২৫ আগস্ট ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
অবসরের পর দু’ বিচারপতির স্বাক্ষর আল্লামা সাঈদীর আপিলের রায়ে
২৩ জানুয়ারি ২০১৬, শনিবার,
অবসরের পর দু’জন বিচারপতি বিশ্ববরেণ্য আলেম ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেছেন। আপিলের রায়ের পাঁচ বিচারপতির মধ্যে দু’জনই অবসরে থাকা অবস্থায় স্বাক্ষর করেন, যা গত ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত হয়েছে। এদের মধ্যে সাবেক প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন অবসরের সাড়ে ১১ মাস পর এবং অপর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী অবসরের দু’ মাস পর আল্লামা সাঈদীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন। তাদের একজন রায়ে আল্লামা সাঈদীকে আজীবন কারাদণ্ড এবং অপরজন মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। যদিও এরই মধ্যে আপিলের রায়ের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশন ও আল্লামা সাঈদী রিভিউ দাখিল করেছেন। 

গত ১৭ জানুয়ারি প্রধান বিচারপতি দায়িত্ব নেয়ার এক বছর পূর্তিতে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা এক বাণীতে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের বিচারপতিগণ বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের শপথ গ্রহণ করেন। কোনো বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর তিনি একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে গণ্য হন বিধায় তার গৃহীত শপথও বহাল থাকে না। আদালতের নথি সরকারি দলিল (পাবলিক ডকুমেন্ট)। একজন বিচারপতি অবসর গ্রহণের পর আদালতের নথি নিজের নিকট সংরক্ষণ, পর্যালোচনা বা রায় প্রস্তুত করা এবং তাতে দস্তখত করার অধিকার হারান। আশা করি বিচারকগণ আইনের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এমন বেআইনী কাজ থেকে বিরত থাকবেন।’

এই বক্তব্যের জের থেকে আইন অঙ্গনসহ সারা দেশে তুমুল সমালোচনার ঝড় শুরু হয়। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বলা হয় অবসরের পর রায় লেখা যায় না। সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের তরফ থেকে বিষয়টি বার বার বলে এসেছি। প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বাণীতে এটি আরো স্পষ্ট হয়েছে। 

অবসরে যাওয়া বিচারপতিদের রায় লেখার এখতিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেন সংবিধান ও আইন বিশেষজ্ঞরা। তারা বলেছেন অবসরের পর বিচারপতিরা সংবিধানের রক্ষণ ও সমর্থনের যে শপথ নিয়ে থাকেন তার অধীনে থাকেন না। তাদের শপথও বহাল থাকে না। ফলে তারা রায় লেখার যোগ্যতা হারান। যদি অবসরে গিয়ে রায় লেখা হয় তা হবে সংবিধানের লঙ্ঘন এবং সংবিধান পরিপন্থী। ওই রায় আইনগতভবে ভিত্তিহীন। এর সমর্থনে তারা বলেন, সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধান বিচারপতিসহ সব বিচারপতিদের নিয়োগপ্রাপ্তির পর সংবিধানের ১৪৮ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী শপথ গ্রহণপূর্বক দায়িত্বভার গ্রহণ করতে হয়। বিচারক হিসেবে বাংলাদেশের সংবিধান, আইনের রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধানের যে শপথ বিচারক হিসেবে গ্রহণ অবসরের পর তিনি আর ওই শপথের আওতায় থাকেন না। এর অর্থ হলো অবসরের পর রায় লেখা হবে অবৈধ।


গত ৩১ ডিসেম্বর আল্লামা সাঈদীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয় সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে। বিচারপতিদের স্বাক্ষরের পর এই রায় প্রকাশ হয় সংক্ষিপ্ত রায় দেয়ার ১৫ মাস পর। ততদিনে রায় প্রদানকারী দু’জন বিচারপতি অবসরে চলে যান। ২০১৫ সালের ১৭ জানুয়ারি অবসরে যান তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন। বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী গত বছরের ১ অক্টোবর অবসরে যান। এর আগে ১৭ সেপ্টেম্বর কোনো রকম সংবর্ধনা ছাড়াই তাকে বিদায় নিতে হয়।

২০১৪ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ আল্লামা সাঈদীর আপিলের সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি মোঃ আবদুল ওয়াহহাব মিঞা সব অভিযোগ থেকে আল্লামা সাঈদীকে খালাস দেন। আর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী আসামীর মৃত্যুদ-ের পক্ষে রায় দেন। তবে তখনকার প্রধান বিচারপতি মোঃ মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মতামতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আমৃত্যু কারাদ-ের রায় আসে। 

আপিলের রায়ে সকল অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিঞা পূর্ণাঙ্গ রায়ে বলেন, প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতে বলেছেন অভিযুক্ত রাজাকার, তিনি ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন সুনির্দিষ্ট করে ৬,৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৭ নম্বর অভিযোগে। কিন্তু ডিফেন্স পক্ষের আপিল এবং সাক্ষীরা ক্যাটাগরিভাবে দেখিয়েছেন তিনি (আল্লামা সাঈদী) অপরাধ সংঘটনের স্থানে ওই সময়ে উপস্থিত ছিলেন না। তখন তিনি রওশন আলীর (ডিডব্লিউ-৬) দোহা খোলায় ছিলেন। তিনি রাজাকার ছিলেন না এবং অপরাধ সংঘটিত করেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা। প্রসিকিউশনের মামলা এবং ডিফেন্সের আপিল থেকে দেখা যায় অভিযুক্ত রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন প্রসিকিউশন তা চূড়ান্ত প্রমাণের (ক্রুশিয়াল ফ্যাক্ট) মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে দেখাতে ব্যর্থ। উপরন্তু ডিফেন্স পক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং প্রামাণ্যচিত্র পরিষ্কার সংশয় সৃষ্টি করে প্রসিকিউশনের করা তিনি ১৯৭১ সালে রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন এ বিষয়ে। ফলে অভিযুক্তকে বেনিফিট অব ডাউট দেয়া হলো। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত যে প্রসিকিউশন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৭ নম্বর অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি (আল্লামা সাঈদী) সকল অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার অধিকারী। একইসঙ্গে অভিযুক্তের অপরাধ খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং তাকে খালাস দেয়া হলো। 


২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মৃত্যুদণ্ড দেয়। ১৯৭১ সালে হত্যা, গণহত্যা, অগ্নিসংযোগ, লুটপাট, নির্যাতন, ধর্ষণ, ধর্মান্তরকরণসহ ২০টি অভিযোগ আনে প্রসিকিউশন। এর মধ্যে আটটি অভিযোগে আল্লামা সাঈদীকে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ইব্রাহিম কুট্টি ও বিশাবালী হত্যার অভিযোগে দেয়া হয় মৃত্যুদণ্ড। অপর ১২টি অভিযোগ থেকে খালাস দেয়া হয় আল্লামা সাঈদীকে। খালাস দেয়া অভিযোগের মধ্যে উল্লেখযোগ্য রয়েছে হুমায়ূন আহমেদের পিতা ফয়জুর রহমানসহ পিরোজপুরের তিনজন সরকারি কর্মকর্তাকে হত্যার অভিযোগ, ভাগিরথী হত্যা এবং ভানুসাহাকে ধর্ষণের অভিযোগ।


ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে গত বছরের ২৮ মার্চ আপিল করেন আল্লামা সাঈদী। যে ছয়টি অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে কিন্তু সাজা উল্লেখ করেনি ট্রাইব্যুনাল সেগুলোতে সাজার দাবি জানিয়ে একই দিন আপিল করে প্রসিকিউশন। ২৪ সেপ্টেম্বর আপিল শুনানি শুরু হয়। সাড়ে ছয় মাস শুনানির পর গত ১৬ এপ্রিল আলোচিত এ মামলার রায় অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন আপিল বিভাগ।

http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=221018