২২ নভেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মাওলানা নিজামীর আপিলের যুক্তিতর্ক শুরু: সাঁথিয়ার গণহত্যা বিষয়ে সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়
১ ডিসেম্বর ২০১৫, মঙ্গলবার,
জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর আপিলের যুক্তি উপস্থাপন শুরু হয়েছে। শুনানিতে মাওলানা নিজামীর আইনজীবী বলেন, সাঁথিয়ার গণহত্যার ঘটনায় প্রসিকিউশনের একমাত্র দেখা সাক্ষীর সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। তিনি প্রত্যক্ষদর্শী নন। মামলার শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে তিনি কিছু বলেননি। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার সময় প্রথম বলেছেন।
গতকাল সোমবার প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চে যুক্তিতর্কের শুনানি হয়। বেঞ্চের অপর সদস্যরা হলেন বিচারপতি নাজমুন আরা সুলতানা, বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন ও বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। গতকাল মাওলানা নিজামীর পক্ষে মামলার প্রথম ও দ্বিতীয় অভিযোগের যুক্তি উপস্থাপন শেষ হয়। এরপর তৃতীয় অভিযোগের আংশিক যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের পর আজ মঙ্গলবার পর্যন্ত শুনানি মুলতবি করা হয়েছে।
মাওলানা নিজামীর পক্ষে লিখিত যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী এসএম শাহজাহান। তিনি আদালতে বলেন, এ মামলার প্রথম অভিযোগ মাওলানা কসিমউদ্দিন হত্যাকাণ্ড। এই অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। এ বিষয়ে প্রসিকিউশনের চতুর্থ সাক্ষী হাবিবুর রহমান বলেছে কসিমউদ্দিনের ছেলে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী শিবলী তাকে বলেছে মাওলানা নিজামী তার বাবার হত্যার সাথে জড়িত। অথচ এই শিবলী বলেছে হাবিবুর রহমানের সাথে তার পরিচয় নেই। সে আরো বলেছে তার বাবাকে নিজামী মেরেছে এটা সে বলেনি।
এছাড়া দ্বিতীয় ও তৃতীয় অভিযোগের সাক্ষীরা ট্রাইব্যুনালে যে অভিযোগ করেছে তা মামলার তদন্তকারি কর্মকর্তার কাছে বলেনি।
মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে দ্বিতীয় অভিযোগ হলো পাবনার সাঁথিয়ার গণহত্যা। এই অভিযোগে ট্রাইব্যুনাল তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। এসএম শাহজাহান আদালতে বলেন, এই অভিযোগে প্রসিকিউশনের চারজন সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছে। এরমধ্যে একমাত্র নবম সাক্ষী আইনুল হক ঘটনা দেখার কথা বলেছে। তবে তার দেখার কথা মামলার শুরুতে তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে বলেননি। ট্রাইব্যুনালে জবানবন্দী দেয়ার সময় প্রথম বলেছেন। এজন্য তার কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়। এই অভিযোগে প্রসিকিউশনের ১১তম সাক্ষী এডভোকেট শামসুল হক নান্নুর একটি ভিডিও টেপ ইউটিউবে পাওয়া যাচ্ছে। ওই ভিডিও টেপে নান্নু বলেছেন, ১৯৭১ সালে তিনি মাওলানা নিজামীকে দেখেননি। সাঁথিয়ার গণহত্যার ঘটনার সাথে নিজামী জড়িত এটা সে দেখেনি। এছাড়া এই অভিযোগের রাষ্ট্রপক্ষের ১৭ ও ১৮তম সাক্ষী শোনা সাক্ষী, তারা তদন্ত কর্মকর্তার কাছে দেয়া জবানবন্দীতে মাওলানা নিজামীর জড়িত থাকার কথা বলেননি।
তৃতীয় অভিযোগের বিষয়ে এসএম শাহজাহান বলেন, মামলার তৃতীয় অভিযোগে দুইজন সাক্ষী বিচ্ছু জালাল এবং রোস্তম আলীর জবানবন্দীর মধ্যে গরমিল রয়েছে। বিচ্ছু জালাল বলেছে, মোহাম্মদপুর ফিজিক্যাল ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ঘটনা রোস্তমের কাছ থেকে শুনেছে। আর রোস্তম বলেছে, সে তাকে বলেনি।
অপর দিকে আদালতের এক প্রশ্নের জবাবে এসএম শাহজাহান বলেন, মাওলানা নিজামীকে আলবদরের প্রধান বলা হলেও এ বিষয়ে কোন এভিডেন্স নেই।
মাওলানা নিজামীর পক্ষে আদালতে এডভোকেট মো.শিশির মনির ও ব্যারিস্টার নাজিব মোমেন উপস্থিত ছিলেন। সরকার পক্ষে ছিলেন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম ও অতিরিক্ত এটর্নি জেনারেল মমতাজ উদ্দিন ফকির।
গত ২৫ নবেম্বর পেপারবুক উপস্থাপন শেষ হলে মাওলানা নিজামীর আপিলের যুক্তিতর্ক উপস্থাপনে সময়সীমা বেঁধে দেন আপিল বিভাগ। যুক্তি উপস্থাপনের ডিফেন্স পক্ষকে সময় দেয়া হয়েছে তিন কার্যদিবস। আর একদিন তারা প্রসিকিউশনের (সরকার পক্ষ) যুক্তি খণ্ডন ও জবাব দেয়ার সুযোগ পাবেন। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ৩০ নবেম্বর এবং ১ ও ২ ডিসেম্বর যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করবেন নিজামীর আইনজীবী। এরপর ৭ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেল তার বক্তব্য উপস্থান করবেন। পরদিন ৮ ডিসেম্বর এটর্নি জেনারেলের যুক্তির জবাব দিবেন মাওলানা নিজামীর আইনজীবী।
গত ৯ সেপ্টেম্বর এই আপিলের শুনানি শুরু হয়েছিল। ওইদিন এটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম শুনানি শুরু করেন। পরে মাওলানা নিজামীর এডভোকেট অন রেকর্ড জয়নাল আবেদীন তুহিন পেপারবুক পড়েন। মাঝে সুপ্রিম কোর্টের দেড় মাসের অবকাশ ছুটি থাকায় শুনানি ২ নবেম্বর পর্যন্ত মুলতবি রাখা হয়। ওইদিন আংশিক শুনানি হয়। পরদিন ৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর আপিলের শুনানির দিন ধার্য থাকলেও ওই দিন আপিল বিভাগের একজন জ্যেষ্ঠ বিচারপতি অনুপস্থিত থাকায় শুনানি অনুষ্ঠিত হয়নি। এরপর গত ১৭, ১৮, ২৩, ২৪ ও গতকাল মিলিয়ে ৬ কার্যদিবসে পেপারবুক উপস্থপান শেষ হয়।
গত বছরের ২৩ নবেম্বর মাওলানা নিজামীর খালাস চেয়ে সুপ্রিম কোর্টের সংশ্লিষ্ট শাখায় আপিল আবেদন দায়ের করেন তার আইনজীবীরা। ১২১ পৃষ্ঠার মূল আপিল আবেদনে ১৬৮টি যুক্ত দেখিয়ে মাওলানা নিজামীর খালাস চাওয়া হয়। আবেদনে ৬ হাজার ২৫২ পৃষ্ঠার নথিপত্র রয়েছে।
গত বছরের ২৯ অক্টোবর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীকে মৃত্যুদণ্ড দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১। মাওলানা নিজামীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের দায়ের করা মোট ১৬টি অভিযোগের মধ্যে ৮টিতে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। এর মধ্যে ৪টি অভিযোগে তাকে মৃত্যুদণ্ড এবং অপর ৪টি অভিযোগে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করা হয়। এছাড়া বাকি ৮টি অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় মাওলানা নিজামীকে অভিযোগগুলো থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=214322