১৯ আগস্ট ২০১৯, সোমবার
Choose Language:

সর্বশেষ
ট্রাইবুনাল
মীর কাসেমের প্রাণদন্ড
৩ নভেম্বর ২০১৪, সোমবার,
১৯৭১ সালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আটক বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কর্মপরিষদ ও নির্বাহী পরিষদ সদস্য এবং দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশনের চেয়ারম্যান মীর কাসেম আলী মিন্টুকে দুটি অভিযোগে মৃত্যুদন্ডাদেশ দিয়েছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। গতকাল রোববার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসানের নেতৃত্বে অপর দুই সদস্য বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া ও বিচারপতি শাহীনুল ইসলাম সমন্বয়ে গঠিত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় দেন। মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে সরকারপক্ষ আনীত মোট ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১০টি প্রমাণিত হয়েছে বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ১১ ও ১২ নম্বর অভিযোগে তাকে মৃত্যুদ- দেয়া হয়েছে। ১১ নম্বর অভিযোগে সর্বসম্মতিক্রমে মৃত্যুদ- দিলেও ১২ নম্বর অভিযোগের রায়ে বিচারপতি মুজিবুর রহমান মিয়া দ্বিমত পোষণ করেছেন। ফলে এই অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে সংখ্যাগরিষ্ঠের রায়ে মৃত্যুদন্ড দেয়া হয়। এই প্রথম ট্রাইব্যুনাল থেকে কোনো মামলার দ্বিধাবিভক্ত রায় ঘোষণা করা হলো। মীর কাসেম আলীর রায়ের মাধ্যমে আওয়ামী মহাজোট সরকার গঠিত দুই ট্রাইব্যুনালে মানবতাবিরোধী অপরাধের মোট ১১টি মামলার রায় ঘোষণা করা হলো।
৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ের ১১ পৃষ্ঠার সারাংশ পাঠকালে মীর কাসেম আলী ট্রাইব্যুনালে হাজির ছিলেন। এ সময় তিনি ছিলেন সম্পূর্ণ শান্ত। রায় শেষে কাঠগড়ায় প্রদত্ত প্রতিক্রিয়ায় তিনি মিথ্যা মামলা, মিথ্যা সাক্ষী, কালো আইনে বিচার এবং ফরমায়েশী রায় বলে উল্লেখ করে বলেন, সত্য বিজয়ী হবেই, শীঘ্রই শীঘ্রই শীঘ্রই। এটুকু বলার পরেই তাকে এজলাস কক্ষ থেকে নামিয়ে নীচতলায় হাজতখানায় নিয়ে যাওয়া হয়। রায় ঘোষণাকালে সরকারপক্ষ ও আসামীপক্ষের আইনজীবীরা উপস্থিত ছিলেন।
মৃত্যুদন্ড দেয়া ১১ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, শহীদ জসিম উদ্দিনসহ ছয়জনকে অপহণের পর নির্যাতন করা হয়। এতে জসিমসহ পাঁচজন নিহত হন এবং পরে লাশ গুম করা হয়। ঈদের পর জসিমকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করেন মীর কাসেম আলী।
ফাঁসির দন্ড দেয়া অপর ১২ নম্বর অভিযোগে বলা হয়, জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীসহ তিনজনকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়। এতে দুজন নিহত হন এবং তাদের লাশ গুম করা হয় মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে।
এছাড়া গতকাল প্রদত্ত রায়ে ২ নম্বর অভিযোগে ২০ বছর, ৩, ৪, ৬, ৭, ৯ ও ১০ নম্বর অভিযোগে ৭ বছর করে এবং ১৪ নম্বর অভিযোগে মীর কাসেম আলীকে ১০ বছর মিলিয়ে মোট ৭২ বছর কারাদন্ড দিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল। এগুলো পর্যায়ক্রমে চলতে থাকবে বলে রায়ের সারাংশে উল্লেখ করা হয়। তবে ১১ ও ১২ নং অভিযোগে মৃত্যুদন্ড দেয়ার পর সেটাকেই সিঙ্গেল সেন্টেন্স (একমাত্র দন্ড) হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ১, ৫, ৮ ও ১৩ নম্বর অভিযোগ সরকারপক্ষ প্রমাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে মর্মে উল্লেখ করে  ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে বেকসুর খালাস প্রদান করেছেন।
২০ বছর কারাদন্ড দেয়া ২নং অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেমের নেতৃত্বে ১৯৭১ সালের ১৯ নবেম্বর চাকতাই থেকে লুৎফর রহমান ফারুককে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন করা হয় এবং বাড়িঘরে আগুন দেয়া হয়।
৭ বছর কারাদন্ড দেয়া ৩ নং অভিযোগে বলা হয়, ২২ অথবা ২৩ নবেম্বর আসামীর নেতৃত্বে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে তার কদমতলা বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। ৪নং অভিযোগে বলা হয়, ডাবলমুরিং থানায় সালাহউদ্দিন খানকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে আল বদর বাহিনী কর্তৃক নির্যাতন। ৬নং অভিযোগে বলা হয়, চট্টগ্রাম শহরের একটি চায়ের দোকান থেকে হারুনুর রশিদ নামে একজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেল এবং সালমা মঞ্জিলে নির্যাতন করা হয়। ৭নং অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে সাত/আটজন যুবক ডাবলমুরিং থানা থেকে সানাউল্লাহ চৌধুরীসহ দুজনকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে নির্যাতন করা হয়। ৯নং অভিযোগে বলা হয়, ২৯ নবেম্বর সৈয়দ মো. এমরানসহ ছয়জনকে অপহরণ ও নির্যাতন করা হয়। ১০নং অভিযোগে বলা হয়, কাসেমের নির্দেশে মো. যাকারিয়াসহ চারজনকে অপহরণ ও নির্যাতন করা হয়।
রায়ে ১০ বছর কারাদন্ড প্রদত্ত ১৪ নং অভিযোগে বলা হয়, নাসির উদ্দিন চৌধুরীকে অপহরণ করে নির্যাতন করা হয়।
১, ৫, ৮ ও ১৩ নং অভিযোগ প্রমাণ না হওয়ায় ট্রাইব্যুনাল মীর কাসেম আলীকে বেকসুর খালাস দিয়েছেন। ১ নং অভিযোগে বলা হয়, মীর কাসেম আলীর নেতৃত্বে আলবদর বাহিনী ১৯৭১ সালের ৮ নবেম্বর ওমরুল ইসলাম চৌধুরীকে চাকতাই ঘাট থেকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে কয়েক দফায় চট্টগ্রামের আন্দরকিল্লার ডালিম হোটেল, পাঁচলাইশ থানার সালমা মঞ্জিল এবং একটি চামড়ার গুদামে নিয়ে নির্যাতন করা হয়। ৫ নং অভিযোগে বলা হয়, ২৫ নবেম্বর আনোয়ারা থানার আবদুল জব্বারকে তার নিজ বাসা থেকে ধরে নিয়ে ডালিম হোটেলে মীর কাসেম আলীর সামনে হাজির করা হয়। এরপর তাকে নির্যাতন করে ছেড়ে দেয়া হয়। ৮নং অভিযোগে বলা হয়, ২৯ নবেম্বর রাতে নুরুল কুদ্দুসসহ চারজনকে অপহরণ করে ডালিম হোটেলে নিয়ে নির্যাতন। ১৩নং অভিযোগে বলা হয়, সুনীল কান্তিকে অপহরণ ও নির্যাতন করা হয়।
তবে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে আনীত ১৪টি অভিযোগের মধ্যে ১২টি অভিযোগের পক্ষে প্রসিকিউশন সাক্ষ্য-প্রমাণ ও আইনী যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেন। ১ ও ৫ নম্বর অভিযোগে সাক্ষী না থাকায় যুক্তিতর্ক উপস্থাপন করেননি প্রসিকিউশন। এই হিসেবে প্রসিকিউশন উপস্থাপিত অভিযোগের ১২টির মধ্যে ২টি বাদে সবই প্রমাণিত বলে রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
রায় উপলক্ষে গতকাল রোববার সকাল সোয়া নয়টার দিকে কড়া নিরাপত্তায় মীর কাসেম আলীকে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে আনা হয়েছে। সেখানে তাকে হাজতখানায় রাখা হয়। সেখান থেকে বেলা ১০টা ৩৫ মিনিটে মীর কাসেম আলীকে দ্বিতীয় তলার এজলাস কক্ষের কাঠগড়ায় নেয়া হয়। ১০.৪০ মিনিটে তিন বিচারপতি উপচে পড়া এজলাস কক্ষে আসন গ্রহণ করেন। কার্য তালিকায় ১ ও ২ নম্বরে থাকা মামলা দুটির বিষয়ে দরখাস্তের সংক্ষিপ্ত মীমাংসা দেয়ার পর বেলা ১০টা ৫৫ মিনিটে মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে মোট ৩৫১ পৃষ্ঠার রায়ের মধ্যে ১১ পৃষ্ঠা সারসংক্ষেপ ট্রাইব্যুনালে পড়ে শোনান ট্রাইব্যুনাল-২ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি ওবায়দুল হাসান। বেলা সাড়ে ১১টার দিকে (চূড়ান্ত) তা শেষ হয়।
রায় ঘোষণাকালে মীর কাসেম আলীর পক্ষে ছিলেন এডভোকেট মিজানুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সাইফুর রহমান, ফরিদ উদ্দিন খান, ব্যারিস্টার তানভীর আহমেদ আল আমিন, এহসান সিদ্দিক, ইমরান সিদ্দিক, মীর আহমাদ বিন কাসেম প্রমুখ। অপরদিকে সরকার পক্ষে ছিলেন চিফ প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপু, প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুম, তুরিন আফরোজসহ অন্যান্য প্রসিকিউটর। বিপুল সংখ্যক সাংবাদিক, আইনজীবী ছাড়াও ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি, গণজাগরণ মঞ্চ ও সরকার পক্ষের বিপুল সংখ্যক গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব এজলাস কক্ষে উপস্থিত ছিলেন। আর আদালতের মূল ফটকের সামনেই ছিল শ্লোগানরত মুক্তিযোদ্ধাসহ সরকার পক্ষের বিপুল সংখ্যক দলীয় ক্যাডার ও কর্মী।
গত বছরের ১১ ডিসেম্বর থেকে ১৭ এপ্রিল পর্যন্ত কাসেম আলীর বিরুদ্ধে তদন্ত কর্মকর্তাসহ ২৪ জন সাক্ষ্য দেন। অন্যদিকে আসামীপক্ষে সাফাই সাক্ষ্য দেন তিনজন। গত ৪ মে উভয়পক্ষের যুক্তি উপস্থাপন শেষে মীর কাসেম আলীর মামলা রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন ট্রাইব্যুনাল।
জামায়াতে ইসলামীর আমীর মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীর মৃত্যুদন্ডের রায়ের প্রতিবাদে ডাকা হরতালের মধ্যে গতকাল এই রায় দেয়া হলো। রায় ঘিরে সুপ্রিম কোর্ট ও এর আশপাশের এলাকায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়। সকাল থেকে তল্লাাশি করে সবাইকে আদালতে প্রবেশ করতে দেয়া হয়। ট্রাইব্যুনাল এলাকায় যান চলাচলেও নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছিল।
গত বছরের ১৮ নবেম্বর মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের ওপেনিং স্টেটমেন্ট উপস্থাপনের মধ্য দিয়ে বিচারকাজ শুরু হয়। এরপর ১১ ডিসেম্বর তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ২০১৩ সালের ১৬ মে প্রসিকিউটর জেয়াদ আল মালুমসহ প্রসিকিউশন টিম ১৪টি অভিযোগে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ ট্রাইব্যুনালের রেজিস্ট্রার বরাবর দাখিল করেন। গত ৫ সেপ্টেম্বর মীর কাসেম আলীকে ১৪টি ঘটনায় অভিযুক্ত করে অভিযোগ গঠন করেন ট্রাইব্যুনাল। ২০১২ সালের ১৭ জুন মীর কাসেম আলীর বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনাল থেকে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করলে ওইদিনই মতিঝিলে দৈনিক নয়া দিগন্ত পত্রিকার কার্যালয় (দিগন্ত মিডিয়া করপোরেশন) থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
http://www.dailysangram.com/news_details.php?news_id=163019