১৪ নভেম্বর ২০১৯, বৃহস্পতিবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া চলছে -স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ০ সাক্ষাতের জন্য ডাকের অপেক্ষায় পরিবার || কামারুজ্জামান প্রাণভিক্ষা চাননি
১১ মে ২০১৫, সোমবার,
১১ এপ্রিল ২০১৫ :
রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাননি জামায়াতে ইসলামীর সিনিয়র সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। স্বরাষ্ট্রপ্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল সাংবাদিকদের জানান, ফাঁসি কার্যকরের প্রক্রিয়া চলছে। গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকায় বাড়ানো হয় নিরাপত্তা। তবে রাত সাড়ে ৯টার দিকে নিরাপত্তা শিথিল করা হয়। কারা কর্তৃপক্ষ শেষ সাক্ষাতের জন্য তার পরিবারের সদস্যদেরকে খবর দেয়নি বলে জানা গেছে।
গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যার পর থেকে কারাগারের সামনের নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। উৎসুক মানুষকে সামনের রাস্তায় আসতে দেয়া হয়নি। এ ছাড়া মিডিয়াকর্মীদেরও গেটের সামনে থাকতে দেয়া হয়নি। নির্ধারিত গ্রাউন্ডের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকেন তারা। রাত ৮টার দিকে রাজধানীর লালবাগ জোনের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মফিজ উদ্দিন আহমেদ ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে প্রবেশ করেন। ৮টা ১০ মিনিটে কারাগারে প্রবেশ করেন ঢাকা জেলার সহকারী সিভিল সার্জন আহসান হাবিব। সাড়ে ৭টার দিকে একটি ট্রলিতে করে কারাগারে বাঁশ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। এর আগে কারাগারে ঢোকেন সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলী। তবে রাত ৯টা ২০ মিনিটে তিনি বাসায় ফিরে যান। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও বেড়িয়ে যান।
এর আগে গতকাল সকাল ৯টা ৫০ মিনিটে কামারুজ্জামানের সঙ্গে দেখা করতে কারাগারে প্রবেশ করেন জ্যেষ্ঠ ম্যাজিস্ট্রেট মাহবুব জামিল ও তানভীর আজিম। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে তারা কারাগার থেকে বের হয়ে জিপ গাড়িতে উঠে চলে যান। এ সময় তারা সাংবাদিকদের কিছু জানাননি।
ঢাকা জেলার প্রশাসক তোফাজ্জেল হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, তারা দুজন (ম্যাজিস্ট্রেট) এসেছিলেন। কেন এসেছিলেন জানতে চাইলে বলেন, কামারুজ্জামানের রায় কার্যকর করার প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে তারা সেখানে গিয়েছিলেন।
এর আগে গতকাল সকাল ১০টার আগে কারাগারে উপস্থিত হন আইজি প্রিজন, ডিআইজি প্রিজন ও সিনিয়র জেল সুপার।
দুইজন ম্যাজিস্ট্রেট চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পর কারাফটকে সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলীর কাছে কামারুজ্জমানের প্রাণভিক্ষার বিষয়ে সাংবাদিকরা জানতে চাইলে তিনিও কোনো মন্তব্য না করে চলে যান।
এদিকে গতকাল দুপুরে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেছেন, দুই ম্যাজিস্ট্রেট দেখা করলেও প্রাণভিক্ষার বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত জানাননি জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলকে একথা বলেন তিনি। তিনি বলেন, তিনি (কামারুজ্জামান) কিছুটা সময় চেয়েছেন। তবে তাকে দ্রুত সিদ্ধান্ত জানাতে বলা হয়েছে। তবে রাত ৮টার দিকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গণমাধ্যমকে জানান, কামারুজ্জামান ক্ষমা প্রার্থনা করেননি। উচ্চ আদালতের রায় কার্যকরের প্রক্রিয়া চলছে।
গত বুধবার সন্ধ্যায় কামারুজ্জামানের রিভিউ আবেদন খারিজ আদেশের কপি কারাগারে পৌঁছায়। কারা কর্তৃপক্ষ তাকে (কামারুজ্জামান) রায় পড়ে শোনান। এরপর তার কাছে জানতে চান তিনি প্রাণভিক্ষার আবেদন করবেন কি না। কামারুজ্জামান এ ব্যাপারে আইনজীবীর সঙ্গে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত জানানোর কথা বলেন। সেই অনুযায়ী গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে তার আইনজীবীরা কারাগারে দেখা করেন। কামারুজ্জামানের সাথে দেখা করে বের হয়ে আসার পর তার আইনজীবী শিশির মনির সাংবাদিকদের বলেন, ক্ষমা চাওয়ার ব্যাপারে তিনি ভেবেচিন্তে সিদ্ধান্ত নেবেন। তিনি তার সিদ্ধান্তের কথা কারা কর্তৃপক্ষকে জানাবেন।
তবে কামারুজ্জামান রাষ্ট্রপতির কাছে প্রাণভিক্ষা চাইবেন কি না, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়নি।
রিভিউ আবেদন খারিজ
৬ এপ্রিল মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যুদন্ডের বিরুদ্ধে করা রিভিউ (পুনর্বিবেচনার) আবেদন খারিজ করেন সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগ। সংক্ষিপ্ত আদেশে আপিল বিভাগ বলেছেন ‘ডিসমিসড’। এর ফলে ট্রাইব্যুনালের দেয়া মৃত্যুদন্ড বহাল রেখে আপিল বিভাগ আগে যে রায় দিয়েছিল তা বহাল থাকে। পাশাপাশি শেষ হয় মামলার বিচার কার্যক্রমও। সংবিধান অনুসারে প্রেসিডেন্টের কাছে ক্ষমা চাওয়ার জন্য অন্তত সাত দিনের সুযোগ থাকলেও ওই দিনই আইনমন্ত্রী আনিসুল হক জানান ক্ষমা প্রার্থনার বিষয়টি কয়েক ঘণ্টার মাত্র। অথচ অন্যান্য মৃত্যুদন্ডাদেশ কার্যকর করার ক্ষেত্রে কারা আইনে ‘৭ দিনের আগে না, আবার ২১ দিনের পরে না’-এমন বিধান আছে। এ মামলার ক্ষেত্রে ওই আইন প্রযোজ্য হবে না বলে মন্তব্য করেন আইনমন্ত্রী। আগেরদিন রিভিউ আবেদনের ওপর শুনানি গ্রহণ শেষে আদালত সোমবার (৬ এপ্রিল) আদেশের জন্য নির্ধারণ করেছিলেন।
গত সোমবার সকালে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার (এস কে সিনহা) নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ আদেশ দিয়ে বলেন, রিভিউ আবেদন ‘ডিসমিসড’।
মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে রিভিউ আবেদনের শুনানি করেন বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান ও সুপ্রিম কোর্ট বার এসোসিয়েশনের সভাপতি সিনিয়র এডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন। তাকে সহায়তা করেন এডভোকেট মুহাম্মদ শিশির মনির।
মৃত্যু পরোয়ানা জারি
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বর্তমান প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নেতৃত্বে আপিল বিভাগের চার বিচারপতির বেঞ্চ কামারুজ্জামানের আপিলের পূর্ণাঙ্গ রায়ে স্বাক্ষর করেন। পরদিন ১৯ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ মুহম্মদ কামারুজ্জামানের মৃত্যু পরোয়ানা কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠায়। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার ফরমান আলীসহ চারজন কামারুজামানকে পরোয়ানা পড়ে শোনান। আপিল বিভাগের আবদুল কাদের মোল্লার রিভিউ আবেদনের রায় অনুযায়ী, দন্ডিতদের জন্য আপিল বিভাগের পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে রিভিউ আবেদন করার সুযোগ পান। এই রায়ের ভিত্তিতে গত ৫ মার্চ আপিল বিভাগের দেয়া মৃত্যুদন্ডের রায় পুনর্বিবেচনার জন্য আবেদন করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। তার আইনজীবীরা ৪৪টি যুক্তি দেখিয়ে রিভিউ আবেদনটি দায়ের করেন। ৪৫ পৃষ্ঠার রিভিউ আবেদনে মোট ৭০৪ পৃষ্ঠার ডকুমেন্ট ছিল।
ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রম
২০১৩ সালের ৯ মে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে  বিচারপতি মজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারক মো. শাহিনুর ইসলাম মুহাম্মদ কামারুজ্জামানকে মৃত্যুদন্ডের রায় দেয়। ওই রায়ের বিরুদ্ধে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত বছরের ৬ জুন আপিল করেন মুহাম্মদ কামারুজ্জামান। চলতি বছরের ৫ জুন এ বিষয়ে শুনানি শুরু হয়। এরপর উভয়পক্ষের শুনানি শেষে গত ১৭ সেপ্টেম্বর মুহাম্মদ কামারুজ্জামানের পক্ষে আপিলের যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন তার আইনজীবীরা।
২০১১ সালের ৫ ডিসেম্বর কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) ট্রাইব্যুনালে দাখিল করে প্রসিকিউশন। ২০১২ সালের ১২ জানুয়ারি প্রসিকিউশন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে পুনরায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করেন। গত বছরের ৩১ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেয় ট্রাইব্যুনাল-১। এরপর ১৬ এপ্রিল কামারুজ্জামানের মামলাটি ট্রাইব্যুনাল-১ থেকে ট্রাইব্যুনাল-২ এ স্থানান্তর করা হয়। ১৬ মে ডিফেন্সপক্ষ এবং ২০ মে প্রসিকিউশনের আইনজীবীরা কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানি শেষ করেন। এরপর ২০১২ সালের ৪ জুন কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। তার বিরুদ্ধে ১৯৭১ সালে হত্যা, নির্যাতন, দেশত্যাগে বাধ্য করাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের সাতটি ঘটনায় অভিযোগ গঠন করা হয়। ২০১২ সালের ১৫ জুলাই থেকে এ বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত কামারুজ্জামানের বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তা (আইও) আব্দুর রাজ্জাক খানসহ প্রসিকিউশনের ১৮ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে কামারুজ্জামানের পক্ষে গত ২০১৩ সালের ৬ থেকে ২৪ মার্চ পর্যন্ত ৫ জন ডিফেন্স সাক্ষী সাক্ষ্য দিয়েছেন। তারা হচ্ছেন মো. আরশেদ আলী, আশকর আলী, কামারুজ্জামানের বড় ছেলে হাসান ইকবাল, বড় ভাই কফিল উদ্দিন এবং আব্দুর রহিম।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=183610