১৫ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
নিবন্ধ
ভূমিকা : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী
২৫ মার্চ ২০১৬, শুক্রবার,
মানুষ নামক সৃষ্টির সেরা জীবটিকে সৃষ্টি করা হয়েছে দেহ ও মনের এক অপূর্ব সম্মেলনের মাধ্যমে। মানুষের উন্নতি ও উৎকর্ষতা বলতে মুলত শারীরিক ও মানসিক উভয় ক্ষেত্রের ভারসাম্যপূর্ন অগ্রগতিকেই বোঝানো হয়। আর ইসলাম হলো আল্লাহ রাব্বুল আলামীন কর্তৃক মনোনীত একমাত্র পূর্নাংগ জীবন বিধান। এই জীবন বিধানের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে মানুষের জীবনের সার্বিক বিষয়াবলী নিয়েই দিক নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। ইসলাম শুধু ইমান বা বিশ্বাসের কথাই বলেনা, বরং এর পাশাপাশি সব ধরনের ব্যবহারিক আচরন নিয়েও কথা বলে। ইসলাম মানুষের আধ্যাতিক এবং বৈষয়িক সকল বিষয়েই পর্থ নির্দেশনা দেখায়। 

আর জামায়াতে ইসলামীর লক্ষ্য হলো আল্লাহ প্রদত্ত এবং রাসুল (সা:) প্রদর্শিত বিধান অনুযায়ী মানব জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে ও পর্যায়ে ইতিবাচক পরিবর্তন নিয়ে আসা। জামায়াতে ইসলামী সকল মানুষকে, বিশেষ করে মুসলমানদের প্রতি উদাত্ত আহবান জানায় এবং কুরআনের ভাষায় তাদেরকে দাওয়াত দেয়, “হে মানবজাতি, তোমরা আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পন করো। আল্লাহ ছাড়া আর কোন ইলাহ নেই, মাবুদ নেই।”

জামায়াতে ইসলামী কুরআনের এই অমীয় বানীকে ভিত্তি করে নিম্নোক্ত ৩টি দফার মাধ্যমে মানুষের কাছে ইসলামের বার্তা পৌছানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে।  
  • যদি আপনি দুনিয়ার জীবনে শান্তি ও পরকালে মুক্তি পেতে চান, তাহলে কেবলমাত্র এবং একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনকে সকল সার্বভৌমত্বের একমাত্র মালিক এবং হযরত মোহাম্মাদ (সা:) কে জীবনের সকল পর্যায়ের একমাত্র অনুসরনীয় নেতা হিসেবে মেনে নিন।
  • যদি আপনি এই আহবানে সাড়া দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনার সেই বিশ্বাস বা ঈমানের সাথে সাংঘর্ষিক সকল ধরনের চিন্তা-ভাবনা, কার্যক্রম এবং অভ্যাস পরিহার করুন এবং আল্লাহর বিধান এবং তার রাসুলের প্রদর্শিত পথের বাইরে অন্য কোন কিছুর আনুগত্য না করার ব্যপারে ঘোষনা দিন।
  • যদি আপনি মৌলিকভাবে আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করার ব্যপারে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ হন তাহলে অবশ্যই আপনাকে অসৎ এবং অযোগ্য নেতৃত্বকে হটিয়ে সৎ এবং যোগ্য নেতৃত্বকে দায়িত্বশীল পদে আসীন করার লক্ষ্যে নিয়মিত প্রচেষ্টা ও তৎপরতা চালাতে হবে।

জামায়াতে ইসলামী সকল কাজ ও কর্মের মাধ্যমে সমাজে সামগ্রিক পরিবর্তন আনতে চায়। তবে একটি স্থায়ী এবং কল্যানমুখী পরিবর্তনের জন্য সবার আগে মানুষের ভাবনা ও দর্শনকে সঠিক পথে বা সঠিক চিন্তাধারায় নিতে হয়। তারপর একই চিন্তাধারার মানুষগুলোকে সংঘবদ্ধ করে তাদেরকে যোগ্য নেতা ও দক্ষ জনশক্তিতে রূপান্তর করার প্রচেষ্টা চালাতে হয়। এই দক্ষ মানুষগুলোকে সামাজিক সংকট সমন্ধে অবহিত হতে হয় এবং একই সাথে সেই সমস্যাগুলোকে জনহিতকর মানসিকতার মাধ্যমে সমাধান করার মত সক্ষমতাও অর্জন করতে হয়। 
 
যদি আল্লাহ তায়ালা সন্তুষ্ট হয়ে জামায়াতকে কবুল করেন এবং জনগনের সমর্থনে যদি জামায়াত সরকার গঠন করতে পারে তাহলে জামায়াত ক্ষমতায় আসীন হয়ে দেশকে কুরআন ও হাদীসের আলোকে একটি কল্যানরাষ্ট্র বানানোর জন্য কাজ করবে। সেই উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে জামায়াত ৪ দফা কর্মসূচী হাতে নিয়েছে।
১.ভাবনার বিশুদ্ধতা ও পুনর্গঠন: 
ইসলাম প্রচারে এবং মানুষকে আল্লাহর পথে ডাকার জন্য কুরআন ও হাদীসের আলোকে মানুষের চিন্তা চেতনায় ও ভাবনায় শুদ্ধতা আনা এবং সেই জন্য এমন একটি প্রচেষ্টা পরিচালনা করা যাতে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মাঝে ইসলামিক চেতনার বিকাশ ঘটে এবং তারা জীবনের প্রতিটি পর্যায়ে ইসলাম অনুসরনের প্রয়োজনীয়তা অনুধাবন করে।
২.সংগঠন ও প্রশিক্ষন: 
ইসলামপ্রিয়, সচেতন এবং সৎ মানুষগুলোকে এবং সেই সাথে যারা সৎভাবে জীবন যাপন করতে চায় তাদেরকে ব্যবহারিক বিভিন্ন কার্যকলাপের মধ্য দিয়ে প্রশিক্ষন দেয়া যাতে তারা আল্লাহর খাস বান্দা হিসেবে আবির্ভুত হতে পারে। একই সাথে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের নিয়তে যাতে তারা মানবিক কার্যক্রম চালাতে উৎসাহিত হয় এবং এরই পরিনতিতে তারা সমাজের যোগ্য ও সৎ নেতা হিসেবে আসতে পারে সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় মানসিকতা তৈরীতেও কার্যকর উদ্যেগ ও প্রশিক্ষনের ব্যবস্থা করা। 
৩.সমাজ সেবা এবং সমাজ সংস্কার: 
সমাজের সব শ্রেনীর মানুষের অবস্থান ও জীবন মান উন্নত করার উদ্দেশ্যে ব্যপকহারে সমাজ সেবা এবং সামাজিক কল্যানমুলক কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তাই মানুষের মধ্যে ইসলামিক সংস্কৃতির চর্চা এবং ইসলামিক নীতিমালার আলোকে মানব চরিত্র গঠন করা অপরিহার্য। একই সাথে অসামাজিক কার্যক্রম প্রতিরোধে মানুষকে সংঘবদ্ধ করাও জরুরী।
৪.সরকার ও প্রশাসনিক সংস্কার: 
আভ্যন্তরীন প্রশাসন ব্যবস্থাপনা, পররাষ্ট্রনীতি, আইন ও বিধি-বিধান, মানুষের নৈতিক উন্নয়ন, শিক্ষা ব্যবস্থা, দেশের সামগ্রিক ও বস্তুনিষ্ঠ অগ্রগতি এবং সমাজের সকল স্তরে অসৎ ও অযোগ্য লোকের পরিবর্তে সৎ ও যোগ্য লোক বসানোর জন্য ইসলামী অনুশাসনের আলোকে সরকারকে পরামর্শ দেয়া একটি নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব।
 
কাজের প্রক্রিয়া:
  • কর্মসূচীর প্রথম দফা বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা বিভিন্ন শ্রেনী ও পেশার মানুষের সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে যোগায়োগ স্থাপন করে তাদেরকে ইসলামের বিভিন্ন বিষয় সম্পর্কে ধারনা দেয় এবং পরবর্তীতে তাদেরকে ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়নের জন্য আহবান জানায়। সংগঠনের মুরুব্বী ও দায়িত্বশীল পর্যায়ের ব্যক্তিরা কুরআন এবং হাদীস ক্লাস পরিচালনা করেন এবং সাধারন জনগনের মাঝে ইসলামের সুমহান শিক্ষা ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। জামায়াতে ইসলামী শহরে, নগরে এবং গ্রামীন এলাকার মানুষের মাঝে ইসলামের বার্তা পৌছে দেয়ার জন্য জনসভারও আয়োজন করে।
  • দ্বিতীয় দফা বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামী তাদেরকে সংঘবদ্ধ করে যারা তাদের আহবানে সাড়া দেয়। প্রথমে তাদেরকে সহযোগী সদস্য হিসেবে সংগঠনের অধীনে নিয়ে আসে এবং তারপর নিয়মিত নানাবিধ কার্যক্রমের মাধ্যমে তাদেরকে প্রশিক্ষন দেয়ার কাজটি করে। একই সংগে তাদেরকে ব্যক্তিগত মান উন্নয়নের জন্য তাদেরকে নিয়মিতভাবে কুরআন ও হাদীস পাঠ এবং নানা ধরনের ইসলামী সাহিত্য অধ্যায়নের উৎসাহ দেয়া হয়। তাদেরকে প্রত্যহ জামায়াতে নামাজ আদায় করতে হয়। তাদেরকে আবারও ব্যক্তিগত যোগাযোগের মাধ্যমে নতুন নতুন সহযোগী সদস্য তৈরী করার তাগিদ দেয়া হয়। একটি নির্ধারিত সময় পরপর তাদের কাজের অগ্রগতি সমন্ধে একটি রিপোর্ট বা প্রতিবেদনও জমা দিতে হয়।  
  • তৃতীয় দফা কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামী সবসময়ই নগদ অর্থ ও অন্যন্য সহযোগিতার মাধ্যমে গরীব-দুখী মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে তাদের কষ্ট ও দুর্দশা লাঘব করতে চেষ্টা করে। যখনই কোন দৈব বা প্রাকৃতিক দুর্যোগে মানুষ সমস্যায় পড়ে জামায়াত তখনই ঘটনাস্থলে ছুটে যেয়ে তাদের পাশে সাধ্যমত সাহায্য করে। জামায়াতে ইসলামী এর পাশাপাশি অসামাজিক এবং অনৈসলামিক কার্যক্রমের বিরুদ্ধে জনমত গঠনে প্রচেষ্টা চালায়।
  • চতুর্থ দফা কর্মসূচী বাস্তবায়নের জন্য জামায়াতে ইসলামী জনগনের মধ্যে স্বাধীনতার চেতনা গড়ে তোলার জন্য উৎসাহ প্রদান করে কেননা দেশের অস্তিত্বের জন্য এই চেতনার বিকাশের কোন বিকল্প নেই। বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচী ও বিবৃতির মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী বিদ্যমান জাতীয় ইস্যু ও সংকট নিয়ে সরকারকে গঠনমূলক পরামর্শ প্রদান করে। সরকার যেসব ভুল পদক্ষেপ বা নীতিমালা গ্রহন করে জামায়াত তার সমালোচনা করে এবং তা সংশোধনের জন্য পরামর্শ দেয়। 

জামায়াতে ইসলামী দেশে ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে জনগনকে উদ্বুদ্ধ করার জন্য তাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা সৃষ্টিতে নিরবিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা চালায়। একটি সুস্থ ও শালীন রাজনৈতিক সংস্কৃতি বিনির্মানের জন্য জামায়াতে ইসলামী সকল রাজনৈতিক দলের মধ্যে একটি পরমতসহিষ্ণুতা ও সহাবস্থানের মানসিকতা তৈরীতে চেষ্টা করে। জামায়াতে ইসলামী জনগনের সমর্থন আদায় করতে চায় আর সেই কারনেই তাদের প্রতিনিধিদের সংসদে প্রেরনের উদ্দেশ্যে নিয়মিতভাবে নির্বাচনে অংশগ্রহন করে আসছে। জামায়াত বিশ্বাস করে, এমন একটি সময় আসবে যখন দেশের মানুষ একটি ইসলামী সরকার প্রতিষ্ঠায় তাদের দলের মনোনীত প্রার্থীদের বিজয়ী করে সংসদে পাঠাবে।

জামায়াতে ইসলামীর প্রত্যাশা হলো বাংলাদেশকে একটি ইসলামিক কল্যান রাষ্ট্রে পরিনত করা। জামায়াত মনে করে, সেই ধরনের কল্যানরাষ্ট্র সেই সব ব্যক্তিদের মাধ্যমেই তৈরী করা সম্ভব যারা ইসলামকে সঠিকভাবে জানে এবং ইসলামের পরিপূর্ন চর্চা করার চেষ্টা করে। তাই কেবলমাত্র ইসলামের প্রকৃত অনুশীলনকারীরাই এই সংগঠনের সদস্য হতে পারেন। জামায়াতে ইসলামী কাউকে রেডীমেড নেতা হতে দেয়না। সদস্য না হলে কেউ এই সংগঠনের নেতা হতে পারেনা। আবার নেতৃত্বের জন্য প্রার্থী হয়ে প্রচারনা চালানোর সুযোগ এই সংগঠনে নেই। দলীয় নির্বাচনগুলো সব সময় নির্ধারিত বিরতিতে অর্থাৎ নির্দিষ্ট সময় পর পর হয়ে থাকে। সেই নির্বাচনে দলের রুকন বা সদস্যরা সম্পুর্ন স্বাধীনভাবে গোপণীয়তা রক্ষা করে তাদের ভোট প্রদান করতে পারেন। সদস্যরা সাধারনত ইসলামিক চরিত্র, আনুগত্য, মর্যাদা, দক্ষতা এবং সাংগঠনিক মেজাজের প্রতি লক্ষ্য রেখে তাদের নেতা নির্বাচন করেন। 

আপনাদের প্রতি আমাদের আকুল আবেদন, দয়া করে শোনা কথা বা অব্যহত মিথ্যা প্রচারনা-প্রপাগান্ডা বিশ্বাস করে আমাদেরকে যাচাই করবেন না। অনুগ্রহ করে জামায়াতকে অন্ধভাবে গ্রহনও করবেন না আবার না জেনে এই দলটিকে শুধু বিরোধীতার জন্য বিরোধীতাও করবেন না। দয়া করে, জামায়াতের কার্যক্রম থেকেই জামায়াত সমন্ধে আপনি সরাসরি ধারনা নেয়ার চেষ্টা করুন। 

এই সংগঠন সম্পর্কে জানতে দলের ব্রুশিয়ার, সংবিধান এবং অন্যন্য সাহিত্য পড়াশুনা করুন। আমরা আপনাকে আন্তরিকভাবে এই আদর্শিক সংগঠনে যোগ দেয়ার আহবান জানাচ্ছি। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভের পর দীর্ঘ দিন পর্যন্ত বাংলাদেশে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন বিশেষ করে ইসলামিক দলগুলো নিষিদ্ধ ছিল। ১৯৭৭ সালে সংবিধানের ৫ম সংশোধনীর মাধ্যমে ইসলামিক রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম পরিচালনা করার সুযোগ দেয়া হয়। এরপর ১৯৭৯ সালের ২৫ থেকে ২৭ মে, ঢাকার ইডেন হোটেলে একটি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় যার মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী একটি ইসলামিক রাজনৈতিক দল হিসেবে আবির্ভুত হয়।
 
[কেন্দ্রীয় কার্যালয়:]
৫০৫ এলিফ্যান্ড রোড, বড় মগবাজার, ঢাকা-১২১৭।
টেলিফোন: ৯৩৩১৫৮১, ৯৩৩১২৩৯
ইমেইল: info@jamaat-e-islami.org