২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯, শুক্রবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
বিশ্ব শেয়ারবাজারে চীন-আতংক
৪ সেপ্টেম্বর ২০১৫, শুক্রবার,
|| আবু আহমেদ ||
প্রকাশ : ০৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫
গত ২৪ আগস্ট বিশ্বের শেয়ারবাজারগুলো ৪-৮ শতাংশ পর্যন্ত পড়ে যায়। একদিনেই তিন ট্রিলিয়ন ডলার হাওয়া হয়ে যায়। লাখ লাখ লোক অর্থ হারিয়ে সরকার ও নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থাকে দোষ দিতে থাকে তাদের ভাগ্য বিপর্যয়ের জন্য। বিপর্যয়টা শুরু হয়েছিল চীনের শেয়ারবাজার ধসের মাধ্যমে। সেই ধস অন্য বাজারগুলোতেও অতি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গত কয়েক বছরের মধ্যে নিউইয়র্ক, লন্ডন, অস্ট্রেলিয়া, মুম্বাইয়ের শেয়ারবাজারগুলোর মূল্যসূচকের বৃহত্তম পতন ঘটে। লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ ২০০৭-এর পর এত বড় পতন দেখেনি। মুম্বাইয়ের স্টক এক্সচেঞ্জের মূল্য সূচক সেদিন ১৬০০ পয়েন্ট পড়ে যায়। আর্থিক বাজারের এই টালমাটাল অবস্থায় নীতিনির্ধারক মহল দুশ্চিন্তায় পড়ে যায়। সবাই বলাবলি করতে লাগল, শেয়ারবাজারের ধসের
 
আগে বিশ্বের বড় অর্থনীতিগুলো আবার দীর্ঘমেয়াদি মন্দায় পড়বে। তবে সেই পতন কি একদিনের পতন, না সামনে আরও পতন- সেটা দেখার জন্য আমাদের আরও কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে।
এটা ঠিক, বাজার একসময় পড়তে পড়তে একপর্যায়ে স্থিতিশীল হয়ে যাবে। আবার এমনও হতে পারে, বাজার পড়ার কথা ছিল না; কিন্তু চীনে বাজার পড়ছে বলে তার একটা মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব লন্ডন, নিউইয়র্কসহ অন্য শেয়ারবাজারগুলোতেও পড়েছে। আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, চীনের সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ছাড়া অন্য শেয়ারবাজারগুলোর পতন একদিনের জন্যই ঘটেছে। পরদিন যখন ইউরোপ ও আমেরিকার শেয়ারবাজারগুলো খুলল তখন দেখা গেল বাজারগুলো ঘুরে দাঁড়িয়েছে। বাজারগুলো আগের দিনের অবস্থা থেকে ২-৩ শতাংশ বেড়েছে। এই বৃদ্ধি কম-বেশি পরের কয়েকদিনও অব্যাহত ছিল। তবে চীনের সাংহাইয়ের শেয়ারবাজার পরদিনও মূল্য হারিয়েছে। অনেকে বলছে, চীনের বাজার আরও সংশোধনের (Correction) দিকে যাবে। এর অর্থ হল, চীনের লাখ লাখ ক্ষুদে বিনিয়োগকারীকে আরও অর্থ হারানোর জন্য তৈরি থাকতে হবে।
প্রশ্ন হতে পারে, চীনের শেয়ারবাজারে ধস কেন শুরু হল? আসলে কোনো বাজারে ধস নামে না, বাজার যদি অতিমূল্যায়িত না থাকে। অতিমূল্যায়িত বাজার একদিন না একদিন বাস্তবতার স্তরে নেমে আসবেই। পৃথিবীর সর্বত্র তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। চীনের ক্ষেত্রে যা ঘটেছে তা হল, মাত্র এক বছরের মধ্যে ওই বাজারের মূল্যসূচক বেড়েছে ১৩০ শতাংশ। এর আগেও বাজার অতিমূল্যের স্তরে পৌঁছে গেছে বলে অনেকে শংকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু চীনের বিনিয়োগকারীরা শুনতে নারাজ ছিল। তাদের একটা ধারণা জন্মেছে যে, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করা মানে অতি তাড়াতাড়ি ধনী হওয়া। তাদের মনস্তাত্ত্বিক কাঠামোতে এই ধারণা প্রবেশ করেছিল যে, কোটিপতি বা মিলিয়নিয়ার হওয়ার জন্য শেয়ারবাজারে বিনিয়োগই শ্রেষ্ঠ পথ। লাখ লাখ চীনা নাগরিক নতুন নতুন বিনিয়োগ হিসাব খুলে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগকারী হয়ে গেছে। এসব বিনিয়োগকারীর শেয়ারের মূল্যায়ন (Valuation) সম্বন্ধে বিন্দুমাত্র ধারণাও ছিল না। এর মধ্যে ব্রোকার থেকে শুরু করে সুযোগ সন্ধানী মহল চারদিকে প্রচার করতে শুরু করল, শেয়ারবাজার আরও বাড়বে। চারদিকে গ্রিড (Greed) এবং খুশির একটা আবহ ছড়িয়ে পড়ল। গ্রাম ও ছোট শহর থেকে চীনারা এসে সাংহাইয়ের শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করতে শুরু করল। অবস্থা দাঁড়াল, অধিক থেকে অধিক অর্থ নির্দিষ্টসংখ্যক শেয়ারকে তাড়াতে লাগল। ফল হল প্রায় প্রতি ট্রেডিং সেশনেই শেয়ারের অব্যাহত মূল্যবৃদ্ধি।
এ ধরনের মূল্যবৃদ্ধিকে শেয়ারবাজারের বা আর্থিক বিজ্ঞানের ভাষায় বলা হয় Bull Run! যখন ‘বুল রান’ চলতে থাকে তখন অনেকে নানা যুক্তি নিয়ে হাজির হয় যে, ‘বুল রান’ আরও বেশি সময় ধরে চলবে। ফলে শেয়ারবাজার অরেক দফা তেজী হতে থাকে। চীনের ক্ষেত্রেও গত কয়েক বছর এমনই হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির দিক থেকে চীনের সাংহাই শেয়ারবাজার ছিল বিশ্বে অন্য বাজারগুলোর ওপরে। বিদেশীরাও দলে দলে চীনের বাজারে বিনিয়োগ করতে লাগল। সবাই চীনের অর্থনৈতিক অর্জনের বড় বড় গল্প শুনতে লাগল। কিন্তু সবকিছুরই একটা সীমা আছে। চীনের অর্থনীতি উচ্চ প্রবৃদ্ধিতে বাড়ছে বলে শেয়ারবাজার শুধু বাড়তেই থাকবে- এটা অবশ্যই ভুল ধারণা ছিল। আর চীনা অর্থনীতি তো এক থেকে দেড় দশক ১০-১১ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পেয়ে অনেক আগেই অনেকটা শীতল হয়ে ৭-৮ শতাংশে প্রবেশ করেছে, যে প্রবৃদ্ধি আজকে আরও মন্থর হয়ে পড়েছে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হার কমে গেছে; কিন্তু শেয়ারবাজারে তেজীভাব অব্যাহত ছিল। ফলে একপর্যায়ে শেয়ারবাজার অর্থনীতি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। আর তারই ফল হল ২৪ আগস্টের ব্ল্যাক মানডে বা কালো সোমবার।
চীনের শেয়ারবাজার কিন্তু জুনের প্রথম থেকেই পড়া শুরু করেছিল। তবে আগস্টের ২৪ তারিখ সোমবারের পতনটা ছিল সবচেয়ে বড়। তাই সেটার নাম দেয়া হল মার্কেট ক্র্যাশ বা বাজার ধস। সেই ৮ শতাংশ ধসই যদি ৮ দিনে মিলে ঘটত, তাহলে গড়ে প্রতিদিন বাজার পড়ত ১ শতাংশ করে। তখন কিন্তু ওই পতনকে কেউ ধস বলত না। বলত মার্কেট কারেকশন বা বাজার সংশোধন। বলত, বাজারে Profit taking হচ্ছে, তাই বাজার কারেকশন হচ্ছে। কিন্তু সেই পতনটা যখন একদিনেই ঘটে গেল, সেই দিনটা অভিহিত হল ব্ল্যাক মানডে হিসেবে। স্টক মার্কেটের ইতিহাসে এ ধরনের অনেক ব্ল্যাক মানডে এসেছে-গেছে। সপ্তাহের অন্য দিনগুলোতেও ব্ল্যাক বা কালো দিবস এসেছে। ইতিহাসে অনেক ব্ল্যাক টিউসডেও আছে, ব্ল্যাক থার্সডেও আছে। ব্ল্যাক ডে আসা শেয়ারবাজারে একটা অতি কদাচিত ঘটনা নয়। বরং বলা চলে, বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন অবয়বে এক যুগ বা ততোধিক সময় পার হয়ে যাওয়ার পর আবার ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটছে- আবার ব্ল্যাক মানডে, ব্ল্যাক টিউসডে, ব্ল্যাক থার্সডে আসছে। মানুষ এই ব্ল্যাক ডে-গুলোকে স্বাভাবিক হিসেবে নিয়েছে। আর্থিক বিজ্ঞান এ ধরনের একদিনের বড় দরপতনকে এখন বাজারেরই অংশ মনে করে। আর্থিক বিজ্ঞান ধরেই নিয়েছে, লাভালাভ আর লোভের বাজারে অঘটন ঘটবেই। আর অঘটনেই হল বাজারের মজা। অঘটন আছে বলেই এই বাজার এত লোককে আকর্ষিত করে।
বস্তুত কোনো একদিন বড় ধরনের ধস নামলেই বলা হয়, ব্ল্যাক ডে। ব্ল্যাক ডে কোনো একটি নির্দিষ্ট শেয়ারবাজারের ক্ষেত্রে আসতে পারে আবার একই ব্ল্যাক ডে অন্য শেয়ারবাজারেও ঘটতে পারে। ২৪ আগস্ট চীনের শেয়ারবাজারের ব্ল্যাক মানডের সঙ্গে অন্যত্রও যখন ট্রেডিং শুরু হল, তখন শেয়ারের মূল্যসূচক দ্রুত পড়তে লাগল। দেখতে দেখতে ব্ল্যাক ডে বিশ্বের সব বড় শেয়ারবাজারেই ছড়িয়ে পড়ল। চীনের শেয়ারবাজারে ব্ল্যাক মানডের আগে থেকেই দরপতন হচ্ছিল। চীন সরকার সেই ব্ল্যাক মানডের আগে থেকেই বাজার পতন আর যাতে বাড়তে না পারে সে ব্যাপারে অনেক পদক্ষেপ নিয়েছিল। যেমন নতুন আইপিও বিক্রি বন্ধ করে দিয়েছিল, ঋণ করে লোকে যাতে শেয়ার কিনতে পারে সেজন্য মার্জিন লোনের সুদ কমিয়ে দিয়েছিল, বড় বিনিয়োগকারীদের শেয়ার বিক্রির ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছিল। কিন্তু তাতেও বাজারের পতন বন্ধ হয়নি। আর সেই পতন ২৪ আগস্ট সোমবার এত বেশি হয়েছিল যে লোকে নাম দিল ব্ল্যাক মানডে। বিশ্বের অন্য শেয়ারবাজার পরদিন ঘুরে দাঁড়ালেও সাংহাইয়ের শেয়ারবাজার পরদিন মঙ্গলবারও পতিত হয়েছিল। বলা চলে, আরও পতিত হয়ে একদিন সেই পতনের ধারা বন্ধ হয়ে যাবে।
সব শেয়ারবাজারেই ক্রাশ হওয়ার বা ধস নামার পর রেগুলেটর কারসাজির হোতাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনতে উঠেপড়ে লেগে যায়। চীনের ক্ষেত্রেও এমনটাই ঘটছে। কারা বাজারকে ফেলে দিল, কারা গুজব ছড়াল এসব নিয়ে বিশ্লেষণ হচ্ছে। কিন্তু এসব ক্ষেত্রে অন্যত্র সাফল্য এসেছে সামান্যই। চীনেও সাফল্য আসবে না। চোর ধরা পড়বে না, ধরা পড়লেও ওইসব চোরের বিচার করা কঠিন হবে। অনেক চোর হারিয়ে যাবে। আসলে সত্য হল, শেয়ারবাজারকে অতি সাধারণের কাছে নিতে নেই। অতি সাধারণ লোক যখন শেয়ারবাজারে ঢুকবে, তখন অঘটন হবেই। চীনে লাখ লাখ লোক বিনিয়োগকারী হিসেবে অর্থ নিয়ে শেয়ারবাজারে প্রবেশ করেছে গত দুই বছরে। তারা জানত না যে, তারা একটা ফাঁদে পা দিচ্ছে। সেই ফাঁদ পাতানোর মধ্যে বিদেশীরাও ছিল। তারাও শেয়ারবাজার থেকে গত দুই বছরে লাখ লাখ ডলার আয় করেছে। তাদের নজরে সাংহাই স্টক এক্সচেঞ্জ ছিল বিশ্বের সেরা শেয়ারবাজার। সেরা কেন হল তার কারণ তো বুঝতে পারছেন। যে শেয়ারবাজার থেকে টাকা বানানো যায়, সেটাই হল এদের নজরে সেরা। আর পতনের মধ্য দিয়ে সেই সেরার মূল্য দিল চীনের লাখ লাখ নতুন বিনিয়োগকারী। বাংলাদেশে ২০১০ সালে শেয়ারবাজার ধসের কারণে কারা মূল্য দিয়েছিল? লাখ লাখ অবুঝ বিনিয়োগকারী। কোনো প্রতিবাদই এদের অর্থ ফেরত দিতে সহায়ক হয়নি।
আবু আহমেদ : অধ্যাপক ও অর্থনীতিবিদ
- See more at: http://www.jugantor.com/sub-editorial/2015/09/04/318487#sthash.9cJmNN5i.dpuf