২০ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর রিভিউ আবেদনের রায় আজ
৫ মে ২০১৬, বৃহস্পতিবার,
জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সাবেক মন্ত্রী মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদণ্ড থেকে খালাস চেয়ে করা রিভিউ (পুনর্বিবেচনা) আবেদনের রায় দেয়া হবে আজ বৃহস্পতিবার। এই রায়ের মধ্য দিয়ে কথিত মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারিক প্রক্রিয়ার সমাপ্তি হবে। রায়ের জন্য রিভিউ আবেদন কার্যতালিকার শীর্ষে রয়েছে। গত মঙ্গলবার শুনানি শেষে রায়ের এদিন ধার্য করেন সর্বোচ্চ আদালত। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ রিভিউ আবেদনের রায় দেবেন। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। 
 
মঙ্গলবার সকাল ৯টা ২৫ মিনিট থেকে ১০টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত যুক্তি উপস্থাপন করেন মাওলানা নিজামীর প্রধান আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন। এরপর ১০ মিনিট এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম প্রসিকিউশন পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন। মাঝে আধা-ঘণ্টার বিরতি শেষে এটর্নি জেনারেল তার যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। এরপর আদালত রায়ের জন্য দিন ধার্য করেন। 
 
রিভিউর শুনানিতে আদালতে জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনকে সহায়তা করেন আইনজীবী এস এম শাহজাহান, ব্যারিস্টার এহসান এ সিদ্দিকী ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। 
 
শুনানি শেষে খন্দকার মাহবুব হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, প্রসিকিউশন আদালতে যে সাক্ষ্য প্রমাণ উপস্থাপন করেছে তাতে অভিযোগ প্রমাণ হয় না। অভিযুক্তকে খালাস দেয়া উচিত। ১৯৭৪ সালের সিমলা চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত ও পাকিস্তান সম্মিলিতভাবে একটি চুক্তি স্বাক্ষর করে তাতে ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা হয় পরে তাদের ক্ষমা করে ছেড়ে দেয়া হয়েছিল। ছেড়ে দেয়া ১৯৫ জন পাকিস্তনী সৈন্য ছিলেন প্রধান আসামী। তাদের ছেড়ে দিয়ে সহযোগীদের বিচার আইনত চলতে পারে না। আমাদের উচ্চ আদালতের রায়েও উল্লেখ রয়েছে প্রধান আসামীকে ছেড়ে দিয়ে সহযোগীদের বিচার হয় না। তারপরেও প্রসিকিউশন থেকে যে সাক্ষ্য ও প্রমাণ তাতে অভিযোগ প্রমাণ হয় না। প্রসিকিউশন সাক্ষীদের সেইফহোমে রেখে আদালতে দাঁড় করিয়েছে।
 
দুর্ভাগ্যজনক হলো ড. আলীমের স্ত্রী মামলার তদন্ত কর্মকর্তার (আইও) কাছে বলেননি নিজামী সাহেবের নির্দেশে তাকে তুলে নিয়েছে। ডা.আজহার হত্যার ঘটনায় তার স্ত্রী কিছু বলেননি। আইওর কাছে যা বলেননি কিন্তু হঠাৎ করে অভিযোগ করলেন। তারা বলেছেন, নিজামী সাহেবের নির্দেশে তুলে নিয়ে গেছে যা অবিশ্বাস্য। এ কথার ওপর ভিত্তি করে একটি লোককে চরম দণ্ড দেয়া যায় না।
আমরা দেখিয়েছি নিজামী সাহেব মৃত্যুদণ্ডের অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার যোগ্য। কারণ সরাসরি তিনি অভিযোগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। পরোক্ষ অপরাধের (ভাইকেরিয়াস লায়াবিলিটি) জন্য মৃত্যুদণ্ড দেয়া যায় না। প্রধান বিচারপতিও এ প্রসঙ্গে এটর্নি জেনারেলকে জিজ্ঞেস করেছেন প্রধান আসামীকে ছেড়ে দেয়ার পর সহযোগীদের চরম দণ্ড দেয়া যায় কিনা? আমার মনে হয় না এটর্নি জেনারেল এ প্রশ্নে সঠিক জবাব দিতে পেরেছেন। 
 
আমরা মনে করি প্রধান আসামীদের ক্ষমা করে দেয়ার পর যদি প্রসিকিউশনের সাক্ষ্য মেনে নেয়াও হয় তাহলেও পরোক্ষ অপরাধের জন্য চরম দণ্ড হতে পারে না। পরোক্ষ অপরাধের জন্য যে সাজা রয়েছে সে সাজা হওয়া উচিত।
শুনানিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, নিজামী সাহেব আলবদর বাহিনীর সদস্য ছিলেন, এ রকম কোনো তথ্য ছিল না। যুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে দালাল আইনে মামলা হয়েছিল। তখন তার বিরুদ্ধে কোনো মামলা হয়নি। যুদ্ধের ৪২ বছর পর হঠাৎ করে আমার (নিজামী) নাম আনা হয়েছে। তখন রাজনৈতিক মতাদর্শের কারণে নিজামী সাহেব তাদের সমর্থন দিয়েছেন। কিন্তু তিনি কোনো হত্যাকাণ্ডে বা কোনো ঘটনায় সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলেন না।
 
যে তিন অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড : আপিলের রায়ে প্রসিকিউশনের আনা ২, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ২ নম্বর অভিযোগ হলো রুপসী, ডেমরা ও বাউশগাড়ী হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ অনুযায়ী এ ঘটনায় প্রায় ৪৫০ লোককে হত্যা করা হয়েছে, বাড়িঘরে অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট করা হয়েছে এবং নারী নির্যাতন করা হয়েছে। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল মৃত্যদণ্ড দিয়েছিল। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের সাজা বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। ৬ নম্বর অভিযোগ হলো ধুলাউড়ি হত্যাকাণ্ড। অভিযোগ হলো-একাত্তরের ২৭ নবেম্বর রাত সাড়ে তিনটায় মাওলানা নিজামী কর্তৃক রাজাকার ও পাক বাহিনী সাথে নিয়ে ধুলাউড়ি গ্রামের আব্দুল আউয়াল সাহেবের বাড়িতে ঘেরাও দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর আক্রমণ করে ভোর সাড়ে ৬টায় পুরুষ, মহিলা ও শিশুদেরকে ধুলাউড়ি স্কুলে নিয়ে ৩০ জনকে হত্যা। পরে রাজাকারদের সাথে নিয়ে ২২ জনকে ইছামতি নদীর তীরে নিয়ে হত্যা। এর শিকার সকলে ছিলেন বেসামরিক ব্যক্তি (আন আর্মড সিভিলিয়ান)। এই অভিযোগে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিল ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগের সাজা আপিল বিভাগে বহাল রয়েছে। ১৬ নম্বর অভিযোগ হলো বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড। এই অভিযোগে বলা হয় মতিউর রহমান নিজামীর বিরুদ্ধে ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসাবে পদাধিকার বলে আলবদর ও সহযোগী বাহিনীর প্রধান হিসাবে বিশেষত ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর সংঘটিত বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের দায়ে গণহত্যা এবং কমান্ড রেসপনসিবিলিটির অভিযোগ আনা হয়েছে। এই অভিযোগেও মৃত্যুদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের সাজা বহাল রেখেছেন আপিল বিভাগ। এই তিনটি অভিযোগের মৃত্যুদণ্ডের সাজার বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে রিভিউ আবেদন করেন মাওলানা নিজামী। 
 
মাওলানা নিজামীর পক্ষে ২ নম্বর অভিযোগের যুক্তি হলো, প্রসিকিউশনের সাক্ষী মোঃ আইনুল হক একাত্তরের ১৪ মে কথিত হত্যাকাণ্ড, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট ও নারী নির্যাতনের ঘটনায় মাওলানা নিজামীকে উপস্থিত ছিলেন-এ ধরনের কোন বর্ণনা দেননি। ঘটনার দিন তিনি শান্তি কমিটি গঠনের বিষয়ে মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে যে বক্তব্য প্রদান করেছেন তা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট বলেননি। কাজেই নিজামী সাহেব সম্পর্কে তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। প্রসিকিউশনের সাক্ষী শামসুল হক নান্নু এ-তো বেশী অসত্য তথ্য ট্রাইব্যুনাল এবং তার বাইরে প্রদান করেছেন তাকে বিশ্বাস করার কোন সুযোগ নাই। উপরন্তু তার বক্তব্য যে কতটা অসাড় তার প্রমাণ হলো তার নিজের বক্তব্য-‘২৪ মার্চ পাবনা আলিয়া মাদরাসার নিকটবর্তী দোকানদার সেকেন্দার আলীর নিকট থেকে জানতে পারি যে ইসলামী ছাত্র সংঘের সভাপতি মতিউর রহমান নিজামী, মাওলানা আব্দুস সোবহান, মাওলানা ইছহাক, রফিকুন নবী ওরফে বাবলু পাবনা আলিয়া মাদরাসায় বসে পাকিস্তান ইসলামী ছাত্রসংঘের ও জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের নিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনীকে সাহায্য ও সহযোগিতা করার জন্য একটি স্বাধীনতা বিরোধী সেল গঠন করেস্ট অর্থাৎ স্বাধীনতা ঘোষণার আগেই স্বাধীনতা বিরোধী সেল গঠনের কথা তিনি বলেছেন, এটি হাস্যকর বক্তব্য। আর দুই বছর বয়সে মাওলানা নিজামীকে বোয়াইলমারী মাদরাসায় পড়তে দেখা। প্রসিকিউশনের সাক্ষী জামাল উদ্দিন-এর এই ঘটনা সম্পর্কে কোন প্রত্যক্ষ জ্ঞান নাই। তিনি সাক্ষী মো.আইনুল হক ও শামসুল হক নান্নুর উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন। এই দু’জনের সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য না হওয়ায় তাকেও বিশ্বাস করা যায় না। সাক্ষী জহুরুল হক এই মামলার তদন্ত সমাপ্ত হওয়ার পরে প্রসিকিউশনের সাজানো সাক্ষী হিসাবে হাজির করায় তাকে বিশ্বাস করার কোন যৌক্তিক কারণ নেই। তদুপরি তিনি দাবি করেন ঘটনার রাত্রে তিনি বাউশগাড়ি শহীদ আব্দুল জব্বারের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খান পরিষ্কার জানিয়েছেন বাউশগাড়ী গ্রামে আব্দুল জব্বার নামে ঐদিন শহীদ কোন ব্যক্তির নাম তিনি পান নাই। তিনি তদন্ত কর্মকর্তার সাথে তার দেখা হওয়ার বিষয়েও মিথ্যাচার করেছেন। কারণ তার মতে ১৭ মে, ২০১৩ তারিখের আগে তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা হয় নাই, দেখা যায় তিনি মূল তদন্তের সময় ২০১০ এর ৬ নবেম্বর তদন্তকারী কর্মকর্তার সাথে দেখা করেছেন অথচ ঐ সময় তিনি জবানবন্দী দেননি। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি একজন মিথ্যাবাদী ও সাজানো সাক্ষী।
 
৬ নম্বর অভিযোগের যুক্তি হলো, ডিফেন্সপক্ষের বক্তব্য হলো-প্রসিকিউশন সাক্ষী এবং তদন্তকারী কর্মকতার ভাষ্য মতে, উক্ত ঘটনাটি দু’পক্ষের একটি যুদ্ধের মাঝে সংঘটিত একটি হত্যাকাণ্ড এবং যাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল তারা মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সুতরাং অভিযোগের বক্তব্য, ‘নিহত সকলে আন আর্মড সিভিলিয়ান ছিলেন’ এটা তদন্তকারী কর্মকর্তা ও অন্যান্য সাক্ষীর বক্তব্য অনুযায়ী সত্য নয়। প্রথমত:-উক্ত চার্জের সাক্ষী মোঃ শাহজাহান আলীর মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ: তিনি বলেছেন, ‘১৯৭১ সালের ২৮ নবেম্বরের আগে মাওলানা নিজামীকে আমি দেখেছি, আনোয়ারুল হকের নির্বাচনী জনসভায়। নির্বাচনী জনসভা গৌরী গ্রামে হয়েছিল। গৌরী গ্রামটি সাঁথিয়া থানাধীন, আমার গ্রাম থেকে ৫ মাইল দূরে। এই জনসভা শুনতে আমি যাই নাই।’ তিনি যদি জনসভায় না-ই যান তবে সেই জনসভায় মাওলানা নিজামীকে কিভাবে দেখলেন? সুতরাং তিনি জেরায় অসত্য তথ্য দিয়েছেন। তিনি স্বীকার করেছেন যে, তিনি টিভি চ্যানেলে অনেকবার সাক্ষাৎকার দিয়েছেন, তবে তিনি দিগন্ত টিভি, চ্যানেলে সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন কিনা মনে করতে পারেন নাই। দু’বার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার কারণে তার স্মরণশক্তি কমে গিয়েছে, কখন কি বলেন তা মনে থাকে না বলে তিনি দাবি করেন। তবে তিনি সেই সাক্ষাৎকারসমূহে ‘১৯৮৬ সালের নির্বাচনের আগে তিনি মাওলানা নিজামীকে দেখেননি’ বলে বলেছিলেন সেটা অস্বীকার করেন। ডিফেন্স সেই সাক্ষাৎকারসমূহের ভিডিওসমূহ প্রদর্শন করেছে। সেখানে দেখা যায় যে, তিনি মাওলানা নিজামীকে ১৯৭১ সালে দেখার বিষয়টি অস্বীকার করেছেন। এই সাক্ষী শপথ করে কাঠগড়ায় এসে তার পূর্বোক্ত সাক্ষাৎকারের ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলায় তার সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কোন কারণ নেই। উপরন্তু তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন তার স্মরণশক্তি কমে গেছে তিনি কখন কি বলেন তা মনে থাকে না। সুতরাং ৪৩ বছর আগের বিষয়ে এধরনের স্মৃতিশক্তিহীন ব্যক্তির সাক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনি জেরার জবাবে বলেছেন, তিনি পাবনা সাঁথিয়ার মিয়াপুর হাজি জসিম উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৭২ সালে এসএসসি পাস করেছেন। অথচ তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন, তিনি ১৯৭১ সালের যুদ্ধে আহত হওয়ার পর ঢাকা মেডিকেলে ৪ বছর চিকিৎসাধীন ছিলেন। তিনি বলেছেন, তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা গ্রহণের পর সর্বপ্রথম পাবনায় ১৯৭৫ সালে যান। অতএব তিনি হয় ১৯৭২ সালে পাবনার একটি স্কুল থেকে এসএসসি পাস করার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন অথবা চিকিৎসার জন্য ঢাকায় ৪ বছর অবস্থান শেষে ১৯৭৫ সালে সর্বপ্রথম পাবনা যাওয়ার ব্যাপারে মিথ্যা বলেছেন। সুতরাং এই স্ব-বিরোধী ও সাংঘর্ষিক বক্তব্য প্রদানকারী সাক্ষী বিশ্বাসযোগ্য নয় এবং তার জবানবন্দী গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি তার জবানবন্দীতে বলেছেন যে, তার সাথে যেসকল মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হয় তাদের মধ্যে তাকে ছাড়া তাদের সবাইকে হত্যা করা হয়। অথচ সাক্ষী তার জবানবন্দীতে বলেন, শাহজাহান ছাড়াও আরও একজন বেঁচে যান তার নাম মাজেদ। সাক্ষী শাহজাহান আলী পরে স্বীকার করেন যে, মাজেদ এখনও জীবিত আছেন। এই ধরনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তিনি অসত্য তথ্য দেয়ায় তার বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয়ত: উক্ত অভিযোগের সাক্ষী মোঃ খলিলুর রহমানের মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে দেয়া বক্তব্য গ্রহণযোগ্য বা বিশ্বাসযোগ্য নয়। কারণ তিনি বলেছেন, ২৭ নবেম্বর দিবাগত রাতে রাত সাড়ে ৩টায় চাঁদের আলোয় তিনি মাওলানা নিজামীকে দেখেছেন। অথচ ঐদিন বাংলা পঞ্জিকা অনুযায়ী চন্দ্র অস্ত গিয়েছিল রাত ১টা ২৩ মি. ৫৪ সেকেন্ডে। সুতরাং তার চাঁদের আলোয় মাওলানা নিজামীকে দেখার বিষয়টি অসত্য। তার বক্তব্য অনুযায়ী তার সহযোদ্ধাদের মধ্যে ২ জন (শাহজাহান ও মাজেদ) বাদে সকলে ঐদিন নিহত হন। পরে তিনি বলেন, উক্ত ২ জন এবং কুদ্দুস ছাড়া তার গ্রুপের বাকী সবাই নিহত হন। পরে তিনি বলেন, উক্ত তিনজন ছাড়াও তার গ্রুপের সালাম ঐদিন বেঁচে যায়। একই সাথে তার তিন ধরনের বক্তব্য প্রদান থেকেই বুঝা যায় তিনি অসত্য বক্তব্য দিয়েছেন। বাস্তবে আদৌ তিনি নিজামী সাহেবকে চিনতেন না। তিনি স্বীকার করেছেন যে, রেজাউল করিম নামে সাঁথিয়ার একজন মুক্তিযুদ্ধের ঘটনা নিয়ে একটি বই লিখেছেন, উক্ত বই ডিফেন্স পক্ষ দাখিল করেছে। উক্ত বইয়ের ২৭-২৮ পৃষ্ঠায় ধুলাউড়ি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা রয়েছে কিন্তু মাওলানা নিজামী সেখানে উপস্থিত ছিলেন মর্মে কোন বর্ণনা নেই। এখান থেকে এটাই প্রমাণিত হয় যে, মাওলানা নিজামী সাহেব উক্ত ঘটনার সাথে কোনভাবে সংশ্লিস্ট নন। তিনি তার জবানবন্দীতে প্রদত্ত ‘ঐদিন রাত্রি আনুমানিক সাড়ে তিনটার দিকে হঠাৎ করে আর্মিদের পায়ের বুটের শব্দ শুনতে পাই। তখন আমি ঐ বাড়ির ঘরের পূর্ব-দক্ষিণ দিকের জানালা খুলে দেখতে পাই যে, মাওলানা নিজামী এবং কিছু দখলদার বাহিনী এবং কিছু রাজাকারসহ আমাদের ঘরের দিকে আসছে।’ বক্তব্যটি তদন্তকারী কর্মকর্তাকে বলেছেন বলে দাবি করেন। অথচ তদন্তকারী কর্মকর্তা তার জবানবন্দীতে অস্বীকার করেন যে, উক্ত সাক্ষী তার নিকট উক্ত কথাগুলি বলেছেন। যে ব্যক্তি মাত্র কয়েক বছর আগে প্রদত্ত জবানবন্দীর ব্যাপারে মিথ্যা কথা বলতে পারেন, তিনি ৪২ বছর আগের ঘটনা সম্পর্কেও মিথ্যা কথা বলতে পারেন। সুতরাং এই সাক্ষীকে কোনভাবেই বিশ্বাস করা যায় না। তৃতীয়ত-সাক্ষী মোঃ জামাল উদ্দিন এর বক্তব্যও এই ক্ষেত্রে গ্রহণযোগ্য নয়, কেননা তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন এবং এ ঘটনা তিনি সাক্ষী মো.শাহজাহান আলীর কাছ থেকে শুনেছেন। যেহেতু সাক্ষী মো.শাহজাহান আলীর বক্তব্য গ্রহণযোগ্য নয়, সুতরাং তার কাছ থেকে শোনা সাক্ষী জামালউদ্দিনের বক্তব্যও গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত বই এবং ডিফেন্স পক্ষ কর্তৃক প্রদর্শিত বইতে ধুলাউড়ি হত্যাকাণ্ডের বর্ণনা আছে, অথচ কোথাও মাওলানা নিজামীর সংশ্লিস্টতার কথা আসেনি। অর্থাৎ প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত দলিলেই ঘটনার সাথে মাওলানা নিজামীর সংশ্লিস্টতার কথা আসেনি, সুতরাং মাওলানা নিজামী এই ঘটনার সাথে কোনভাবেই জড়িত নন।
 
১৬ নম্বর অভিযোগের যুক্তি হলো-তদন্তকারী কর্মকর্তার জবানবন্দীসহ অন্যান্য প্রমাণপত্র হতে দেখা যায়, তদন্ত রিপোর্ট দাখিলের সময় মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের অভিযোগ আনা হয়নি। দুইজন সাক্ষী ছাড়া প্রসিকিউশন পক্ষ কোন সাক্ষীকে আদালতে উপস্থিত করতে পারেন নাই। প্রথমত: অপরাধের সময়কাল: চার্জ গঠনের আদেশে উক্ত অপরাধ সংঘটনের সময়কাল সুনির্দিস্টভাবে বলা না থাকলেও বলা হয়েছে প্রধানত: অপরাধসমূহ সংঘটিত হয়েছে ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১ অথবা এর আশেপাশের সময়ে। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড শুরু হয় ১৫ নবেম্বর ১৯৭১ সাল থেকে। এর সমর্থনে প্রসিকিউশন একটি বই দাখিল করেছে। এই চার্জের সমর্থনে প্রসিকিউশনের দুইজন মাত্র সাক্ষী যে দু’টি ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন তাদের ভাষ্য অনুযায়ী সে দু’টি ঘটনা সংঘটিত হয়েছিল ১৫ নবেম্বর এবং ১৪ ডিসেম্বর ১৯৭১। এখন বিচার্য বিষয় হলো উক্ত সময়ে মাওলানা নিজামী ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসাবে আলবদরের প্রধান ছিলেন কি না? দ্বিতীয়ত: ছাত্র সংঘ প্রধান: প্রসিকিউশনের স্বীকৃত মতে মাওলানা নিজামী সাহেব ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বরের শেষ পর্যন্ত ছাত্র সংঘের সভাপতি ছিলেন। ডিফেন্সের প্রদর্শনী থেকে দেখা যায় ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৭১ এর পরে মাওলানা নিজামী নন বরং তাসনীম আলম মানজার ছাত্র সংঘের প্রধান ছিলেন। সুতরাং ছাত্র সংঘের সভাপতি হিসাবে পদাধিকার বলে আলবদর প্রধান হিসাবে ৩০ সেপ্টেম্বরের পরে সংঘটিত অপরাধের সাথে মাওলানা নিজামীকে জড়ানোর কোন সুযোগ নেই। 

তৃতীয়ত: আলবদর প্রধান: প্রসিকিউশনের প্রদর্শিত ডকুমেন্ট অনুযায়ী ৪ ডিসেম্বরের একটি সভায় আলবদর প্রধান হিসাবে মতিউর রহমান নিজামী নন বরং অন্য একজন উপস্থিত আছেন মর্মে দেখা যায়। সুতরাং প্রসিকিউশন ডকুমেন্ট থেকেই একথা প্রমাণিত যে মাওলানা নিজামী আলবদর প্রধান ছিলেন না। প্রসিকিউশনের দাবি অনুযায়ী আলবদর একটি সশস্ত্র অক্সিলারি বাহিনী যার স্বতন্ত্র সাংগঠনিক কাঠামো, মিলিটারি ট্রেনিং-এর ব্যবস্থা, বেতনভাতা ও অস্ত্রশস্ত্র ছিল। একজন বেসামরিক ব্যক্তির এরকম একটি সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হওয়ার কোন সুযোগ নেই। প্রসিকিউশনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী মাওলানা নিজামী ১৯৭১ সালের পুরো সময়েই একজন বেসামরিক ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং নিজামী সাহেবের আলবদর বাহিনীর প্রধান হওয়ার কোন সুযোগ ছিল না। এ সংক্রান্তে যুগোশ্লাভিয়ার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের আপীল বিভাগে Prosecutor vs Timohir Blaskic, Case no. IT-95-14-A para-114 মামলায় একটি সিদ্ধান্ত রয়েছে যে, একই ব্যক্তি একই সাথে বেসামরিক নাগরিক এবং সামরিক কর্মকর্তা হতে পারেন না।

চতুর্থত: মতিউর রহমান নিজামী সাহেব আলবদরের সাথে সংশ্লিস্ট ছিলেন মর্মে প্রসিকিউশন ৪টি বই দাখিল করেছে। উক্ত বইসমূহের আলোচনায় স্পস্টভাবে দেখানো হয়েছে যে, কিভাবে রেফারেন্স বিকৃত করে অথবা রেফারেন্স ছাড়াই আলবদর বাহিনীর প্রধান হিসাবে মাওলানা নিজামীকে চিত্রিত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রসিকিউশন প্রদর্শিত দুইটি বইতে মাওলানা নিজামীকে আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা দাবি করা হয়েছে। উক্ত বই দুটির আলোচনায় দেখানো হয়েছে যে, একটিতে ভুল রেফারেন্সে এবং অন্যটিতে রেফারেন্স ছাড়াই এ দাবিটি করা হয়েছে এবং বই দুটির লেখকদের ১৯৭১ সালের ঘটনার কোন প্রত্যক্ষ জ্ঞান নেই। উল্লেখিত ৬টি বইই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ১৯৮৬ সালের পরে লিখিত। সুতরাং নি:সন্দেহে বলা যায়, মাওলানা নিজামীর সাথে আলবদরের কোন দূরতম সম্পর্ক ছিল একথা প্রমাণে প্রসিকিউশন সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়েছে। 

পঞ্চমত: আলবদরের পরিচয়পত্র হিসেবে প্রসিকিউশন এই মামলায় ১১টি কার্ড প্রদর্শন করেছে। উক্ত কার্ডগুলো প্রদর্শনকারী তদন্ত কর্মকর্তা জেরায় স্বীকার করেন উক্ত পরিচয়পত্রসমূহ ইস্যু করেছেন একজন ক্যাপ্টেন। এর ইস্যুকারী এবং প্রতিস্বাক্ষরকারী উভয়েই পাকিস্তানী আর্মি অফিসার। নিজামী সাহেব যদি আলবদর প্রধান হতেন এবং এর উপর যদি তার কমান্ড এবং কন্ট্রোল থাকতো তাহলে অবশ্যই তার স্বাক্ষর থাকতো। এ থেকেই প্রমাণিত হয় যে, তিনি আলবদরের প্রধান ছিলেন না এবং আলবদর বাহিনী তার কমান্ড এবং কন্ট্রোলে ছিল না। 
 
ষষ্ঠত: আলবদরের প্রতিষ্ঠা এবং এর কমান্ড ও কন্ট্রোল: প্রসিকিউশনের তথ্য অনুযায়ী আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠা হয়েছিল একাত্তরের ১৬ মে ময়মনসিংহ জেলার শেরপুরে এবং এর প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন তরুণ মেজর রিয়াদ হোসাইন মালিক এবং এর প্রথম কমান্ডারের নাম ছিল কামরান। সুতরাং প্রসিকিউশনের ডকুমেন্ট দ্বারাই প্রমাণিত যে, মাওলানা নিজামী আলবদরের প্রতিষ্ঠাতাও ছিলেন না এবং প্রধানও ছিলেন না। ডিফেন্সপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত তৎকালীন পাক বাহিনীর ইস্টার্ণ কমান্ডার জেনারেল নিয়াজি কর্তৃক লিখিত বই The Betrayal of East Pakistan। উক্ত বইয়ের ৭৮-৭৯ পৃষ্ঠায় জেনারেল নিয়াজি স্পস্টভাবে বলেছেন, আলবদর বাহিনী ছিল রাজাকার বাহিনীর একটি শাখা যার প্রতিষ্ঠা এবং কমান্ড ও কন্ট্রোলে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনী। ডিফেন্সপক্ষ কর্তৃক দাখিলকৃত THE VANQUISHED GENERALS AND THE LIBERATION WAR OF BANGLADESH একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক বই, যেখানে ১৯৭১ সালে পাকবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বিশেষভাবে জেনারেল রাও ফরমাল আলী ও জেনারেল নিয়াজির সাক্ষাৎকার লিপিবদ্ধ আছে। বইটির ১৪৯-১৫০ পৃষ্ঠায় জেনারেল রাও ফরমান আলী সুস্পস্টভাবে বলেছেন, রাজাকার আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং কমান্ড ও কন্ট্রোলে ছিল পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বিশেষভাবে জেনারেল নিয়াজি। জেনারেল নিয়াজি তার সাক্ষাৎকারে ১৬৪-১৬৫ পৃষ্ঠায় বলেছেন, অনেকে বলে রাজাকার আলবদর জামায়াতে ইসলামীর। এটা সত্য নয়। আমিই রাজাকার-আলবদর বাহিনী প্রতিষ্ঠা করি এবং আমিই এটা নিয়ন্ত্রণ করতাম, আমি রাজনীতিবিদদের ঘৃণা করতাম এবং জামায়াতের লোকদেরকে আমার কাছে ঘেঁষতে দিতাম না। এখান থেকেই পরিষ্কার হয় যে, মাওলানা নিজামী নন বরং পাকিস্তান সেনাবাহিনী বিশেষভাবে জেনারেল নিয়াজি ছিলেন আলবদর বাহিনীর প্রতিষ্ঠাতা এবং নিয়ন্ত্রক। 
 
সপ্তমত: প্রসিকিউশন ১৯৭১ সালে মাওলানা নিজামীর খবর সম্বলিত ২১টি পেপার কাটিং এবং ৬টি গোয়েন্দা রিপোর্ট প্রদর্শন করেছে। এর কোন একটিতেও বলা হয়নি যে, মাওলানা নিজামী আলবদর বাহিনীর সাথে কোনভাবে সংশ্লিস্ট ছিলেন অথবা তিনি আলবদরের কোন বৈঠকে উপস্থিত হয়েছেন। অথচ এসমস্ত পত্র-পত্রিকা ও গোয়েন্দা রিপোর্টসমূহে আল বদরের অনেক বর্ণনা পাওয়া যায়। যা চূড়ান্তভাবে প্রমাণ করে যে, নিজামী সাহেব আলবদরের সাথে কোনভাবেই সংশ্লিস্ট ছিলেন না। 

অস্টমত: বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড বিষয়ে ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছে। যদিও তদন্তকারী কর্মকর্তা ৪২টি মামলা হওয়ার বিষয়ে তার অজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। কিন্তু তার প্রদর্শিত বই ‘একাত্তরের ঘাতক ও দালালরা কে কোথায়’ হতে দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে ৪২টি মামলা ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত দায়ের হয়েছে। তার প্রদর্শিত বই থেকে আরও দেখা যায় যে, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডটির পরিকল্পনা হামিদুল হকের মালিকানাধীন অবজারভার পত্রিকার অফিসে হামিদুল হকের কক্ষেই সম্পন্ন হয়। এছাড়াও ভিডিও ডকুমেন্ট ‘রণাঙ্গনের দিনগুলি’ হতে দেখা যায়, খান এ সবুরের বাড়ি থেকে মিরপুর মুক্ত হওয়ার পর বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের নীলনকশা উদ্ধার করা হয়েছিল। ঐ নীলনকশার বিবরণ বা নীলনকশাটি তদন্তকারী কর্মকর্তা সরকারের নিকট আবেদন করেও পান নাই অর্থাৎ তা আটকে রাখা হয়েছে। অন্যান্য দলিলপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে প্রখ্যাত সাংবাদিক জহির রায়হানকে আহ্বায়ক করে একটি বেসরকারি তদন্ত কমিটি গঠিত হয়েছিল যার অন্যতম সদস্য ছিলেন ব্যারিস্টার মওদূদ আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলাম। ঐ কমিটির নথিপত্র জহির রায়হান সাহেবের মৃত্যুর পর বাংলাদেশের বন্ধুপ্রতিম একটি দেশের একজন সাংবাদিকের হাতে তুলে দেয়া হয়, যা তদন্তকারী কর্তৃপক্ষ সংগ্রহের কোন প্রচেষ্টা করেন নাই বা ঐ কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদূদ আহমেদ ও ব্যারিস্টার আমিরুল ইসলামের সাথেও যোগাযোগ করেননি। এ বিষয়ে সরকার কর্তৃক একটি তদন্ত কমিটি গঠনের কথা আমরা বিভিন্ন দলিলপত্র হতে দেখতে পাই কিন্তু এ বিষয়ে ঐ কমিটি কি রিপোর্ট দিয়েছিল বা কি কি তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছিলেন সে বিষয়ে তদন্তকারী কর্মকর্তা কোন বক্তব্য দেন নাই। তদন্ত সংস্থা কর্তৃক সরকারের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হতে ১৯৭২ সালে প্রণীত স্বাধীনতা বিরোধীদের তালিকা তদন্ত সংস্থায় প্রেরিত হলেও তিনি তা সংগ্রহ করেননি বা বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ডের মামলাসমূহে কি বর্ণনা ছিল তা তিনি জানারও চেষ্টা করেননি। এরপরও যে ২ জন ব্যক্তিকে এই মামলায় সাক্ষী হিসাবে আনা হয়েছে অর্থাৎ শহীদ ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী এবং শহীদ ডা. আজহারের স্ত্রী সালমা হক তাদের স্বামীদের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে মামলা হওয়ার কথা স্বীকার করলেও ইচ্ছাকৃতভাবে ঐ মামলার আসামী সম্পর্কে কোন বক্তব্য দিতে চাননি তবে শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী বলেছেন যে, ডা. আলীম চৌধুরীর মামলাটি নিষ্পত্তি হয়ে গিয়েছে। 

নবমত: এই দু’টি হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে তদন্তে দালাল আইনে রিপোর্ট দাখিল করা হয়েছিল। ঐ রিপোর্ট দাখিলের পূর্বে নিশ্চিতভাবে এই দুই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছিল। কিন্তু তখন তারা মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে কোন বক্তব্য প্রদান করেননি তা স্বাভাবিকভাবেই অনুমান করা যায়। সাক্ষ্য প্রমাণ বিশ্লেষণে আমরা আরও দেখতে পাই, ঐ দুই হত্যাকাণ্ড সংক্রান্তে স্বাধীনতার পরপরই দুইজন ব্যক্তিকে আটক করা হয়েছিল। কিন্তু কোন এক অজ্ঞাত কারণে তাদেরকে ছেড়েও দেয়া হয়েছিল। তারা মাওলানা নিজামী সাহেবের অনুগত ব্যক্তি ছিলেন এই মর্মে কোন প্রমাণ নাই। উপরন্তু ঐ দুই সাক্ষী যেভাবে মাওলানা নিজামীকে জড়িয়ে ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দিয়েছেন তা বিশ্বাসযোগ্য হওয়ার কোন কারণ নাই। কেননা তাদের এই বক্তব্যসমূহ তারা তদন্তকারী কর্মকর্তার নিকট দেয়া জবানবন্দীর সময় বলেননি। তদন্তকারী কর্মকর্তা এই চার্জের তদন্ত ও সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পর্কে যে বক্তব্যের অবতারণা করেছেন তা মিথ্যাচার ছাড়া অন্য কিছু হতে পারে না। কারণ তদন্তকারী কর্মকর্তার বক্তব্য অনুযায়ী ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের পরে তিনি এই মামলার তদন্ত অব্যাহত রাখেন অতিরিক্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। এই তদন্তের ধারাবাহিকতাতেই ১৩তম সাক্ষী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরীকে সাক্ষী মান্য করেন যে বিষয়ে তিনি চীফ প্রসিকিউটর বরাবরে ২০১৩ সালের ২০ জানুয়ারির স্মারক নং- আন্ত: অপ: ট্রাই:/তদন্ত সংস্থা/৮৮ মূলে প্রেরিত চিঠিতে উল্লেখ করেন যে, তিনি ৩০ অক্টোবর উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী লিপিবদ্ধ করেন। অথচ তিনি তার জবানবন্দীতে উল্লেখ করেন যে, তার সহযোগী তদন্তকারী কর্মকর্তা মনোয়ারা বেগম উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করেন ২০১১ সালের ১০ মার্চ। দেখা যাচ্ছে যে, তদন্তের ধারাবাহিকতাতেই এই সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণের কথা বললেও এই তদন্তের কয়েক মাস পূর্বেই উক্ত সাক্ষীর জবানবন্দী গ্রহণ করা হয়েছে যা অবিশ্বাস্য ও অসম্ভব। ইতিহাস পিছন দিকে ঘুরলেই ২০১১ সালের ১০ মার্চ তারিখটি ২০১১ সালের ৩০ অক্টোবর হওয়া সম্ভব। কাজেই বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড সংক্রান্তে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগটি ফরমায়েশী এবং সাক্ষ্য-প্রমাণও অনুরূপভাবে গৃহীত। 
 
দশমত: সাক্ষী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী তার জেরায় যে সমস্ত বিষয়ে স্বীকার করেছেন তাতে খুব সহজে প্রতীয়মান হয় যে, তিনি আদালতে অসত্য জবানবন্দী দিয়েছেন। সর্বশেষ ফরমাল চার্জের অসংলগ্ন ও অসত্য বক্তব্য, সে অনুযায়ী চার্জ গঠন, সাক্ষীদের অসংখ্য অসত্য তথ্য প্রদান, মিথ্যাচার, তদন্তকারী কর্মকর্তার তদন্তে গাফিলতি, তথ্য গোপন, গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তদন্ত না করা এবং জেরা ও জবানবন্দীতে মিথ্যার আশ্রয় নেয়া, পক্ষাশ্রিত ঘোষিত মিথ্যাচারী ব্যক্তিদের বইপুস্তককে সাক্ষ্য হিসাবে দাখিল করা, কোন কোন ক্ষেত্রে দাখিলি দলিলপত্র ট্রাইব্যুনালে উপস্থাপন না করা প্রমাণ করে যে, মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা।
গত ১০ এপ্রিল আপিল বিভাগ ডিফেন্সপক্ষে সময়ের আবেদন মঞ্জুর করে ৩ মে রিভিউর পরবর্তী দিন নির্ধারণ করেছিলেন। 
এর আগে গত ৩ এপ্রিল এ বিষয়ে শুনানির দিন ধার্য ছিল। ওইদিন রিভিউ আবেদন কার্যতালিকায় আসলে ডিফেন্সপক্ষের সময় চেয়ে করা আবেদন মঞ্জুর করে আদালত “এই সপ্তাহে নয় বলে আদেশ দিয়েছিলেন। এর ধারাবাহিকতায় এক সপ্তাহ পর রিভিউ আবেদনটি আবার কার্যতালিকায় আসে ১০ এপ্রিল। একইসঙ্গে ডিফেন্সপক্ষের মুলতবির আবেদনও শুনানির জন্য আসে। ওইদিন শুনানি শেষে আদালত ৩ মে শুনানির পরবর্তী দিন ধার্য করেন। 
 
গত ২৯ মার্চ মাওলানা নিজামীর আইনজীবীরা খালাস চেয়ে আপিলের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করেন। ৭০ পৃষ্ঠার মূল রিভিউর আবেদনের সঙ্গে মোট ২২৯ পৃষ্ঠার নথিপত্রে ৪৬টি (গ্রাউন্ড) যুক্তিতে খালাস চান তার আইনজীবীরা। রিভিউ আবেদনের এডভোকেট অন রেকর্ড হলেন আইনজীবী জয়নুল আবেদীন তুহিন। 
এর একদিন পরেই সরকারপক্ষে শুনানির দিন নির্ধারণের জন্য আবেদন করে। সরকারের আবেদনের প্রেক্ষিতে গত ৩০ মার্চ আপিল বিভাগের চেম্বার জজ বিচারপতি মির্জা হোসেইন হায়দার আবেদনটি আপিল বিভাগের নিয়মিত বেঞ্চে পাঠিয়ে ৩ এপ্রিল দিন নির্ধারণ করেন। ওইদিন ডিফেন্সপক্ষে ৬ সপ্তাহ সময় চেয়ে আবেদন করা হলে আদালত এ সপ্তাহ নয় বলে আদেশ দেন। মামলার প্রধান আইনজীবী ও জ্যেষ্ঠ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেনের ব্যক্তিগত অসুবিধার কারণে সময় চাওয়া হয়।
গত ১৫ মার্চ আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ হয়েছিল। নিয়ম অনুযায়ী রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করতে হয়। সে হিসেবে ৩০ মার্চ পর্যন্ত রিভিউ করার সময় ছিল। তার আগেই মাওলানা নিজামীর পক্ষে তার আইনজীবীরা সংশ্লিষ্ট শাখায় এই আবেদন করেন। 
 
গত ১৬ মার্চ মাওলানা নিজামীর সঙ্গে আইনজীবীরা কাশিমপুর কারাগারে সাক্ষাৎ করলে তিনি রিভিউ করার পরামর্শ দেন। মাওলানা নিজামী তার আইনজীবীদের বলেন, তিনি নির্দোষ। যে অভিযোগে তাকে সাজা দেয়া হয়েছে তার সঙ্গে তার দূরতম সম্পর্কও নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন রিভিউ করার পর ন্যায়বিচার হলে তিনি খালাস পাবেন। আগেরদিন ১৫ মার্চ মাওলানা নিজামীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করে আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ রায়ে স্বাক্ষর করলে ওইদিন রায় প্রকাশ হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। পূর্ণাঙ্গ রায় লেখেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা। পূর্ণাঙ্গ রায়ে তিনটি অভিযোগে মাওলানা নিজামীর মৃত্যুদণ্ড, তিনটিতে খালাস, দুটিতে যাবজ্জীবন দেয়া হয়। এর আগে গত ৬ জানুয়ারি আপিল বিভাগ সংক্ষিপ্ত রায় প্রদান করেন। 
 
২০১৪ সালের ২৯ অক্টোবর মাওলানা নিজামীর মামলায় রায় ঘোষণা করেন বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। রায়ে ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ২, ৪, ৬ ও ১৬ নম্বর অভিযোগে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয়া হয়। অপর চারটি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া বাকি আটটি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মাওলানা নিজামীকে অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
ট্রাইব্যুনালের দেয়া এ রায়ের বিরুদ্ধে একই বছরের ২৩ নবেম্বর সুপ্রিম কোর্টে আপিল করেন তিনি। ছয় হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার আপিলে মৃত্যুদণ্ডের রায় বাতিল করে খালাসের আরজি জানান মাওলানা নিজামী। মোট ১৬৮টি যুক্তি দেখিয়ে এ আপিল করা হয়। 
 
২০১৩ সালের ১৩ নবেম্বর প্রথমবারের মতো এই মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমান (সিএভি) রাখা হয়। কিন্তু রায় ঘোষণার আগেই অবসরে চলে যান ট্রাইব্যুনাল-১-এর তৎকালীন চেয়ারম্যান বিচারপতি এটিএম ফজলে কবীর। পুনর্গঠিত ট্রাইব্যুনাল অধিকতর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষে দ্বিতীয় দফায় গত ২৪ মার্চ মামলার রায় অপেক্ষমান রাখেন। 
২০১২ সালের ২৮ মে ট্রাইব্যুনাল মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের ১৬টি অভিযোগ গঠন করে বিচার শুরু করে। অভিযোগের মধ্যে ছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় হত্যা, লুট, উসকানি ও সহায়তা, পরিকল্পনা ও ষড়যন্ত্র এবং বুদ্ধিজীবী হত্যা। অভিযোগ গঠনের ৩ মাস পর ২৬ আগস্ট তার বিরুদ্ধে ইসলামী ঐক্যজোটের (একাংশ) চেয়ারম্যান মিছবাহুর রহমান চৌধুরীর জবানবন্দীর মধ্যদিয়ে প্রসিকিউশনের সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। পরে প্রসিকিউশন পক্ষে সাক্ষ্য দেন মুক্তিযোদ্ধা জহিরউদ্দিন জালাল, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর স্ত্রী শ্যামলী নাসরিন চৌধুরী, শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা.আজহারুল হকের স্ত্রী সৈয়দা সালমা হক, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আবদুর রাজ্জাক খানসহ আরো ২৫ জন।
আসামীপক্ষের সাক্ষী (সাফাই সাক্ষী) হিসেবে প্রথমে ১০ হাজার ১১ জন সাক্ষীর তালিকা দিয়েছিল আসামীপক্ষ। পরে তারা ২৩ জন সাক্ষীর একটি সংশোধিত তালিকা জমা দেন। এর মধ্যে মাত্র ৪ জনকে সাফাই সাক্ষ্য দেয়ার জন্য নির্দিষ্ট করে দেন ট্রাইব্যুনাল। সাফাই সাক্ষীদের মধ্যে ছিলেন মাওলানা নিজামীর ছেলে ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। ২০১০ সালের ২৯ জুন কথিত ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় মাওলানা নিজামীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে একই বছরের ২ আগস্ট এক আবেদনে তাকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=233755