১১ ডিসেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর
৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬, সোমবার,
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য, দেশের বিশিষ্ট ব্যবসায়ী ও সমাজসেবক মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড গত শনিবার রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে কার্যকর করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মিডিয়ায় প্রকাশিত খবর এখানে তুলে ধরা হলো। 
বিবিসির খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের বৃহত্তম ইসলামী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামীর প্রভাবশালী নেতা ও মিডিয়া টাইকুন মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে ও পরে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। পরে তার লাশ মানিকগঞ্জে নিয়ে যাওয়া হয় দাফনের জন্য। আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে স্বাধীনতাযুদ্ধকালে অপহরণ করে নির্যাতন ও একজন তরুণ মুক্তিযোদ্ধাকে হত্যার অভিযোগ আনা হয়। তার এক মেয়ে তাহেরা তাসনিম বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেছেন, ‘তিনি সব সময়ই নিজেকে নির্দোষ দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, তাকে অযৌক্তিকভাবে হত্যা করা হচ্ছে।’ শনিবার রাতে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার কয়েক ঘণ্টা আগে পরিবারের সদস্যদের সাথে কারাগারে গিয়ে পিতার সাথে শেষ দেখা করার পর তিনি এ কথা বলেন।
বিবিসি বাংলার খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর জামায়াত নেতা মীর কাসেম আলীর লাশ কড়া পুলিশি পাহারায় মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে দাফন করা হয়েছে। সেখানকার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম বিবিসিকে জানিয়েছেন, ভোররাত পৌনে ৪টার দিকে পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে দাফন সম্পন্ন হয়। সেখানে নামাজে জানাজায় তার পরিবারের উপস্থিত সদস্যরা অংশ নেন।
শনিবার রাত সাড়ে ১০টার দিকে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগার থেকে কড়া পুলিশি পাহারায় তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় মানিকগঞ্জে। এর প্রতিবাদে জামায়াতে ইসলামী তাদের দলীয় ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সোমবার দেশব্যাপী সকাল ছয়টা থেকে বেলা ২টা পর্যন্ত অর্ধদিবস হরতাল ডেকেছে।
রাত সাড়ে ১২টার দিকে তিনটি অ্যাম্বুলেন্স বেরিয়ে আসে কাশিমপুর কারাগার থেকে। এর একটিতে ছিল মীর কাসেম আলীর লাশ। অ্যাম্বুলেন্সগুলোর সামনে পেছনে ছিল পুলিশ-র্যা বের গাড়ি। গাড়ির বহরে দমকল বাহিনীরও একটি গাড়ি ছিল। সেখান থেকে এই বহর রওনা দেয় মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার চালা গ্রামের উদ্দেশে। মীর কাসেম আলীর বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামে হলেও তার পৈতৃক বাড়ি মানিকগঞ্জের হরিরামপুরে।
লাশ নেয়ার পথে কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন আর রশিদ বলছিলেন, পথে যাতে কেউ কোনো সমস্যা তৈরি করতে না পারে, সে জন্য এই নিরাপত্তা নেয়া হয়েছে। রাত পৌনে ১০টার দিকে গাজীপুরের জেলা প্রশাসক এবং সিভিল সার্জন ও কারা কর্তৃপরে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কারাগারের ভেতরে যান। রাত পৌনে ১১টার দিকে জেল সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক সাংবাদিকদের কাছে এসে ফাঁসি কার্যকর করার কথা জানান আনুষ্ঠানিকভাবে।
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর মীর কাসেম আলীর পরিবারের প থেকে কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তার পরিবারের একজন সদস্য জানিয়েছেন, আইনশৃঙ্খলা রাকারী বাহিনীর সদস্যরা তাদের বাসায় অবস্থান নিয়েছিলেন এবং তাদের বাইরের কারো সাথে কথা বলতে দেননি। তবে ফাঁসি কার্যকরের আগে কারাগারে শেষ দেখা করার পর মীর কাসেম আলীর স্ত্রী খন্দকার আয়েশা খাতুন বিবিসিকে ুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন। 
আল জাজিরার খবরে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় বিভিন্ন অপরাধের অভিযোগে একটি বিতর্কিত যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের রায়ে মৃত্যুদণ্ড দেয়ার পর জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ নেতা মীর কাসেম আলীর ফাঁসি শনিবার রাতে কার্যকর করা হয়েছে। এর আগে মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মীর কাসেম আলীর রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। কিন্তু তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে মার্জনা চেয়ে কোনো আবেদন করেননি। ফলে তার দণ্ড কার্যকর করার ক্ষেত্রে আর কোনো বাধা ছিল না। দেশটির আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, শনিবার রাত ১০টা ৩৫ মিনিটে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। গাজীপুর পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা রাসেল শেখ বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, মীর কাসেম আলীর সমর্থকেরা সহিংসতা সৃষ্টি করতে পারে এমন আশঙ্কায় মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। গাজীপুর জেলায় এক হাজারেরও বেশি পুলিশ মোতায়েন করা হয়। 
বাংলাদেশ বিষয়ক ভাষ্যকার ও আইনজীবী তালহা আনমাদ আলজাজিরাকে বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামীর অন্য নেতাদের চেয়ে মীর কাসেম আলী ছিলেন ভিন্ন ধারার একজন মানুষ। তিনি ছিলেন একজন খ্যাতিমান সমাজসেবী, অত্যন্ত সফল একজন ব্যবসায়ী এবং এমন মানুষ যিনি মুক্ত গণমাধ্যম তৈরিতে অনেক কাজ করেছেন এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠী বিশেষ করে শরণার্থীদের নিয়ে অনেক কাজ করেছেন।’ 
তালহা আনমাদ আরো বলেন, ‘জামায়াতের রাজনীতিবিদদের মধ্যে তিনি ছিলেন এমন বিরল গুণাবলির অধিকারী, যিনি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের কাছে পৌঁছতে সক্ষম হয়েছিলেন। এটাই প্রতীয়মান হয়েছে যে, যে বা যিনি বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে বুদ্ধিবৃত্তিক ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিতে সক্ষম সরকার তার বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নিচ্ছে। সরকার সাম্প্রতিক সময়ে এতটাই কর্তৃত্বপরায়ণ হয়ে উঠেছে যে, তারা বিরোধীদের কোনো কর্মকাণ্ডই সহ্য করতে পারছে না সেটা জামায়াত বা অন্য যে কোনো দলই হোক না কেন।’
তুরস্কের আনাদোলু বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী ও জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ নেতা মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড শনিবার রাতে কার্যকর করা হয়েছে। কাশিমপুর কারাগারের সিনিয়র সুপার প্রশান্ত কুমার বণিক সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন, স্থানীয় সময় রাত সাড়ে ১০টায় ফাঁসি কার্যকর করা হয়েছে। এ জন্য কারাগারের চারপাশসহ গাজীপুর জেলায় সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেয়া হয়। এর আগে গত ৩০ আগস্ট মঙ্গলবার সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ মৃত্যুদণ্ডের রায়ের বিরুদ্ধে করা রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেন। এরপর শেষ পন্থা ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে মার্সি পিটিশন করা কিন্তু মীর কাসেম আলী তা করেননি। 
আনাদোলুর খবরে আরো বলা হয়, পাকিস্তান ‘ত্রুটিপূর্ণ’ বিচারের মাধ্যমে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার নিন্দা জানিয়েছে। পাকিস্তানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, ‘ত্রুটিপূর্ণ বিচারের মাধ্যমে বিরোধীদের দমন করার কর্মকাণ্ড গণতান্ত্রিক চেতনার সম্পূর্ণ পরিপন্থী। (মীর কাসেম আলীর) বিচারের শুরু থেকেই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠন, মানবাধিকার গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ের আইন বিশেষজ্ঞরা বিচারপ্রক্রিয়া নিয়ে বিশেষ করে বিচারের সুষ্ঠু ও স্বচ্ছতা, বিবাদি আইনজীবী ও সাক্ষীদের হয়রানির বিষয়গুলো নিয়ে বার বার আপত্তি জানিয়েছেন। পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামি, করাচিভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস নেটওয়ার্ক ছাড়াও পাকিস্তান হিউম্যান রাইটস কমিশনের সাবেক জেনারেল সেক্রেটারি আসমা জাহাঙ্গির মীর কাসেম আলীর ফাঁসি কার্যকরের সমালোচনা করেছেন। 
পাকিস্তানের জিও টিভির খবরে বলা হয়েছে, মানবাধিকার সংগঠনগুলো বরাবরই অভিযোগ করে আসছিল যে, মীর কাসেম বিচারপ্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়নি। কিন্তু বাংলাদেশ সরকার সবসময়ই এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে। 
ভারতের এনডিটিভি, টাইমস অব ইন্ডিয়া, দ্য হিন্দু, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসসহ বিভিন্ন প্রভাবশালী মিডিয়ার খবরেও মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। টাইমস অব ইন্ডিয়ার খবরে বলা হয়েছে, আপিল বিভাগ রিভিউ আবেদন খারিজ করার পর সর্বশেষ পদক্ষেপ ছিল রাষ্ট্রপতির কাছে মার্জনা চাওয়া। কিন্তু মীর কাসেম আলী তা না চাওয়ায় তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে আর কোনো বাধা ছিল না। দ্য হিন্দুর খবরে বলা হয়েছে, জাতিসঙ্ঘের মানবাধিকার বিশেষজ্ঞদের একটি গ্রুপ মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড রদ করে আন্তর্জাতিক আইনের মানদণ্ডের সাথে সঙ্গতি রেখে তার পুনর্বিচারের আহ্বান জানিয়েছিলেন। 
ব্রিটেনের দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের পর বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, মীর কাসেম আলীর অনুসারীরা যাতে কোনো সহিংসতা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে না পারে সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সতর্কাবস্থায় রাখা হয়েছে। ব্রিটেনের আরেক প্রভাবশালী পত্রিকা গার্ডিয়ানেও একই ধরনের খবর প্রকাশিত হয়েছে। 
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ালস্ট্রিট জার্নাল পত্রিকার খবরে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের অনেক মানুষের কাছে যুদ্ধাপরাধের বিচার অনেকাংশে জনপ্রিয়তা পেলেও অনেক সমালোচক ও বিরোধীরা বলেছেন, বর্তমান সরকার রাজনৈতিক স্বার্থ হাসিলের জন্যই এই বিচার করছে। তবে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরই এই অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন। পত্রিকাটিতে মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড নিয়ে গত সপ্তাহে দেয়া অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের বিবৃতির প্রসঙ্গও টানা হয়। এ ছাড়া ভয়েস অব আমেরিকা ও চীনের সিনহুয়া বার্তা সংস্থাও মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার খবরটি গুরুত্বের সাথে তুলে ধরেছে। - See more at: http://www.dailynayadiganta.com/detail/news/150967#sthash.n1mufo2C.dpuf