১৯ জুলাই ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মীর কাসেম আলীর রিভিউর শুনানি শুরু
২৫ আগস্ট ২০১৬, বৃহস্পতিবার,
 জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য মীর কাসেম আলীর রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে আবেদনের শুনানি আগামী রোববার পর্যন্ত মুলতবি করেছেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। এর আগে আদালত সময় চেয়ে করা আবেদন নামঞ্জুর করেন। গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চে এ মামলার শুনানি হলে মুলতবির আদেশ আসে। বেঞ্চের অন্য বিচারপতিরা হলেন- বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী, বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার ও বিচারপতি মোহাম্মদ বজলুর রহমান।
সকাল সাড়ে নয়টার কিছু পরে আপিল বিভাগের কার্য তালিকার ৫ নম্বরে থাকা রিভিউর আবেদন শুনানির জন্য এলে মীর কাসেম আলীর প্রধান কৌঁসুলি খন্দকার মাহবুব হোসেন দাঁড়ান। তিনি সময়ের আবেদনের কথা বলেন। সময়ের আবেদনের শুনানিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, মীর কাসেম আলীর ছেলে মীর আহমেদ বিন কাসেম এ মামলার দেখাশোনা করেন। তাকে সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ফলে মীর আহমেদ বিন কাসেমের কাছে থাকা মামলার কাগজপত্র ও শুনানির প্রস্তুতি নিতে পারেননি তিনি। এ কারণে প্রস্তুতির জন্য শুনানি তিন সপ্তাহ পেছানো প্রয়োজন। প্রধান বিচারপতি তাকে উদ্দেশ্য করে বলেন, আপনি যে যুক্তিতে সময় চেয়েছেন, সেটা গ্রহণযোগ্য নয়। আমার ব্রাদার বিচারপতি এখানে আছেন। তিনি সময় নির্ধারণ করেছিলেন। এরপর ৬ সপ্তাহ সময় পেয়েছেন। অথচ রিভিউর কোনও আইন নাই। এরপরও আমরা সেই সুযোগ দিয়েছি। যদিও এখানে সাংবিধানিক বাধা (কনস্টিটিউশনাল ব্যারিয়ার) রয়েছে, তারপরও আমরা সেটি দিয়ে থাকি। কারণ, এটা প্রাকটিস এবং নর্মের জন্য। রিভিউতে যুক্তি খুবই কম থাকে। খন্দকার মাহবুব সময়ের জন্য আবেদন করলে আদালত বলেন, ‘আমরা দুঃখিত।’
তখন খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমার কাছে কিছুই নাই। কাগজপত্রও নাই। এসব ছিল তার (মীর কাসেম) ছেলের নিকট। তাকে সম্প্রতি আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর নামে তুলে নিয়ে গেছে। সে কেবল তার ছেলেই ছিল না। সে এই মামলার আইনজীবীও ছিল। তার কাছেই সব কাগজপত্র ছিল। আমি এই মামলার জ্যেষ্ঠ আইনজীবী, কিন্তু আমার কাছে তো কিছুই নাই। আমি অসহায়। তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, তাকে ল এনফোর্সিং এজেন্সি নিয়ে গেছে। 
এ সময় খন্দকার মাহবুব হোসেন আরো বলেন, রিভিউ শুনানির জন্য গুরুত্বপূর্ণ তথ্য আমাদের কাছে রয়েছে। কিন্তু এটার নথি আমাদের হাতে নেই। এটা ব্যারিস্টার আরমানের কাছেই আছে। তাই শুনানি করতে পারছি না। তাই আমাদের সময় দেয়া হোক। 
জবাবে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনাদের আমি সম্মান করি। আপনারা সিনিয়র আইনজীবী। আমি যথেষ্ঠ লিবারেল, সময়ে দিয়ে দেই, কিন্তু ওই যুক্তিতে (সময় মুলতবি) দেবো না। এক পর্যায়ে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমার কাছে পেপার বুকও নাই। কোন কাগজপত্র নাই। আমাদের কাছে নথি না থাকলে আমরা কীভাবে শুনানি করব?
তখন প্রধান বিচারপতি বলেন, আমরাতো রায়ের বাইরে যাব না। কোথায় এডভোকেট অন রেকর্ড? এখানে এডভোকেট শাহজাহান (এস এম শাহজাহান) আছেন, আপনি আছেন। খন্দকার মাহবুব হোসেনকে উদ্দেশ্য করে প্রধান বিচারপতি বলেন, আপনার কাছে ওইদিনও পেপার বুক ছিল। এখন নাই কেনো। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, ওইদিনের পর ওরা নিয়ে গেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, ওইদিন আপনি আবেদন করেছেন। আমি সময় দিয়ে দিয়েছি। প্রসিকিউশন নানা বক্তব্য দিয়েছে। আমি বলতে গেলে তাদের বক্তব্য শুনিও নাই। সময় দিয়ে দিয়েছি। এরপর নিজের পেপার বুক খন্দকার মাহবুবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে প্রধান বিচারপতি বলেন, আমি আমার পেপার বুক দিয়ে দিচ্ছি। আপনি শুনানি শুরু করেন। তখন খন্দকার মাহবুব শুনানিতে অংশ নেন। এরপর প্রধান বিচারপতি বলেন, এটা আংশিক শ্রুত, আগামী রোববার কার্যতালিকার শীর্ষে আসবে।
গত ২৫ জুলাই রিভিউ শুনানির জন্য প্রস্তুতিতে দু’ মাস সময় চাইলে সর্বোচ্চ আদালত এক মাস শুনানি পিছিয়ে দেন। ওইদিন মীর কাসেম আলীর প্রধান আইনজীবী ও সুপ্রিম কোর্ট বার এেেসাসিয়েশনের সাবেক সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন রিভিউ শুনানির দুই মাসের সময় আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে আদালত এক মাসের সময় মঞ্জুর করেন। ওই দিনই ২৪ আগস্ট রিভিউ শুনানির পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেন আদালত। এর ধারাবাহিকতায় রিভিউ আবেদনটি আবারো গত মঙ্গলবার শুনানির জন্য কার্যতালিকায় আসে। এরপর গতকাল বুধবার শুনানি শুরু হয়।
গত ১৯ জুন আপিল বিভাগের মৃত্যুদণ্ডের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন মীর কাসেম আলী। রিভিউ দাখিলের একদিন পরেই সরকার পক্ষ দিন ধার্যের জন্য আবেদন করে। পরে ২১ জুন আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী রিভিউ শুনানির জন্য ২৫ জুলাই দিন ধার্য করেন। এরই ধারাবাহিকতায় বিষয়টি আপিল বিভাগের ২৫ জুলাইর কার্যতালিকায় আসে। 
মীর কাসেম আলীর রিভিউতে বলা হয় আপিলের রায়ে ১১ নম্বর অভিযোগে মৃত্যুদণ্ডের আদেশ দেয়া ত্রুটিপূর্ণ। আবেদনে আপিলের রায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া সাতটি (২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ এবং ১৪) অভিযোগ থেকে খালাস চান তিনি। খালাসের পক্ষে ৮৬ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে মোট ১৪টি যুক্তি তুলে ধরা হয়েছে। এসব যুক্তিতে বলা হয়েছে মীর কাসেম আলী নির্দোষ এবং ঘটনার সঙ্গে তার সম্পৃক্ততা নেই। 
রিভিউতে আরো বলা হয়েছে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের রায়ে মারাত্মক ত্রুটি রয়েছে কেননা এটা সম্পূর্ণরূপে সন্দেহ ও অনুমানভিত্তিক এবং স্ববিরোধী রায়। তাই ন্যায়বিচারের স্বার্থে মামলাটি রিভিউ হওয়া উচিত। গত ৬ জুন মীর কাসেম আলীর মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে এ রায় প্রকাশিত হয়। 
গত ৮ মার্চ মীর কাসেম আলীর আপিল আংশিক মঞ্জুর করে তিনটি অভিযোগ থেকে তাকে অব্যাহতি এবং সাতটি অভিযোগে সাজা বহাল রাখেন সুপ্রিম কোর্টে আপিল বিভাগ। এরমধ্যে ১১ নম্বর অভিযোগে কিশোর মুক্তিযোদ্ধা জসিম উদ্দিন হত্যার অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়ার মৃত্যুদণ্ডের রায় বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। 
আপিলের সংক্ষিপ্ত রায়ে বলা হয়, আসামিপক্ষের আপিল আংশিক মঞ্জুর করা হলো। প্রসিকিউশন করা অভিযোগের মধ্যে ৪, ৬ ও ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে মীর কাসেম আলীকে খালাস এবং ২, ৩, ৭, ৯, ১০, ১১ ও ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ট্রাইব্যুনালে দেয়া দন্ড বহাল রাখা হলো। এরমধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে মৃত্যুদন্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। ১২ নম্বর অভিযোগ থেকে আপিল বিভাগ খালাস দিলেও ১১ নম্বর অভিযোগে তার মৃত্যুদন্ড বহাল রাখা হয়েছে।
২০১৪ সালের ২ নবেম্বর আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে দু’ সদস্য মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় প্রদান করেন। 
প্রসিকিউশনের আনীত ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে মুক্তিযোদ্ধা জসিম ও জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে হত্যার অভিযোগে তাকে এই দন্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। ওইদিন মোট ৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ের মধ্যে ১১ পৃষ্ঠার সংক্ষিপ্ত রায় পড়ে শোনায় ট্রাইব্যুনাল। 
একই বছরের ৩০ নবেম্বর ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের রায় থেকে খালাস চেয়ে আপিল করেন মীর কাসেম আলী। তার পক্ষে আইনজীবীরা আপিলটি দাখিল করেন। আপিলটি পাঁচটি ভলিউমে ১৭৫০ পৃষ্ঠার। ১৫০ পৃষ্ঠার আপিলে ১৮১টি যুক্তিতে খালাস চাওয়া হয়েছিল। 
২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ওই দিনই তাকে গ্রেফতার করে বিকেল সোয়া চারটার দিকে ট্রাইব্যুনালে নিয়ে আসে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
http://www.dailysangram.com/post/248370-%E0%A6%AE%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%B8%E0%A7%87%E0%A6%AE-%E0%A6%86%E0%A6%B2%E0%A7%80%E0%A6%B0-%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%AD%E0%A6%BF%E0%A6%89%E0%A6%B0-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%A8%E0%A6%BE%E0%A6%A8%E0%A6%BF-%E0%A6%B6%E0%A7%81%E0%A6%B0%E0%A7%81