২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
ব্যর্থ অভ্যুত্থানের পর এরদোগানের চ্যালেঞ্জ: সহজ কথা
২০ জুলাই ২০১৬, বুধবার,
||আলফাজ আনাম||
২০ জুলাই ২০১৬,বুধবার, ০০:০০
জনগণের সমর্থন ও সাহসী রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিভাবে একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকাতে পারে, তার অভূতপূর্ব নজির স্থাপন করল তুরস্ক। বিশ্বরাজনীতির ইতিহাসে এমন ঘটনা বিরল। জনগণের এই প্রতিরোধ নিছক একটি সামরিক অভ্যুত্থান ঠেকানোর প্রয়াস নয়, নির্বাচিত সরকারকে টিকিয়ে রাখতে জনগণের বিপ্লবও বলা যায়। শুধু তুরস্ক নয়, গণতান্ত্রিক আন্দোলনে দেশে দেশে এর প্রভাব পড়বে এবং উদাহরণ হয়ে থাকবে। একই সাথে এতে আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে তুরস্কের গতিপথ বদলে যাওয়ার ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে।
সেনা-অভ্যুত্থান মোকাবেলায় গণ-অভ্যুত্থান
তুরস্কে যখন অভ্যুত্থান শুরু হয় তখন প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোগান ছিলেন অবকাশ যাপনে কৃষ্ণসাগরীয় দ্বীপ মারমারিসে। এখানে তিনি ফার্স্ট আর্মির কমান্ডার উমিত দানদারের মাধ্যমে সেনা-অভ্যুত্থানের খবর পান। দ্রুত তিনি যোগাযোগ করেন টেলিভিশন চ্যানেল সিএনএন টার্কের সাথে। আইফোনের একটি বিশেষ অ্যাপস ফেস টাইমের মাধ্যমে তিনি এক সংক্ষিপ্ত সাক্ষাৎকারে জনগণকে রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। একই সাথে জানিয়ে দেন, যারা অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত তাদের চড়া মূল্য দিতে হবে। জনগণকে তিনি ইস্তাম্বুল বিমানবন্দরের দিকে আসার আহ্বান জানিয়ে বলেন, আমিও সেখানে আসছি। এরপর তিনি হোটেল ত্যাগ করেন। এরদোগানের আহবানের অল্প সময়ের মধ্যে বিমানবন্দর এলাকায় লাখ লাখ লোকের সমাগম হয়। একপর্যায়ে বিমানবন্দর এলাকা থেকে সেনাসদস্যরা সরে যেতে বাধ্য হয়। এর মধ্যে মারমারিসের অবকাশ কেন্দ্রের যে হোটেলটিতে তিনি অবস্থান করছিলেন, সেখানে হামলা চালায় অভ্যুত্থানকারীরা। ততক্ষণে এরদোগানকে বহনকারী বিমান ইস্তাম্বুলে অবতরণ করেছে। তিনি সেখানে জনগণের সাথে কথা বলেন। তাদের বিক্ষোভ চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগে প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম পুলিশ প্রশাসনকে সক্রিয় করেন। তিনি সাধারণ মানুষ ও প্রশাসনকে এই বার্তা দেন, সেনা কমান্ডের বাইরে গিয়ে কিছু কর্মকর্তা অভ্যুত্থান ঘটাতে চাইছে। যেকোনো মূল্যে অভ্যুত্থানকারীদের দমন করতে হবে। অভ্যুত্থানকারীদের পুলিশ হেডকোয়ার্টারে গুলি ও বোমা বর্ষণে ২৪ জন পুলিশ কর্মকর্তা নিহত হন। অভ্যুত্থানকারীদের দ্বিতীয় টার্গেট ছিল পার্লামেন্ট ভবন। যেখানেও বোমা বর্ষণ করা হয়। এ ছাড়া ক্ষমতাসীন একে পার্টির অফিস, রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন কেন্দ্রসহ বহু সরকারি অফিস অভ্যুত্থানকারীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু ছিল। প্রেসিডেন্টের আহ্বানে শুধু ইস্তাম্বুল বা আঙ্কারা নয়, সারা দেশের মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। মাত্র দুই ঘণ্টার মধ্যে অভ্যুত্থানকারীরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। বিভিন্ন স্থান থেকে সেনাসদস্যদের আটক করতে থাকে পুলিশ। সাধারণ মানুষও সেনাসদস্যদের আটক, এমনকি চড়াও হওয়ার ঘটনা ঘটে। তুরস্কের প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম এই অভ্যুত্থানে ২০৮ জন লোক নিহত হওয়ার তথ্য জানিয়েছেন। এর মধ্যে ৬০ জন পুলিশ অফিসার, তিন জন সৈন্য, ১৪৫ জন বেসামরিক লোক। ২৪ জন অভ্যুত্থানকারী নিহত হয়েছে।
অভ্যুত্থান ব্যর্থ হওয়ার পর তুরস্কের পরিস্থিতি কোন দিকে যায় তা নিয়ে এখন বিশ্লেষণ চলছে। সব বিশ্লেষক একমত যে, এরদোগান এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ক্ষমতা আরো সংহত করবেন। রাষ্ট্র পরিচালনায় তার কর্তৃত্ব আরো বাড়বে। এই অভ্যুত্থানের সাথে তিনি সরাসরি জড়িত থাকার অভিযোগ এনেছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ধর্মীয় নেতা ফতেউল্লাহ গুলেনকে। সেনাবাহিনী থেকে বিদ্রোহীদের শিকড় উৎপাটন করা হবে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেছেন এই অভ্যুত্থান হয়তোবা আল্লাহর রহমত। এর মাধ্যমে সেনাবাহিনী ও প্রশাসনকে তিনি পরিচ্ছন্ন করার সুযোগ পেয়েছেন। লক্ষণীয় বিষয় হলো, বিরোধী কোনো রাজনৈতিক দলকে তিনি দায়ী করেননি। বরং অভ্যুত্থান প্রতিরোধে সরকারকে সমর্থন দিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলো।
জাতীয় ঐকমত্য
তুরস্কে সেনা-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে জাতীয় ঐক্য। প্রেসিডেন্ট এরদোগান বিরোধী দল রিপাবলিকান পিপলস পার্টি (সিএইচপি) ও ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টির (এমএইচপি) প্রধানকে টেলিফোন করে সেনা-অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান। একই সময় তিনি পার্লামেন্টের স্পিকারের সাথে কথা বলেন। গণতন্ত্র রায় পার্লামেন্ট সদস্যদের ভূমিকার প্রশংসা করেন। অবশ্য প্রেসিডেন্টের ফোনের আগে ঐক্য প্রকাশ করে তুরস্কের সব রাজনৈতিক দল। জরুরি অধিবেশন আহ্বান করা হয় তুরস্কের পার্লামেন্ট দ্য গ্রান্ড ন্যাশনাল অ্যাসেম্বলির। অধিবেশন চলাকালে এর বাইরে সব রাজনৈতিক দলের হাজার হাজার সাধারণ মানুষ অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে স্লোগান দিতে থাকে। অভ্যুত্থান চেষ্টার বিরুদ্ধে যৌথ বিবৃতি প্রকাশ করা হয়। এতে সম্মতি ছিল পার্লামেন্টের চারটি দলের। প্রধানমন্ত্রী বিনালি ইলদিরিম জোর দিয়ে বলেছেন, যারা জাতির বড় তি করার জন্য অভ্যুত্থান চেষ্টা করেছিল, উপযুক্ত শাস্তি তাদের পাওনা। শনিবার ছিল এমন একটি দিন যেদিন তুরস্কের সব রাজনৈতিক দল অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সবাই পার্লামেন্টে যে সহযোগিতা দেখিয়েছে তাতে নতুন করে আমাদের যাত্রা শুরু হবে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর পার্লামেন্টে বক্তব্য রাখেন রিপালিকান পিপলস পার্টির চেয়ারম্যান কামাল কিলিকদারোগলু। তিনি অভ্যুত্থান চেষ্টার তীব্র নিন্দা জানান। অভ্যুত্থান চেষ্টার নিন্দা করেছেন ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্ট পার্টি চেয়ারম্যান ডেভলেট বাহসেলি। তিনি অভ্যুত্থান চেষ্টাকে সন্ত্রাসী হামলা বলে আখ্যায়িত করেন। পিপলস ডেমোক্র্যাটিক পার্টির ডেপুটি গ্রুপ চেয়ারম্যান ইদ্রিস বালুকেন তীব্র ভাষায় অভ্যুত্থান চেষ্টার নিন্দা জানান।
অপর দিকে অভ্যুত্থানের পর প্রেসিডেন্ট এরদোগানের দল একে পার্টির ঐক্যবদ্ধ ভূমিকা পালনের প্রচেষ্টাও ছিল লক্ষণীয়। অভ্যুত্থানে নিহতদের শোকসভায় তার পাশে সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুল্লাহ গুলকে দেখা গেছে। অভ্যুত্থানের পর দিন জনসমাবেশে এরদোগানের পাশে ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী আহমেদ দাভোতুগলু। তিনি জনসভায় অভ্যুত্থান দমনে সহযোগিতার জন্য দাভোতুগলুর প্রশংসা করেছেন। এরদোগানের সাথে মতবিরোধের কারণে এ দুই নেতা তাদের পদ ছেড়ে দিয়েছেন বলে মনে করা হয়।
নেপথ্যে ফতেউল্লাহ গুলেন
যুক্তরাষ্ট্রে স্বেচ্ছা নির্বাসনে থাকা বিতর্কিত ধর্মীয় নেতা ফতেউল্লাহ গুলেনের বিরুদ্ধে এরদোগান দীর্ঘ দিন ধরে অভিযোগ করছেন যে, তার অনুসারীরা রাষ্ট্রের মধ্যে আরেকটি রাষ্ট্র কায়েম করেছে। এরা সরকার উৎখাতের ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। গুলেন মুভমেন্ট বা হিজমত শক্তিশালী সামাজিক আন্দোলন। তুরস্কের সেনাবাহিনী, বিচার বিভাগ ও গণমাধ্যমে এর ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত ফতেউল্লাহ গুলেন এই আন্দোলনের প্রবক্তা। সারা দেশে এবং দেশের বাইরে গুলেন মুভমেন্টের অসংখ্য স্কুল রয়েছে। এসব স্কুল থেকে গুলেনের অনুসারী মেধাবী প্রজন্ম বের হয়েছে। যারা সরাসরি রাজনীতি না করেও রাষ্ট্রকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা রাখে। এরদোগান প্রথম দফা ক্ষমতায় আসার পর ফতেউল্লাহ গুলেনের সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল। তার পরামর্শ অনুযায়ী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে গুলেনের অনুসারীদের বসানো হয়। এখন যে তিন হাজারের মতো বিচারককে অপসারণ করা হয়েছে, এদের এরদোগানের শাসনের প্রথম দিকে গুলেনের পরামর্শে গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। এরদোগানের সাথে গুলেনের এই বিরোধ প্রকাশ্যে আসে যখন এরদোগানের কেবিনেটের চার মন্ত্রী ও পুত্রের বিরুদ্ধে গুলেনপন্থী প্রসিকিউটররা দুর্নীতির অভিযোগ আনেন। গেজি পার্ক নিয়ে আন্দোলনের সময় গুলেনপন্থীরা আন্দোলনকারীদের সমর্থন দিয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। এ ছাড়া একে পার্টির রাজনৈতিক নেতৃত্বের চেয়েও প্রশাসনিকভাবে গুলেনপন্থীরা নানাভাবে সামনে চলে আসেন। ফলে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর চেয়ে একে পার্টির জন্য চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় গুলেনপন্থীরা। ফতেউল্লাহ গুলেন ১৯৯৯ সাল থেকে যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করলেও তুরস্কে তার প্রভাব কোনো অংশে কম ছিল না। অভ্যুত্থানের পর ফতেউল্লাহ গুলেন পেনসিলভানিয়ায় তার বাড়িতে সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, তিনি কোনোভাবেই এই অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত নন। তিনি মন্তব্য করেন পুরো প্রক্রিয়াটি এরদোগানের সাজানো নাটক।
অভিযোগ যাদের বিরুদ্ধে
অভ্যুত্থানের সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে তুরস্কজুড়ে এখন অভিযান চলছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, অভ্যুত্থানে জড়িতরা কে কিভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং সফল হলে কে কোন পদ পাবেন তার কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্যপ্রমাণ তারা পেয়েছেন। অভ্যুত্থানের অন্যতম প্রধান হিসেবে দেশটির বিমানবাহিনীর সাবেক কমান্ডার এবং বর্তমানে সুপ্রিম মিলিটারি কাউন্সিলের সদস্য আকিন ওজতুককে চিহ্নিত করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে এই মাস্টার মাইন্ডের সাথে ইসরাইলের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ ছিল। তিনি ১৯৯৬ সাল থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ইসরাইলে তুরস্কের মিলিটারি অ্যাটাশে হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। ইসরাইলি বামপন্থী পত্রিকা হারেৎজ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা আনাদুলোর সর্বশেষ তথ্যে বলা হচ্ছে, ১০৩ জন জেনারেল ও অ্যাডমিরালকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে। এ ছাড়া ৪১ জন ঊর্ধ্বতন সেনাকর্মকর্তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এর মধ্যে সেকেন্ড আর্মি কমান্ডার জেনারেল আদেমি হুদেতি, মালাতিয়া গ্যারিসন কমান্ডার আভনি আনজুম এবং তুরস্কের দক্ষিণাঞ্চলের একটি সামরিক বিমানঘাঁটির দায়িত্বে থাকা এক ব্রিগেডিয়ার পর্যায়ের কর্মকর্তাকে আটক করা হয়েছে। এই বিমানঘাঁটিটি সিরিয়ায় আইএসের ওপর বিমান হামলায় ন্যাটো ব্যবহার করে থাকে। প্রেসিডেন্ট এরদোগানের সামরিক সচিবের বিরুদ্ধেও অভ্যুত্থানে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলছে, অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্টতার কারণে আট হাজার ৭৭৭ জন পুলিশ কর্মকর্তাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। এর আগে দুই হাজার ৭৪৫ জন বিচারককে বরখাস্ত করা হয়। আটক আছেন তিন হাজারের বেশি সেনাসদস্য।
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে টানাপড়েন
সেনা-অভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে তুরস্কের টানাপড়েন চলছে। যুক্তরাষ্ট্র এরদোগানের পতন চেয়েছিল কিংবা সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন সমর্থন ছিল কি না তা নিয়ে এখন নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র এক ধরনের নিরপেক্ষ অবস্থান নিয়ে সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছিল। অভ্যুত্থান শুরু হওয়ার প্রথম দুই ঘণ্টায় আন্তর্জাতিক মহল বিশেষ করে ইউরোপীয় দেশগুলো ‘দেখি কী হয়’ নীতি গ্রহণ করে। যখন নিশ্চিত হয় অভ্যুত্থান ব্যর্থ হচ্ছে তখন এরদোগানের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। এখন তুরস্ক সরাসরি যখন ফতেউল্লাহ গুলেনকে ফেরত পাঠানোর জন্য চাপ দিচ্ছে, তখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যথাযথ তথ্যপ্রমাণ ছাড়া তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে। তুরস্কের একজন মন্ত্রী এই অভ্যুত্থানের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সম্পৃক্ততা আছে বলেও ইঙ্গিত করেছেন।
সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন থাক বা না থাক, এরদোগানের পতন অনেকের কাম্য ছিল। এরদোগানের পতন হলে তার পরিণতি যে মিসরের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মুরসির মতো হতো এবং জেনারেল সিসির মতো তুর্কি জেনারেলদের সাথে তারা কাজ করত তা নিশ্চিত করে বলা যায়। সেনা-অভ্যুত্থান নিয়ে মার্কিন গণমাধ্যমের বিশ্লেষণে এরদোগানের ওপর মার্কিন ক্ষোভের বিষয়টি ফুটে উঠেছে। অভ্যুত্থানের ব্যর্থতায় হতাশা জানিয়ে ফক্স নিউজে কলাম লিখেছেন সাবেক সেনাকর্মকর্তা ফিলিপ পিটার্স। টার্কিস লাস্ট হোপ ডাই (Turkey\'s last hope dies) শিরোনামে কলামে তিনি কোনো রাখঢাক ছাড়াই বলেছেন, ‘যদি এ সেনা-অভ্যুত্থান সফল হতো, তাহলে ইসলামিস্টদের পরাজয় এবং আমাদের জয় হতো।
মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র বেশ কয়েকজন সাবেক কর্মকর্তার প্রকাশ্যে মন্তব্য ও অভ্যুত্থানের হোতাদের উৎসাহ দেয়ার এ ঘটনায় মার্কিন ভূমিকা কেমন হতে পারে, সে ব্যাপারে স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে। মার্কিন টিভি চ্যানেল সিএনএন অভ্যুত্থান চলাকালে সিআইএ’র সাবেক তিন কর্মকর্তার বক্তব্য প্রচার করে, তাদের তিনজনই প্রত্যক্ষ এবং পরোভাবে সেনা-অভ্যুত্থান সমর্থন করে বক্তব্য রাখেন। তাদের মধ্যে একজন হলেন রবার্ট বায়ের, যিনি নিজেই লাইভ টিভিতে দাবি করেছেন তিনি বহু দেশে সেনা-অভ্যুত্থানের সাথে জড়িত ছিলেন। আর তার সেই অভিজ্ঞতা থেকেই বর্ণনা করেন, তুরস্কের গত শুক্রবারের অভ্যুত্থানকারীরা অতটা পেশাদার নয়। তিনি বলেন, ‘সেনাদের উচিত ছিল প্রথমেই সিএনএন টার্ক বন্ধ করে দেয়া। এ ছাড়া সামাজিক মাধ্যম এবং ইন্টারনেট ও রেডিও স্টেশনগুলো বন্ধ করে প্রেসিডেন্ট এরদোগানকে গ্রেফতারের চেষ্টা করা উচিত ছিল।’ সিআইএ’র সাবেক ডিরেক্টর জেমস উসলিও হতাশা প্রকাশ করেন অভ্যুত্থান সফল না হওয়ায়। ওয়াশিংটন পোস্ট এক রিপোর্টে বলছে, মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী জন কেরি বলেছেন, অভ্যুত্থানের পর যেভাবে ধরপাকড় চলছে, তাতে তুরস্কের ন্যাটোর সদস্যপদ থাকার ভিত্তি ধ্বংস করছে। অবশ্য তুরস্কে মার্কিন দূতাবাসের একজন কর্মকর্তা বলেছেন, জন কেরি এমন কোনো মন্তব্য করেননি।
বিদেশনীতিতে পরিবর্তনের ইঙ্গিত
এই অভ্যুত্থানের পর এরদোগান অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে তার অবস্থান যেমন সংহত করবেন, তেমনি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে দরকষাকষি বাড়াবেন। এরদোগানের বিদেশনীতিতে কিছুটা পরিবর্তনের ইঙ্গিতও পাওয়া যাচ্ছে। আরব বসন্ত-পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহে এরদোগান মার্কিন ভূমিকায় যথেষ্ট ক্ষুব্ধ। ওয়াশিংটনের আগ্রহে সিরিয়া যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ে তুরস্ক। অথচ বাশার আল আসাদের সাথে এক ধরনের পারিবারিক সম্পর্ক ছিল এরদোগানের। তা সত্ত্বেও মার্কিন পরিকল্পনায় তুরস্ক আসাদ সরকারকে সরিয়ে দেয়ার আন্দোলনে সমর্থন দিয়েছিলেন। মিসরের নির্বাচিত মুসলিম ব্রাদারহুডের সরকারকে সরাতে সেনা-অভ্যুত্থানের পর মার্কিন নীতিতে এরদোগান ছিলেন হতাশ। এ ছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো এখন কুর্দি বিচ্ছিন্নতাবাদীদেরও সমর্থন দিচ্ছে। তুরস্ক এখন সিরিয়া প্রশ্নে মার্কিন পরিকল্পনার বাইরে আপস রফায় যেতে পারে। সম্ভবত এই লক্ষ্য সামনে রেখে ইতোমধ্যে রাশিয়ার সাথে সম্পর্কোন্নয়ন করছে তুরস্ক। অভ্যুত্থানের পর প্রথম রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এরদোগানকে ফোন করেছেন। আগামী মাসে পুতিনের সাথে তার বৈঠক হবে।
অপর দিকে ব্রেক্সিটের পর ইউরোপীয় দেশগুলোর অর্থনৈতিক পরিস্থিতি যেদিকে মোড় নিচ্ছে, তাতে তুরস্ক ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়ার ব্যাপারে আগের মতো আগ্রহী নাও হতে পারে। তুরস্ক খুব ভালোভাবে জানে, ইউরোপের নিরাপত্তার জন্য সামরিক জোট ন্যাটো গঠন করা হয়েছে। তুরস্ককে বাদ দিলে ন্যাটো আরো দুর্বল হবে। ইউরোপের দেশগুলো তাদের স্বার্থে ভূকৌশলগত অবস্থানের কারণে তুরস্কের সাথে সম্পর্ক বহাল রাখবে। এ ছাড়া তুরস্কের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য রাশিয়ার সাথে সম্পর্ক বাড়ানো জরুরি। তুরস্কের গ্যাসের প্রধান চাহিদা পূরণ করে রাশিয়া। এ ছাড়া রাশিয়ার সহযোগিতায় দেশটিতে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করা হচ্ছে। তুরস্কের রফতানি ও পর্যটন খাতের বড় আয় আসে রাশিয়া থেকে।
সামনে অনেক চ্যালেঞ্জ
দেড় দশকের শাসনে প্রেসিডেন্ট এরদোগান প্রকৃতপক্ষে একজন সুলতান হিসেবে সামনে চলে এসেছেন। তুরস্কের মানুষ তার এই আকাক্সার বিরুদ্ধে অবস্থান নেননি। এর বড় কারণ অতীতে সেকুলার সরকারগুলো অর্থনৈতিক সাফল্য যেমন দেখাতে পারেনি, তেমনি তারা আকণ্ঠ দুর্নীতিতে নিমজ্জিত ছিল। কিন্তু একে পার্টির সরকারের বিরুদ্ধে দুর্নীতির কোনো অভিযোগ ওঠেনি। অর্থনৈতিক উন্নতি বিশেষ করে কর্মসংস্থান বেড়েছে। এরদোগানের ইসলামি অনুশাসন প্রতিষ্ঠার আগ্রহ নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে তীব্র সমালোচনা করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, তুরস্কের সাধারণ মানুষের বিরাট একটি অংশ ইসলামি অনুশাসন সানন্দে মেনে চলছে। যারা মানছেন না, তারা কোনোভাবে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন না। পশ্চিমা বিশ্ব কিংবা ইসলামবিদ্বেষী সেকুলাররা তুরস্কের অতীত বিবেচনায় নিচ্ছেন না বলে এমনটি ভাবছেন। কারণ প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে তুরস্কের ইতিহাস শুরু হয়নি। তুরস্কের উসমানীয় শাসনের ঐতিহ্য সমাজে আগেও ছিল, এখনো আছে। অরখান থেকে ষষ্ঠ মাহমুদ (১২৯৯-১৯২৩) প্রায় ৭শ’ বছর উসমানীয় শাসকেরা উত্তর আফ্রিকা থেকে পূর্ব ইউরোপ পর্যন্ত শাসন করেছে। উসমানীয় শাসকরা তুরস্কের ইতিহাসের অংশ এবং সাধারন মানুষের কাছে এই শাসনকাল গৌরবের। মনে রাখতে হবে, কামাল আতাতুর্কের ইতিহাস শুধু তুরস্কের ইতিহাস নয়। কিন্তু তুর্কিরা মোস্তাফা কামালের ভূমিকাকে ভুলে যাননি। তাকেও মর্যাদার আসনে রেখেছেন। এ কারণে ইউরোপ এরদোগানকে সুলতান বলে যতই ব্যঙ্গ করুক সুলতানদের মর্যাদা তুরস্কের সাধারণ মানুষের কাছে ভিন্ন।
তবে এ কথাও সত্য জনগণের প্রতিরোধের মুখে অভ্যুত্থান প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও এরদোগানের জন্য সামনে এগিয়ে চলার পথ সহজ হবে না। গুলেনপন্থীদের সরানোর জন্য তিনি দেশজুড়ে অভিযান চালাচ্ছেন। ইতোমধ্যে ৯ হাজারের বেশি লোককে আটক করা হয়েছে। বিপুল লোকের চাকরিচ্যুতি ও গ্রেফতার এক ধরনের শূন্যতা তৈরি করবে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযান সেনা নেতৃত্বের ওপর বিরাট প্রভাব পড়বে। দেশকে অস্থিতিশীল করতে গোপন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড বাড়তে পারে। এমনকি টার্গেট কিলিং ও আত্মঘাতী বোমা হামলার মাধ্যমে অস্থিরতা বাড়ানো হতে পারে। এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা বিরাট এক চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দেবে। এরদোগান মৃত্যুদণ্ড ফিরিয়ে আনার জন্য আইন পরিবর্তনের কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন। কিন্তু বিরোধী দলগুলো তার সাথে একমত হবে না। ফলে বিরোধী দলগুলোর সাথে যে ঐক্য তৈরি হয়েছে তা নড়বড়ে হতে পারে। এরদোগানের ডাকে জনগণ রাস্তায় নেমে আসার মাধ্যমে তিনি জনপ্রিয়তার প্রমাণ দিলেও ব্যাপক ধরপাকড়ের মাধ্যমে ধীরে ধীরে তার বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ তৈরি করতে পারে। আর এতে বিদেশী সমর্থনের কোনো অভাব হবে না। এরদোগান অবশ্যই তুরস্কের সবচেয়ে জনপ্রিয় শাসকদের একজন। কিন্তু একই সাথে তাকে ন্যায়বিচারের বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। এখন এই ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে তার জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। প্রতিহিংসার মনোভাব তাকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যেতে পারে। ইতোমধ্যে ইউরোপীয় দেশগুলো ন্যায় বিচার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করতে তাকে সতর্ক করে দিয়েছে। আগামীতে এসব দাবি আরো জোরদার হবে। প্রকৃতপক্ষে এখন তার পাশে দরকার আবদুল্লাহ গুল বা দাভতুগুলোর অভিজ্ঞ ও প্রজ্ঞাবান রাজনৈতিক নেতৃত্বের। এই সঙ্কট কাটিয়ে উঠতে পারলে অবশ্যই এরদোগান ও তুরস্ক আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে আরো জোরালো ভূমিকা পালন করতে পারবে।
alfazanambd@yahoo.com
- See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/137275#sthash.NkVkjmt2.dpuf