১০ ডিসেম্বর ২০১৯, মঙ্গলবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
খালাস চেয়ে রিভিউ করার নির্দেশ আল্লামা সাঈদীর
১৪ জানুয়ারি ২০১৬, বৃহস্পতিবার,
বিশ্ব বরেণ্য আলেম ও জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর আল্লামা দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদী খালাস চেয়ে রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন (রিভিউ) করতে তার আইনজীবীদের নির্দেশ দিয়েছেন। একই সঙ্গে নিজেকে নির্দোষ দাবি করে তিনি দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন। আল্লামা সাঈদী মনে করেন নিরপেক্ষ বিচার হলে তিনি অবশ্যই রিভিউতে অভিযোগ থেকে খালাস পাবেন।
গতকাল বুধবার গাজীপুরের কাশিমপুর কারাগারে আল্লামা সাঈদীর সঙ্গে তার আইনজীবীরা দেখা করতে গেলে তিনি এ নির্দেশ দেন। দুপুর দেড়টার দিকে কাশিমপুর কারাগারে প্রবেশ করেন আল্লামা সাঈদীর চার আইনজীবী এডভোকেট মো.সাইফুর রহমান, এডভোকেট তাজুল ইসলাম, এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ ও এডভোকেট মো.ইউসুফ আলী। প্রায় এক ঘণ্টা পর কারাগার থেকে বেরিয়ে আসেন তারা।
পরে আইনজীবী মো.সাইফুর রহমান বলেন, সাঈদী সাহেব বলেছেন, যেসব অভিযোগে তাকে শাস্তি দেয়া হয়েছে, সেগুলোর সঙ্গে তিনি জড়িত ছিলেন না। তিনি এসব বিষয়ে কিছু জানেনও না। অভিযোগের সঙ্গে তার দূরতম সম্পর্কও নেই। এমনকি যারা অভিযোগ করেছেন তাদেরকে তিনি চেনেনও না। সবকিছু আল্লাহর ওপর ছেড়ে দিয়ে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন তিনি। এ ছাড়া আইনজীবীদের রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন করতেও আল্লামা সাঈদী পরামর্শ দিয়েছেন।
আইনজীবী মো.সাইফুর রহমান জানান, জামায়াতে ইসলামীর সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউর রায় অনুযায়ী রিভিউ আবেদন করার জন্য ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত সময় আছে। সে জন্য তারা আগামী সপ্তাহে রিভিউ আবেদন করবেন। এর ব্যাখ্যা হিসেবে তিনি বলেন, যে দিন অভিযুক্তকে কারাগারে রায় পড়ে শোনানো হবে সেদিন থেকে রিভিউ দাখিলের ১৫ দিনের ক্ষণ গণনা শুরু হবে। সে হিসেবে গত ৬ জানুয়ারি সাঈদী সাহেবকে রায় পোড়ে শোনানো হয়েছে।
আল্লামা সাঈদীর অপর আইনজীবী মতিউর রহমান আকন্দ জানান, আপিল বিভাগের রায়ে আল্লামা সাঈদীর বিরুদ্ধে তিন রকমের রায় হয়েছে, যা আসলে নজীরবিহীন। একই আদালতে এক মামলায় একই আইনে কি করে তিন ধরনের রায় হয়। একজন বিচারপতি খালাস দিয়েছেন, একজন বিচারপতি মৃত্যুদ- ও তিনজন বিচারপতি আমৃত্যু কারাদণ্ডের রায় দেন। বিচারে এত তারতম্য হবে কেন। এতে প্রমাণিত হয় প্রসিকিউশন তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেননি। এ অভিযোগ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। যেখানে অভিযোগ প্রমাণিতই হয়নি সেখানে তো তার এ সাজা থাকার প্রশ্নই উঠে না। তাই ওই রায়ের বিরুদ্ধে তিনি রিভিউ করবেন। তিনি বিশ্বাস করেন রায়ে তিনি ন্যায় বিচার পাবেন এবং তিনি অবশ্যই মুক্ত হয়ে কোরআনের ময়দানে ফিরবেন। তিনি ভাল আছেন, সুস্থ আছেন এবং মানসিকভাবে দৃঢ় আছেন। তিনি কারাগার থেকে দেশবাসীর দোয়া চেয়েছেন এবং সালাম জানিয়েছেন।
আল্লামা সাঈদীর ছেলে মাসুদ বিন সাঈদী বলেন, দুপুর দেড়টার দিকে তারা কারা চত্বরে যান। পরে কারাকর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে দুপুর দুইটার দিকে বাবার সঙ্গে কথা বলেন। সেখানে প্রায় আধাঘণ্টা কথা তিনি বলেন। এসময় তার সঙ্গে চার আইনজীবী ছিলেন।
গত মঙ্গলবার সরকার পক্ষে (প্রসিকিউশন) আল্লামা সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি চেয়ে রিভিউ দাখিল করা হয়। আপিল বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখায় এডভোকেট অন রেকর্ড সৈয়দ মাহবুবুর রহমান রিভিউ আবেদনটি করেন। সরকার পক্ষের রিভিউ আবেদনটি ৩০ পৃষ্ঠার। পাঁচটি গ্রাউন্ডে মৃত্যুদ- চেয়েছে সরকার। এর সঙ্গে রয়েছে ৬৫৩ পৃষ্ঠার নথিপত্র। এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম জানান, আপিল বিভাগের রায়ের বিরুদ্ধে রিভিউ আবেদন করেছি। এতে সাঈদীর সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদ- চাওয়া হয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে গত ৩১ ডিসেম্বর সকালে আল্লামা সাঈদীর আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশিত হয়। তৎকালীন প্রধান বিচারপতি মো.মোজাম্মেল হোসেনের নেতৃত্বে পাঁচ বিচারপতির বেঞ্চ সংক্ষিপ্ত রায় ঘোষণা করেন। পূর্ণাঙ্গ রায়ে বিচারপতি মো. আবদুল ওয়াহহাব মিঞা সব অভিযোগ থেকে আল্লামা সাঈদীকে খালাস দেন। আর বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী আসামীর মৃত্যুদন্ডের পক্ষে রায় দেন। তবে তখনকার প্রধান বিচারপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন, বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা (এস কে সিনহা) ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকীর মতামতে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে আমৃত্যু কারাদ-ের রায় আসে।
আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে সকল অভিযোগ থেকে খালাস দিয়ে আপিল বিভাগের জ্যেষ্ঠ বিচারপতি আবদুল ওয়াহ্হাব মিয়া বলেন, প্রসিকিউশন তাদের যুক্তিতে বলেছেন অভিযুক্ত রাজাকার, তিনি ১৯৭১ সালে মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছেন সুনির্দিষ্ট করে ৬,৭,৮,১০,১১,১৪,১৬ ও ১৭ নম্বর অভিযোগে। কিন্তু ডিফেন্স পক্ষের আপিল এবং সাক্ষীরা ক্যাটাগরিভাবে দেখিয়েছে তিনি (আল্লামা সাঈদী) অপরাধ সংঘটনের স্থানে ওই সময়ে উপস্থিত ছিলেন না। তখন তিনি রওশন আলীর (ডিডব্লিউ-৬) দোহা খোলায় ছিলেন। তিনি রাজাকার ছিলেন না এবং অপরাধ সংঘটিত করেছে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় রাজাকার এবং শান্তি কমিটির সদস্যরা। প্রসিকিউশনের মামলা এবং ডিফেন্সের আপিল থেকে দেখা যায় অভিযুক্ত রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন প্রসিকিউশন তা চূড়ান্ত প্রমাণের (ক্রুশিয়াল ফ্যাক্ট) মাধ্যমে সন্দেহাতীতভাবে দেখাতে ব্যর্থ। উপরন্তু ডিফেন্সপক্ষে উপস্থাপিত সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং প্রামাণ্যচিত্র পরিষ্কার সংশয় সৃষ্টি করে প্রসিকিউশনের করা তিনি ১৯৭১ সালে রাজাকার বা শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন এ বিষয়ে। ফলে অভিযুক্তকে বেনিফিট অব ডাউট দেয়া হলো। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত যে প্রসিকিউশন অভিযুক্তের বিরুদ্ধে আনা ৬, ৭, ৮, ১০, ১১, ১৪, ১৬ ও ১৭ নম্বর অভিযোগ সন্দোহীততভাবে প্রমাণে ব্যর্থ হয়েছে এবং তিনি (আল্লামা সাঈদী) সকল অভিযোগ থেকে খালাস পাওয়ার অধিকারী। একইসঙ্গে অভিযুক্তের অপরাধ খুঁজে পাওয়া যায়নি এবং তাকে খালাস দেয়া হলো।
২০১৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আল্লামা সাঈদীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ মৃত্যুদ- দেয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ের বিরুদ্ধে খালাস চেয়ে একই বছরের ২৮ মার্চ আপিল করেন আল্লামা সাঈদী।
- See more at: http://192.185.226.192/~dailysan/news_details.php?news_id=219910#sthash.QA2qtXxi.dpuf