২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর আপিলের যুক্তিতর্ক: বুদ্ধিজীবী হত্যার ঘটনায় মাওলানা নিজামীকে জড়ানোর সুযোগ নেই
২ ডিসেম্বর ২০১৫, বুধবার,
জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের দ্বিতীয় দিনের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়েছে। শুনানিতে মাওলানা নিজামীর পক্ষে চারটি যুক্তি তুলে ধরেন তার আইনজীবী। শুনানিতে বলা হয় মুক্তিযুদ্ধের পর জেলা প্রশাসকদের জমা দেয়া রাজাকারদের তালিকায় মাওলানা নিজামীর নাম ছিল না। বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৪২টি মামলা দায়ের হলেও তার নাম ছিল না। একাত্তরের ৩০ সেপ্টেম্বর থেকে তিনি ছাত্র সংঘের সভাপতির দায়িত্বে ছিলেন না। আল বদর নেতা হিসেবে প্রসিকিউশনের কোন সাক্ষ্য-প্রমাণেও তার নাম নেই। সুতরাং আলবদর প্রধান হিসাবে ৩০ সেপ্টেম্বরের পরে সংঘটিত অপরাধের সাথে মাওলানা নিজামীকে জড়ানোর কোন সুযোগ নেই।
গতকাল মঙ্গলবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে দ্বিতীয় দিনের যুক্তিতর্কের শুনানি হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী।
আদালতে মাওলানা নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন এডভোকেট এস এম শাহজাহান। তাকে সহযোগিতা করেন এডভোকেট মো.শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন। সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।
আদালতে যুক্তি উপস্থাপনের বিষয়ে আইনজীবী এস এম শাহজাহান বলেন, তিনি আদালতে চারটি যুক্তি উপস্থাপন করেছেন। প্রথম যুক্তি ছিল মুক্তিযুদ্ধের পর ১৯৭২ সালে জেলা প্রশাসকরা একটি রাজাকারের তালিকা জমা দিয়েছিলেন। ওই তালিকায় মাওলানা নিজামীর নাম ছিল না। দ্বিতীয় যুক্তি হলো-যুদ্ধের পর বুদ্ধিজীবী হত্যার অভিযোগে ১৯৭২ সালের ২৮ মার্চ পর্যন্ত ৪২টি মামলা হয়েছিল। কিন্তু একটিতেও মাওলানা নিজামীর নাম ছিল না। তৃতীয় যুক্তি ছিল মতিউর রহমান নিজামী ইসলামী ছাত্র সংঘের নিখিল পাকিস্তানের দায়িত্বে ছিলেন ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। অথচ বুদ্ধিজীবী হত্যাকাণ্ড হয় ডিসেম্বর মাসে। অপরাধ সংঘটনের সময় তিনি ছাত্র সংঘের কোনো দায়িত্বে ছিলেন না। চতুর্থ যুক্তি ছিল প্রসিকিউশন মৌখিক অনেক সাক্ষ্যে অসামাঞ্জস্যতা রয়েছে। আলবদর নেতা হিসেবে মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে কোনো নথি প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
এস এম শাহজাহান আরো বলেন, আগামীকাল পুনরায় আমরা যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করব। এরপর ৭ ডিসেম্বর সরকার পক্ষ যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবে।
আগেরদিন সোমবার মাওলানা নিজামীর আইনজীবী শুনানিতে বলেন, সাঁথিয়ার গণহত্যার ঘটনায় প্রসিকিউশনের একমাত্র দেখা সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন। মামলার শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে তিনি কিছু বলেননি। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার সময় প্রথম বলেছেন।
মাওলানা নিজামীর পক্ষে লিখিত যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী এসএম শাহজাহান। তিনি আদালতে বলেন, এ মামলার প্রথম অভিযোগ মাওলানা কসিমউদ্দিন হত্যাকাণ্ড। এই অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রসিকিউশনের চতুর্থ সাক্ষী হাবিবুর রহমান বলেছে কসিমউদ্দিনের ছেলে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিবলী তাকে বলেছে মাওলানা নিজামী তার বাবার হত্যার সাথে জড়িত। অথচ কসিমউদ্দিনের ছেলে শিবলী বলেছেন হাবিবুর রহমানের সাথে তার পরিচয় নেই। তিনি আরো বলেছেন তার বাবাকে নিজামী মেরেছে এটা তিনি বলেননি।
এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে যে অভিযোগ করেছে তা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে বলেনি।
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ হল পাবনার সাঁথিয়ার গণহত্যা। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এসএম শাহজাহান আদালতে বলেন, এই অভিযোগে প্রসিকিউশনের চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। এরমধ্যে একমাত্র নবম সাক্ষী আইনুল হক ঘটনা দেখার কথা বলেছে। তবে তার দেখার কথা মামলার শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে বলেননি। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার সময় প্রথম বলেছেন। এজন্য তার কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই অভিযোগে প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী এডভোকেট শামসুল হক নান্নুর একটি ভিডিও টেপ ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। ওই ভিডিও টেপে নান্নু বলেছেন, ১৯৭১ সালে তিনি মাওলানা নিজামীকে দেখেননি। সাঁথিয়ার গণহত্যার ঘটনার সাথে নিজামী জড়িত এটা সে দেখেননি। এছাড়া এই অভিযোগের সরকারপক্ষের ১৭ ও ১৮তম সাক্ষী শোনা সাক্ষী, তারা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে মাওলানা নিজামীর জড়িত থাকার কথা বলেননি।
তৃতীয় অভিযোগের বিষয়ে এসএম শাহজাহান বলেন, মামলার তৃতীয় অভিযোগে দুইজন সাক্ষী বিচ্ছু জালাল এবং রোস্তম আলীর জবানবন্দীর মধ্যে গরমিল রয়েছে। বিচ্ছু জালাল বলেছে, মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ঘটনা রোস্তমের কাছ থেকে শুনেছে। আর রোস্তম বলেছে, সে তাকে বলেনি।
অপর দিকে আদালতের এক প্রশ্নের জবাবে এসএম শাহজাহান বলেন, মাওলানা নিজামীকে আলবদরের প্রধান বলা হলেও এ বিষয়ে কোন এভিডেন্স নেই।
গত ২৫ নবেম্বর পেপারবুক উপস্থাপন শেষ হলে মাওলানা নিজামীর আপিলের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সময়সীমা বেঁধে দেন আপিল বিভাগ। যুক্তি উপস্থাপনের জন্য ডিফেন্স পক্ষকে সময় দেয়া হয়েছে তিন কার্যদিবস। আর একদিন তারা প্রসিকিউশনের (সরকার পক্ষ) যুক্তি খণ্ডন ও জবাব দেয়ার সুযোগ পাবেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী ৩০ নবেম্বর এবং ১ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন হয়েছে। আজ ডিফেন্সপক্ষ শেষ দিনের যুক্তি উপস্থপান করবে। এরপর ৭ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেল তার বক্তব্য উপস্থান করবেন। পরদিন ৮ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেলের যুক্তির জবাব দিবেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী।
গত ৯ সেপ্টেম্বর এই আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল। ওইদিন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি শুরু করেন। পরে মাওলানা নিজামীর এডভোকেট অন রেকর্ড জয়নাল আবেদীন তুহিন পেপারবুক পড়েন। মাঝে সুপ্রিম কোর্টের দেড় মাসের অবকাশ ছুটি থাকায় শুনানি ২ নবেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। ওইদিন আংশিক শুনানি হয়। পরদিন ৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর আপিলের শুনানির দিন ধার্য থাকলেও ওই দিন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি অনুপস্থিত থাকায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর গত ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও গতকাল মিলিয়ে ৬ কার্যদিবসে পেপারবুক উপস্থপান শেষ হয়।
গত বছরের ২৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। ১২১ পৃষ্ঠার মূল আপিল আবেদনে ১৬৮টি যুক্তি দেখিয়ে মাওলানা নিজামীর খালাস চাওয়া হয়। আবেদনে ৬ হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার নথিপত্র রয়েছে।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দায়ের করা মোট ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪টি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ৪টি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া বাকি ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মাওলানা নিজামীকে অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=214470