২০ নভেম্বর ২০১৯, বুধবার
Choose Language:

সর্বশেষ
চলতি বিষয়াবলি
আলোচিত সৌদি বাদশাহর বিদায়
২৪ জানুয়ারি ২০১৫, শনিবার,
|| মাসুমুর রহমান খলিলী ||
২৪ জানুয়ারি ২০১৫, শনিবার, ১০:০৩
​সৌদি আরবের বাদশাহ আবদুল্লাহ বিন আবদুল আজিজের (৯০) ইন্তেকালের খবর সৌদি গণমাধ্যমে শুক্রবার ভোররাতে ঘোষণা করা হয়। ২০০৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণের পর সৌদি রাজতন্ত্রের ইতিহাসে সবচেয়ে ক্রান্তিকালে তিনি দেশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। তার মৃত্যুর পরে নতুন বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন ৭৯ বছর বয়সী তার বৈমাত্রেয় ভাই সালমান বিন আবদুল আজিজ। বাদশাহ আবদুল আজিজের কনিষ্ঠতম ছেলে মুকরিন বিন আবদুল আজিজ নতুন ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তার বয়স ৭০-এর কাছাকাছি। সৌদি রাজতন্ত্রের উত্তরাধিকার যাতে কোনো ধরনের জটিলতা ছাড়াই নির্ধারণ হয় তার ব্যবস্থা বাদশাহ আবদুল্লাহ আগেই করে গিয়েছিলেন। তিনি সৌদি সিংহাসনে তৃতীয় প্রজন্মের সদস্যদের বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণের জন্য ৩৫ সদস্যের একটি এলিজিয়েন্স কাউন্সিল গঠন করেন, যার অনুমোদন অনুযায়ী সালমান-মুকরিনের পর থেকে নতুন বাদশাহ ও যুবরাজ নির্বাচন করা হবে। বাদশাহ আবদুল্লাহর মনোনয়ন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে এই এলিজিয়েন্স কাউন্সিলের কোনো ভূমিকা ছিল না।
আবদুল্লাহ সৌদি রাজতন্ত্রের প্রতিষ্ঠাতা বাদশাহ আবদুল আজিজের ১৬ জন স্ত্রীর মধ্যে অষ্টম স্ত্রী ও প্রভাবশালী শামার বেদুইন গোত্রের মেয়ে ফাহাদার একমাত্র ছেলে। শিশুকালের উল্লেখযোগ্য অংশ তিনি মরু এলাকায় কাটিয়েছেন। আবদুল্লাহ ছিলেন তার পিতার ৩৭ সন্তানের মধ্যে ১৩তম। তার আগে আবদুল্লাহর চার জ্যেষ্ঠ ভাই সিংহাসনে আরোহণ করেন। ২০০৫ সালের আগস্টে বাদশাহ ফাহাদ পরলোকগমন করলে আবদুল্লাহ বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এর আগে ক্রাউন প্রিন্স থাকাকালেই ১০ বছর তিনি কার্যত বাদশাহর দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় বাদশাহ ফাহাদ মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণজনিত কারণে দায়িত্ব পালনের মতো কর্মক্ষম ছিলেন না।
আবদুল্লাহর জন্য ক্রাউন প্রিন্স অথবা বাদশাহ হওয়া সহজ কোনো বিষয় ছিল না। তাকে ফাহাদ যখন যুবরাজ করেন, তখন বাদশাহ আবদুল আজিজের প্রভাবশালী সৌদি ধর্মীয় নেতৃত্ব নিয়ন্ত্রণকারী সুদাইরি গোত্রের স্ত্রী প্রিন্সেস হাসা আল সুদাইরির সন্তানেরা এর বিরোধিতা করেছিলেন। নিজের যোগ্যতা দিয়ে আবদুল্লাহ এসব বিরোধিতাকে জয় করেছেন। এর আগে তিনি সৌদি ন্যাশনাল গার্ডের কমান্ডার এবং উপপ্রধানমন্ত্রী হিসেবে সাফল্যের সাথে দায়িত্ব পালন করেন। আবদুল্লাহ শিশুকালেই ধর্ম, ঐতিহ্য এবং আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে ওঠেন। তিনি ১৩ জন স্ত্রী গ্রহণ করলেও একসাথে চারজনের বেশি কোনো সময় ছিলেন না।
বাদশাহ আবদুল্লাহ তার শাসনকালে অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ করেছেন। তিনি সীমিত নাগরিক অধিকার দেয়ার জন্য মিউনিসিপ্যাল নির্বাচনের ব্যবস্থা করেন এবং তাতে নারীদের ভোটাধিকার দান করেন। তিনি নারী অধিকারের ব্যাপারে আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেন। যেগুলো রক্ষণশীল সৌদি সমাজের জন্য বেশ তাৎপর্যপূর্ণ। ২০০১ সালে ৯ সেপ্টেম্বর টুইন টাওয়ারে হামলার পর সৌদি রাজতন্ত্র বড় ধরনের চাপের মধ্যে পড়ে। এ সময় তিনি ডি ফ্যাক্টো বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এ সময় সৃষ্ট চাপ মোকাবেলার জন্য তিনি সৌদি শিক্ষা এবং সমাজব্যবস্থায় কট্টরপন্থী তৈরি হওয়ার মতো যে কারিকুলাম রয়েছে মনে করা হয়, তাতে সংস্কার আনেন। তিনি ঐতিহ্যগত ইসলামপন্থীদের সরিয়ে পাশ্চাত্য শিক্ষায় শিক্ষিত অনেক সৌদিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেন।
২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে সৌদি রাজতন্ত্র এক বড় ধরনের চাপের মুখে পড়ে। এ সময় তিনি উপসাগরীয় রাজতন্ত্র এবং সৌদি মিত্রদেশগুলোর শাসকদের রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। আরব বসন্তকে ব্যর্থ করে দিতে তিনি এমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেন, যাতে তিন বছরের মাথায় মধ্যপ্রাচ্যে আরব জাগরণ ব্যর্থ হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। মিসরে নির্বাচিত সরকারের বিরুদ্ধে সামরিক অভ্যুত্থানের পেছনে জেনারেল সিসিকে মূল সমর্থন জোগান বাদশাহ আবদুল্লাহ।
বাদশাহ আবদুল্লাহকে তার রাজত্বকালে অনেক বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হয়েছে। তার অনেক পদক্ষেপ সৌদি সমাজে প্রভাবশালী সালাফিদের একটি অংশের বিরোধিতার মুখে পড়ে। তিনি মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাবশালী ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দল মুসলিম ব্রাদারহুডকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে ঘোষণা দেন। মধ্যপ্রাচ্য থেকে তাদের প্রভাব মুছে দিতে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেন। বাদশাহ আবদুল্লাহর এই পদক্ষেপ উপসাগরীয় দেশগুলোর রাজতন্ত্র এবং স্থিতিশীলতার রক্ষার জন্য বলিষ্ঠ পদক্ষেপ হিসেবে প্রশংসিত যেমন হয়েছে, তেমনিভাবে এ পদক্ষেপ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে। বিশেষত ইসরাইলের সাথে সৌদি আরবের অঘোষিত সম্পর্ক এবং ইসলামপন্থীদের বিরুদ্ধে একধরনের নির্মূল অভিযান অনেক সৌদি নাগরিক স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা দীর্ঘমেয়াদে এই পদক্ষেপ সার্বিকভাবে ইসলাম ও মুসলিম স্বার্থের অনুকূল বলে মনে করেন না।
বাদশাহ আবদুল্লাহ যখন মৃত্যুশয্যায়, তখন ইসলামিক রাষ্ট্র (আইএস) সৌদি সীমান্তে আক্রমণ করে একজন ব্রিগেডিয়ার জেনারেলসহ কমপক্ষে ১১ জন সৌদি সেনাকে হত্যা করে। সৌদি সৈন্যরা এ আক্রমণ প্রতিহত করলেও এটি সৌদি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের হুমকি সৃষ্টি করে। অন্য দিকে সৌদি আরবের পূর্বাঞ্চলীয় শিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। সৌদি বাদশাহর মৃত্যুখবর যখন ঘোষণা করা হয়, ঠিক সে সময়ই ইয়েমেনের ক্ষমতা কার্যত দখল করে নেয় শিয়া হুতি বিদ্রোহীরা। সৌদি সমর্থিত প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিপরিষদ সদস্যরা রাজধানী ত্যাগ করে সৌদি সীমান্তে আশ্রয় গ্রহণ করেন। এ ঘটনা সৌদি নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করে।
আবদুল্লাহর মৃত্যুর পরে সালমান বিন আবদুল আজিজের বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণের মধ্যে দৃশ্যত কোনো ধরনের অপ্রীতিকর বিষয় লক্ষ করা যায়নি। সালমান স্বাস্থ্যগতভাবে খুব স্বস্তিকর অবস্থার মধ্যে নেই। বাদশাহ আবদুল আজিজের প্রভাবশালী স্ত্রী প্রিন্সেস হাসা আল সুদাইরির ছেলে হিসেবে সালমান সৌদি রাজপরিবারের বড় অংশের সমর্থন লাভ করবেন। তিনি এর আগে রিয়াদের গভর্নর, প্রতিরক্ষামন্ত্রী ও যুবরাজ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার ভাই ও সন্তানেরা বিভিন্ন প্রদেশের গভর্নরসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে রয়েছেন। বাদশাহ আবদুল্লাহর আগের সিদ্ধান্ত অনুসারেই ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স মুকরিন বিন আবদুল আজিজ ক্রাউন প্রিন্সের দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। মুকরিনও আবদুল্লাহর মতো বাদশাহ আবদুল আজিদের ক্ষণস্থায়ী এক স্ত্রীর সন্তান। তার মা বাদশাহ আবদুল আজিজের ইয়েমেন বংশোদ্ভূত গৃহপরিচারিকা ছিলেন। আবদুল্লাহ বাদশাহ হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করার পরে প্রভাবশালী সুদাইরি মায়ের সন্তানদের বিপরীতে তার পিতার এ ধরনের ক্ষণস্থায়ী স্ত্রীদের সন্তানদের মধ্যে অনেক যোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়ে আসেন। মুকরিন ছিলেন তাদেরই একজন। তাকে যখন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে সিংহাসনে সম্ভাব্য উত্তরাধিকার করা হয়, তখন তার জ্যেষ্ঠ ভাইদের মধ্যে দু’জন ছিলেন এমন, যারা রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেছেন এবং করছেন।
তাদের মধ্যে আহমদ বিন আবদুল আজিজ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। যিনি বাদশাহ সালমানের নিজ মায়ের সন্তান। মুকরিনকে সিংহাসনে উত্তরাধিকারী করার মাধ্যমে তাৎপর্যপূর্ণ আর যে কাজটি করা হয়, সেটি হলো সৌদি রাজপরিবারের বাদশাহ হিসেবে আবদুল আজিজের নাতিদের সিংহাসনে আরোহণের পথ সুগম করা। সালমান বাদশাহর দায়িত্ব গ্রহণের পর এখনো ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের নাম ঘোষণা করা হয়নি। ধারণা করা হয়, বাদশাহ আবদুল্লাহর ছেলে মোতায়েব বিন আবদুল্লাহ এ দায়িত্ব পেতে পারেন। মুকরিন বিন আবদুল আজিজ বিশেষভাবে এর পক্ষে রয়েছেন বলে জানা যায়। অন্য দিকে, সুদাইরি পরিবারের সন্তানেরা চান পরলোকগত ক্রাউন প্রিন্স নায়েফের ছেলেকে নতুন ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স করা হোক। সৌদি আইন অনুসারে বাদশাহ নতুন ক্রাউন প্রিন্স বা ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্স হিসেবে তিনজনের নাম প্রস্তাব করবেন। এলিজিয়েন্স কাউন্সিল তাদের মধ্য থেকে সর্বাধিক ভোটে একজনকে নির্বাচিত করবেন। এটি প্রযোজ্য হবে পরবর্তী ডেপুটি ক্রাউন প্রিন্সের ক্ষেত্রে। এত দিন পর্যন্ত সৌদি রাজপরিবারে উত্তরাধিকার নিয়ে কোনো দ্বন্দ্ব-সঙ্ঘাতের কথা বাইরে প্রকাশ হতো না। সে অবস্থা এখন আর নেই। বাদশাহ আবদুল্লাহ যেভাবে শক্ত হাতে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পেরেছেন, সেভাবে সালমানও সক্ষম হতে পারেন। কিন্তু আলজেইমার (স্মৃতিভ্রষ্ট) রোগে আক্রান্ত বাদশাহ সালমান কত দিন দায়িত্ব পালনের মতো সুস্বাস্থ্যের অধিকারী থাকেন, সেটা নিশ্চিত বলা যায় না। এরপর মুকরিন বাদশাহর দায়িত্বে এলে রাজপরিবারের অন্তর্দ্বন্দ্ব বেড়ে যেতে পারে। তবে সৌদি বাদশাহ এবং ক্রাউন প্রিন্সদের মধ্যে শশ্রƒবিহীন মুকরিনের সাধারণভাবে যোগ্যতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন দেখা যায় না। এ ক্ষেত্রে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিবেশেই হতে পারে সৌদি আরবের নতুন শাসকদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।
বাদশাহ সালমান বিন আবদুল আজিজ তার পূর্বসূরিদের মৌলিক নীতির মধ্যে বড় ধরনের পরিবর্তন না-ও আনতে পারেন। তবে সালমানকে ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে অধিক সহনশীল মনে করা হয়। তিনি দায়িত্ব গ্রহণের পর মধ্যপ্রাচ্যের সার্বিক পরিস্থিতিতে কিছুটা উন্নতি ঘটতে পারে। বিশেষত মুসলিম ব্রাদারহুড এবং ভিন্নমতাবলম্বী সালাফিদের সাথে সমঝোতার ক্ষীণ হলেও সম্ভাবনা রয়েছে। ইয়েমেনে শিয়া বিদ্রোহীদের ক্ষমতা গ্রহণ এবং ইসলামিক রাষ্ট্রের উগ্রপন্থীদের পক্ষ থেকে নিরাপত্তার জন্য যে হুমকি সৃষ্টি হয়েছে, তা মোকাবেলায় মুসলিম ব্রাদারহুডের সাথে একধরনের সমঝোতায় আসার বিষয়টি সালমান বিবেচনা করতে পারেন। ইতোমধ্যে ইয়েমেনে যে সঙ্কট সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ব্রাদারহুডের প্রতি সহানুভূতিশীল হিসেবে পরিচিত কাতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। এই কাতারই ব্রাদারহুডের সাথে আরব উপসাগরীয় দেশগুলোর শাসকদের যে সঙ্ঘাতপূর্ণ সম্পর্র্ক সৃষ্টি হয়েছে, সেটাকে নমনীয় করার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতার ভূমিকা রাখতে পারে।
- See more at: http://www.dailynayadiganta.com/details.php?nayadiganta=MTAzNzY5&sec=7#sthash.LB7Y0Tic.dpuf