১২ ডিসেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে তারা বললেন... • ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। ইসলামী আন্দোলন করার কারণে আমাকে হত্যা করা হচ্ছে’ -মুজাহিদ • আমি কোনো অন্যায় করিনি। এরও বিচার আছে। এই বিচার আল্লাহ করবেন -চৌধুরী
২৩ নভেম্বর ২০১৫, সোমবার,
স্টাফ রিপোর্টার : দুই পরিবারের সদস্যরা কারাগার থেকে শেষ সাক্ষাৎ করে বের হওয়ার পরই সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সেলে হাজির হয় জল্লাদ বাহিনী। রাত তখন ১২টা ৪০ মিনিট। এ সময় পাশেই অবস্থান নেয় কারারক্ষীদের সম্বন্বয়ে গঠিত কারা কমান্ডো দল। পাশের সেলেই ছিলেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক সফল মন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ। দুজনই সেলের ভেতরে তখন জায়নামাযে বসে নামায আদায় করে দোয়া দরূদ পড়ছিলেন। প্রধান জল্লাদ শাহজাহান ও তার দল সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সেলে ঢুকে বলেন, ‘স্যার আপনার সময় শেষ, আমাদের সাথে এখনই যেতে হবে’। দুই মিনিটের মধ্যে তাকে জমটুপি পরিয়ে ও হাতবেধে সেল থেকে নিয়ে ফাঁসির মঞ্চের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। জমটুপি ও হাত বাধা নিয়ে সালাহউদ্দিন কাদের জল্লাদদের বলতে থাকেন, এসবের আর দরকার নেই। আমিতো স্বেচ্ছায় যাচ্ছি। এরপরই জল্লাদরা পাশের সেল থেকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে একইভাবে জমটুপি পরিয়ে ও তার হাত বেধে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর পেছনে পেছনে হাটতে শুরু করে। ১২টা ৫৩ মিনিটে দুজনকেই একই মঞ্চে তোলা হয়। গলায় ঝোলানো হয় দড়ি। কারাবিধি মোতাবেক এর আগেই মঞ্চের পাশে অবস্থান নেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা। এরপর সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবির তার হাত থেকে লাল রুমাল ফেলে দেয়ার সাথে সাথে প্রধান জল্লাদ শাহজাহান লিভার টান দেয়। মুহুর্তে দুজনের পাটাতন সরে গিয়ে কুপের মধ্যে ঢুকে পড়ে। এর আগে ফাঁসির সেলেই তাদের দুজনকে কারা মসজিদের ঈমাম হাফেজ মো. মনির হোসেন তওবা পড়ান। এ সময়ের মধ্যে দুজনের একাধিকবার স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন কারাগারের চিকিৎসকরা। 
প্রত্যক্ষদর্শী ও কারাগার সূত্রে জানা যায়, গত শনিবার সকাল থেকেই ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে আইন শৃংখলাবাহিনীর সদস্যরা সতর্ক অবস্থান নিতে শুরু করে। বেলা বাড়ার সাথে সাথে প্রশাসনের তৎপরতাও বাড়তে থাকে। সকাল ১০টার দিকে কারাগারে প্রবেশ করেন দুজন মেজিস্ট্রেট। তারা বেলা ৩টা ২৬ মিনিটে কারাগার থেকে বের হলেও কারো সাথে কথা না বলে সোজা গাড়িতে উঠে চলে যান। বেলা সাড়ে ৩টার দিকে আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিনের দফতর থেকে একটি লাল খাম নিয়ে একজন কারারক্ষী (ম্যাসেঞ্জার) ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন। মেডিকেলের একটি ব্যাগের মতো একটি ব্যাগে তিনি খামটি নিয়ে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র সেল সুপার মো. জাহাঙ্গীর কবিরের কাছে পৌঁছে দেন। এই খামেই কখন কোন সময় ফাঁসি কার্যকর করা হবে তার উল্লেখ থাকে। এরপর সেটি কারাগারের রেজিস্ট্রারে তা উল্লেখ করার নিয়ম রয়েছে বলে কারাগার সূত্র জানায়। বিকেলের পর পুলিশ র্যাব ছাড়াও আইন শৃংখলাবাহিনীর তৎপরতা আরো বাড়তে থাকে। তবে মাঝে দুই আসামীর পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপ্রতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাওয়ার আবেদনের একটি স্ত্রুল টিভি মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়লে এ নিয়ে শুরু হয় নানা গুঞ্জন। এই অবস্থায় কারাগারের প্রধান গেটের পাশে অনুসন্ধানের সামনে অপেক্ষায় থাকা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর দুজন আইনজীবি আবেদন করেও সাক্ষাৎ পাচ্ছিলেন না। প্রাণভিক্ষার আবেদনের বিষযটি নিয়ে সাংবাদিকরা তাদের কাছে জানতে চাইলে তারা বলেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষার আবেদন করেছেন এমনটি শুনছি। কিন্তু এটা কোনোভাবে সম্ভব নয় দাবি করে বলেন, আমার এই বিষয়টি নিয়ে সন্দেহ হচ্ছে। সন্ধ্যার আগ পর্যন্ত অপেক্ষার পরও তিনি সাক্ষাৎ না পেয়ে ফিরে যান। তখনও ফাঁসি কার্যকর হবে কি না এ নিয়ে সবার মধ্যে সন্দেহ দেখা দেয়। সন্ধ্যার পর কারাগারের দক্ষিণ পশ্চিম পাশে বড় বড় তিনটি লাইট জ্বলে উঠলে তখন অনেকেই ধারণা করতে শুরু করে। ফাঁসি কি তাহলে আজই হচ্ছে। কিন্তু এখানে ফাঁসি হওয়ার কোনো আলামততো দেখা যাচ্ছে না। এর মধ্যে একজন পুলিশ কর্মকর্তা জানান, আমার কাছে খবর আছে ফাঁসি হওয়ার সম্ভবনা ৯৯%। তার এই কথাও কেউ তেমন আমলে নিতে চাননি। সবার দৃষ্টি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ে যে প্রাণভিক্ষার আবেদন গেছে তার ফয়সালাহ না হওয়া পর্যন্ত কিভাবে আজ ফাঁসি কার্যকর হবে? এভাবে সময় গড়ানোর মধ্যে হঠাৎ সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর স্ত্রী, দুই সন্তান ও মেয়ে ও মেয়ের জামাই এসে কারাগারে হাজির হন। তাদের মধ্যে দুই ভাই এসে সাংবাদিকদের বলেন, আমাদেরকে কেউ ডাকেনি। আমরা নিজেরাই এসেছি। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ছেলে হুম্মান কাদের চৌধুরী সাংবাদিকদের বলেন, বাবা রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চেয়ে আবেদন করেছেন এমনটা শুনেই এসেছি। কিন্তু আমরা যেহেতু বাবার সাথে কথা বলতে পারিনি তাই প্রাণভিক্ষার বিষয়টি মোটেও ঠিক নয় বলে জানান তিনি। যাওয়ার সময় বলে যান আমরা আবার আসছি। রাত তখন ৮টা। হঠাৎ আইন শৃংখলাবাহিনীর সদস্যদের তৎপরতা বেড়ে যায়। গোয়েন্দা সংস্থা ডিবির টীম চলে আসে। কারাগারের চারপাশের রাস্তাঘাটে যানচলাচল কমে আসে। ৮টা ২ মিনিটে কারাগারে আসেন এডিশনাল আইজি প্রিজন্স কর্ণেল ফজলুল কবীর। তিনি সোজা চলে যান কারাগারের ভেতরে। জরুরী প্রয়োজন ছাড়া তিনি কারাগারে আসেন না। এরপরই সবার মনে দানা বাধতে শুরু করে। তাহলে কি আজ ফাঁসি হতে যাচ্ছে। এরপরই একে একে আসতে থাকেন ঢাকার জেলা প্রশাসক, আইজি প্রিজন্স ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সৈয়দ ইফতেখার উদ্দিন, সিভিল সার্জন, গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিনিধি। তাহলে কি স্বজনদের সাথে শেষ সাক্ষাৎ না করেই ফাঁসি কার্যকর হয়ে যাবে? এমন প্রশ্ন যখন ঘুরপাক খাচ্ছে ওই সময়ই খবর আসে সালাহউদ্দিন কাদের ও মুজাহিদের পরিবারের সদস্যদের দেখা করতে খবর দেয়া হয়েছে কারাগারের পক্ষ থেকে। এরপরই সবাই ধরে নেন আজই হতে যাচ্ছে ফাঁসির রায় কার্যকর। এরপরই দুই পরিবারের সদস্যরা কারাগারে চলে আসেন। প্রথমে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সাথে পরিবারের ১৭ জন সদস্য সাক্ষাৎ করেন। তারা বের হওয়ার পর সাক্ষাৎ করতে যান মুজাহিদের পরিবারের ২৫ সদস্য। তারা রাত ১২টা ২৫ মিনিটে কারাগার থেকে বের হয়ে আসেন। দুজনের পরিবারের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের জানানো হয়, তারা কেউই প্রাণভিক্ষার জন্য রাষ্ট্রপ্রতির কাছে আবেদন করেননি। তারা বের হওয়ার পরই শুরু হয় জল্পনা কল্পনা। এ সময় কেউ কেউ বলতে থাকেন, সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে। কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেল ১২টা ১ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে বলেও স্ত্রুল দিতে শুরু করে। কেউ দেয় সাড়ে ১২টায়। আবার কোনো কোনো মিডিয়া ১২টা ৪৫ মিনিটে ফাঁসি কার্যকর হয়ে গেছে বলে প্রচার শুরু করে। তবে কারাগার সূত্র জানায়, আইজি প্রিজন্স অফিস থেকে যে লাল খামটি কারাগারের সুপারের কাছে গিয়েছে সেটিতে ফাঁসি কার্যকরের সময় উল্লেখ করা হয়েছে রাত ১২টা ১ মিনিট। 
ফাঁসির দায়িত্বে থাকা একটি সূত্র জানিয়েছে, ফাঁসির রায় কার্যকর করার আগেই দুপুরে ও রাত ৮টার দিকে কারা হাসপাতালের ডাক্তার বিপ্লব কান্তি বিশ্বাস সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী ও আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। সন্ধ্যার আগে তাদের কারাগার থেকে পরীক্ষা করে খাবার দেয়া হলেও তারা খাবার খাননি। কারণ তাদের ওই সময় খাবার খাওয়ার মনমানসিকতা ছিল না। এরপর কারা মসজিদের ঈমাম মনির হোসেন তাদের দুজনকে তওবা পড়াতে যান। কিন্তু দুজন নিজেরাই তওবা পড়বেন বলে জানান। পরে তাদের কারাবিধির কথা জানানো হলে তখন দুজন তওবা পড়েন। এরপরই কারাগারের ৮ নম্বর ফাঁসির সেলে (রজনীগন্ধা সেল) দক্ষিণ পাশের পাশাপাশি সেলে থাকা সালাহউদ্দিন ও মুজাহিদের ফাঁসি কার্যকরের আগে ফাঁসির মঞ্চের সামনে অবস্থান নেন কারাবিধি মোতাবেক প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তবে আইজি প্রিজন্স ফাঁসি হওয়ার আগেই কারাগার থেকে বেরিয়ে যান। 
সূত্র জানায়, ফাঁসি কার্যকর করার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা প্রধান জল্লাদ শাহজাহানের নেতৃত্বে ৭ সদস্যের একটি দল ১২টা ৪০ মিনিটে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সেলে প্রবেশ করেন। তারা সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরীর সেলে ঢুকে বলতে থাকেন, স্যার আপনার সময় শেষ হয়ে গেছে। আপনাকে এখনই ফাঁসির মঞ্চে যেতে হবে। এরজন্য নিয়ম অনুযায়ী জমটুপি পরাতে হবে। দুই হাত পেছনে বাধতে হবে। তখন সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী জল্লাদদের কথামতো জমটুপি পরতে অস্বীকৃতি জানান। একইভাবে হাত বাধতে চাননি। তবে তিনি জল্লাদদের বলেন, আমিতো এমনিতেই যাচ্ছি। এসবের দরকার নেই। ওই সময় তিনি বলতে থাকেন, আমি কোনো অন্যায় করিনি। এরও বিচার আছে। এই বিচার আল্লাহ করবেন। মাত্র ২ মিনিটের মধ্যে জল্লাদরা সাদাকালো কয়েদীর পোশাক পরা সালাহউদ্দিন কাদেরকে জমটুপি পরিয়ে ও হাত বেধে মঞ্চের দিকে নিয়ে এগুতে থাকে। এরপরই তিনি দোয়া দরূদ পড়তে থাকেন। একইভাবে মুজাহিদের সেলে প্রবেশ করে জল্লাদরা। জল্লাদ শাহজাহান ও রাজুসহ অন্যরা তাকেও জমটুপি ও পেছনে হাত বেধে নিয়ে যেতে শুরু করে। এ সময় মুজাহিদ তাদের শুধু বলেছেন, ‘আমি কোনো অন্যায় করিনি। ইসলামী আন্দোলন করার কারণে আমাকে হত্যা করা হচ্ছে’। সেল থেকে মাত্র ১০-১২ সেকেন্ডের ব্যবধানে দুজনকেই নিয়ে যাওয়া হয় ফাঁসির মঞ্চের দিকে। ওই সময় দুজনই স্বাভাবিকভাবে কলেমা পড়তে পড়তে এগিয়ে যেতে থাকেন। 
কারাগার সূত্র জানায়, ফাঁসির মঞ্চে যাওয়ার আগে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, আপনারা আমাদের জন্য দোয়া করবেন। আমাদের (দম) মৃত্যুটা যাতে তাড়াতাড়ি হয়ে যায়। ওই সূত্রটি আরো জানায়, যখন ফাঁসির মঞ্চে তুলে জল্লাদ লিভার টান দেয় তখন শুধু একটি শব্দ ভেসে আসে ‘আল্লাহ’।
কারাগারের অপর একটি সূত্র জানায়, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মুজাহিদের কাছে যখন কারা ডাক্তার যান তখন তিনি তাকে বলেছেন, পৃথিবীতে এক মিনিট বেঁচে থাকতে হলে আগে স্বাস্থ্য ঠিক রাখতে হবে। ডাক্তার সাহেব আপনি স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। তবে ডাক্তারকে সালাহউদ্দিন কাদের চৌধুরী বলেছেন, চেকআপ করবেন করেন। তখন ডাক্তার তাকে বলেছেন, স্যার আপনি হচ্ছেন মেহমান। তখন সালাহউদ্দিন বলেন, করেন, স্বাস্থ্যই তো চেকআপ করবেন। 
এসব ব্যাপারে গতকাল রোববার ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার জাহাঙ্গীর কবীর ও জেলার নেছার আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তাদের মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়। 
গতকাল বিকেলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সামনে খোঁজ নিতে গেলে কেউ এ ব্যাপারে কথা বলতে রাজী হননি। জানা গেছে, এসব ব্যাপারে মিডিয়ার কাছে কেউ যাতে কোনো কথা না বলে, সে ব্যাপারে কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে আগেই সবাইকে সর্তক করে দেয়া হয়েছে।

http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=213428