২৩ অক্টোবর ২০২০, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
নিজ গ্রামে চিরনিদ্রায় শায়িত মাওলানা নিজামী
১২ মে ২০১৬, বৃহস্পতিবার,
(১) গতকাল বুধবার জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমে বাদ জোহর অনুষ্ঠিত শহীদ মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর গায়েবানা জানাযার দৃশ্য (২) চট্টগ্রামে গায়েবানা জানাযায় অংশগ্রহণকারীদের একাংশ (৩) সিলেট সরকারি আলিয়া মাদরাসা ময়দানে গায়েবানা জানাযার দৃশ্য -সংগ্রাম
•পর পর তিনটি জানাযায় জনতার ঢল
নিজ গ্রামের সাধারণ মানুষের মাঝেই চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন জননেতা মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী। পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার মনমথপুর তার জন্মস্থান। গ্রাম্য কবরস্থানে সাধারণ মানুষের মাঝেই হয়েছে তার শেষ ঠিকানা। কবরস্থান সংলগ্ন ফসলী জমিতে পর পর তিনটি নামাযে জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। প্রথম জামায়াতে শরিক হন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভারপ্রাপ্ত সেক্রেটারি জেনারেল ডা. শফিকুর রহমান, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরীর নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল হালিম, পাবনা জেলা জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তালেব ম-ল, শিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মুস্তাফিজুর রহমানসহ স্থানীয় বিএনপি, জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ। প্রশাসনের তীব্র বাধা ও তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনীকে ফাঁকি দিয়ে হাজার হাজার মানুষ শরিক হয় তার প্রথম জানাযায়। জনতার চলতে থাকে গতকাল সারা দিন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে গত মঙ্গলবার রাত ১২টার পরে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে নির্মম মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার পর রাত দেড়টায় তার কফিনবাহী এম্বুলেন্স রওয়ানা হয় পাবনার উদ্দেশ্যে।
পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির কড়া প্রহরায় তার লাশ নিয়ে যাওয়া হয় পাবনার চিরচেনা সাঁথিয়ায়। সকাল ৬টা ২০ মিনিটে লাশবাহী বহর পৌঁছে মনমথপুর তার নিজ বাড়িতে। সেখানে পূর্বেই পৌঁছে যান মাওলানা নিজামীর দুই ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন ও ডা. নাইমুর রহমান খালিদসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। তাদের প্রাণাধিক শ্রদ্ধেয় পিতা বিশ্ববরেণ্য ইসলামী চিন্তাবিদ আমীরে জামায়াত মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর লাশ শনাক্ত করেন দুই ছেলেসহ পরিবারের ১০ জন সদস্য। তাদের একনজর লাশ দেখতে দেয়া হয়। এছাড়া কাউকে লাশ দেখতে দেয়া হয়নি। যে বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী সেই বাড়িটি এক জরাজীর্ণ টিনের ঘর। তার কফিনবাহী গাড়ির বহর বাড়িতে পৌঁছলে সেখানে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়। সাধারণ মানুষ তাদের নেতা নিজামীকে একনজর দেখার জন্য আকুতি করতে থাকে এবং ডুকরে কেঁদে ওঠে। তাদের সমস্বরের কান্নায় মনমথপুরের আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। তাদের অবস্থা সামলাতে অস্ত্রধারী আইনশৃংখলা বাহিনীকেও হিমশিম খেতে হয়। লাশ শনাক্তের পর কফিনবাহী এম্বুলেন্স নিয়ে যাওয়া হয় বাড়ি সংলগ্ন মনমথপুরের গ্রাম্য কবরস্থানে। সেখানে পূর্ব থেকেই অপেক্ষমাণ হাজার হাজার মানুষ সারিবদ্ধ হয়ে জানাযায় দাঁড়িয়ে যায়। কোন ময়দান, খোলা জায়াগা বা ঈদগাহ মাঠে জানাযা করতে দেয়া হয়নি। কবরস্থানের সামনেই পটল, বেগুন, আখ, পাট ও ধানের ক্ষেতে দাঁড়িয়ে যায় মানুষ তাদের প্রাণপ্রিয় নেতার জানাযায়। সকাল ৭টায় অনুষ্ঠিত এই জানাযায় অন্তত ১০ হাজার মানুষ শরিক হয়। জানাযায় ইমামতি করেন মাওলানা নিজামীর সুযোগ্য সন্তান ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন। 
জানাযা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই আইনশৃংখলা বাহিনীর লোকেরা লাশ নিয়ে যায় কবরস্থানে। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো সাধারণ মানুষ কবরস্থানে ঢুকে পড়তে চাইলে আইনশৃংখলা বাহিনী তাদের বাধা দেয়। তাদের বাধা উপেক্ষা করে হাজার হাজার মানুষ কবরস্থানে প্রবেশ করে। দাফন সম্পন্ন হলে দোয়া করা হয়। দোয়া করেন ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। দোয়ার পূর্বে তিনি সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন।
প্রশাসনের তিন স্তরের নিরাপত্তা বেষ্টনী এবং পথে পথে বাধা, মানুষকে ফিরিয়ে দেয়াসহ নানা বিপত্তি সত্ত্বেও হাজার হাজার মানুষ শরিক হয় আমীরে জামায়াত সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর জানাযায়। আগের দিন সন্ধ্যা থেকে মনমথপুরের গ্রাম, কবরস্থানগামী সমস্ত রাস্তা, অলিগলি ও মেঠোপথ পর্যন্ত বন্ধ করে দেয়া হয়। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি কোন সংবাদ কর্মীকেও এ সময় এলাকায় ঢুকতে দেয়া হয়নি। ছবি তোলায় ছিল পুরোপুরি নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু দুই দুইবার বিপুল ভোটে যে এলাকা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য- সাবেক মন্ত্রী ও জামায়াতে ইসলামীর মতো আদর্শবাদী সংগঠনের প্রধান নেতার জানাযায় শরিক হওয়া তীব্র ঈমানী চেতনা সে প্রচেষ্টা অনেকখানিই ব্যর্থ হয়।
চার কিলোমিটার রাস্তা হেঁটে মানুষ কবরস্থানে হাজির হয়। প্রশাসনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে অলিগলি চোরাই ও মেঠোপথ দিয়ে পায়ে হেঁটে মানুষ আগের রাতেই সেখানে পৌঁছে যায় জানাযাস্থলে। সেখানে মাঠের মধ্যে অনেক মানুষ জামায়াতের সাথে ফজরের নামায আদায় করেন। প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় আগের রাত ৯টা থেকে কবর খোঁড়া শুরু হয় বলে স্থানীয়রা জানান। কবর খোঁড়েন নিজামীর চাচাত ভাই সিরাজুল ইসলাম। রাতে এলাকায় ঝড়-বৃষ্টির আশংকা দেখা দিলে কবর ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেয়া হয়। 
পরে বৃষ্টি না এসে ঝড়ো বাতাসে মেঘ কেটে যায়। পরে সারা রাত পুলিশ, ডিবি পুলিশ ও র্যাব কবর ও আশপাশের এলাকা ঘিরে রাখেন। গতকাল সকাল ৭টায় জানাযা শেষ করে লাশ দাফন করার পর আইনশৃংখলা বাহিনীর কড়াকড়ি কিছুটা শিথিল করা হয়। এই সময় চতুর্দিক থেকে হাজার হাজার মানুষ  মতো আসতে থাকে কবরস্থানে। পরে স্থানীয়ভাবে ঘোষণা করা হয় যে, সকাল নয়টায় গায়েবানা জানাযা অনুষ্ঠিত হবে। এই জানাযায় শরিক হওয়ার জন্য বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো ছুটে আসে মানুষ। এই জানাযার পূর্ব সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে বক্তব্য রাখেন পাবনা জেলা জামায়াতের ভারপ্রাপ্ত আমীর মাওলানা জহুরুল ইসলাম, সেক্রেটারি অধ্যাপক আবু তালেব ম-ল, সদর উপজেলা আমীর মাওলানা আব্দুল গাফফার খান, সেক্রেটারি ইব্রাহিম খলিল আইনুল, সাঁথিয়া উপজেলা আমীর মাওলানা আব্দুল কুদ্দুস, সেক্রেটারি ডা. ইদ্রিস আলী, নাটোর জেলা নায়েবে আমীর মীর নুরুল ইসলাম, ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান এবং আঞ্চলিক ও স্থানীয় জামায়াত ও শিবির নেতৃবৃন্দ। প্রশাসন এলাকাবাসীর দাবির প্রেক্ষিতে প্রথম জানাযা করার অনুমতি দিলেও কোন প্রকার মাইক ব্যবহার করতে দেয়নি। পরবর্তী জানাযায় মাইক ব্যবহার শুরু হলেও প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়।
বক্তারা বলেন, শহীদের রক্ত বৃথা যেতে পারে না। এই দেশ, এই গ্রাম সাক্ষী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী কোন অন্যায় করেননি করতে পারে না। তার চরিত্রে কোন ন্যূনতম কালো স্পট নেই। তারা বলেন, জুলুমবাজ ভোটারবিহীন প্রহসনের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতাসীন হওয়া দানব সরকার ইহুদি খৃস্টান ও মুশরিকদের চক্রান্তে ইসলামী আন্দোলনের নেতাদের বেছে বেছে হত্যা করছে। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী তার সর্বশেষ চক্রান্তের শিকার। মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী দেখিয়ে দিলেন ইসলামী আন্দোলনের শুধু কর্মীরাই জীবন দিতে জানে না, শীর্ষ নেতারাও জীবন দিতে জানে। এর মাধ্যমে তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নির্বাপিত করতে চায়। কিন্ত আল্লাহর কুরআনের ঘোষণা, তিনি তাঁর নুরকে প্রজ্জ্বলিত করবেনই। তারা বলেন, শাহাদাত হলো জান্নাতের পথ, বিপ্লবের পথ, শাহাদাতের সিঁড়ি বেয়েই এদেশে ইসলামের বিজয় হবে। তিনি নিজে জীবন দিয়ে আমাদের ওপর গুরুদায়িত্ব চাপিয়ে দিয়ে গেছেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, সরকার গোটা দেশকে কারাগারে পরিণত করেছে। প্রতিদিন এত খুন-খারাবি হচ্ছে যা কখনও ঘটেনি। তারা বলেন, মাওলানা মতিউর রহমান নিজামী কোন একটি অন্যায় কাজ করেননি। অথচ তার ওপর জুলুম চালিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আল্লাহর দ্বীন কায়েমের মাধ্যমে আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বদলা নেব। মাওলানা নিজামী আল্লাহর একজন অলী ছিলেন। তিনি কারো ওপর অন্যায় তো দূরের কথা কোন মানুষকে কষ্টদায়ক কথাও বলেননি। তাকে হত্যা করা গোটা দুনিয়ার মানবতাকে হত্যা করার শামিল। এমন মানবদরদী দ্বিতীয় মানুষটি খুঁজে পাওয়া কষ্ট। তিনি কারো চোখের দিকে তাকিয়ে পর্যন্ত কথা বলেননি। এমন সত্য, ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি দেখা যায় না। তিনি ছিলেন রাসূলের (সা.) দেখানো পথের প্রকৃত অনুসারী। বক্তারা বলেন, জামায়াতে ইসলামী এবং বাংলাদেশকে নেতৃত্বশূন্য করার হীনচেষ্টার অংশ হিসেবে প্রথমে ইসলামী আন্দোলনের শীর্ষ নেতাদের বেছে বেছে হত্যা করা হচ্ছে। কিন্তু আমীরে জামায়াত জেলখানা থেকেই আমাদের জন্য নির্দেশনা পাঠিয়েছিলেন এবং অভয়বাণী দিয়েছেন যে, ইসলামী আন্দোলনে নেতৃত্বের শূন্যতা হবে না।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=234546