২২ অক্টোবর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ফাঁসির মঞ্চের বিজয়ী বীর শহীদ কামারুজ্জামান
৯ এপ্রিল ২০১৬, শনিবার,
হারুন ইবনে শাহাদাত: ১১ এপ্রিল বিশ্ব ইসলামী আন্দোলনের জন্য একটি বিশেষ দিন। বিশেষ করে বাংলাদেশের ইসলামী আন্দোলনের নেতা কর্মী ও ইসলামপ্রিয় জনগণ এই দিনটির কথা কোনদিন ভুলতে পারবে  না। আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য জীবনবাজি রেখে শাহাদাতের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে বিজয়ী বীর মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রক্তের অক্ষরে লেখা চিরস্মরণীয় দিন ১১ এপ্রিল সাপ্তাহিক সোনার বাংলা পরিবার, অগণিত পাঠকদের জন্য চিরস্মরণীয় এক করুণ এপিটাফ। 

“যে ঈমান ফাঁসির মঞ্চে, অসংকোচে- গায় জীবনের গান/ আমাকে দাও সে ঈমান,/ দাও সে ঈমান আল্লাহ্ মেহেরবান।” কবি মতিউর রহমান মল্লিকের লেখা এমন জাগরণের গানের প্রথম সংকলন ‘প্রত্যয়ের গান’ শিরোনামে যাঁর আন্তরিক সহযোগিতা আর উৎসাহে প্রকাশিত হয়েছিলো সেই সৃজনশীল মানুষ ইসলামী আন্দোলনের প্রথম সারির নেতা বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান  গত এক বছর আগে ২০১৫ সালের ১১ এপ্রিল রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ঢাকার কেন্দ্রীয় কারাগারের ফাঁসির মঞ্চে অসংকোচে জীবনের বিজয় সঙ্গীত গেয়ে শাহাদাতের মহান মর্যাদার সিঁড়ি বেয়ে চলে গেছেন বিশ্ব জাহানের মালিক আল্লাহতায়ালার সান্নিধ্যে। ফাঁসির মঞ্চে উঠানোর আগে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁকে নির্বাহী আদেশ পড়ে শোনান। আদেশ শুনে তিনি শান্ত ও দৃঢ় কণ্ঠে বলেন, ‘যে অভিযোগে আমাকে শাস্তি দেয়া হচ্ছে, তার সাথে আমার দূরতম কোনো সম্পর্ক নেই। আমি দেশের জন্য কাজ করেছি। দেশ ও দেশের মানুষকে ভালোবেসেছি । মনে প্রাণে ইসলামের বিজয় কামনা করেছি। আমার বিশ্বাস এদেশে ইসলামের বিজয় পতাকা উড়বেই, ইনশাল্লাহ।’ তারপর তিনি উচ্চারণ করেন, পবিত্র কুরআনের বাণী, ‘ওয়া মা-নাক্বমূ মিন্হুম্ ইল্লা আঁই ইয়ুমিনূ বিল্লা-হিল্ ‘আযীযিল্ হামীদ’ অর্থাৎ তাদের ওপর নির্যাতন করা হয়েছে একমাত্র এই ‘অপরাধে’ যে তারা মহাপরাক্রমশালী সপ্রংশসিত আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছিলো।’ ইসলামী আন্দোলনের জন্য নিজেকে সঁপে দেয়ার শপথ নেয়ার সময় তিনি পবিত্র কুরআনের  অমিয় বাণী উচ্চারণ করেছিলেন, ’ইন্নাস সালাতি ওয়া নুসুকি ওয়া মাহইয়াইয়া ওয়া মামাতি লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন। অর্থাৎ (বল) নিশ্চয়ই আমার নামাজ, আমার যাবতীয় ইবাদত, আমার জীবন, আমার কুরবানি সবই সারা জাহানের মালিক আল্লাহর জন্য।’ তিলাওয়াত করতে করতে দৃপ্ত পায়ে সাহসী বুকে উঠলেন ফাঁসির মঞ্চে।

গত ২০১৫ সালের ৬ এপ্রিল মাত্র দশ সেকেন্ডে একটি মাত্র শব্দ ‘ডিসমিসড’ উচ্চারণ করে মৃত্যুদণ্ডের বিরুদ্ধে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার সদস্যের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ  যে রায় ঘোষণা করেন, নির্বাহী আদেশে গত ১১ এপ্রিল সেই রায়ের বাস্তবায়নের মধ্যদিয়ে  ১৯৫২ সালের ৪ জুলাই শুরু হওয়া ৬৩ বছরের একটি জীবন- ইতিহাসের সমাপ্তি অধ্যায়ে সূচনা হয় নতুন আরেক ইতিহাসের স্বর্ণালী যাত্রা।

তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগের কথা সমবেতভাবে এক শ্রেণীর মিডিয়া প্রচার করলেও, যুক্তি বিচারে তা গ্রহণযোগ্য না হওয়ায় ১৯৭১ সালে মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। সরকার এই অভিযোগে তাঁকে প্রায় ৫ বছর কারাগারে বন্দী রাখে। উল্লেখ্য, গ্রেফতারের আগে তাদের বিরুদ্ধে এমন কোনো অভিযোগ আনা হয়নি। আর এজন্যই  বিচার শুরু করতে সরকার এক বছর সময় নেয়। এই দীর্ঘ সময় বিনা বিচারে তাঁকে কারাগারে আটক রাখা হয়েছিল।

জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান এবং আবদুল কাদের মোল্লা পুলিশের দায়ের করা একটি মামলা থেকে জামিন নিয়ে হাইকোর্ট থেকে বের হওয়ার সময় ২০১০ সালের ১৩ জুলাই গ্রেফতার হন। যদিও মহামান্য আদালতের আদেশ ছিল তাদেরকে গ্রেফতার ও হয়রানি না করার। ওই বছরের ২ আগস্ট তাদেরকে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে ডিফেন্স পক্ষ এবং ২০ মে প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন। এর পর ২০১২ সালের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তাঁর বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করার পরিকল্পনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের ১৮ জন সাক্ষ্য  দেন। অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে গত ৬ থেকে ২৪ মার্চ ২০১৩ পর্যন্ত ৫ জন ডিফেন্স সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মো. আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম।

গত ২০১৩ বছরের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ কামারুজ্জামানকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেন। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ও খালাস চেয়ে গত বছরের ৬ জুন আপিল করেন তিনি। ২০১৪ সালের ৫ জুন থেকে আপিলের শুনানি শুরু হয়। ১৬তম দিনে ১৭ সেপ্টেম্বর শুনানি শেষ হয়। ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর আপিল বিভাগের বিভক্ত রায়ে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে তাঁর মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখা হয়। ২০১৫ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি বুধবার বিকালে সুপ্রিম কোর্টের ওয়েব সাইটে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় সাড়ে তিনমাস পর প্রকাশিত হয়। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহাসহ চার বিচারপতির স্বার শেষে রায়টি প্রকাশ করা হয়। বেঞ্চের অপর তিন বিচারপতি হলেন বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা, বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী ও বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী। এরমধ্যে জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে ভিন্নমত পোষণ করেছেন। পূর্ণাঙ্গ রায়টি ৫৭৭ পৃষ্ঠার। রায়ের ৫৭৬ পৃষ্ঠায় সংপ্তি আদেশ রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ রায়ের সংপ্তি আদেশে বলা হয়েছে-আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। আপিলকারী মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে প্রথম অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হলো। ২ ও ৭ নম্বর অভিযোগে তার দণ্ড সংখ্যারিষ্ঠতার ভিত্তিতে বহাল থাকলো। ৩ অভিযোগে তাঁকে সর্বস্মতভাবে দোষীসাব্যস্ত করা হলো তবে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হলো সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে। ৪ অভিযোগে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তার সাজা মৃত্যুদণ্ড থেকে কমিয়ে যাবজ্জীবন করা হয়েছিল।

জ্যেষ্ঠ বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা রায়ে বলেছেন আপিল আংশিকভাবে মঞ্জুর হলো। ২, ৪ এবং ৭ নম্বর অভিযোগে আপিলকারী দোষী না হওয়ায় তাঁকে (মুহাম্মদ কামারুজ্জামান) খালাস দেয়া হলো। ৪ নম্বর অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের স্থলে যাবজ্জীবন সাজা দেয়া হলো। ২ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে প্রসিকিউশন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ। কারণে দোষী প্রমাণিত না হওয়ায় অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো। ৩ নম্বর অভিযোগে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদণ্ডের আদেশ সংশোধন করে যাবজ্জীবন সাজা দেয়াই যুক্তিযুক্ত। কারণ ঘটনাস্থলে অভিযুক্তের উপস্থিতি নিয়ে কিছুটা সন্দেহ রয়েছে। ৪ নম্বর অভিযোগের ক্ষেত্রে বলা হয়েছে প্রসিকিউশন অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি। ৭ নম্বর অভিযোগে বলা হয়েছে এই অভিযোগটিও প্রসিকিউশন সন্দেহাতীত প্রমাণ করতে পারেনি। তদন্ত কর্মকর্তা বলেছেন, কামারুজ্জামান কোন কোন দিন সকালে, কোন কোন দিন দুপুরে আবার কোন কোন দিন সন্ধ্যার পর ডাক বাংলোর ক্যাম্পে আসত। যদি তাই হয় তাহলে কিভাবে অভিযুক্ত প্রণিধানযোগ্য আল বদর নেতা হলেন? কিভাবে সাক্ষীরা তাকে দেখেছে এবং ঘটনায় তার সম্পৃক্ততা রয়েছে তা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এবিষয়গুলো আরো বিস্তারিত ট্রাইব্যুনাল বিবেচনায় নিতে পারতো। তাই অভিযুক্তকে খালাস দেয়া হলো।

আপিল বিভাগের সংপ্তি রায় প্রকাশের পর গত ২০১৪ সালের ১০ নভেম্বর জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল জনাব মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল ওয়ামী বলেছিলেন, আমার বাবা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে সম্পূর্ণ অন্যায়ভাবে সাজানো অভিযোগে ফাঁসির দণ্ড দেয়া হয়েছে। তিনি কখনো সোহাগপুরে যাননি। এমনকি, রাষ্ট্রপরে দায়ের করা ফর্মাল চার্জেও সোহাগপুর গণহত্যার সময় তিনি সেখানে উপস্থিত ছিলেন এমন অভিযোগ করা হয়নি। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশন মিলনায়তনে এ প্রেস ব্রিফিংয়ে  কামারুজ্জামানের স্ত্রী, মেজ ছেলে, ছোট ছেলে, ভাইসহ পরিবারের অন্য সদস্যরাও উপস্থিত ছিলেন। হাসান ইকবাল বলেন, এই মামলায় মূল সাক্ষীর তালিকায় ৪৬ জনের নাম ছিল। তাদের মধ্যে ১০ জন সাক্ষী ট্রাইব্যুনালে সাক্ষ্য দেয়ার পর নতুন করে তিনজন মহিলাকে অতিরিক্ত সাক্ষী হিসেবে প্রসিকিউশন আদালতে উপস্থাপন করে।  এই সাক্ষীরাও তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে প্রদত্ত জবানবন্দীতে গণহত্যার সময় আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন এমন দাবি করেননি। ট্রাইব্যুনালে প্রদত্ত সা্েয ভিকটিম বলে দাবিকৃত চারজন সাক্ষীর সবাই স্বীকার করেছেন যে, স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় তারা কেউই আমার বাবাকে চিনতেন না। যেসব সাক্ষীরা আমার বাবাকে ১৯৭১ সালে চিনতেন না, তাদের কথার ভিত্তিতে ১৯৭১ সালে সঙ্ঘটিত অপরাধের দায় কীভাবে আমার বাবার উপর বর্তায়, এটি জাতির কাছে আমার প্রশ্ন। তিনি আরো বলেন, ২০১১ সালে সোহাগপুরের গণহত্যা নিয়ে সাংবাদিক মামুন-উর-রশিদ উক্ত এলাকা পরিদর্শন করে “সোহাগপুরের বিধবা কন্যারা” নামে একটি বই প্রকাশ করেন। প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী হাসেন বানু ও ১৩তম সাক্ষী করফুলি বেওয়াসহ অনেকের সাক্ষাৎকার  সেই বইতে আছে এবং তারা কেউই তাদের সাক্ষাৎকারে গণহত্যার সময় আমার বাবা উপস্থিত ছিলেন এমন দাবি করেননি। এমনকি, বইটিতে মোট ১শ’ ৩৮ জন রাজাকারের  যে তালিকা দেয়া আছে সেখানেও আমার বাবার নাম নেই। হাসান ইকবাল বলেন, শেরপুরের নালিতাবাড়ী থানার বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুর রহমান তালুকদার ২০১১ সালে অনুপম প্রকাশনী থেকে “মুক্তিযুদ্ধে নালিতাবাড়ী” নামক একটি বই প্রকাশ করেন। সেখানে সোহাগপুর গণহত্যার বিস্তারিত বিবরণ থাকলেও কোথাও কোনো ঘটনার সাথে আমার বাবার সম্পৃক্ততার কথা বলা হয়নি। মুক্তিযুদ্ধ গবেষক এবং বিডিনিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকমের সাবেক কনসালটেন্ট এডিটর জনাব আফসান চৌধুরী ২০১২ সালের ৩০ জুলাই, অর্থাৎ এই মামলা চলাকালীন সময়ে, সোহাগপুরের গণহত্যা নিয়ে বিডিনিউজে “In Srabon I Remember the Massacre of Shohagpur in 1971” শিরোনামে একটি প্রবন্ধ লিখেন। উক্ত প্রবন্ধে এই গণহত্যা যারা ঘটিয়েছে তাদের নাম-পরিচয় উল্লেখ থাকলেও কোথাও আমার বাবার নাম নেই। হাসান ইকবাল দাবি করেন, আমার বাবা জনাব কামারুজ্জামান সোহাগপুরসহ কোনো হত্যাকাণ্ডের সাথে কখনোই জড়িত ছিলেন না। রাজনৈতিক কারণে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে তাকে এই মামলায় জড়ানো হয়েছে। তিনি সম্পূর্ণ নির্দোষ। অত্র মামলায় আনীত অভিযোগের সাথে তার দূরতম সম্পৃক্ততা নেই। আমরা আশা করি বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ এই রায় পুনর্বিবেচনা করে আমার বাবা মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে বেকসুর খালাস দিয়ে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন। সাংবাদিকরা তার কাছে জানতে চান আপনারা কি মনে করেন এই জাজমেন্টটা ভুল ছিল? উত্তরে হাসান ইকবাল বলেন, আমরা মনে করি এটি ন্যায়ভ্রষ্ট জাজমেন্ট।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে হাসান ইকবাল বলেছিলেন, যে কোনো জাস্টিস সিস্টেমে মিসক্যারেজ অফ জাস্টিস হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যায় না। যে কোনো ছোট-খাট মিসটেক থেকে এটি হতে পারে। আমরা মনে করি যদি এই রিভিউ এর সুযোগটা আমরা পাই এবং এই জিনিসগুলো সবার সামনে উঠে আসে, তাহলে কোনো চেঞ্জ আসলেও আসতে পারে। আমরা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আশা রাখতে চাই যে, তিনি বেকসুর খালাস পাবেন। তিনি আরো বলেছিলেন, আমি আপনাদের সামনে আজ যে বিষয়গুলো উপস্থাপন করলাম এগুলো ফ্যাক্ট। আমরা চ্যালেঞ্জ দিয়ে বলতে পারি সোহাগপুরের গণহত্যার ইতিহাসে কামারুজ্জামানের সম্পৃক্ততার কথা কোনো বই, ডকুমেন্ট বা রিপোর্টে নেই।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, তুরস্ক, পাকিস্তানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এবং জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ,  নো  পিস উইদাউট  জাস্টিস, কমনওয়েলথ ল’য়ার এসোসিয়েশন, তুরস্কের জাস্টিস এবং ডেভেলভমেন্ট পার্টিসহ বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং ব্যক্তিগতভাবে যুক্তরাজ্যের হাউস অব লর্ডের সদস্য লর্ড কারলাইল, লর্ড এভিব্যুরিসহ বিশ্ব সম্প্রদায়ের পক্ষ থেকে বিচার প্রক্রিয়াকে ত্রুটিপূর্ণ উল্লেখ করে মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার তাদের আহ্বানকে উপো করে দেশের সবচেয়ে বড় ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল জাময়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করেছে। জাতিসংঘ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিচার প্রক্রিয়ার শুরু থেকেই আপত্তি জানিয়ে আসছিলো। জাতিসংঘের পক্ষ থেকে দেয়া সর্বশেষ বিবৃতিতেও সে কথা উল্লেখ করা হয়েছে। গত ২০১৫ সালের ৮ এপ্রিল বুধবার জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের পক্ষে জেনেভা থেকে দেয়া বিবৃতিতে বলা হয়েছিল, জামায়াত নেতা মুহাম্মাদ কামারুজ্জামানের ফাঁসির দণ্ড স্থগিত করতে আমরা বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি। কামারুজ্জামান বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত হয়েছেন। তার বিচার প্রক্রিয়ায় নানা অনিয়ম বিদ্যমান ছিল এবং ন্যায্য বিচার প্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী হয়নি। বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘের মানবাধিকার অফিস দীর্ঘদিন যাবত বিচারের স্বচ্ছতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছিল, তাই বাংলাদেশ সরকারের উচিত হবে না মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা। ট্রাইব্যুনাল কর্তৃক ১৬টি রায় দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ১৪ জনকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়, যার অধিকাংশই বিরোধী রাজনৈতিক দল-জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপির নেতা। তারা সবাই ১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতা বিরোধী অপরাধ, গণহত্যাসহ বিভিন্ন অপরাধে দণ্ডিত হয়েছেন। এর মধ্যে ২০১৩ সালে আবদুল কাদের মোল্লার মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করা হয়। বাংলাদেশ কর্তৃক অনুস্বারিত ইন্টারন্যাশনাল কভোন্যান্ট অন সিভিল এন্ড পলিটিক্যাল রাইট্স এর উদ্ধৃতি দিয়ে বিবৃতিতে বলা হয়, মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেয়া বিচারের ক্ষেত্রে বিবেকী ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। যদি অন্যায্য বিচার প্রক্রিয়ার মধ্যদিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়, তা হবে মানুষের বেঁচে থাকার অধিকার থেকে বঞ্চিত করা।

বিবৃতিতে বলা হয়, জাতিসংঘ সব সময়ই মৃত্যুদণ্ডের বিরোধী, এমনকি যেখানে কঠোরভাবে ন্যায্য বিচারের মানদণ্ড অনুসরণ করা হয়েছে এবং অধিকাংশ গুরুতর আন্তর্জাতিক অপরাধ সংঘটিত হয়েছে সে ক্ষেত্রেও। বিবৃতিতে অমানবিক মৃত্যুদণ্ডাদেশ বিলোপকারী দেশের কাতারে শামিল হতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। আন্তর্জাতিক মহলের সকল আবেদন নিবেদনকে উপেক্ষা করে সরকার তাঁর মৃত্যুদণ্ডাদেশ কার্যকর করে দেশের রাজনীতির ইতিহাসে যে প্রতিহিংসার রাজনীতির যে অধ্যায়ের সূচনা করেছে তার শেষ পরিণতি সময়ই বলে দিবে। 
http://www.weeklysonarbangla.net/news_details.php?newsid=21588