায়, সম্ভবত তারা সাগরে ঠাণ্ডায় মারা যান। গ্রিক কর্তৃপক্ষ তাদের ময়নাতদন্তের জন্য ডিএনএ নমুনা এবং ফিঙ্গারপ্রিন্ট সংগ্রহ করে থাসোসের সতিরোস কবরস্থানে দাফন করে। জীবিত ১১ বাংলাদেশিকে ২৮শে নভেম্বর দেশটির ওরিসতিয়াদা নির্বাসন কেন্দ্রে পাঠানো হয়। দূতাবাস সূত্র জানায়, তারা ওই ১১ জনের সঙ্গে কথা বলে নিশ্চিত হয়েছেন যে তারা বাংলাদেশি। এরা হলেন- টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলার চামরীপথে পুর গ্রামের গফুর খানের ছেলে খোকন খান, ধনবাড়ি থানার ইসলামপুর গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে ছানোয়ার হোসেন, নাগরপুর থানার ডাকাইতমারা গ্রামের নুরুল ইসলামের ছেলে সোহেল রানা, কুষ্টিয়ার দৌলতপুর থানার গাছেরদের নতুনপাড়া গ্রামের রেজাউল প্রামাণিকের ছেলে আবদুর রাজ্জাক, কিশোরগঞ্জের বাজিতপুর থানার মিয়ারবন গ্রামের রাজু ভুঁইয়ার ছেলে ফারুক মোহাম্মদ, হোসেনপুর থানার টানশিবলা গ্রামের শামছুদ্দিন ফকিরের ছেলে জিয়া উদ্দিন, নেত্রকোনার পূর্বধলা থানার বাদিবিনা গ্রামের মকবুল হোসেনের ছেলে শাখাওয়াত হোসেন, মৌতাম গ্রামের আবদুল হেকিমের ছেলে জিয়াউর রহমান, মাদারীপুর জেলার হাজরাপুর গ্রামের শাহজান মাতবরের ছেলে হাবিবুল্লাহ টিটু এবং রাজবাড়ি জেলার চালদিয়া গ্রামের আকাশ আলী শেখের ছেলে মো. হাবিব। তারা দূতাবাস কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, তারা প্রত্যেকে গ্রিস যাওয়ার উদ্দেশ্যে বাংলাদেশী মানবপাচারকারীদেরকে ৮-১০ লাখ টাকা দিয়েছেন। দূতাবাস কর্মকর্তারা তাদের প্রত্যেকের ছবি তুলে তা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠান। গ্রিক কর্তৃপক্ষ মৃত ওই চার বাংলাদেশির ছবি পাঠিয়েছে। নির্বাসন কেন্দ্রের এই ভিকটিমরা দেশে ফিরতে চান। তারা তাদের দেশে যোগাযোগ করতে পারছেন না। কারণ তাদের সেল ফোন নিয়ে নেয়া হয়েছে।
এদিকে নির্বাসন কেন্দ্রে অবস্থানরত কুষ্টিয়া জেলার দৌলতপুর থানার আবদুর রাজ্জাকের ভাই তারেক জানান, ৩ বছর আগে তার ভাই ইরাকে গিয়েছিলো। সে সময় খরচ হয়েছিল ৫ লাখ টাকা। দেশটিতে যাওয়ার পর প্রথমদিকে তার কোনো কাজ ছিল না। এরপর সেখানে কাজ পাইয়ে দিতে দালালরা আরো ৫০ হাজার টাকা নিয়েছিল। তারপর থেকে প্রতিমাসে ৩৫ হাজর টাকা বাড়িতে পাঠাতো। ইরাক যাওয়ার আগে জমিজমা বন্ধক ও বিক্রি করে তাকে দেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেই ঋণ শোধ না হতেই গত ৩ মাস আগে সে আবারো বাড়িতে ৫ লাখ টাকা চায়। বলে, গ্রিস যাবে। সেখানে অনেক বেশি ইনকাম (আয়)। পরে অনেক কষ্টে আবারো ৪ লাখ টাকা যোগাড় করে দেয়া হয়। এসব টাকা বিকাশ ও ব্যাংকের মাধ্যমে দেয়া হয়েছিল। তারেক বলেন, পরে শুনেছি দালালরা তাকে অন্য জায়গায় বিক্রি করে দিয়েছে। পরে আরো দেড় লাখ টাকা দিয়ে তাকে ছাড়ানো হয়েছে। এরপর জানতে পারি গ্রিস যাওয়ার পথে সে আটক হয়েছে। বর্তমানে সে জেলে রয়েছে বলেও জানান আবদুর রাজ্জাকের ভাই তারেক। বলেন, জেল থেকে হয়তো ছাড়া পাবে। কিন্তু বাড়ি এসে কি করবে? মাথার ওপর দেনা। কীভাবে ভবিষ্যত চলবে? সে বাড়ি আসুক কেউই চায় না। আমরা চাই, সেখানে কাজ করুক। নির্বাসন কেন্দ্রের আরো কয়েকজনের পরিবারের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই মিলেছে। পরিবারের এই অবস্থায় তারা ফিরে না আসুক। তারা চান, সেখানে কাজ করুক। বাড়ির ঋণগুলো শোধ করার পর ফিরে আসতে চাইলে ফিরে আসুক। 
http://www.mzamin.com/article.php?mzamin=49166&cat=2/%E0%A7%A7%E0%A7%AB-%E0%A6%AC%E0%A6%BE%E0%A6%82%E0%A6%B2%E0%A6%BE%E0%A6%A6%E0%A7%87%E0%A6%B6%E0%A6%BF%E0%A6%B0-%E0%A6%97%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%B8--%E0%A6%AF%E0%A6%BE%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%B0%E0%A6%BE,-%E0%A7%AA-%E0%A6%9C%E0%A6%A8-%E0%A6%95%E0%A6%AC%E0%A6%B0%E0%A7%87