২০ অক্টোবর ২০১৯, রবিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ফরিদপুরের সাধারণ মানুষের অনুভূতি : একজন সত্যিকার মর্দে মুজাহিদ ছিলেন তিনি
২৪ নভেম্বর ২০১৫, মঙ্গলবার,
শহীদুল ইসলাম, ফরিদপুর থেকে ফিরে : বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফিরে গেছেন আল্লাহর কাছে যার কাছ থেকে তিনি এসেছিলেন। জন্ম নিলে একদিন মৃত্যুকেও বরণ করতে হয়। এই মহাসত্য সকলের জানা। তারপরেও কিছু কিছু মৃত্যু মানুষের বিবেককে করে জাগ্রত, মানুষকে নতুন করে ভাবতে শেখায়। কি তার অপরাধ? কেন তাকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হলো? তিনি কি সত্যিই কোন প্রকার মানবতাবিরোধী অপরাধের সাথে জড়িত ছিলেন? না এটা বিশ্বাস করার কোন কারণ নেই। হ্যাঁ বিশ্বাস করার আছে এটাই যে, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ একজন সত্যিকার অর্থেই মর্দে মুজাহিদ, তিনি আল্লাহর রাহে নিবেদিত একজন পরীক্ষিত সৈনিক। তিনি এই জমিনে আল্লাহর দ্বীন কায়েমের জন্য সারাটি জীবন ছিলেন নিবেদিত। এটাই তার অপরাধ! তাই জীবন দিয়ে শিখিয়ে গেলেন কিভাবে হাসতে হাসতে, কালেমা পড়তে পড়তে দৃঢ়পদে ফাঁসির মঞ্চে এগিয়ে যেতে হয়।
গত রোববার ভোরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যাপক উপস্থিতিতে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুরে নিজের প্রতিষ্ঠিত মাদ্রাসা ও মসজিদ সংলগ্ন আব্দুর আলি ফাউন্ডেশনের জমিতে দাফন সম্পন্ন হয় শহীদ আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের। সাধারণ মানুষকে সেই জানাযায় শরিক হতে না দিলেও র্যাব-পুলিশের লোকেরা চলে যাওয়ার পর সেখানে মানুষের ঢল নামে। ঐ জানাযায় শরিক হতে না পারা মানুষ পরে গায়েবানা জানাযায় শরিক হন। একই দিন একই স্থানে ৫টি জানাযা অনুষ্ঠিত হয়। বাঁধভাঙ্গা জোয়ারের মতো সারাদিন সর্বস্তরের মানুষ এসেছে প্রিয় নেতার কবর জিয়ারত করতে। অঝোরে কেঁদেছে মানুষ তাদের এই প্রিয় মানুষটির জন্য। আল্লাহ যেন তার শাহাদাত কবুল করে নেন, আর তার প্রতি ফোটা রক্ত যেন বাংলার জমিনকে আল্লাহর দ্বীন প্রতিষ্ঠার জন্য করে উর্বর। সারাদিন মানুষের যে ঢল নামে ফরিদপুর শহরের পশ্চিম খাবাসপুরে তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ফরিদপুরের মানুষের কত প্রিয়জন ছিলেন কত আপনজন ছিলেন।
অশীতিপর এক বৃদ্ধ এসেছিলেন গায়েবানা জানাযায়। অঝোরে কেঁদেছেন মুজাহিদের রুহের মাগফেরাতের জন্য। তার চোখের পানি মুখ থেকে গড়িয়ে শ্বেতশুভ্র দাড়ি ভিজে টপ টপ করে পড়ছিল পাঞ্জাবিতে। কথা হয় তার সাথে এই প্রতিবেদকের। তিনি কোনভাবেই কান্না থামাতে পারছিলেন না। কথা বলছিলেন ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে। বলেন, বাবা মুজাহিদকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি, আমাদের সামনেই বড় হয়েছে। ছোটবেলা থেকেই সে ছিল বিনয়ী। সব সময় মুরব্বিদের সম্মান করতো। সে কারো সাথে কখনো বেয়াদবি তো দূরের কথা কাউকে ন্যূনতম অসম্মান করে কথা বলেছে- এমনটি শুনিনাই, দেখিনাই। শুধু এই বৃদ্ধই নন একই ধরনের কথা বলেছেন অন্যরাও। তাদের কথা- যে মানুষটি কখনো কাউকে কষ্ট দেয়নি, যে মন্ত্রী থেকেই কোন দুর্নীতির আশ্রয় নেয়নি তাকেই কিনা ফাঁসির দড়িতে ঝুলতে হলো! এ কেমন বিচার? জাতির শ্রেষ্ঠ মানুষদের একজন এই মুজাহিদ। তাকে যারা ফাঁসিতে ঝুলিয়েছে তারা কি ভাল মানুষ? এসব প্রশ্ন সকলের মুখে মুখে।
রোববার সারাদিন যেমন সর্বস্তরের মানুষ এসেছিল কবর জিয়ারত করতে এবং গায়েবানা জানাযায় শরিক হতে ঠিক তার বিপরীতে মুজাহিদের ফাঁসির পক্ষের কাউকে গোটা ফরিদপুরেই দেখা যায়নি। এক অস্বাভাবিক নীরবতা ছিল গোটা শহরজুড়ে। ফরিদপুরবাসী হারিয়েছে তাদের প্রিয়জনকে। এমন মানুষ কি অন্যায় করতে পারে! এমন কথাই ঘুরে ফিরছিল মানুষের মুখে মুখে। 
পবিত্র কুরআনের সুরা বাকারায় ১৫৩-১৫৬ নং আয়াতে আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! সবর ও নামাযের দ্বারা সাহায্য গ্রহণ করো, আল্লাহ সবরকারীদের সাথে আছেন। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয় তাদেরকে মৃত বলো না। এই ধরনের লোকেরা আসলে জীবিত। কিন্তু তাদের জীবন সম্পর্কে তোমাদের কোন চেতনা থাকে না। আর নিশ্চয়ই আমরা ভীতি, অনাহার, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতির মাধ্যমে এবং উপার্জন ও আমদানি হ্রাস করে তোমাদের পরীক্ষা করবো। এ অবস্থায় যারা সবর করে এবং যখনই কোন বিপদ আসে বলে“ আমরা আল্লাহর জন্য এবং আল্লাহর দিকে আমাদের ফিরে যেতে হবে, তাদেরকে সুসংবাদ দিয়ে দাও।” গায়েবানা জানাযায় আসা মানুষের অনেকেই পবিত্র কুরআনের এই বাণীর ভিত্তিতেই বলেছেন, মুজাহিদের মৃত্যু হয়নি। সে আল্লাহর কাছে বিরাট মর্যাদা লাভ করেছে। তার রেখে যাওয়া আদর্শ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই এই হত্যার বদলা নিতে হবে। এই শপথেই বলিয়ান হয়ে তারা বিদায় নিয়েছে প্রিয় নেতার কবর জিয়ারত শেষে।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=213531