২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
আপিলের শুনানিতে খন্দকার মাহবুব হোসেন ২০ বছরের তরুণের পাকিস্তান আর্মিকে পথ দেখানো অসম্ভব
৩ ডিসেম্বর ২০১৫, বৃহস্পতিবার,
জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলে ডিফেন্স পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। পরবর্তীতে সরকারপক্ষে এটর্নি জেনারেলের যুক্তি উপস্থাপনের পর তা খন্ডন করবে ডিফেন্স।
গতকাল বুধবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে তৃতীয় ও শেষ দিনের যুক্তিতর্কের শুনানি হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
আদালতে মাওলানা নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন প্রধান কৌঁসুলী ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন, এডভোকেট এস এম শাহজাহান। তাদের সহযোগিতা করেন এডভোকেট মো. শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্তি এটর্নি জেনারেল মো.মোমতাজ উদ্দিন ফকির।
আগামী ৭ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম সরকার পক্ষের যুক্তি পেশ করবেন। এরপর ৮ ডিসেম্বর মাওলানা নিজামীর পক্ষে এটর্নি জেনারেলের বক্তব্যের জবাব দেয়ার মধ্য দিয়ে শুনানি শেষ হবে।
প্রধান কৌঁসুলী ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, চারটি অভিযোগে মাওলানা নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়েছে। প্রসিকিউশন এই অভিযোগগুলো প্রমাণ করতে পারেনি। বলা হয়েছে- তিনি আর্মিদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছেন। ধান ক্ষেতে তেঁতুল গাছের নিচে লুকিয়ে সাক্ষীরা পাকিস্তান আর্মিদের আসতে দেখেছে। অথচ তখন পাকিস্তান আর্মি আসার কথা শুনলে মানুষ পালিয়ে যেত। তখন পুলিশের তথ্য না নিয়ে পাকিস্তান আর্মি মুভ করত না। পাকিস্তান আর্মি কোথাও গেলে পুলিশকে জানিয়ে যেত এবং পুলিশ পথ দেখিয়েছে আর আর্মি সেই পথে গিয়েছে। নিজামীর মতো একজন ১৯ বা ২০ বছরের ছেলের পক্ষে পাকিস্তান আর্মিকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাওয়ার কথা অবাস্তব। তার পক্ষে পাকিস্তান আর্মিকে কমান্ড করাও সম্ভব ছিল না।
এ সময় প্রধান বিচারপতি বলেন, এই লোকগুলো, রাজাকার মুজাহিদরা না থাকলে পাকিস্তান আর্মি ১০ মাস কেন, তিন মাসও থাকতে পারত না।
এসময় খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, পাকিস্তানী আর্মিদের সহযোগিতা করেছে এদেশের পুলিশ। পুলিশ মুভ না করলে পাকিস্তানী আর্মিরা আসতো না। তাদের যদি পথ না দেখাতো তাহলে পাকিস্তানী আর্মির বাংলাদেশের এলাকাগুলো চেনার কথা নয়। মাওলানা নিজামী প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ৩০ সেপ্টেম্বরের পর তিনি (নিজামী) ছাত্র সংঘের দায়িত্বে ছিলেন না। দায়িত্ব ছাড়ার আড়াই মাস পর বুদ্ধিজীবী হত্যা সংঘটিত হয়। প্রধান বিচারপতি বলেন, ’৭১ সালে আইনশৃংখলা বাহিনী ছিল না। এরাই তাদেরকে সহযোগিতা করেছেন, মিলিটারীদের।
প্রধান বিচারপতি বলেন, যুদ্ধের শেষে যদি এ কথা বলেন, তাহলে কি প্রমাণ হচ্ছে না যে, নিজামী লিডার ছিলেন? আপনি টোকিও ট্রায়াল দেখেন। তখন খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, টোকিও ট্রায়াল দেখাবেন না। প্রিন্সিপাল একিউজড ১৯৫ জনকে বাদ দিয়ে বিচার হচ্ছে। যারা মানবতাবিরোধী অপরাধ করেছে সে পাকসেনাদেরকে তো বিচারের আওতায় অনছেন না। তাদের বিচার হলে বিষয়টি অন্য রকম হতো।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, তখন অপরাধ হয়েছে সন্দেহ নাই। এটাই সত্য। কিন্তু নিজামী ছিলেন ২০ বছরের তরুণ। তার মতো ইয়াংরা (তরুণ) পথ দেখালো আর আর্মিরা সেখানে গেলো এটা ইমপসিবল। ২০ বছরের তরুণ পথ দেখালো আর পাকিস্তানী বাহিনী গেলো এটা গ্রহণযোগ্য নয়। প্রসিকিউশন সেফ হোমে সাক্ষীদের প্রশিক্ষণ দিয়েছে। তারা যে ধরনের উপাদান ও বক্তব্য দিয়েছে এতে অনেক পৈরিত্য অসামঞ্জস্যতা রয়েছে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, আমরা একাত্তরে অস্বীকার করছি না একাত্তরে অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। আমি অধ্যাপক গোলাম আযমকে এ ব্যাপারে জিজ্ঞেস করেছিলাম তিনি আমাকে বলেন, দেখো বাবা এটা ছিল পাকিস্তানের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন। আমরা রাজনৈতিক বিশ্বাস থেকে এই সমর্থন করেছিলাম। কিন্তু এটার জন্য এখন ব্যক্তি বিশেষকে দায়ী করা হচ্ছে। ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত নিজামীর বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ আসেনি। যখনই তিনি সংসদ সদস্য হলেন তখন তার বিরুদ্ধে প্রচারণা শুরু হয়। এমনকি ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে ৪২টি মামলা হলে তার মধ্যেও নিজামীর নাম ছিল না। রাজাকারের তালিকায় তার নাম ছিল না। মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এটা স্বীকার করেছেন।
ঘটনা সবই সত্যি ছিল। কিন্তু সেগুলোর পরিবর্তন করা হয়েছে। যেমন মিরপুরের কাদের কসাই হয়ে গেলেন কাদের মোল্লা। নিজামী এসবের সঙ্গে ছিলেন না। তার সে ক্ষমতা ও শক্তি ছিল না। তিনি ছিলেন ছাত্র।
প্রধান বিচারপতি বলেন, তিনি একটা বাহিনীর প্রধান ছিলেন। আদালত এসময় একটা প্রতিবেদন পড়ে শোনান এতে জেহাদে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান ছিল। খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, নিজামীতো কাউকে হত্যা করেননি, ধর্ষণ করেননি। তার বিরুদ্ধে কোন সুস্পষ্ট অভিযোগ নেই। যদি সুনির্দিষ্টভাবে অভিযোগ দেখানো যায় তাহলে বিচার হতে পারে।
খন্দকার মাহবুব হোসেন এ সময় গতকালকে সারা দেশে ৪০ জনের মতো ব্যক্তির ফাঁসির রায়ের উদ্ধৃতি দিয়ে বলেন, এটা এখন ফাঁসির দেশ হয়ে গেছে। প্রধান বিচারপতি বলেন, এটা বলবেন না সৌদি, চীনে কি হচ্ছে আমরা একটি দিলে হৈ চৈ পড়ে যায়। প্রধান বিচারপতি বলেন, সৌদিতে যা হচ্ছে আমাদের দেশে তার এক পার্সেন্টও হচ্ছে না।
বেঞ্চের একজন বিচারপতি বলেন, সব চার্জে সরাসরি অভিযোগ (চার্জ নাই) নেই। দেখিয়ে দিয়েছে বা অন্যের কাছ থেকে শোনা।
খন্দকার মাহবুব হোসেন বলেন, এতোদিন এ বিষয়ে চুপ কেন ছিলেন। রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর এখন বিচার হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামীকে নিয়েই এক সময় তারা আন্দোলন করেছে। হঠাৎ করে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আসলো।
এর আগে মাওলানা নিজামীর আইনজীবী এসএম শাহজাহান বলেন, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা আব্দুর রাজ্জাক খান স্বীকার করেছেন, ১৯৭১ সালে মতিউর রহমান নিজামী আল বদর কমান্ডার ছিলেন কি না, এ ব্যপারে কোন দালিলিক প্রমাণ তার কাছে নেই। সে সময় নিজামী কখনও পাকিস্তান সেনাবাহিনী বা রাজাকার কমান্ডারদের সাথে সাক্ষাৎ করেছেন কি না, এ মর্মেও কোন দালিলিক প্রমাণ নেই। তিনি বলেন, পাবনার সাঁথিয়া এলাকায় একটি মামলায় নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয়া হয়। কিন্তু ১৯৭১ সালে মাওলানা নিজামীর পাবনায় উপস্থিতির বিষয়ে কোন দালিলিক প্রমাণ বা এ মর্মে কোন পত্রপত্রিকার সংবাদ নেই বলেও স্বীকার করেছেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা। এসএম শাহজাহান আদালতে আরও বলেন, ১৯৮২ সালের রাজনৈতিক বিবেচনায় মামলা হওয়ার আগ পর্যন্ত মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে কখনও কোন মামলা হয়নি। মাওলানা নিজামীকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে এ সময় তার খালাস দাবি করেন তার আইনজীবী এস.এম শাহজাহান।
গত ২৫ নবেম্বর পেপারবুক উপস্থাপন শেষ হলে মাওলানা নিজামীর আপিলের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সময়সীমা বেঁধে দেন আপিল বিভাগ। যুক্তি উপস্থাপনের ডিফেন্স পক্ষকে সময় দেয়া হয়েছে তিন কার্যদিবস। আর একদিন তারা প্রসিকিউশনের (সরকার পক্ষ) যুক্তি খণ্ডন ও জবাব দেয়ার সুযোগ পাবেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ নবেম্বর এবং ১ ও ২ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়েছে। ৭ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেল তার বক্তব্য উপস্থান করবেন। পরদিন ৮ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেলের যুক্তির জবাব দিবেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী।
গত ৯ সেপ্টেম্বর এই আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল। ওইদিন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি শুরু করেন। পরে মাওলানা নিজামীর এডভোকেট অন রেকর্ড জয়নাল আবেদীন তুহিন পেপারবুক পড়েন। মাঝে সুপ্রিম কোর্টের দেড় মাসের অবকাশ ছুটি থাকায় শুনানি ২ নবেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। ওইদিন আংশিক শুনানি হয়। পরদিন ৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর আপিলের শুনানির দিন ধার্য থাকলেও ওই দিন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি অনুপস্থিত থাকায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর গত ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও গতকাল মিলিয়ে ৬ কার্যদিবসে পেপারবুক উপস্থপান শেষ হয়।
গত বছরের ২৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। ১২১ পৃষ্ঠার মূল আপিল আবেদনে ১৬৮টি যুক্তি দেখিয়ে মাওলানা নিজামীর খালাস চাওয়া হয়। আবেদনে ৬ হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার নথিপত্র রয়েছে।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দায়ের করা মোট ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪টি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ৪টি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া বাকি ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মাওলানা নিজামীকে অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=214617